থ্রিলার লোকে কেন পড়ে? কেন আবার, রোমাঞ্চিত হবার জন্য। মনজুর রশীদ খানের এই বই অনেকটা থ্রিলার পড়বার অনুভূতি দিয়েছে আমাকে। লেখক এরশাদের শোচনীয় পদত্যাগের বছরখানেক আগে তার সামরিক সচিব হিসেবে যোগ দেন বঙ্গভবনে। টানা কাজ করেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীনের মেয়াদকাল পর্যন্ত। এই ক্রান্তিকালের প্রশানের একেবারে ভেতরকার সব ঘটনার সাক্ষী লেখক। তারই সাদামাটা স্মৃতিচারণ এ বই। মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে বাজারে বহুৎ মশলাদার কিতাব চালু আছে। কিন্তু জিয়া আর এরশাদের শাসনামল নিয়ে লেখাজোখা বেশি নাই, জ্ঞানত আমি দু'চারটে ছাড়া খুঁজে পাইনি। অথচ বাংলাদেশকে বুঝতে এদের শাসনকাল সম্পর্কে জানা জরুরি। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের কথা জানতে, স্বৈরাচারের কীভাবে শোচনীয় পতন হয়েছিল তার বর্ণনা পেতে মনজুর রশীদের এ বইটি সহায়ক। ক্ষমতা কে ছাড়তে চায়। কেউ না। সেদিক দিয়ে সেনাশাসকেরা তো একডিগ্রী সরেস। এরশাদ তার জানপ্রাণ দিয়ে সেনাবাহিনীকে সেবা দিয়েছিল। তার পতন যখন অনিবার্য, তখন সেনাপ্রধান নূরুদ্দিন কেন এগিয়ে এলেন না? তবে কী সেনাবাহিনীও এরশাদকে অপাঙতেও মনে করেছিল শেষ সময়ে? নাকী এরশাদ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে? উত্তর বড় জটিলভাবে দিয়েছেন মনজুর রশীদ। তিনি ঘটনা বর্ণনা করে দাবী করেছেন শেষচাল হিসেবে মার্শাল ল জারি করতে এরশাদের চেষ্টার কমতি ছিল না,রাজনৈতিক মীমাংসাতেও ছিল না অরুচি। কিন্তু সাহায্যে এগিয়ে আসেনি সেনাবাহিনী, ১৯৮৬,১৯৮৮ সালের মতো নির্বাচনী খেলায় রাজি হয়নি আওয়ামীলীগ কিংবা জাসদের মতো কোনো দল।ষড়যন্ত্র তত্ত্ব মাথায় ভর করছিল আমার। এরশাদের গদিচ্যুতির পর আনন্দ- উল্লাস কীভাবে হিংসাত্মক রূপ নিয়েছিল তার স্মৃতিচারণ করেছেন মনজুর রশীদ খান।কী হয়, কী হবে - এসব ভাবনাকে স্রেফ থ্রিলার কে হার মানানো গতিতে ভাবিয়ে তুলছিল আমাকে। দু'দিন কোনো প্রশাসন ছিল না সারাদেশে। তখন কীভাবে রাজি করানো হয়েছিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীনকে - এ এক ইতিহাস বটে। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের কথাই ধরুন না। এরশাদ তাঁকে বিচারপতি ও রেডক্রস প্রধানের পদ থেকে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে বিদায় করেছিলেন। অন্যায় করেছিলেন সাহাবুদ্দীনের সাথে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! সেই সাহাবুদ্দীনের কাছেই তাকে হস্তান্তর করতে হল বঙ্গভবনের কর্তৃত্ব। একেই বোধহয় বলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীনের কার্যকলাপ ভালোভালেই দেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন তার সামরিক সচিব মনজুর রশীদ। সেই সুবাদে জানিয়েছেন এই লোকটির প্রশ্নাতীত সততার কথা। যিনি কত সহজে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাকে কর্তব্যজ্ঞানে অবহেলা করেছিলেন। সাহাবুদ্দীনকে রাষ্ট্রপতি পদে মানতে গররাজি ছিল বিএনপি । অথচ পরে দেখা গেল নির্বাচনে তারাই জিতেছে। তখন অবশ্য চুপ। একানব্বইয়ে জয়ের পর সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরী হলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তার মীমাংসা করেন দক্ষহাতে। খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রপতিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রণয়নের ভূতও তাড়ান তিনি। সে সময় সরকার ও সংসদ নিয়ে দ্বন্দ্বের একটি চিত্র লেখায় পাবেন। রাষ্ট্রপতির কাজ নিয়ে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন বলেছিলেন, "মাজার যেয়ারত ছাড়া রাষ্ট্রপতির কোনো কাজ নেই।" সেই জেয়ারতের দায়িত্ব আবদুর রহমান বিশ্বাসের কাঁধে দিয়ে বিচারালয়ে ফিরে যান এই সফল মানুষটি। চারদিন বাদে সেনাবাহিনীতে থিতু হন বইটির লেখক মেঃ জেঃ (অবঃ) মনজুর রশীদ খান। পেশাদার লেখক নন মনজুর রশীদ খান। তাই লেখায় শতভাগ পরিপক্বতা আশা করা অনুচিত। হ্যা, সামরিক সচিব হিসেবে আরো অনেককিছু জানতেন তিনি । হয়তো সব জানানো জরুরি মনে করেন নি বলেই লিখেন নি। কিন্তু লিখলে মন্দ হতো না। "অঙ্কুর" প্রকাশনী বইটির ঘষামাজার কাজটিতে ফাঁকি দিয়েছে- বানান ভুল তার প্রমাণ। তবে এককথায় বলতে গেলে বইটা একটি রত্নবিশেষ তাদের কাছে, যারা এরশাদের পতনের ভেতরকার কথা জানতে চান এক নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স, হাউজ স্পীকার পল রায়ান সহ দেশটির যাবতীয় কংগ্রেস সিনেটের সদস্যরা কোনো এক অনুষ্ঠানে মিলিত হলো। এরপর দেখা গেলো, কোনো বোমা হামলা কিংবা ভূমিকম্পে একসাথে সবাই নিহত হলো। তখন দেশটির দায়িত্ব গ্রহণ করবে কে?
মূলত সাংবিধানিক এই শূন্যতার তাৎক্ষনিক সমাধান হিসেবে ঠান্ডাযুদ্ধের যুগ থেকে আমেরিকান প্রেসিডেন্টশিয়াল সিস্টেমে শুরু হয় 'ডেসিগনেটেড সারভাইভর' নামে একটা ব্যবস্থার। যেখানে হোয়াইট হাউজ থেকে মনোনীত 'গোপনীয়' কোনো মন্ত্রী/কংগ্রেসম্যানকে অনুষ্ঠানের দিন নিয়ে যাওয়া হয় 'গোপনীয়' একটি স্থানে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই তিনিই পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হবেন। আর এই নিয়ে পুরো একটা সিরিজই প্রচার করছে ABC Designated Survivor শিরোনামে।
মনজুর রশীদ খানের এই বই আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল হলিউডের এই পলিটিকাল থ্রিলারটির কথা। সাবেক স্বৈরচার এরশাদের পতনের বছরখানেক আগে তিনি তার সামরিক সচিব হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের স্বল্পকালীন রাষ্টপতিত্ব এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম 'পরিষ্কার' একটি নির্বাচন, সবকিছুই তিনি খুব কাছ থেকেই দেখেছেন। বঙ্গভবণে তার সামনেই রচিত হতে একেরপর এক ইতিহাস। যার রেশ এখনো আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদ্যমান। এসবকিছুর চাক্ষুশ দলিল বইটি।
৯০ এর শেষেরদিকে এরশাদ যখন বুঝতে পারে আর সম্ভব না, ঠিক তখনি আবার মরিয়া হয়ে উঠে গদি রক্ষার জন্য। এরপর চেষ্টা চলে সেনাবাহিনী নামানোর, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেনাভবন থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। লেখক জানায় তৎকালীন সেনাবাহিনীর শীর্ষকর্মকর্তা কিভাবে শেষেরদিকে এসে তাদের কমান্ডার ইন চিফের টেলিফোনের শব্দ এড়িয়ে চলেছিল।
এরপর এরশাদ এমন একজন লোকের কাছে এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে যাকে ঠিক সাত বছর নয় মাস আগে এরশাদ অপমান করে দায়িত্ব থেকে সরিয়েছিল।
মানুষ হিসেবে এরশাদ মহা চতুর এটা প্রমানিত। লেখকের মতে এরশাদকে তৎকালীন সময় তার সহকর্মী মওদুদগং সহজে প্ররোচিত করত। এরশাদ ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার সাথে পল্টিমারে, ২০১৪ এর 'নির্বাচনে' আমরা একই ঘটনা ভিন্নমঞ্চে দেখি।
বাংলাদেশের নির্বাহী ক্ষমতার কতটা ভয়াবহ ভাবে বন্টিত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীনের একটা কথাতেই টের পাওয়া যায়, তিনি বলেন, "মাজার যেয়ারত ছাড়া রাষ্ট্রপতির কোনো কাজ নেই।" সেই জেয়ারতের দায়িত্ব আবদুর রহমান বিশ্বাসের কাঁধে দিয়ে বিচারালয়ে ফিরে যান এই সফল মানুষটি। এর কদিন পরেই লেখক ফিরে যান সেনাবাহিনী।
অসাধারণ তথ্যভান্ডারে পরিপূর্ণ এক বই। এরশাদ আমল নিয়ে যে দু একটি বই পাওয়া যায়, এটা তার মধ্যে অন্যতম। যদিও লেখক পেশাদার লেখক না, তার কারণে লেখায় রসের যথেষ্ঠ ঘাটতি রয়েছে ।