লেখক আনিস মাহমুদ মারা গেছেন এই বাক্য দিয়েই শুরু যে উপন্যাসের, তারপর শুধু লেখকের কুশলী হাতে এক এক করে পর্দা সরে যাবার মতো উন্মোচিত হয়েছে জটিল, গুঢ় এক রহস্যের। লেখক আনিস মাহমুদ যেন আমাদেরই অতি পরিচিত কোনো চরিত্র, যার জনপ্রিয়তা ঘিরে প্রচলিত নানা মিথ, নানা গল্প। যে মুহূর্তের সিদ্ধান্তে নিজের চেয়ে প্রায় অর্ধেকেরও কম বয়সী এক মডেলকে বিয়ে করে হৈচৈ বাধিয়ে দেন সারা দেশে, যে তুড়ি বাজানোর মতো পরক্ষণেই বেছে নেন লেখালেখিহীন স্বেচ্ছানির্বাসিতের এক জীবন। এহেন খেয়ালী, আত্মপর আনিস মাহমুদ তারপর পরবর্তী পাঁচ বছর আর কোথাও থাকেন না, না কোনো বইয়ে; না কোনো আলোচনায়। তারপরই বজ্রপাতের মতো এই একলা মৃত্যু! কেন? উত্তর মেলাতে পাঠককে যেতে হবে উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। তার আগে এক এক করে উন্মোচিত হতে থাকবে একেকটি মুখ: লেখকের তরুণী স্ত্রী, তার রহস্যময় এক প্রেমিক, আর নামপরিচয়হীন এক যুবকসহ আরও অনেকে।
এই উপন্যাস যেমন অংশত এক রহস্যগল্প, আবার অংশত এক রহস্যগল্প, আবার অংশত এক প্রেমের অজানা আখ্যানও- বাংলা ভাষার চিরায়ত সাহিত্যধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লেখকের ভিন্নতর নতুন এক সাহিত্যসৃষ্টির প্রয়াস এই উপন্যাস। (ফ্ল্যাপ থেকে)
প্রথম বিশ পৃষ্ঠা পড়ে খুবই আশান্বিত হয়ে উঠেছিলাম। মার্ডার-মিস্ট্রি। কিন্তু সেই ঘরানার মার্ডার-মিস্ট্রি, যেখানে খুনকে স্রেফ পশ্চাতে রেখে ঔপন্যাসিক কাহিনীর আত্মা করে তোলেন আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছুকে। মনে হচ্ছিলো, এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে বইয়ের সেই আত্মাটা ধরতে চাইছে পুরনো সব বইয়ের জগত, কালো হরফের একেকটা রোমাঞ্চকর ময়দান।
কিন্তু বই নিয়ে লেখকের বলার সব কথা যেন ফুরিয়ে গেলো অর্ধাংশেই। শেষদিকে পুলিশ অফিসার চাইলেন পুরোনো সব কায়দা ব্যবহার করে খুনীকে পাকড়াও করতে।
প্রথাগত মার্ডার-মিস্ট্রি'র দিকে এভাবে ঝুঁকে না গেলে খুব চমৎকার একটা উপন্যাস হয়ে পারতো এ বইটা।
থ্রিলার উপন্যাসের শুরুটা এভাবেই হয়েছে। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের মৃত্যু হয়েছে বই ভর্তি বিশাল সেল্ফের নিচে চাপা পড়ে। সারাজীবন পাঠক এবং লেখক হিসেবে অক্লান্ত নিষ্ঠার পরিচয় দেয়ার পর এ ধরণের ডেথ যেন মানুষের মনে একধরণের পার্পেচুয়ালিটির সৃষ্টি করে।
আলীম আজিজের 'কালো হরফের অশ্বারোহী' পড়া শেষ হলো। লেখক থ্রিলার বই লিখার কারণে পরিচিত নন। তিনি বেশি পরিচিত তাঁর অন্যান্য ধারার বই এবং নামকরা সাহিত্য কাগজের সম্পাদক হিসেবে। কিন্তু রহস্যরোমাঞ্চের লেখার দায় যখন কাঁধে নিলেন, ব্রিলিয়ান্টলি লিখলেন।
অধুনা সময়ে কয়েক লেয়ারে লিখা দারুন সব থ্রিলার প্রকাশ পেয়েছে, পাচ্ছে। আলীম আজিজ টানটান উত্তেজনার বইয়ে মাঝে মাঝে যখন সেই টানে ঢিল দিয়েছেন তখনো একজন বইপোকার মাঝে আরো তীব্র টানের সৃষ্টি হবে। কেন? বলছি নিচের প্যারার পরেরটায়।
উত্তম পুরুষে লিখা গল্প / উপন্যাস আমার বেশি ভালো লাগে। আনিস মাহমুদের বর্ণাঢ্য লেখক জীবনের সাথে সাথে তাঁর গোয়ার্তুমি, দেশের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিকদের মেনশন এবং সর্বোপরি এমন এক বিষয় প্লটে আছে যা উপন্যাসটিকে মনে হয় ভুলতে দিবে না।
উত্তম পুরুষে স্টোরি বয়ান করা রহস্যময় নাম-পরিচয়হীন চরিত্র রিডারকে নিয়ে যাবে ঢাকার নীলক্ষেত থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের স্টেশন রোডস্থ অমর বুক হাউজ পর্যন্ত, দুস্প্রাপ্য সব বইয়ের খোঁজে।
'কালো হরফের অশ্বারোহী' কিউরিয়াস পাঠকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে রেয়ার সব বইয়ের সাথে। বইয়ের ভিতর বিভিন্ন ইল্যাস্ট্রেশন বা অঙ্কন এ সকল অ্যান্টিক বুকের ব্যাপারে সংক্ষেপে বলে দিবে চমকপ্রদ সব সারকথা।
আরেকটি বিষয় ভালো লেগেছে। প্রায় প্রতি চ্যাপ্টারের প্রথমে প্রাসঙ্গিক মোক্ষম কিছু লাইন দেয়া, বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন নামী বইয়ের পাতা থেকে।
আনিস মাহমুদের সাথে ঘটে যাওয়া অ্যাক্সিডেন্ট কি আসলেই অ্যাক্সিডেন্ট? সন্দেহের তীর ছুটে যায় আনিলা হক, মোবারক, চন্দন এবং উত্তম পুরুষে বর্ণনাকারীর দিকে।
আলীম আজিজ কোন অসাধারণ প্লট নিয়ে হাজির হন নি। শুধুমাত্র চমৎকার গল্পকথন দিয়েই পুরো উপন্যাস মাতিয়ে রেখেছেন। টুইস্ট নির্ভর নভেল নয় এটি। কিছু টুইস্ট লেখক মনে হয় নিজেই চেয়েছেন যেন পাঠক আগে থেকে ধরে ফেলে। তেমন একটা ক্লিফহ্যাঙ্গারও রাখেন নি। তবে দুস্প্রাপ্য বই বিষয়ক তথ্য এবং অঙ্কনগুলো চমকপ্রদ।
উত্তম পুরুষে ন্যারেটিভ, কাহিনি নির্ভরতার চেয়ে চরিত্র নির্ভরতা প্রাধান্য পাওয়া, অর্থবিত্ত প্রাপ্তির সাথে সাথে রেয়ার বই সংগ্রহও খুনের মোটিভ হতে পারে এবং ঐসব দুস্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রাহকের ঢাকার যেসব কী পয়েন্টে একসময় বা হয়তো এখনো হানা দিতে হয় সেসবের মিথস্ক্রিয়ায় স্টোরিটেলিং এর কারণে 'কালো হরফের অশ্বারোহী' উপন্যাসটি মনে থাকবে বহুদিন। একজন লেখক নিজে যা ফীল করেন তা ঠিকঠাক মতো লিখতে পারলে তাঁর রাইটিং দারুন কিছু হয়।
গোটা বইজুড়েই যে টানটান আবহটা তৈরি করেছিলেন, শেষ পাতা পর্যন্ত লেখক তা বজায় রাখতে পেরেছেন। ক্রাইম স্টোরি বা ডিটেকটিভ কেস সলভিং যেটাই বলুন, কিংবা হোক সেটা দুজন মানুষের মনস্তত্ত্বের গহীন অলিন্দ, অন দি স্পটে না থেকেও পুরো ঘটনায় ঢুকে যেতে বাধা পড়ে না একটুও।
সাথে আমার বাড়তি পাওনা অ্যান্টিক বইয়ের তথ্যগুলো। আহা, যদি হাতে পেতাম 'আমির হামজা' কিংবা 'বিষাদ সিন্ধু'র প্রথম সংস্করণ!
“Where is it I've read that someone condemned to death says or thinks, an hour before his death, that if he had to live on some high rock, on such a narrow ledge that he'd only room to stand, and the ocean, everlasting darkness, everlasting solitude, everlasting tempest around him, if he had to remain standing on a square yard of space all his life, a thousand years, eternity, it were better to live so than to die at once. Only to live, to live and live! Life, whatever it may be!.” ~ Fyodor Dostoevsky (Crime and Punishment)
প্রথম দিকেই কিংবদন্তিতুল্য একজন লেখকের অদ্ভুত মৃত্যুর ব্যাপারে জানিয়ে দিয়েছেন গল্পের ন্যারেটর। এই ঘটনাটা কি স্রেফ একটা দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত একটা হত্যাকাণ্ড এরকম একটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলার প্রয়াস করা হয়েছে নানা আঙ্গিকে। এরপর যুক্তিতর্ক আর স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে পেঁয়াজের খোসার মতো সবকিছু স্তরে স্তরে উন্মোচিত হতে থাকে। উন্মোচিত হতে হতে শেষমেষ চোখের সামনে আইনের চোখ যে অন্ধ এই ব্যাপারটা মেলে ধরা হলো যেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনের আর কিছুই করার থাকে না। আইন তখন হয়ে পড়ে অসহায়, নিস্তেজ আর অসার। আইনের অন্ধ দৃষ্টিতে নিরপরাধ সাব্যস্ত হলেই কি সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যায়? এরপর আরো কিছু সম্ভাবনা রয়ে যায় নাতো? এখন প্রশ্ন হলো বইটা আমি কতখানি উপভোগ করলাম? আমাকে আকৃষ্ট করার মতো প্লটে পাতার পর পাতায় অক্ষরের প্রলেপ দেয়া হয়েছে গল্পে। লেখকের বাক্য বিন্যাস আর শব্দচয়ন অনেক সমৃদ্ধ। পড়লেই বোঝা যাবে প্রচুর রেফারেন্স ঘাটা হয়েছে। শুরু থেকেই ইঙ্গিতে আমাদের সু পরিচিত একজন রাইটারকে আচ্ছা মতো তুলোধোনা করা হয়েছে। পাঠকমহলে আমার পরিচিত অনেকের কাছেই তাকে নিয়ে হবহু এরকম কথা রটতে শুনেছি। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না আমি। আকৃষ্ট হয়ে পড়তে পড়তে একটা সময় গিয়ে শেষটা জানার আগ্রহ বেড়ে গিয়েছিল। লেখায় একটুখানি ধীরগতি চলে এলো কিনা এ ব্যাপারটা তখন আপনাআপনিই চলে আসে। কিন্তু লেখক ধীরে-সুস্থে, সচেতন হয়ে খুব নিপুণভাবে পরিণতি পর্যন্ত কাহিনীর জাল বুনেছেন। কতখানি পারফেক্টলি জালটা বুনতে পেরেছেন এই রহস্যের সমাধান করা কেবল পড়ার পরই সম্ভব। আমার কাছে কিন্তু এন্ডিং আর এর পেছনের বিল্ড আপ যথার্থই মনে হয়েছে।