ইহুদি ইলিয়ানা রোজেনবার্গ মৃত্যুর আগে তাঁর ইচ্ছাপত্রে বিপুল পরিমাণ অর্থ রেখে যান হিরণ্ময় হালদারের নামে। জার্মান কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে ইলিয়ানা রোজেনবার্গের এই শেষ ইচ্ছে পূরণের দায়িত্ব পায় জরিনা ইসমাইল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তরুণ হিরণ্ময় হালদার ব্রিটেনের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের পাইলট ছিলেন। তিনি জার্মানিতে যুদ্ধবন্দি হন। রহস্য এটাই, কেন ইলিয়ানা রোজেনবার্গ হিরণ্ময় হালদারকে অর্থ দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন? হিরণ্ময় হালদারের উত্তরসূরিরা যখন ইলিয়ানা রোজেনবার্গের রেখে যাওয়া অর্থ পাওয়ার জন্য লোলুপ, তখন চলছে মির্জা গালিবের শায়েরিকে আশ্রয় করে জরিনার পেশাদার ও মানবিক মনের নিরন্তর যুদ্ধ।‘স্পর্শ’ উপন্যাসে সমান্তরালভাবে জরিনা উন্মোচন করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এক বাঙালি তরুণ ও এক ইহুদি তরুণীর আশ্চর্য জীবন আলেখ্য এবং সম্পর্ক।
কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৬৪, ব্যারাকপুরে। প্রথম জীবন কেটেছে শ্যামনগরে। ইছাপুর নর্থল্যান্ড বয়েজ হাইস্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা। স্কুলজীবন থেকেই লেখালেখির সূত্রপাত। প্রথমে অনিয়মিতভাবে কিছু লিটল ম্যাগাজিনে লিখতেন। ২০০৫ থেকে নিয়মিতভাবে আনন্দবাজার পত্রিকার বিভিন্ন প্রকাশনায় ছোটগল্প লিখছেন। ‘খেজুর কাঁটা’ গল্পটি নিয়ে হয়েছে শ্রুতিনাটক। ছোটগল্প ‘ছবির মুখ’ আকাশবাণীতে বেতারনাটক হয়ে সম্প্রচারিত হয়েছে। লেখকের ‘ব্রহ্মকমল’ গল্পটি ২০০৬-এ ‘দেশ রহস্যগল্প প্রতিযোগিতা’য় প্রথম পুরস্কার লাভ করেছে। ২০০৭-এ ‘পূর্বা’ শীর্ষক একটি কল্পবিজ্ঞান গল্পের জন্য ‘দেশ গল্প প্রতিযোগিতা’য় দ্বিতীয় স্থান পেয়েছেন। রাধিকা লেখকের প্রথম উপন্যাস।পেশাদারি জীবনে ইঞ্জিনিয়ার, বেসরকারি বিদ্যুৎ সংস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে কর্মরত। সাহিত্য ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে প্রবন্ধ লেখেন। ভারতীয় মার্গ সংগীতের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত।
বুদ্ধিদীপ্ত অথচ নরম, আবেগমথিত অথচ গতিময় - এমন আপাতদৃষ্টিতে বিপরীতধর্মী বেশ ক'টি বৈশিষ্ট্য একত্র হয়েছে এই উপন্যাসে। কী নিয়ে এই কাহিনি? ইলিয়েনা রোজেনবার্গ মৃত্যুর আগে বিপুল সম্পত্তি দিয়ে গেলেন প্রাক্তন পাইলট হিরণ্ময় হালদার-কে। ইলিয়ানা'র ইচ্ছাপূরণের দায়িত্ব পেল জরিনা ইসমাইল। তার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এল ধ্বংস আর মৃত্যুর মধ্যেও ধিকিধিকি জ্বলে থাকা জীবনের এক অদ্ভুত গল্প। কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গদ্য সাবলীল, কাব্যিক, গালিবের বয়েতে সমৃদ্ধ। লেখাটা পড়তে বেশ ভালো লেগেছিল। কিন্তু এই লেখকের সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি লেখার মতো এটিও ভয়ানক সরলরৈখিক, ক্রাইসিস-বর্জিত, আন্ডারহোয়েল্মিং, শেষ বিচারে কেমন যেন লো বিপি টাইপের। সব মিলিয়ে তিন তারার বেশি দেওয়া গেল না।
কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে ওনার ভৌতিক উপন্যাস 'মায়াভিলা' র মাধ্যমে। তবে সেই উপন্যাসটা একটা হিন্দি সিনেমার স্ক্রিপ্টের থেকে বেশি কিছু লাগেনি। তবে লেখকের লেখার গুণে পুরো উপন্যাসটাই পড়ে ফেলেছিলাম। তারপর বহুদিন পরে এই লকডাউনে পড়ে ফেললাম ওনার লেখা ' স্পর্শ' উপন্যাসটি। মনকে ভালো লাগার স্পর্শে মুগ্ধ করে রাখলো এই উপন্যাস। সম্ভবত কোনও একটি আনন্দ গোষ্ঠীর শারদীয়াতে এই উপন্যাসটি পূর্বে প্রকাশিত হয়েছে। হিরন্ময় হালদার আকাশে উড়তে চেয়েছিল। তার স্বপ্ন ছিল একজন ফ্লাইং অফিসার হওয়ার। তার সেই স্বপ্ন পূরণও হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময় তিনি হয়েছিলেন ব্রিটেনের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের পাইলট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধটা ছিল আকাশের যুদ্ধ। ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সঙ্গে জার্মান বিমানবাহিনীর যুদ্ধ। এই যুদ্ধে লড়তে গিয়েই হিরন্ময় জার্মান সৈন্যদের হাতে যুদ্ধবন্দী হন। তার স্থান হয় স্ট্যালাগ লুফত ওয়ানের নথিভুক্ত যুদ্ধবন্দী হিসাবে। এই স্ট্যালাগ লুফত ওয়ানেই তার পরিচয় হয় ইলিয়ানা রোজেনবার্গ নামক এক সুন্দরী ইহুদি যুদ্ধবন্দিনীর সঙ্গে। পরবর্তীতে হিরন্ময় হালদার স্ট্যালাগ লুফত ওয়ান থেকে পালিয়ে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। স্ট্যালাগ লুফত ওয়ান থেকে পালানোর সময় সে মুক্ত করে ইলিয়ানা রোজেনবার্গকেও। ইলিয়ানা রোজেনবার্গের কাছে হিরন্ময় হালদার ছিলেন ঈশ্বরের পাঠানো এক বিস্ময়। ইন্ডিয়া দেশটার নামও জানতো না ইলিয়ানা রোজেনবার্গ। শুধু জানতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রেমের সৌধ আছে সেখানে, তাজমহল। আর সেই দেশটায় থাকেন তার সেই সৈনিক- 'হিরন্ময় হালদার' যে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময় জার্মানদের হাত থেকে মুক্ত করে তার বন্দিনী জীবনের অবসান ঘটায়। এই ইহুদি ইলিয়ানা রোজেনবার্গ তার মৃত্যু শয্যায় থাকাকালীন তার শেষ ইচ্ছাপত্রে তার সারাজীবনের সঞ্চিত অর্থের একটা বিরাট অংশ দিয়ে যেতে চান তার জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ বীর হিরন্ময় হালদারকে। জার্মান কনস্যুলেট ল-ফার্ম ম্যাকলিন এন্ড স্টুয়ার্ডকে নিয়োগ করেন ইলিয়ানা রোজেনবার্গের এই শেষ ইচ্ছাপূরণের জন্য। যার তদন্তের ভার ও দায়িত্ব পায় জরিনা ইসমাইল। জার্মান এমব্যাসির নিয়ম অনুযায়ী হিরন্ময় হালদার যেহেতু মারা গেছেন সেক্ষেত্রে তার উত্তরসূরিদের মধ্যে এই টাকার অংকটা সমান ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে জরিনা ইসমাইল খোঁজ পায় যে হিরন্ময় হালদারের এই উত্তরসূরীরাই তাকে তার শেষ বয়সে তার নিজের বাড়ি থেকে রীতিমতো কোর্ট কাছারি করে আইনবলে বিতাড়িত করেন। এই উত্তরসূরীরাই এখন ইলিয়ানা রোজেনবার্গের হিরন্ময় হালদারকে দিয়ে যাওয়া টাকা পাওয়ার জন্য লোলুপ হয়ে ওঠে। কে তার কতখানি কাছের ছিল প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। তবে কি ইলিয়ানা রোজেনবার্গের সারাজীবনের সঞ্চয়ের টাকা যা তিনি হিরন্ময় হালদারকে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তা আত্মসাৎ করবে তার লালসায় পরিপূর্ণ উত্তরসূরিরা? একটা প্রশ্ন পাঠকের মনে নিরন্তর ঘোরে সারা উপন্যাস জুড়ে। হিরন্ময় হালদার ও ইলিয়ানা রোজেনবার্গের মধ্যে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা ছিল। তারা একে অপরের ভাষা জানতো না ও বুঝতো না। পরস্পরের ভাষা না বোঝা দুই মানব মানবী নিজেদের মধ্যে কী ভাষায় কথা বলতেন? উত্তরটা পাঠকমন যেন নিজেই খুঁজে নেয়। ' স্পর্শের' ভাষায়।