বসুধা, তার স্বামী নন্দকিশোর ও কন্যা মৃত্তিকা। সুখে দিন যাপন করে তারা। কিন্তু সেই সুখকে অপসারিত করে এক ভয়ানক অসুখ। বসুধার জীবনসংগ্রাম তাকে রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এ উপন্যাস এক নারীর নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের তথা মুক্তির আলোয় অবগাহনের আখ্যান।
নন্দিতা বাগচী-এর জন্ম জলপাইগুড়ি শহরে। বিবাহোত্তর জীবনে কলকাতা ও দিল্লিতে কিছুকাল কাটিয়ে বিদেশে পাড়ি দেন। উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ায় বসবাস এবং শিক্ষকতা করলেও পশ্চিম আফ্রিকার প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে ঘুরেছেন ডাক্তার স্বামীর কর্মসূত্রে এবং সমাজসেবার কাজে। নাইজেরিয়ার ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস্ ক্লাব’-এর সদস্য হিসেবে সেখানকার নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঘুরেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। দেশে ফিরে বর্তমানে লেখালেখির পাশাপাশি আত্মনিয়োগ করেছেন সমাজসেবায়। গাছপালার সঙ্গে নিবিড় সখ্য তাঁর। নিয়মিত লেখেন বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজি পত্র-পত্রিকায়।
আচ্ছা, আমরা কি কারও দুঃখকে স্পর্শ করতে পারি? যদি পারি, তবে কি সেই স্পর্শ আমাদের সুখ দেয়? একটা গোপনীয় সুখ। দুঃখ আসলে সুখেরই তো ছায়ামাত্র। এবার প্রশ্ন হল সুখ কী? আর কীই বা দুঃখ? একজনের জন্য যা সুখ, অন্যের কাছে তা দুঃখ হতেই পারে। আপেক্ষিকতার নিক্তিতে কে কেমন ওজন চাপাতে পারে তাতেই হবে বিচার। আবার বিচার করেই বা কী হবে? সেই তো চাকা ঘুরবে। যে সুখ উপরে জয়ধ্বজ তুলে ছিল, তা কালের নিয়মে নিচে আসবে। পতাকা ওড়াবে দুঃখ। পড়লে মনে হবে ভগবান কৃষ্ণের অমোঘ বাণীগুলো লিখে চলেছি। আসলে নন্দিতা বাগচীর ‘পুনর্বাসন’ পড়ে ফেলার পর এত গভীর আবেগ এসে আমার গলার কাছে একটা ব্যাথা জমিয়ে দিল যে সেটা দূর করার জন্য ‘গীতা’ বৈ অন্য কোনও পুস্তকের কথা মাথাতেও এল না। ‘পুনর্বাসন’। দেশ পত্রিকায় একটা সময়ে ধারাবাহিক হিসাবে বেরিয়েছিল। সাড়া ফেলেছিল। নিন্দা, প্রশংসা যোগ্য হাত থেকে বেরিয়ে নিন্দিত এবং নন্দিত করেছে লেখককে। কিন্তু সাহিত্যমধুকরদের কাছে বহুবার নাম শুনেও এবং দেশ পত্রিকার নিয়মিত পাঠক হয়েও আমি ‘পুনর্বাসন’ ধারাবাহিক উপন্যাস হিসাবে পড়িনি। বলা ভালো, পড়তে পারিনি। কারণ? এক এবং অদ্বিতীয় – আমি ধারাবাহিক উপন্যাস পড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। পড়তে – পড়তে আগের হিসাব – কিতাব ভুলে যাই। যখন যে অংশ পড়ি, তখন সেই অংশেই প্রাবল্য প্রয়োগ করে বসি ইত্যাদি ছলের অভাব আমার মত দুর্জন ব্যক্তির কাছে হওয়ার কথাই নয়। যাই হোক, বই হিসাবে হাতে তুলে নিলাম ‘পুনর্বাসন’ এবং উপলব্ধি করলাম যে আমি কী না পড়েও এতদিন ছিলাম। প্রচ্ছদের কথা ও কাহিনী আমি বরাবরই শেষে বলে থাকি। তবে আজ উলটো কাহন গাইব। এক রূপবতী নিজদার্ঢ্যে দণ্ডায়মান। পশ্চাৎপটে আরও এক নারীমুখ। অসাধারণ প্রচ্ছদ। আনন্দর প্রোডাকশন নিয়ে কলম ঠেকানো প্রায় দেবতারও অসাধ্য এটা সুবিদিত সত্য। চলে আসি গল্পে। ছবি বলে দিচ্ছে গল্পে একজন নায়িকা আছে। থাকবেই। বড়দের সব গল্পেই মোটামুটি নায়িকা থাকে। একজন নায়িকা আছে, একজন নায়ক আছে, আর আছে তাদের একটা ভাড়ার ফ্ল্যাট। সঙ্গে আছে তাদের মেয়ে। নায়িকার নাম বসুধা, নায়কের নাম নন্দকিশোর, মেয়েটির নাম মৃত্তিকা। পৃথিবীর সব গল্পই নাকি প্রেমের হয়। এখানেও প্রেমে ভরন্ত একটা সংসার সামাল দিচ্ছে নায়ক – নায়িকা। সামাজিক দায় মেটাচ্ছে, কর্তব্য পালন করছে। আচমকা একটা ঝড় উঠল। একটা মারণ অসুখে এলোমেলো হয়ে গেল সংসার। খোলা জানালাগুলো যেন এক – এক করে বন্ধ হয়ে গেল নায়িকা বসুধার মুখের উপরে। অসহায় এক রূপবতী। কে তার সহায় হবে? এটা হল গল্প। বেশি বলে দিলে ইন্টারেস্ট থাকবে না। তাই রেখে ঢেকে কভারের কথাটাই বললাম। বাকিটা বই থেকে.... এবার আসি লেখকের মুন্সিয়ানায়। এবং কেন এই বই পড়বেন? অনেকে বলেন, নন্দিতা বাগচী ডাক্তারি নিয়েই লিখে চলেন। আচ্ছা, গৌতম কীভাবে বুদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন মনে পড়ে? রোগ, শোক, জরা দেখতে না পেরে। কিন্তু তিনি কি আদৌ এইসবের জগত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছিলেন? আমরা তো কোন ছাড়। এই রোগ, শোক, জরা নিয়ে ভাবলেই কি চিকিৎসককে মনে পড়ে যায় না? বলুন তো? পড়ে না? আপনার আশেপাশে থাকা অন্তত এমন পাঁচজন ব্যক্তিকে বেছে নিন তো যিনি জীবনে বড় রোগে পড়েননি বা তার কোনও প্রিয়জনকে কোনও মারণরোগ কেড়ে নিয়ে যায়নি। পারবেন? তাহলে কেনই বা আমরা অধীত বিদ্যার এই প্রয়োগ দেখেবুঝে নেব না? ক্যান্সার সংক্রান্ত চিকিৎসা তথা হেলথ ইন্সিওরেন্স নিয়ে এই উপন্যাস সেই কাজই করেছে যা করেছে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’। এই উপন্যাস আসলে এক এমন তমসুক, যেখানে মাঝেমধ্যে প্রাঞ্জল গদ্যে ফিকশন আর নন – ফিকশনের সূক্ষ্ম নীল রেখাটা যেন কোথাও মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বাংলা সাহিত্য আপনার কাছে ঋণী থাকবে মহোদয়া। আপনি নিজেও জানেন না আপনি কী রচনা করেছেন। তবে আমার কাছে ব্যক্তি নয় রচনা বড়, তাই আবার রচনাতেই ফিরে আসি। পুরোনো হিন্দি সিনেমা নিয়ে আমি মাঝেমধ্যে নানা কথা জোগাড় করে পড়ি। কোথাও পড়েছিলাম নির্দেশক হৃষীকেশ মুখার্জি ‘আনন্দ’ সিনেমার কাহিনী নাকি তাঁর প্রিয় বন্ধু রাজ কপূরের সদা হাসিখুশি স্বভাব দেখে লিখেছিলেন। রাজ কপূর নিজের আনন্দের চরিত্রে অভিনয় করতে চাইলেও হৃষীকেশ বাবু মানা করে দেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল ওই চরিত্র এতটাই প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে যে সেই জায়গায় নিজের প্রিয় বন্ধুকে মরতে দেখতে পারবেন না। পুনর্বাসন উপন্যাসে নায়িকার জীবনের সুখকে অপসারিত করে এক ভয়ানক অসুখ। অর্থাৎ, এখানেও একটি মৃত্যু ঘটেছে। আমি সেই মৃত্যুর প্রতি পল অনুভব করেছি। একবারের জন্য মনে হয়নি অন্য কেউ ওটা, মনে হয়েছি যেন আমি নিজেই শায়িত মৃত্যুশয্যায়। কী মর্মান্তিক ভাবে প্রতিটা আগামী পদক্ষেপ বুঝতে পেরেও পড়ে গেছি মৃত্যু কখন আসবে সেটা দেখার জন্য। নায়ক হেরে গেল। নায়িকা হেরে গেল। হেরে যাওয়ার পর আমার মাথায় মুনির নিয়াজির লাইনগুলো ভেসে বেরিয়েছে কেবল-- কিসিকো মৌত সে পহলে, কিসি গম সে বচানা হো, হকিকত অউর থি কুছ, উসকো জাকর ইয়ে বতানা হো, হামেশা দের কর দেতা হু ম্যায়...! দুর্জন, কুটিল, খল, স্বার্থপর আমার চোখও করুণার্দ্র হয়েছে। এত কষ্ট না হলে যেন উপন্যাসটাও সার্থকনামা হত না। পুনর্বাসন করার জন্য আগে দরকার উচ্ছেদ। সেটাকে এত নিষ্ঠুর ভাবে দেখিয়েছেন লেখক যে মাঝেমধ্যে তাঁকেই নিয়তি বলে বিভ্রম জাগে। নিখুঁত ডিটেলিং নিয়ে কাজ করতে লেখককে আগেও দেখেছি। এই উপন্যাসের চিকিৎসাবিদ্যা সংক্রান্ত অংশ বাদ দিলেও বাকি সবখানেই সেই একই পেলব পরশ মেলে। যন্ত্রবিদ্যার খুঁটিনাটি থেকে আরম্ভ করে বাঙালির বামমনস্কতায় উদার হাতে ‘পারফেকশনের’ সার ছড়িয়েছেন লেখক। বসুধা, নন্দকিশোর, বসুধার ভাই পৃথ্বীরাজ, ভাজ মিতালি এই সব চরিত্রের মন্দের মধ্যে ভালো আর ভালোর মধ্যে মন্দ মিশিয়ে – মিশিয়ে গড়ে তুলেছেন অজস্র শেডস। প্রত্যেকেই নিজের যুক্তিতে অকাট্য। প্রত্যেকের মধ্যেই পাঠক একটু করে নিজেকে খুঁজে পাবেন। সকলের স্বার্থেই মনে হয় আমার স্বার্থ। এবার আসি এই বিরিয়ানির আসল মশলায়। অনঙ্গলাল চৌধুরী। একজন নামজাদা অনকোলজিস্ট। নিধুবাবুর টপ্পা ধরেন, ন্যুড পেইন্টিঙ্গে দেখে ব্লিস খোঁজেন। তিনি ঘূর্ণাবর্ত থেকে উদ্ধার করবেন বসুধাকে, নাকি নিয়ে গিয়ে ফেলবেন আরও একটি ঘূর্ণাবর্তের অক্ষে সেটা পাঠক পড়ে বুঝে নিন। তবে এমন একটা রঙদার চরিত্র ছাড়া এই উপন্যাস বেমানান ছিল। খুব গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেছি, এই কামুক বা বলা ভালো বিকৃতকাম পুরুষকে কি কোথাও দেখেছি? চেনা – চেনা লাগল যে। উত্তর এল মনের গহীনতম স্থল থেকে। হ্যাঁ, দেখেছি। নিজের মধ্যেই তো লুকিয়ে আছে। সত্যিই কি এমন কোনও পুরুষ আছে, যে বিকৃত কামনার শিকার করে না নারীকে? সমাজে সকলের সামনে না হোক, মনে – মনে? বুকে হাত রেখে সব পুরুষ একবার নিজেকে প্রশ্নটা তুলে দেখবেন তো। লেখক সময়ের থেকে এগিয়ে থাকেন এটা আমি আগেও বলেছি। নোটার কথা উল্লেখ করা হয়েছে দেখলাম, সম্ভবত তখনও নোটা বাস্তবায়িত হয়নি ভারতে, যখন এই উপন্যাস ধারাবাহিক হিসাবে চলছিল। ম্যারিটাল রেপ এই উপন্যাসের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে। ম্যারিটাল রেপ বা বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে ভূ-ভারত সরব হয়ে উঠেছিল কিছুদিন আগেই। কিন্তু তার আগেই পাঠকের দরবারে তা পেশ করেছেন লেখক নিজের রক্তমসী দিয়ে। ‘মাধুকরী’ পড়ে মনে হয়েছিল বুদ্ধদেব গুহ এর থেকে ভালো আর কিছু লিখতে অপারগ হবেন। ‘পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ’ পড়ে মনে হয়েছে স্বপ্নময় চক্রবর্তী মনে হয় আর এর থেকে বেশি ভালো কিছু লিখতেই পারবেন না। আজ লাখ দেড়েক শব্দের এই উপন্যাস পড়���র পর মনে হয়েছে নন্দিতা বাগচীর নিজের পক্ষেই এই লেখাকে ছাপিয়ে যাওয়া খুব কঠিন। আবারও লিখছি, উনি নিজেও সম্ভবত জানেন না উনি কী লিখেছেন। উনি লিখেছেন প্রতিটা মেয়ের লড়াইয়ের কথা। সেটা নারী – পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের পড়া উচিৎ। পড়া উচিৎ নিজেদের জন্য। পড়া উচিৎ সেই সব বসুধাদের জন্য, যারা আমার – আপনার বাড়িতে আমাদের সঙ্গেই থাকে। একটা লতা গাছ সবসময় অবলম্বন খোঁজে। পেলে আলোর দিকে মাথাচাড়া দেবেই দেবে। আলোই তার স্বপ্ন। স্বপ্ন সত্যি করতে কে না চায় বলুন তো? মাহির হম হো চলে, দুখো কো ধোনে মেঁ কুছ হি পল বাকি হ্যায়, সপনে সচ হোনে মেঁ!