সেক্টর কমান্ডারদের সাথে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সরকারদের একটা ইন্টারেস্টিং স্নায়ুযুদ্ধ লক্ষ্য করি আমি। মেজর (অবঃ) এম এ জলিল ছিলেন সেক্টর নয় এর সেক্টর কমান্ডার এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি একাধারে আরও ছিলেন যুদ্ধপরবর্তী প্রধান বিরোধী দল জাসদ এর সভাপতি আবার স্বাধীন দেশের প্রথম রাজবন্দী! তাই ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটায় তিনি নিঃসন্দেহে একজন বড় কুশীলব। 'অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা' বইটা পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে লেখক নিজের সুপ্ত সমস্ত রাগ বইতে ঢেলে দিতে চেয়েছেন। স্বভাবতই তাঁর ক্ষোভ এবং ক্ষোভ হতে উদঘাটিত কিছু প্রশ্ন ইতিহাসকে একটা কঠিন ট্যাকেল দিতে সক্ষম।
মূলতঃ এই বইতে তিনি বঙ্গবন্ধু, আওয়ামীলীগ সরকার, প্রবাসী সরকার, সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা, ভারতের কূটচালকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সমালোচনা করেছেন। এমনকি সমালোচনার কোনো ক্ষেত্রে তিনি মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও প্রশ্ন করতে ছাড়েননি। তাজউদ্দীন আহমেদ বা প্রবাসী সরকার এর বিপক্ষে মত খুঁজতে যেয়ে আমার এই বইটি চোখে পড়ে। আমার ধারণা আমাদের দেশে যারাই ইতিহাস বা রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করেন, তারা নিজ বেলায় বেজায় অন্ধ হলেও বিপক্ষের সমালোচনাটা বেশ ভালো করেন। যেমন এ বইতে তিনি প্রবাসী সরকার, পাপা টাইগার জেনারেল ওসমানীকে নিছক দুধভাত হিসেবে ধুয়ে দিয়েছেন। এবং প্রবাসী সরকার কর্তৃক বন্দী হওয়ায় তাঁদের প্রতি ক্ষোভ ঝাড়তে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।
অনেকের মতো তিনিও বঙ্গবন্ধুকে স্রেফ ক্ষমতালোভী একজন নেতা হিসেবেই দাবী করেছেন। আওয়ামীলীগ সরকারের নেতৃবৃন্দকেও একই ভাবেই সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করেছেন। মেজর জলিল মুক্তিযুদ্ধের একজন সরাসরি যোদ্ধা। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে তাঁর অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল এগারটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। হয়তো সেসব অসামান্য অবদানের কারণেই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনার নানান ক্লাস(!) বিভাজন করতে পেরেছেন। জীবন বাঁচানোর তাগিদ, তারুণ্যের আবেগ, নেতার ডাক, এসবকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের দূর্বলতম চেতনা হিসেবে প্রমাণ করেছেন। যুদ্ধে সাধারণ মানুষ নানা কারণেই অংশগ্রহণ করেছিল। সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও বহু মানুষ রেখেছিলেন বহু অবদান। যেখানে বাজি জীবনটাই, সেটাকেও ঠিক কোন আদর্শের চেতনা দিয়ে তিনি তুচ্ছ করতে চেয়েছেন সেটা একটা প্রশ্ন থেকে যায়।
মেজর জলিল দেশের সংবিধান ও ভারত প্রীতি নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কা জানিয়েছেন বইয়ের অধিকাংশ অংশজুড়েই। তিনি কোনোভাবেই একটি সেক্যুলার দেশের পক্ষপাতি ছিলেন না, বরং তিনি বেশিরভাগ ধর্মালম্বীর দেশ হিসেবে দেশকে সাংবিধানিকভবেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। এ ব্যাপারটি সংবিধানে যুক্ত না হওয়াকে তিনি সরাসরি ভারতীয় চক্রান্ত বলেই আখ্যা দেন। মেজর জলিল, তাঁর কর্মকান্ড ও জাসদ সংক্রান্ত বিবিধ আলোচনা-সমালোচনা পাওয়া যাবে মহিউদ্দিন আহমেদ রচিত, 'জাসদের উত্থান পতন ও অস্থির সময়ের রাজনীতি' বইতে।
আলোচনার প্রথম উক্তিটির কাছে ফিরে যাই আবার..., এজেন্ডা বা বায়াসনেস ছাড়া আমাদের কোনো ইতিহাস বই নেই। এই কথাটি রূঢ় সত্য। 'অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা'র সবচাইতে বড় দোষ আমি বলবো, লেখক ইতিহাসের রচনায় আমিত্ব থেকে বের হতে পারেননি কোনোভাবেই। যেকারণে সরকারি দল যেমন যেকোনো সমালোচনাকে বিরোধীদলীয় চক্রান্ত মনে করে, সেই একই দোষে তিনিও দুষ্ট। স্পষ্টতই সকল আলোচনা একপাক্ষিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলেও আমার মনে হয় উত্থাপিত প্রশ্ন ও এক্যুজেশন গুলোর কারণে হলেও বইটি গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসকে ব্যালেন্স করবার জন্য ভিন্নমত জরুরি। তবে সেই ভিন্নমত গুলো স্রেফ মৌখিক বক্তব্য না হয়ে কংক্রিট এভিডেন্স সহকারে হলে ইতিহাস সহজে লাইনচ্যূত হবার চান্স পায়না। তাই সমালোচনা চলুক!
বইয়ের দুটো অংশ: অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা ৩/৫ আমার কৈফিয়ত ১/৫
প্রথমাংশে লেখক মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু সমস্যা চিহ্নিত করেছেন। সমস্যা না বলে জাতীয় ক্রাইসিস বলা যায়। শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই স্বাধীনতা চাইতেন কি না? ছাত্রনেতাদের চাপে তিনি সাতই মার্চের ভাষণ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তার ভেতর অখন্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার আগ্রহ ছিল কি না - এসব সংঘাতিক কথা দিয়ে শুরু করেছেন। (সাংঘাতিক কারণ কথাগুলো দেশের একটা বড়ো জনগোষ্ঠীর ভালো লাগার কথা নয়) এরপর তিনি যুদ্ধকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অব্যবস্থাপনা নিয়ে আক্ষেপ করেছেন ও এতদসংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়েছেন। পাশাপশি ভারত সরকার, ভারতীয় সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা কিভাবে যুদ্ধকালীন সময়ে নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষায় মুক্তিযোদ্ধাদের বলির পাঁঠা হিসেবে লেলিয়ে দিয়েছে ও এক তরফা প্রক্সি ওয়ার চালিয়েছে, এই নিয়ে অভিজ্ঞতা ও অভিমত দিয়েছেন। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিলো, যুদ্ধ যদি ভবিতব্য স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের হয়ে থাকে, তবে ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কেনো ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে আত্মসমর্পণ করলো? সেই অনুষ্ঠানে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের নেতৃবৃন্দ কোথায় ছিলেন? আরো সুন্দর একটি প্রশ্ন: বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম এ জি ওসমানী তখন কোথায় ছিলেন এবং দেশ স্বাধীন হবার কয়েক সপ্তাহ পরেও তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি কেনো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদিও তিনি দেন নি, তবুও এসবের উত্তর জানা অত্যাবশ্যক বলে আমি মনে করি। সদ্য স্বাধীন দেশে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর করা লুটপাট ও দেশের মানুষের সেই ব্যাপারে নির্বিকারত্ব নিয়ে তিনি হতাশা প্রকাশ করেছেন। স্বাধীন হবার পরেও সরকারের কিছু দূর্ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি লিখেছেন তার বইয়ের প্রথমাংশে। সর্বোপরি তাঁর বইটা ভালো লাগবে কিছু অমীমাংসিত ও বিতর্কিত (অ-তর্কিত ও বলা যায়) প্রশ্ন করা ও এসব রহস্য উন্মোচনের যে এখনো অবকাশ আছে, এই ব্যাপারটা তুলে ধরার জন্যে। লিখন শৈলীতে তাঁর একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জাত্যাভিমান এবং জাতীয় ক্রাইসিস মোমেন্ট এ নীতিনির্ধারকদের অব্যবস্থাপনার প্রতি তীব্র ক্ষোভ লক্ষ্য করা যায়। (এরপর আমরা যুগে যুগে আমরা এই দেশে ক্রাইসিস হ্যান্ডেল করার সময়ের অব্যবস্থাপনা দেখতে থাকবো)
আমার কৈফিয়ত অংশে তিনি দাবি করেন, তিনিই বাংলাদেশে প্রথম "বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র" ধারণা/ মতবাদের প্রবক্তা। (স্বল্পজ্ঞানের আলোকে এই মতবাদের সাথে সিরাজুল আলম খানের সংশ্লিষ্টতা বেশি আছে বলে মনে করি, তবে আরো জানার অবকাশ আছে আমার) এরপর তিনি কেনো এই দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অতি জরুরী, সদ্যশিশু দেশের নাজুক অবস্থাকে তুলে ধরে সেটাকে তৎকালীন সরকারের জাতীয় নীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা না করাকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই অংশের ন্যারেটিভ একদম ভালো লাগে নি আমার ব্যক্তিগতভাবে। বেশিরভাগ যুক্তির ভেতর তথ্য ও যুক্তির চেয়ে আবেগকে প্রাধান্য দেয়া এবং "সমাজতন্ত্র না থাকলে দেশ উচ্ছন্নে যাবে" মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করেছি। বইয়ের এই অংশটা খুবই চাইল্ডিশ, একপেশে ও আত্মকেন্দ্রিক। অবশ্য পুরো বইটাই যথেষ্ট আত্মকেন্দ্রিক ন্যারেটিভ এ লেখা।
অরক্ষিত স্বাধী���তাই পরাধীনতা'। লেখক : মেজর এম এ জলিল।
'যে জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণকে যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে বেকার, অলস যুবকদের মত তাস খেলায় মত্ত হতে পারে সে জাতির দুর্ভাগ্য সহজে মোচন হবার নয়' - মেজর জলিল।
বইটিতে আলোচনা করা হয়েছে বেশ কিছু বিষয়। যা নিয়ে অনেকেই বিতর্ক করেছেন। যেমন স্বাধীনতাপূর্ব পঠভূমি, মুক্তিযুদ্ধ ও সে সময়ে আওয়ামী লীগারদের ভারতে আয়েশি জীবন, যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা ২৫শে মার্চের আগে শেখ সাহেবের দ্বিমুখী আচরণ, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সেনাদের লুটাপাটের মহড়া ও বাহত্তরের সংবিধান ও তথাকথিত রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সহ নানা বিষয়। তার মধ্যে কিছু বিষয় আলোচনার দাবি রাখে। সেগুলো যদি পর্যায়ক্রমে সাজানো হয় তাহলে এরকম দাঁড়ায়, ১. স্বাধীনতাপূর্ব ঘটনাপ্রবাহ। ২. স্বাধীনতা যুদ্ধ ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। ৩. ভারতের মুখোশ উন্মোচন। ৪. সংবিধান রচনা ও ভারতীয় অপপ্রভাব।
তবে লেখকের পরিচয়টি সর্বাগ্রে দেয়া আবশ্যক। তাতে বোঝা যাবে কথাগুলো কে বলছেন। কিংবা সেগুলো কি আসলেই মূল্যায়নের দাবি রাখে।
মেজর এম এ জলিল; উপেক্ষিত অবজ্ঞাত সেনানী : মেজর জলিলের জন্ম বরিশালের উজিরপুরে। ১৯৬৫ সালে পাক মিলিটারিতে কমিশন। যোগদান করেন ট্যাংক বাহিনীতে। পাক-ভারত যুদ্ধের একজন সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন জলিল। ১৯৭০ এ মেজর পদে উন্নীত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেব। নয় নম্বর সেক্টর ছিল মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তম সেক্টর। যার নেতৃত্বে ছিলেন এই সাহসী মেজর। সম্মুখযুদ্ধে একের পর এক জয়লাভ, সফল গেরিলা অভিযান এ লড়াকু সেনানীকে দেয় আন্তর্জাতিক পরিচিতি। প্রশংসিত হন বিবিসি সহ অনেক সংবাদ মাধ্যমে। কিন্ত মুক্তিযুদ্ধে যার অসামান্য ভুমিকা স্বীকৃত হতে পারত সবার আগে তাকেই কেন যেন পেছনে ঠেলে দেয়া হয় অবজ্ঞাভরে। কারণ একটাই, তার চির প্রতিবাদী সত্তা। একাত্তরে ভারতীয় বাহিনী এ গরীব দেশ থেকে ত্রিশ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র সহ সম্পদ লুট করে। মেজর জলিল এ লুটাপাটের মহড়াকে বুলেট দিয়ে প্রতিরোধের হুমকি দিয়েছিলেন। যার ফলে তার স্বাধীন দেশে তাকেই বরণ করতে প্রথম কারাবরণ। আফসোস। মেজর জলিল এরপরে যোগ দেন জাসদে। হয়েছিলেন দলের সভাপতি। '৭৫ এর পট পরিবর্তনে তিনি ...
১. স্বাধীনতাপূর্ব ঘটনাপ্রবাহ :
সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে আওয়ামী লীগ। অভিযোগ ওঠে, এই বিজয়ে হাত ছিল ভারতের। সাতচল্লিশের পার্টিশনে দেশ ছেড়ে যাওয়া হিন্দুরা বাংলাদেশে এসে নাকি ভোট দিয়েছিল এ নির্বাচনে। তবে মেজর জলিল স্বীকার করেছেন এসব কথার সত্যতা তলিয়ে দেখা হয়নি। ৭ই মার্চ জ্বালাময়ী ভাষণ দেন শেখ সাহেব। অথচ 'স্বাধীনতার সংগ্রাম'এর ডাক দিয়েও তিনি ছিলেন সমঝোতার আশায়। বসতে চাচ্ছিলেন পাক সরকারের সাথে আলোচনায়। শেখ সাহেব একদিকে স্বাধীনতাকামী ছাত্র নেতাদের সামাল দিয়ে অপর দিকে পাকিস্তানের সাথে আপসে আসতে চাচ্ছিলেন। মেজর জলিল বলেন, 'তার এ স্ববিরোধী ভূমিকার জন্য ইতিহাস তাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করালে তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না'।
২. স্বাধীনতা যুদ্ধ ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব :
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে আওয়ামীলীগ নেতারা দলবেধে ভারতে হিজরত করেন। এদেশে তরুণ যুবকদের তাজা রক্তে জমিন রাঙা হয়ে উঠছিল যখন স্বাধীনতার চেতনাধারী লীগাররা কোথায় ছিলেন এ প্রশ্ম তুলেছেন অনেকেই। তারা মুজিবনগরে সরকার প্রতিষ্ঠা করেই খালাস। শত মা-বোনের সম্ভ্রমহানী, হাজার যুবকের প্রাণবায়ু যে বাতাসে হাহাকার করে বেড়ায় সে দেশ ছেড়ে পরদেশে কি করছিলেন আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভা? প্রকৃত দেশপ্রেম থাকলে ৮ নাম্বার থিয়েটার রোডে না থেকে তারা থাকতে পারতেন কোন গেরিলা যুদ্ধের সামনের কাতারে। কিন্ত তারা তা থাকেননি। তারা ৫৬/এ, বালিগঞ্জের দোতাল বাড়িতে বসে বসে তাস খেলে দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখেছেন। মেজর জলিল ভারাক্রান্ত মন নিয়ে এসব দেখে বলেছিলেন, 'যে জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণকে যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে বেকার, অলস যুবকদের মত তাস খেলায় মত্ত হতে পারে সে জাতির দুর্ভাগ্য সহজে মোচন হবার নয়'।
মেজর জলিল অস্ত্র সরবারহের জন্য ভারতে যান এপ্রিল মাসে। সাক্ষাৎ করেন জেনারেল অরোরার সাথে। প্রথম সাক্ষাতে বিশ্বাসযোগ্যতা পেলেন না। সেক্টর কমান্ডার হিসেবে পরিচয় প্রমাণ করতে জেনারেল অরোরাকে তাজউদ্দীন ও ওসমানী সাহেবের রেফারেন্স দিয়েছিলেন। জেনারেল এই দুই মহান নেতা সম্পর্কে বলেছিলেন, 'ঐ দু'টি ব্লাডি ইঁদুরের কথা আমি জানি না। অন্য কোন স্বাক্ষী থাকলে নিয়ে আস।' এরপর তার 'মেজর' পরিচয় জেনে ভারতীয় বাহিনী তাকে ইন্টিলিজেন্স এজেন্টের মাধ্যমে জেরা করে। উদ্দেশ্য পাকিস্তান আর্মির গোমর বের করা। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র প্রদান নয় পাক বাহিনী সম্পর্কে তথ্য নেয়াই ছিল ভারতীয় বাহিনীর মূল উদ্দেশ্য।
মেজর জলিল কলকাতায় বালিগঞ্জের আবাসিক এলাকার বাড়িতে গিয়ে দেখেন প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রীসভা নিয়ে (মোস্তাক ছিলেন না সেখানে) তাস খেলছেন। ওসমানী সাহেব সম্মানিত বন্দীর জীবন যাপন ছাড়া কিছুই করতেন না। সবাই ছিল ভারতের হাতে জিম্মির মত।
ভারতে হিজরতকারীরা জড়িয়েছিলেন যৌন কেলেঙ্কারিতেও। জহির রায়হান জানতেন তার অনেকাংশই। মেজর জলিল লিখেছেন,
'ভারতে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অনেক কিছুই জানতে চেয়েছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক ও চিত্রনির্মাতা জহির রায়হান। তিনি জেনেছিলেন অনেক কিছু, চিত্রায়িতও করেছিলেন অনেক দুর্লভ দৃশ্যের। কিন্ত অতসব জানতে গিয়েই বেজায় অপরাধ করে ফেলেছিলেন। ... ভারতের মাটিতে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের চুরি-দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, যৌন কেলেঙ্কারি, বিভিন্ন ভোগ-বিলাসসহ তাদের অপকর্মের প্রচুর প্রামাণ্য দলিল ছিল - ছিল সচিত্র দৃশ্য।'
মেজর জলিল আরও লিখেছেন,
'শরণার্থী শিবির থেকে অসহায় যুবতী হিন্দু মেয়েদের কোলকাতা শহরে চাকরি দেবার নাম করে সেই সকল আশ্রয়হীনা যুবতীদের কোলকাতার বিভিন্ন হোটেলে এনে যৌন তৃষ্ণা মিটাতে বিবেকে দংশন বোধ করেন নি। তারা বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের নেতা হবে না তো হবে আর কে বা কারা! হানাদার পাক বাহিনীর একমাত্র যোগ্য উত্তরসূরি তো তারাই - আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ!
৩. ভারতের মুখোশ উন্মোচন :
যে ভারতীয় বাহিনী গেরিলা যোদ্ধাদের পেছনের সারিতে থেকে পাক সেনাদের বুলেট থেকে বাঁচতে ছিল সদা সপ্রতিভ ১৬ ই ডিসেম্বর তারাই যেন হটাৎ করে সামনের কাতারে চলে আসে।
মুক্তিযুদ্ধকে দেয়া হল পাক ভারত যুদ্ধের রূপ। কি জঘন্য মিথ্যাচার! আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কর্নেল ওসমানীকে ভারত থেকে আসার অনুমতি দেয়া হল না। প্রশ্ন উঠেছিল ভারত সরকার কি তাকে রাজবন্দী হিসেবে আটকে রেখেছিল কি না? চুক্তি স্বাক্ষরিত হল অরোরা আর নিয়াজীর মধ্যে। অথচ বাংলাদেশ আর্মির অনেক সেক্টর কমান্ডার সহ অনেকেই ছিলেন সেখানে। বৃথা গেল আমাদের কষ্টার্জিত বিজয়। ইতিহাস স্বীকার করে নিয়েছে এ বিজয় ভারতের। এ পাক-ভারত যুদ্ধ। বাংলার সাহসী সন্তানদের এখানে কিইবা কৃতিত্ব!
শুধু বিজয়ের কৃতিত্ব লুট কর ক্ষ্যান্ত হয়নি ভারতীয় বাহিনী। শুরু করে লুটপাটের মহড়া। ট্রাকের পর ট্রাক অস্ত্র পাচার করা হয় ওপারে। বাথরুমের আয়নাও রেহাই পায়নি লুটেরাদের ছোবল থেকে। প্রাইভেট কারগুলো রক্ষা করতে মেজর জলিল সব গাড়ি রিকুইজিশন করে সংরক্ষণ করেন।
খুলনা ও আশেপাশের এলাকার চার্জে ছিলেন ভারতীয় জেনারেল দালবীর। মেজর জলিল তাকে তার লুটপাটের জন্য হু���কি দিয়ে পাঠান - দেখা মাত্রই গুলি করা হবে। কিন্ত তার পরিণতি মোটেও সুখকর হয়নি। ৩১শে ডিসেম্বর তাকে করা হয় গ্রেফতার।
বাংলাদেশের ইতিহাস যে-ই লিখতে বসেছে, মনে হয়েছে একধরণের পক্ষপাতদুষ্টতার কালো ছায়া তার উপরে ভর করেছে। মেজর জলিল ও মনে হয় সেই কালো ছায়ার নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেননি।আওয়ামীলীগের ব্যাক্তিবর্গের উপর বিষোদগার যেমন ঢেলে দিয়েছেন, সেই সাথে উত্থাপ্ন করেছেন কিছু চমৎকার প্রশ্নের। সব মিলিয়ে কেমন জগাখিচুরি মনে হয়েছে।
লেখক স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের রাজনীতি, রাজনৈতিক দর্শন ও শাসকদের নিয়ে আলোচনা করেছেন।নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও জনগণের চাওয়া, অধিকার নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বইয়ের দুইটি লাইন-'রাজনীতির এ দুঃখজনক পরিণতি দেশ ও জাতির জন্য সুখের খবর তো নয়ই,বরং ভয়াবহ অমঙ্গলের হাতছানি।এ অবস্থার কারণেই আজ জাতি সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস ও বিবেক হারিয়ে ফেলেছে প্রায়।'
যুদ্ধের এক্স্যাক্ট পরেই কী হইছে সেইটা জানতে হইলে এই বইটা পড়া অবশ্যই জরুরী। সেই সাথে শেখ মুজিবর রহমান কেমন করে ভোল পাল্টাইতেন সেইটাও এই বই থেকে আইডিয়া পাবেন। আর ফ্রন্টে যুদ্ধ করা জলিলরা কবে হাইরা গেল, কবে তাদের হারার মাধ্যমে দেশও হাইরা গেল সেইটাও এই বইতে টের পাইবেন। ৭২-৭৫ এর পটভূমি বুঝতে হইলে আর ৭৫ এর ১৫ আগস্টের ক্ষোভের সূচনা বুঝতে চাইলে এই বই কোনোভাবেই এড়াইতে পারবেন না। পড়ছিলাম ৫ই আগস্টে স্বৈরাচারী সরকার পতনের পর, রিভিউ লেখবো লেখবো কইরা লেখা হয় নাই। এইটাও রিভিউ না, জাস্ট বইটার গুরুত্ব বুঝাইতে কয়েকটা শব্দ ব্যবহার করলাম।
মেজর জলিল... বাংলাদেশের স্বাধীনতা পর প্রথম যে বিরোধী দল(জাসদ) তৈরি হইছিলো তার সভাপতি ছিলেন মেজর জলিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় ৯ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। স্বাধীনতার পর ভারতীয় বাহিনীর লুটপাটের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম তিনিই প্রতিবাদ করেন। যার ফলে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ভারতীয় বাহিনীর হাতে আটক হন। সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ভাঙার অপরাধে কোর্টমার্শাল হয় তার বিরুদ্ধে। সেখানে আবার বিচারক হিসেবে ছিলেন ১১ নাম্বার সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের।
মনে করা হয় ৯ মাস যুদ্ধ করার পর স্বাধীন দেশে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কারনেই তিনি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় সমাজতন্ত্রী দল (জাসদ)। তবে স্বাধীন দেশে জাসদের ভূমিকাও খুব একটা পছন্দনীয় ছিলো না। ব্যাংক ডাকাতি, পুলিশ ফাড়ি লুট, আওয়ামিলীগের এমপিদের প্রকাশ্যে খুনের মত অভিযোগ ছিলো জাসদের বিরুদ্ধে। ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবকে খুন করার পিছনেও জাসদের হাত এমন সন্দেহ করা হয়ে থাকে। ৭ নম্ভেবরের অভূত্থানের পিছেনেও রয়েছে জাসদের হাত। তবে সেসবের অনেক কিছুই বইতে নাই।
বইটা মূলত ভারতীয় বাহিনীর লুটপাটের ঘটনার বর্ননার জন্যই বেশি বিখ্যাত। একই সাথে যুদ্ধের সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারেরও প্রচুর সমালোচনা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আসলে কি বুঝায় বা যে চেতনার কথা বলা হয় সেই সকল কাদের থেকে সৃস্টি এসব নিয়েই কথা বলেছেন জোড়ালো ভাবে।
বইটার সার্থকতা হল এটা আমাকে ভাবাতে পেরেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা'র ক্ষেত্রে! তবে ধর্মকে অনেকটাই বেশী প্রশ্রয় দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে।
মেজর (অব.) এম. এ. জলিল- স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী। ছিলেন ৯ নং সেক্টরের কমান্ডার। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের যে সাহায্য করেছিল সেটা কারোরই অজানা নয়। কিন্তু এই সাহায্য করে তারা বাংলাদেশের ওপর যে দাদাগিরি দেখাচ্ছিল, সেটা তিনি মেনে নিতে পারেননি। এই ছিল তার দোষ। সাম্প্রতিক সময়েও আমরা দেখেছি, আওয়ামী আমলে যারাই ভারতের বিপক্ষে কিছু বলেছে তাদেরকেই নাজেহাল করা হয়েছে। তাদেরকে নানা অত্যাচার-নির্যাতন, জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই বই পুস্তকে পড়ে আসছি, “ভারত বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু।” কিন্তু হায়দ্রাবাদ, সিকিম দখলে নেয়া ভারত কি সত্যিই আমাদের স্বাধীনতা নিঃস্বার্থভাবেই চেয়েছিল? আর কোনো স্বার্থ যদি নাও থাকে, তার কৃতজ্ঞতা আদায় করতে গিয়ে ভারতের কাছে নতি স্বীকার করতে কি আমরা কোনোভাবে বাধ্য? কারোর কৃতজ্ঞতা আদায়ে কি তার কাছে নতি স্বীকার করতে হয়? আর যদি বাধ্য হয়ে থাকি, সেই বাধ্যবাধকতাটা মূলত কোন জায়গায়?
আরো অল্প কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর আমাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভাবিয়েছে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। তাই স্বাধীনতাকে রক্ষা না করে শুধু স্বাধীনতার ‘চেতনা’ ধারণ করলেই কি হয়? দিনশেষে এই অরক্ষিত স্বাধীনতাই আমাদের পরাধীনতা।
শেষের দিকে মেজর জলিল একটা দাবি করেছেন যে বাংলাদেশের সংবিধানের চার মূলনীতি নাকি ভারতের প্রেসক্রিপশনে করা। কিন্তু এই চার মূলনীতির সমালোচনা করলেও তার এই দাবির স্বপক্ষে কোনো যুক্তি বা প্রমাণ তিনি দেননি। তাই স্বাভাবিকভাবে জিনিসটা অবিশ্বাস্য মনে হতেই পারে। একেবারেই যে চেপে গিয়েছেন ব্যাপারটা এমনও নয়। কিছু সংযোগ দেখিয়েছেন, কিন্তু আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে সেগুলো তেমন পোক্ত মনে হয়নি। তবে স্বাধীনতার আগে ভারতের কাছ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি নেয়ার জন্য প্রবাসী সরকার ভারতের কাছে যে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল তাতে এই চার মূলনীতি কীভাবে প্রবেশ করল সেটা পিনাকী ভট্টাচার্যের ‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম’ বইতে বিস্তারিত রয়েছে।
'যে জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণকে যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে বেকার, অলস যুবকদের মত তাস খেলায় মত্ত হতে পারে সে জাতির দুর্ভাগ্য সহজে মোচন হবার নয়'
হানাদার পাক বাহিনী, যারা দীর্ঘ ৯টি মাস ধরে বাংলাদেশের বুঝে অবলীলাক্রমে গণহত্যা চ��লিয়ে ইতিহাসের পাতায় এক জঘন্য অধ্যায় সৃষ্টি করল, তাদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনী কিসের স্বার্থে উদ্ধার করে নিয়ে গেল ভারতে? সেই সকল হত্যাকারী গণদস্যুদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তর করা হলো না কেন? ---- রশুনের গোড়া না-কি এক জায়গায়। এ সকল মার্সিনারি আর্মির গোড়াও একই জায়গায়-আমেরিকার পেন্টাগনে। সুতরাং 'মুক্তিযুদ্ধ', 'স্বাধীনতা যুদ্ধ, 'পাক-ভারত যুদ্ধ'-ও সকল কিছু না, লৌকিকতা মাত্র। সংগ্রামমুখর জনগণকে বিভ্রান্ত এবং হতাহত করে আন্তর্জাতিক মুরব্বিদের প্রভাব বলয় ঠিক রাখাই হচ্ছে এই সকল যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার আসল উদ্দেশ্য। তা না হলে মানবতার খাতিরেও আন্তর্জাতিকমহল থেকেই বাংলাদেশে গণহত্যাকারী পাকিস্তানি নরপশুদের বিচারের দাবি শোনা যেত। না, তেমন কিছুই হয়নি, হবেও না, যতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মহল অভিশপ্ত সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত না হবে। -মেজর জলিল।
কিছু বিবেকবান প্রগতিশীল মানুষ দেখলাম এটি নিয়ে কটু মন্তব্য করেন, বিকৃত বিবেকবোধ এবং অন্ধত্ব নিয়ে বই পড়ার বা মন্তব্য করার দরকার নেই
মেজর জলিল মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের সেক্টর প্রধান, একই সাথে মুজিবনগর সরকারকেও দেখেছেন অনেক কাছে থেকে। মুজিবনগর সরকারের নামে অভিযোগ অনেক যায়গাতেই পাওয়া গ্যাছে। মুজিবনগর সরকার ও বিএলএফ এর দ্বন্দ্ব ছিল স্পষ্ট। এখানেও তার ব্যতিক্রম তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুরোটাই মেজর জলিল লিখেছেন তার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে। যে অভিযোগ গুলি তিনি করেছেন তার অর্ধেকেরই দলিল/প্রমাণাদি তিনি উপস্থাপন করতে পারেন নি, বা, এমনটাও না যে অভিযোগ গুলির পক্ষে অন্য কোথাও প্রমাণ মিলেছে। বিশ্বাস-অবিশ্বাস পুরোটা পাঠক এর উপর। কারণ তিনি নিজেও জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন, ছিলেন আওয়ামিলীগ এর প্রথম ও একমাত্র বিরোধীদলীয় নেতা। ৭২-৭৫ রাজনীতির হালচালে তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে, এমনকি ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানে তার দলের ভূমিকা স্পষ্ট, আর তার ভারতবিরোধী রাজনীতিও, যেগুলির কোন কিছুই তিনি এখানে আলোচনা করেননি। শেষের দিকে সংবিধানের ৪ টি স্তম্ভের আলোচনা করতে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার যে ব্যাখ্যা করেছেন তা আমার কাছে দূর্বল যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে।
কথা ঐটাই, বিশ্বাস-অবিশ্বাস সব পাঠকের কাছে। প্রচলিত/প্রথাগত/পঠিত ইতিহাসের বাইরে কিছু পড়তে চাইলে এই বইটি পড়তে পারেন।
এতদিন একঘেয়ে,অনেক ছন্নছাড়া ইতিহাস জানতাম,যতটুকু আমাকে জানানো হতো।তবে সাম্প্রতিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস জানা নিয়ে উৎসুক হয়ে পড়ি। এই বই এর দেশে গডফাদার সাফওয়ান ভাইকে অনেক ধন্যবাদ আমাকে বেশ কিছু বই সাজেস্ট করার জন্য।এইটা আমার ভিন্ন ন্যারেটিভ যুক্ত পড়া প্রথম বই। পারলে ৩.৫ দিতাম। শেষের দিকে রাষ্ট্রকেও কেনো ধর্মীয় পরিচয় যুক্ত হতে হবে,এই আলাপ আমার পছন্দ হয়নি। তবে সেটা ব্যতীত ভিন্ন ইতিহাস(স্বাধীনতা পূর্ববর্তী,স্বাধীনতার সময় ও স্বাধীনতা উত্তর ইতিহাসের অন্য পিঠ)জানার জন্য এই ক্ষুদ্র বইটি অনেক সহায়ক।কেউ নতুন হলে রাজনীতির ইতিহাস জানতে চাইলে তাকে এইটা পড়তে বলবো।
মেজর জলিল এক অনন্য মানুষ ছিলেন বটে।সেক্টর কমান্ডার ছিলেন।ছাত্রদের খুব ক্ষুদ্র অংশের স্বাধীনতার চেতনা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তবে দুঃখিত যে এইটা প্রসার পায়নি। ফাঁস করে গেছেন তৎকালীন আওয়ামী নেতাদের আয়েশি জীবন । তারা শরণার্থী শিবির দেখতেন ও না,বরং তাস খেলতে দেখা গেছে,উন্মত্ত হয়ে দেখা গেছে।ডালিমের বই পড়েছি অর্ধেক,সেখানেও স্পষ্ট যে কিভাবে তারা মুজিব বাহিনী এবং নিজের স্বার্থের জন্য ব্যস্ত ছিলেন। মুজিবের নিজস্ব দোদুল্যমানতা ও প্রকাশ করে গেছেন।তিনি প্রস্তুতি ও বিভিন্ন খবর পাওয়া সত্ত্বেও ২৫ মার্চের জন্য প্রস্তুতি নেননি, যেখানে মওলানা ভাসানী ১ মার্চ বলে দিয়েছিলেন,,,
“বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো,বাংলাদেশ স্বাধীন করো।”
১৯৮৮ সালে লিখেছিলেন,গত ১৭ বছর যে নেতাই এসেছে,সে দেশকে পৈতৃক সম্পত্তি ভেবে বসেছে। স্বাধীনতা উত্তর যেই ষড়যন্ত্রের রাজনীতি হয়েছে,তাতে দেশের মানুষের অমঙ্গলই(মৌলিক চাহিদা পূরণ না হওয়া উল্লেখ করেছেন বিশেষ ভাবে) শুধু নয়,যারা প্রকৃত দেশপ্রেমিক,তাদেরকেও সন্মান প্রদর্শন করা হয়নি।করা হয়েছে নিজেদের চাটুকার মহলকে।এই জন্য জলিল,বঙ্গতাজ সবাই হয়েছেন নিষ্পেষিত।ভারতের প্রভাব,অস্ত্র লুট সহ নানান কিছু ফাঁস করেছেন। মানুষটাকে মোটামুটি ভালো লেগেছে।জাসদ গড়ে তুলেছেন,এইটা নিয়ে নেগেটিভ অনেক কথা শুনেছি, এখন “জাসদের উত্থান পতন” পড়ার পর অন্য হিস্টরি ও জানতে পারব।মানুষের মুখ চেপে কেউ না ধরুক,স্বাধীন হোক আপামর জনতা।
বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশবিশেষ এখানে quote করে গেলাম।
১) “১৯৭১ সনের সশস্ত্র গণবিস্ফোরণ শেষ পর্যন্ত যে একটি সফল মুক্তিযুদ্ধের রূপ নিতে সক্ষম হয়েছে, তার কৃতিত্ব কোন একক নেতৃত্বের নয়, সমগ্র সংগ্রামী জনগোষ্ঠীই সে কৃতিত্বের দাবীদার। জনগণের সশস্ত্র বিস্ফোরণই প্রয়োজনের তাকিদে বিকল্প নেতৃত্ব জন্ম দিয়েছে। সশস্ত্র গণ-বিস্ফোরণ যুগে যুগে এভাবেই নতুন নেতৃত্বের জন্ম দিয়ে থাকে। ”
২) তাই তখনকার ছাত্র নেতৃত্বের চাপেই শেখ মুজিব ৭ই মার্চ ভাষণে 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম', 'এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম' এ ধরনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি প্রকাশ্যে বলেও ফেলেছিলেন, "আমি যদি আপনার কথা মত কাজ করি, তাহলে ছাত্র নেতারা আমাকে গুলী করবে, আর যদি আমি ছাত্র নেতাদের কথামত চলি তাহলে আপনি আমাকে গুলী করবেন, বলুন তো এখন আমি কি করি।”
৩) “তিনি কি চেয়েছিলেন পাকিস্তানী প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতার মসনদে পৌঁছতে? জাতিকে চূড়ান্ত ত্যাগের জন্য নির্দেশ দিয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোন ত্যাগের প্রস্তুতি। না নিয়ে ৭ই মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত কেনই বা শত্রুপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের চিন্তায় মগ্ন ছিলেন? এখানেই খুঁজতে হবে মুজিবের নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণ। তাঁর নেতৃত্বের সংকট স্পষ্টভাবেই প্রতিভাত হয়ে উঠেছে এখানে। একটি জাতীয়তাবাদী আন্দালনের চূড়ান্ত পর্যায়ই হচ্ছে স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং তেমন একটি ঐতিহাসিক পর্বে নেতৃত্ব দানের লোভ এবং মোহ থাকলেই নেতা হওয়া যায় না। শ্রেণীগত দুর্বল চরিত্রের কারণে শেখ মুজিবের মধ্যকার দোদুল্যমানতা এবং সংশয়ই তাঁকে স্ববিরোধী ভূমিকায় লিপ্ত করেছে। ”
৪) “মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও যারা যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় এবং যুদ্ধোত্তরকালে চুরি ডাকাতি, ধর্ষণ করেছে, অপর বাঙালীর সম্পদ লোপাট করেছে. বিভিন্নরূপে প্রতারণা করেছে, ব্যক্তি শত্রুতার প্রতিশোধ নিয়েছে, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সেই নির্দিষ্ট চেতনা যে সম্পূর্ণভাবেই অজানা ছিল তাতে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। তবে তাদের মধ্যে মুজিবপ্রীতি ছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা আদর্শবোধ ছিল না”
৫) “সংগৃহীত অর্থে ভারতের বিভিন্ন ব্যাংকে আওয়ামী লীগ নেতাদের নামে বেনামে মোটা অংক যে জমা হয়েছিল তার ইতিহাস ভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের মোটেও অজানা নয়। যুদ্ধরত অবস্থায় দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের মুখোমুখি হতে দেখেও যারা ভারতের মাটিতে ভাগ্যোন্নয়নে মত্ত ছিলেন, তারাই যখন আবার মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দাবী করেন, তখন ইতিহাস হয়তো বা মুচকি হেসে প্রচণ্ড কৌতুক বোধ করে বলে আমার বিশ্বাস। শরণার্থী শিবির থেকে অসহায় হিন্দু মেয়েদের কোলকাতা শহরে চাকরী দেয়ার নাম করে সেই সকল আশ্রয়হীনা যুবতীকে যারা কোলকাতার বিভিন্ন হোটেলে এনে যৌনতৃষ্ণা মেটাতে বিবেক-দংশন বোধ করেননি তারা বাঙালী মুক্তিযুদ্ধের নেতা হবেন না তো হবে আর কে বা কারা! হানাদার পাক বাহিনীর সুযোগ্য উত্তরসূরী তো একমাত্র তারাই- আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ!”
সমাপ্তি
This entire review has been hidden because of spoilers.
একজন সেক্টর কমান্ডার, ৯নং সেক্টরে যিনি করেছেন বীরত্বের সাথে যুদ্ধ, ট্যাংক অফ শিরোমণি তে যিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য তিনিই হলেন স্বাধীন দেশের প্রথম রাজবন্দী! শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধা উপাধি বাদে পেলেন না কোন স্বীকৃতি!
বইটিতে আলোচনা করা হয়েছে বেশ কিছু বিষয়। যা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক। যেমন স্বাধীনতাপূর্ব পঠভূমি, মুক্তিযুদ্ধ ও সে সময়ে আওয়ামীলীগ এর ভারতে আয়েশি জীবন, যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা ২৫শে মার্চের আগে বঙ্গবন্ধুর দ্বিমুখী আচরণ, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সেনাদের লুটাপাটের মহড়া ও বাহাত্তরের সংবিধান ও তথাকথিত রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সহ নানা বিষয়।
এ বিষয়ে লেখকের একটি মন্তব্য প্রতিধান যোগ্য।
"যে জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণকে যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে বেকার, অলস যুবকদের মত তাস খেলায় মত্ত হতে পারে সে জাতির দুর্ভাগ্য সহজে মোচন হবার নয়।"
এক্ষেত্রে মেজর জলিলের একটু পরিচিতি দেয়া প্রয়োজন। কে এই মেজর জলিল?
বরিশালের উজিরপুরে জন্মগ্রহণকারী মেজর এম এ জলিল ছিলেন একজন সাহসী যোদ্ধা যিনি ১৯৬৫ সালে পাক মিলিটারিতে যোগদান করেছিলেন। ট্যাংক বাহিনীর একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি ১৯৭১ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে মেজর পদে উন্নীত হন।
মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তম সেক্টর, যেখানে মেজর জলিল সম্মুখযুদ্ধে বহুবার জয়লাভ করেছিলেন এবং সফল গেরিলা অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তার বীরত্বের জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন বিবিসিসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও, মেজর জলিলকে উপেক্ষা করা হয়েছিল। কারণ তাঁর প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব। ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সম্পদ লুট করে নিয়ে যাওয়ার সময়, মেজর জলিল এই লুটপাটের বিরুদ্ধে বুলেট দিয়ে প্রতিরোধ করার হুমকি দিয়েছিলেন। ফলে স্বাধীন দেশে তাকেই প্রথম কারাবরণ করতে হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামীলীগ নেতারা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। যখন দেশের মাটিতে তরুণদের রক্ত ঝরছিল, তখন এই নেতারা মুজিবনগরে বসে সরকার গঠন করেই সন্তুষ্ট ছিলেন। স্বাধীনতার সংগ্রামের সামনের সারিতে থাকার পরিবর্তে তারা বালিগঞ্জের বাড়িতে বসে তাস খেলছিলেন।
মেজর জলিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে অস্ত্র সহায়তা চেয়েছিলেন, তখন ভারতীয় বাহিনীই বরং তাকে জেরা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সম্পর্কে তথ্য আদায় করার চেষ্টা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধাদের অস্ত্র সরবরাহ করার চেয়ে তাদের উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর তথ্য সংগ্রহ করা।
এ থেকে ভারতীয় বাহিনীর মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার প্রকৃত রূপটি দেখতে পাওয়া যায়।এছাড়া আজকের সময়ের হট টপিক মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা কি ছিল সে বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
বইটি মূলত মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন সেক্টরের কমান্ডারের কি কি দেখেছেন তার চাক্ষুষ বর্ণনা। ভিন্ন আঙ্গিকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানার জন্যে অপরিহার্য বই এটি।
বই : অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা লেখক : মেজর এম এ জলিল প্রকাশক : কমল কুঁড়ি প্রকাশন ধরণ : প্রবন্ধ ( রাজনৈতিক ) পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৭২ প্রচ্ছদ : রোমেল প্রথম সংস্করণ : একুশে বইমেলা ২০১৫ সংস্করণ : জুলাই ২০১৯ (দ্বিতীয় মুদ্রণ) মুদ্রিত মূল্য : ১২৫ টাকা ISBN : 984-830-055-4
ফ্ল্যাপের কথা :
“ স্বাধীনতা লাভের প্রায় ১৭ বছর পরেও আমাদের কোন অভাব দূর তো হ'লই না, বরং যত দিন যাচ্ছে ততই যেন জাতি হিসেবে আমরা মর্যাদাহীন হয়ে পড়ছি, নিস্তেজ হয়ে পড়ছি ৷ বুক ভরা আশা স্বপ্ন আজ রূপান্তরিত হয়েছে গ্লানি ও হতাশায় ৷ সম্মান, জাতীয়তাবোধ, মর্যাদাবোধ, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ এ সব কিছুই যেন বিধ্বস্ত ৷ এক কথায়, বিবেক আজ বিভ্রান্ত ৷ সুবিধাবাদ এবং অযোগ্যতার মহড়ায় গোটা জাতি আজ নীরব নিশ্চল অসহায় জিম্মী ৷ ”
পাঠ পর্যালোচনা :
'একটা জাতির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ যখন লোকজনকে যুদ্ধের লেলিহান শিখায় নিক্ষেপ করে বেকার, আলস্য-জীবন ও তাস খেলায় মগ্ন থাকতে পারে, সে জাতির দূর্ভাগ্য সহজে মোচন হবে না ৷ ' এই একটি মাত্র বাক্যেরই বিস্তারিত দলিলসহ ভাবসম্প্রসারণ বইটি ৷ মেজর এম এ জলিল বইটিতে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব, মুক্তিযুদ্ধ সমসাময়িক, শেখ মুজিব ও আওয়ামীলীগের পদক্ষেপ, যুদ্ধের প্রকৃত রুপ, ভারতীয় বাহিনীর পরিকল্পিত ত্রাস ,বিরোধী শক্তি ও মুক্তিযুদ্ধউত্তর আওয়ামীলীগের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির বাস্তবতা আলোচনা করা হয়েছে ৷
মেজর এম এ জলিল ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের নয় নম্বর বৃহত্তর খুলনা সেক্টরের কমান্ডার ৷ মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদান বর্তমানে দৃষ্টি আড়ালে কারণ তার প্রতিবাদী আচরণ ৷ ভারতীয় মিত্র বাহিনী ডিসেম্বরের শেষ দিকে যখন দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিল, অবাদে লুটতরাজ শুরু করেছিল ক্ষমতাসীনের প্রটোকলে ৷ এর বিরোধিতা করায় যুদ্ধের পর এই মহান মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রেফতার করা হয়, যিনি কি না নয় নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ৷
তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রকৃত অবস্থা অধ্যায়ে এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আভাস দিয়েছেন যা আমাদের বুদ্ধিজীবি হত্যা নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবায় ৷ কারণ তিনি বলেছেন , মুজিবনগর সরকার গঠনের পর এর সমগ্র গঠনতন্ত্র যখন কলকাতা কেন্দ্রিক পরিচালিত হচ্ছে তখন জহির রায়হার কলকাতায় যান ৷ ওখানে জহির রায়হানের কিছু বিষয় দৃষ্টিগোচর হয় যা পরবর্তীতে তার হারিয়ে যাবার সাথে সাথে উধাও হয়ে যায় ৷ এছাড়া মুজিবনগর সরকার গঠনের মূলমন্ত্র কি ছিল, কিন্ত কার্যত কি হয়েছে সেসব নিয়ে আলোচনা করেছেন ৷ কারণ, সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যখন মুজিবনগর সরকারের কাছে রসদ, অস্ত্র সাহায্য চেয়েছেন প্রতিবারই ভোগান্তিতে পরেছেন ৷ এমনকি ভারতীয় মিত্রসেনাদের হাতে ঘরবন্দি হয়েছেন ৷
বইটির সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন বিষয় হচ্ছে স্বাধীনতা উত্তর আওয়ামীলীগের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির উৎস ও কার্যত ব্যাখা ৷ কারণ, যদি সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত থাকে সেক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র দর্শনের চর্চা দুটো বিপরীত ও বৈরী সম্পর্কের এক ঘাটে জল খাওয়ানোর ব্যাপারের মতন ৷ কারণ, আওয়ামীলীগের প্রথম মূলনীতি গনতন্ত্র পুঁজিবাদকে সমর্থন করে, কিন্ত দ্বিতীয় মূলনীতি সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদকে অগ্রাহ্য করে, জনগণ ও রাষ্ট্রকে সকল কিছুর মালিকানা প্রদান করে ৷ এই দুই নৌকায় পা দেয়ার ফলে বলি হতে হয়েছে জনগণকে ৷ পুঁজিবাদী চক্র রাতারাতি বিত্তবান হয়েছে কিন্ত , জনগণ যাতে আন্দোলন করতে না পারে সেজন্যে সমাজতন্ত্রের টোপ্ ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে ৷
ব্যক্তিগত মন্তব্য :
বইটি যেকোন পাঠককে একবার হলেও ভাবতে শেখায় যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি ? রাজনৈতিক দিক নয়, ভারতের ধর্মতাত্মিক কুচক্র কিভাবে ধাপে ধাপে প্রতিষ্টিত হয়েছে সেসব নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে ৷ মূল জাতীয়তাবাদ আর নিরপেক্ষতার পার্থক্য যেদিন জনগণ বুঝতে পারবে সেদিনই দেশ উন্নত ���বে ৷ ব��টি একান্তই লেখকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা ৷ একজন সেক্টর কমান্ডার, একজন মুক্তিযোদ্ধার দৃষ্টিভঙ্গিতে রাজনৈতিক বিষয়াবলীর ধারণা নিতে চাইলে বইটি অবশ্যই পড়া উচিত ৷
নাম সুন্দর, অর্থপূর্ণ। কিন্তু অহেতুক। নামের সাথে বিষয়বস্তুর মিল নেই। লেখক পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন পাকিস্তান আর্মিতে। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন ৯ নং সেক্টরের কমান্ডার হিসাবে। ৯ নং সেক্টর ছিল ফরিদপুর থেকে পুরো দক্ষিণবঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি সমাজতন্ত্রী ছিলেন। এর পরে হন তিনি ধর্ম কর্মে মন দেন। তিনি কতটুকু প্র্যাকিটিসিং মুসলমান ছিলেন এখনও জানি না। তবে এইখানে এসে তার চিন্তাভাবনা ঘোলাটে হয়েছে। তিনি খুব সূক্ষ্ম একটা চেষ্টা করেছেন রাজাকারি হালাল করতে। তিনি পরিষ্কার ভাবে বলেছেন যে রাজাকার কর্তৃক হত্যা, ধর্ষন, লুট অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, এগুলো অপরাধ- তাও অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, এই অপরাধের শাস্তি হওয়া উচিৎ- তাও অনস্বীকার্য। কিন্তু তিনি ইনিয়ে বিনিয়ে রাজাকারদের রাজাকারিকে ভুল বোঝাবুঝির ফল হিসাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। এছাড়াও ৭২ এর সংবিধানের চার ভিত্তির যৌক্তিকতা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। বিশেষকরে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র নিয়ে। অথচ তিনি মুক্তিযুদ্ধের পরে জাসদ করেছেন ১৯৮৪'র নভেম্বর পর্যন্ত। সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে তার ভুল ভাংতে যদি ১৯৮৪ পর্যন্ত সময় লাগে তাহলে তিনি কীভাবে একই ভুলের জন্য আওয়ামীলীগকে ৭২ এর সংবিধানের জন্য দোষারোপ করেন? নতুন খুব বেশি কিছু জানা যায় না এই বই থেকে। তবে দৃষ্টিভঙ্গি চওড়া হয় খানিকটা। যেমন ভারত যে এমনি এমনি মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করে নাই এটা সবাই বোঝে, এমনকি [[BAL]] ও বোঝে। তিনি এই কথাটাই বারবার বলেছেন, ভারতীয় দাক্ষিণ্যকে হেলা করেছেন, কিন্তু সেই দাক্ষিণ্য নিয়েই তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। ভারতের স্বার্থ কত নেংটা ছিলো তার স্বপক্ষে তিনি কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। জাতীয় তিন নেতার নামে অত্যন্ত বাজে কিছু অভিযোগ করেছেন কোন প্রমাণ ছাড়া।
মোহাম্মদ আবদুল জলিল (জন্ম: ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪২ - মৃত্যু: ১৯ নভেম্বর, ১৯৮৯) যিনি মেজর জলিল নামেই বেশি পরিচিত, বাংলাদেশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ছিলেন একজন রাজনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তা৷ তিনি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৯নং সেক্টরে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে ট্রেনি অফিসার হিসেবে যোগদান করেন৷ সামরিক বাহিনীতে চাকুরিরত অবস্থায় তিনি বি.এ পাশ করেন৷ ১৯৬৫ সালে তিনি কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং ১২নং ট্যাঙ্ক ক্যাভালরি রেজিমেন্ট অফিসার হিসেবে তৎকালীন পাক-ভারত যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন৷ ১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন৷ তিনি ১৯৭১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ছুটি নিয়ে বরিশালে আসেন এবং মার্চে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি নবম সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব লাভ করেন৷ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠনের সময়ে তিনি কাজ করেছিলেন। তিনি ছিলেন এ দলের যুগ্ম আহ্বায়ক৷ ১৯৭৩ সালে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন৷ এছাড়া তিনি ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন৷ ১৯৮৪ সালে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন৷ পরবর্তীকালে তিনি জাসদ ত্যাগ করে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন নামে একটি দল গঠন করেন৷ ১৯৮৪ সালের ২১ অক্টোবর তিনি মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জীর নেতৃত্বে গঠিত সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদে যোগ দেন। ২৬ অক্টোবর পরিষদের দেশব্যাপী দুআ দিবস ও বায়তুল মুকাররম চত্বরে সমাবেশে তিনি হাফেজ্জীর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন।
যেমনটা বলছিলাম, উনি ধর্মের লেন্স দিয়ে পুরো যুদ্ধটাকে দেখেছেন। এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীকে ধর্মের খাতিরে বিরোধকারী হিসেবে দেখানোর প্রয়াস পেয়েছেন।
এছাড়া বাংলাদেশের চারনীতির দুটি (জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা)কে উনি পুরোপুরি ধর্মের সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার পক্ষ নিতে গেলে যে সংখ্যালঘুরা বাদ পরে যায় (উনার ভাষায় নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশ) একথা উনি নিশ্চয়ই বুঝেননা তা নয়। তাহলে উনি এই দশভাগের স্বার্থরক্ষা কীভাবে করতেন? পাকিস্থানীরা যদি ধর্মের খাতিরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাহলে সে নীতির সাথে মেজর জলিলের নীতির পার্থক্য কোথায়?
আমার মনে হয়েছে, কোন একটা কিছুর সমালোচনা সহজ। কিন্তু সেই কিছু একটার অলটারনেটিভ না দেখাতে পারলে সেই সমালোচনা নিছক বিদ্বেষ ছাড়া আর কিছুই না। উনি চার মুলনীতির সমালোচনা করেছেন, কিন্তু সেগুলোর অলটারনেটিভ কী হতে পারতো সে নিয়ে কোন কথা বলেননি।
"স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন" এ কথাটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শতভাগ সঠিক।আমাদের আছে এক বেদনাময় ইতিহাস।ইতিহাসের উত্থান-পতন শেষে এক বীরগাথা স্বপ্ন দেখেছিলাম আমরা।দীর্ঘ দিবসরজনী পেরিয়ে,লাখো শহিদের রক্তে দেশটাকে নিজেদের করে পেয়েছিলাম।তবুও যেন স্বাধীন হইনি।দালাল চক্রের তোষামোদ,ক্ষমতার লোভে অন্ধ,শাসনব্যবস্থার অদূরদর্শীতা আমাদের পরাধিনের শেকল পড়িয়েই রাখলো।তাই তো আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও যেন পরাধীন,বাঙালি হয়েও যেন ঔপনিবেশের স্বীকার,মুক্ত হয়েও যেন বন্দী। . বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরে বাংলাদেশকে নিয়ে হওয়া চক্রান্ত,পরিস্থিতি,ফলাফল নিয়ে লেখা হয়েছে এই বইটি।একজন মেজরের চাক্ষুষ বিবরণে উঠে এসেছে স্বাধীনতাউত্তর অপদস্ততার ঘটনা! মেজর সাহেব বীরদর্পে দেশকে স্বাধীন করে শেষ জীবনে এসে আফসোস করলেন,'অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা'
একজন সেক্টর কমান্ডারের চোখে এদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন এবং পরবর্তী সময়ের বেশকিছু অজানা তথ্য পাওয়া গেল। তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি বলে পরিচিত দলের নেতা কর্মীদের যুদ্ধকালীন সময়ে ভূমিকা লেখক স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। এবং ভারতীয়রা ঠিক কি কারনে এদেশের স্বাধীনতায় সাহায্য করেছে তা ও ব্যাখা করেছেন, অবশ্য তা এদেশের কট্টর ভারতীয় সমর্থকদের ভালো লাগার কথা না। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী তিনি, শুধুমাত্র দেশ স্বাধীনতার পরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবাধ লুটপাটের বাধা দেয়ায় তাকে বন্দী করা হয়। অস্ত্রশস্ত্র থেকে শুরু করে বাথরুমের ফিটিংস পর্যন্ত রেহাই পায়নি তাদের লুটপাটের হাত থেকে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৯ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিলের লিখা বই তে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর অবদান এবং তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতাদের যুদ্ধকালীন সময়ের বিলাসী জীবিন যে সৈনিকমনে আঘাত করেছে তা বার বার উল্লেখ করেছেন । এমনকি সে সব নেতাগণ যুদ্ধকালীন ট্রেনিং শিবিরের আসে পাশে ভিড়তেন না এ কথা শুনে বড়ই অবাক হয়েছি ।
আর একটি বিষয় লক্ষ্য করেছেন লেখক তা মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে না থাকা । স্বাধীনতার পড়ে ভারতীয় বাহিনীর ব্যাপক লুটতরাজ এমনকি বাথরুমের ফিটিংস খুলে নেওয়ার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন । যা শুনে বড়ই আশ্চর্য হয়েছি ।
বই যে মন কে খুলে দেয় তার প্রমান এই বইটি । আমার মতে অবশ্যপাঠ্য এই বইটি সবারই পড়া উচিত ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল সারা দেশ। বইটি পড়ার উত্তম সময় বোধ হয়! ১৯৮৮ সালে লেখা বইটির কয়েকটি লাইন পড়ে দেখুনতো এই আন্দোলনের সাথে কোনোভাবে মেলানো যায় কী না!
"মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া জাতির মুক্তিযোদ্ধারা কারো দ্বারা পুনর্বাসিত হয় না,বরং মুক্তিযোদ্ধারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হয়। তাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে তারাই সমাজের পুরাতন কাঠামো ভেঙে দিয়ে নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে সমাজের শোষিত-নিগৃহীত শ্রেণিসমূহকে পুনর্বাসন করে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশ্নে ব্যাপারটি ঘটেছে সম্পূর্ণ উলটো।"
সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের যে নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা চলছে তার অন্যতম প্রধান রেফারেন্স এই বই হয়ে ওঠাতে বইটা পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। তবে পড়তে গিয়ে দেখলাম মূলত বইটা থেকে চেরি পিকিং করা হচ্ছে ততটুকুই যতটুকু ন্যারেটিভের পক্ষে যায়। পুরো বইয়ের অনেক অংশে এমন তথ্য বা মন্তব্য আছে যা আবার নতুন চালুকৃত ন্যারেটিভের বিপক্ষে যায়। এজন্য আমাদের উচিত সব দিকের ইতিহাস পড়ে, নিজের বাস্তব বুদ্ধি প্রয়োগ করে একটা সম্ভাব্য সত্যের কাছাকাছি উপস্থিত হওয়া। আর অবশ্যই কোন মানুষই তার বায়াসের ঊর্দ্ধে নয় সেটা মাথায় রেখেই সকল দৃষ্টিকোণ এবং তথ্য পর্যালোচনা করা উচিত। তবে নিঃসন্দেহে একটা ইন্টারেস্টিং এবং পাঠযোগ্য বই।
বাঙালী জাতি হয়ত জাতি হিসেবেই কনফিউজড জাতি। যারাই এদেরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বিভিন্ন চটকদার ইস্যু দিয়ে 'বেনিফিট অফ ডাউট' সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারবে, তারাই এই দেশ শোষণ করতে পারবে। এই জাতির এরকম কনফিউশনের সুযোগ নিয়েই 'পুকুর চুরি' এখন 'দেশ চুরি'তে পরিণত হওয়া সত্বেও আমরা কনফিউজড। উন্নয়ন বড় নাকি চুরি বড়। শেকল পড়া পেট পুড়ে খাওয়ার স্বাধীনতা বড় নাকি ভুখা থেকে লড়াকু জীবন যাপনের পরাধীনতা বড়। কুকুরের মত হাজার বছর বাঁচা ভাল নাকি সিংহের মত পাঁচ মিনিট বাঁচা ভাল।
লেখা থেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন আওয়ামী লীগের একটা চিত্র পাওয়া যায়। এই বই পড়ার পরে "আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি" উক্তিটা কতখানি বানোয়াট আর মিথ্যা সেটা নিয়ে একটা ধারণা পাওয়া যায়। তথ্য নির্ভর না হয়ে লেখক মূলত উনার দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা ভাবনা ব্যক্ত করসেন, যার কিছু কিছুর সাথে একমত হতে পারি নাই। দ্বিতীয়ত, অনেক বেশি খটমটা বাংলায় লেখা, সাথে একটা সাধারণ পয়েন্ট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেক বেশি কথা লেখা।
“স্বাধীনতা লাভের প্রায় ৫২ বছর পরেও আমাদের কোন অভাব দূর তো হলই না, বরং যত দিন যাচ্ছে ততই যেন জাতি হিসেবে আমরা মর্যাদাহীন হয়ে পড়ছি, নিস্তেজ হয়ে পড়ছি। বুক ভরা আশা-স্বপ্ন আজ রূপান্তরিত হয়েছে গ্লানী ও হতাশায়। সম্মান, জাতীয়তাবোধ, মর্যাদাবোধ, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ এ সব কিছুই যেন বিধ্বস্ত । এক কথায়, বিবেক আজ বিভ্রান্ত। সুবিধাবাদ এবং অযোগ্যতার মহড়ায় গোটা জাতি আজ নীরব নিশ্চল অসহায় জিম্মী।”
একজন সেক্টর কমান্ডারের কলমে দেশের মুক্তিযুদ্ধকে নতুনভাবে জানলাম। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের গতানুগতিক ইতিহাস পড়ে বড় হয়েছি তাদেরকে চরমভাবে ধাক্কা দিবে এই বই। শেষের দিকে আমাদের সংবিধানের চারটা মূলনীতি (যেগুলো পুরোটা না হলেও অনেকটা পরস্পরবিরোধী ) - গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ- অন্তর্ভূক্ত করার কারণ সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তা যথেষ্ট বিবেচনার দাবি রাখে।