আমাদের কাহিনী এমন এক সময়ের, এমন এক পৃথিবীর, যেখানে চলছে ঘোর দুর্দিন। দুর্দিনের আভাস এখন মাটি ফুঁড়ে বেরোচ্ছে। বাতাসে থমকে থাকা প্রলয়ের পরশ। সবার মুখে এক কথা, এক বিশ্বাস, 'ঈশ্বর ক্রূদ্ধ'। দেবলোকবাসী পুরুষোত্তম নাকি মানুষকে শাস্তি দিতে চান। তাই দুনিয়াজোড়া এই আকালের আবির্ভাব। মানুষ মরছে, অন্ধকারে ডুবছে, অপরাধে শরীর ভাসাচ্ছে, কিন্তু ঈশ্বরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে অপারগ তারা। কেউ জানতে চায় না কি তাদের অপরাধ। শুধু বেঁকে যাওয়া মেরুদন্ড নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে শেষ আঘাতের জন্য। তবে কি এইভাবেই একসময় শেষ হয়ে যাবে মানুষের অস্তিত্ব? অন্ধকার হাতড়ে উত্তর খুঁজে ফেরে এক কিশোর। একাকী, একরোখা আর নিরলস তার প্রচেষ্টা। বুকে তার দুর্জয় সাহস, পায়ে মুক্তির টান। নাম আলোহান। এ কাহিনী কাল্পনিক সেই স্থান কাল এবং পাত্রদের নিয়ে যারা হয়তো সম্পূর্ণ কাল্পনিক নয়।
১২৮ পৃষ্টার, ১৪৪/- টাকা দামের এই পেপারব্যাক উপন্যাসটি নিয়ে কিছু লেখার আগে বইটি নিয়ে লিখতেই হচ্ছে। সুমন্ত মল্লিক-এর অসামান্য প্রচ্ছদে শোভিত, আপাতভাবে সুমুদ্রিত এই বইটিতেও বিভা পাবলিকেশন-এর যাবতীয় দুর্বলতা, কিছু কম হলেও, প্রকট হয়েছে। রয়েছে বিস্তর বানান ভুল, এবং মোক্ষম টাইপো। এই অবধারিত দুর্বলতাগুলো ছাপিয়ে মূল গল্পের কথা ভাবলে বইটা কেমন লাগে?
“আমাদের এই বইয়ের কাহিনি এমন এক সময়ের, এমন এক পৃথিবীর, যেখানে চলছে ঘোর দুর্দিন”। আমি জানি আপনি কী ভাবছেন। মানুষ বাঘ-ভালুকের হাত থেকে বাঁচার, আর দু’মুঠো খেয়ে গুহার ভেতরে লুকোনোর ব্যবস্থা করার পর থেকেই নিজের আশপাশের দুনিয়াটা সম্বন্ধে এই কথাটা ভেবে আসছে, তাই না? সভ্যতার ঊষালগ্নেও সাহিত্য বলতে যা রচিত হয়েছে তাতে মানুষের বিশ্বাস উৎপাদন করার জন্য, তার সাহসের মরুভূমিতে এক চিলতে সবুজ লালনের আশায় এমন পটভূমি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে নায়ক (ও তার সঙ্গীদের) যেতে হয় এক দুরূহ যাত্রায়। আজও এমন লেখা হয়, শুধু তাকে আমরা ধর্মগ্রন্থ না বলে ফ্যান্টাসি বলি। আলোচ্য বইয়েও খুব সহজ, কবিতার হালকা স্পর্শমাখা গদ্যে বলা হয়েছে এমন এক পৃথিবীর কথা, যেখানে দেবতাদের ক্ষমতালোভী যুবরাজের খেয়ালে পৃথিবী ধ্বংস হতে বসেছে। উজাড় হয়ে আসা পৃথিবীর এই ধুলোখেলায় অসহায় ক্রীড়নক হয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে মত্ত, বা লুট-তরাজের মাধ্যমে অবশিষ্ট মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে পশুর অধম হয়ে পড়ছে মানুষ। একটি ছেলে ছাড়া। নিজের পরিবার, নিজের ভালোলাগা, সবকিছু ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সেই ছেলেটি। তাকে যেতে হবে বহু-বহু দূরে, যেখানে আছে এক মিনার, যার কাছে নাকি দেবতাদের দেখা মেলে। নিষ্করুণ মরুভূমি, হিংস্র ও প্রতিহিংসাপরায়ণ দস্যুদল, মাটির নিচের বাসিন্দা ‘নরমাংসভোজী’ মানুষেরা, তুষারের ঝড়, ঈর্ষাকাতর দেবতার পাঠানো একের পর এক টোপ বা মৃত্যুবাহী ছোবল, এইসব অতিক্রম করে ছেলেটি কি পৌঁছতে পারবে সেই মিনারের কাছে? কেউ কি থাকবে তার সঙ্গে শেষ অবধি? কী হবে তার এই যাত্রার শেষে? সুধী পাঠক মাত্রেই জানেন, শুধু একটি ‘কোয়েস্ট’ বা একটি চরিত্রের দুঃসাহসিক প্রয়াস কখনোই ফ্যান্টাসির উপজীব্য হয় না। এই বইয়েও লেখক দক্ষতার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন জীবন সংগ্রামের সার সত্য: বিপদে হাল না ছেড়ে বরং নিজের দেহ ও মনকে মজবুত করে প্রত্যাঘাত করতে হয়। তার সঙ্গেই এসেছে আমাদের অতি পরিচিত মহাকাব্যে পড়া পুত্রস্নেহ ও রাজকর্তব্যের দ্বন্দ্ব। এসেছে বিশ্বাসে ভর দিয়ে কতটা পথ চলা যায়, সেই প্রসঙ্গ। তা বলে লেখাটা কি নিখুঁত? মোটেই নয়। এদের যে দুর্বলতাগুলো আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সেগুলো হল: (১) সবকিছু ঘটেছে ভীষণ সরলরৈখিক পথে। (২) সব চরিত্র, বিশেষত খল চরিত্ররা এতটাই একমাত্রিক যে তারা মনে দাগ কাটতে পারে না। (৩) ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীতে সবচেয়ে আগে বিপন্ন হয় যে ইউনিটটি, সেই সংসারের বাঁধন একেবারে অটুট রেখে দিয়েছেন লেখক, যা অসম্ভাব্য। (৪) লেখার শেষটায় বড়ো বেশি ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু’ ভাব এসে গেছে, যেটা টোকিয়েন ও অন্যান্য কিংবদন্তি সাহিত্যিকের লেখায় দেখা যায় না। কিন্তু তাও, সব মিলিয়ে, খুব সহজ ভাষায়, মূলত ইয়ং অ্যাডাল্ট বা কিশোর পাঠকদের জন্য লেখা এই ফ্যান্টাসিটি পড়লে দুটো কারণে আশাবাদী হওয়াই যায়: ১. এক নতুন লেখকের অনাড়ষ্ট কলমের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় হল এই বইয়ের মাধ্যমে। ২. এই মুহূর্তে বাংলায় ছোটোদের জন্য বিবেক কুণ্ডু-র লেখায় বুমবুম সিরিজ, এবং বড়োদের জন্য কল্পবিজ্ঞানের মোড়কে মল্লিকা ধর-এর কিছু লেখা ছাড়া বাংলায় ফ্যান্টাসি তেমন নেই। ওপার বাংলায় শরীফুল হাসান তাঁর অসামান্য “সাম্ভালা” ট্রিলজিতে একই সঙ্গে এনেছিলেন মিথ, হরর, থ্রিলার, কোয়েস্ট, এবং ফ্যান্টাসির ক্লিফনোটস কৃত সংজ্ঞার বাস্তবায়ন (ফ্যান্টাসি ফিকশন হল এমন এক জঁর যাতে বর্ণিত ঘটনাবলি কখনোই বাস্তবে সম্ভবপর নয়)। আলোচ্য উপন্যাস সেই স্তরে পৌঁছতে পারেনি, হয়তো পৌঁছতে চায়ওনি। কিন্তু আগামী দিনে সুযোগ পেলে লেখক তাঁর কল্পনাশক্তি এবং সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে নিঃসন্দেহে আমাদের আরো ব্যাপক, আরো গভীর, আরো ধারালো লেখা উপহার দেবেন। অন্তত এটাই আমার বিশ্বাস। পাঠ শুভ হোক।
ফ্যান্টাসি লেখা সহজ কাজ নয়, একেবারেই না। বিশেষ করে যেখানে একটা নতুন দুনিয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানকার মানুষদের সম্পর্কে আমাদের জানানো হচ্ছে, আমাদের পরিচিত করানো হচ্ছে সেই দুনিয়ার ঈশ্বরের সঙ্গে, সেই কাজটি ঠিকঠাক করে তোলা কঠিন, ভীষণ কঠিন। অন্তত আমার তো তাই মনে হয়। আর সেই কাজটি খুব মুন্সিয়ানার সঙ্গে করেছেন গৌতমদা তার এই উপন্যাসে। কল্পনার কোন স্তরে পৌঁছলে এইভাবে একটা নতুন পৃথিবীর কথা লেখা যায় সেটা গৌতমদার লেখা না পড়লে বোঝা যাবেনা। গল্পে কী আছে সেটা নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। খুব সোজাসাপ্টা গল্প, জটিলতা নেই এর মধ্যে একদম। একটি ছেলে বেরিয়ে পড়ে ঈশ্বরের খোঁজে, কারণ তার দুনিয়াতে আর বৃষ্টি হয়না। সে তার ঈশ্বরের দেখা পাবে কিনা বা জল এই পৃথিবীতে আবার আসবে কি আসবেনা সেটা পড়লেই বোঝা যাবে। কিন্তু এই উপন্যাসের বিশেষত্ব আমার কাছে হলো এর journey টা। You will feel the pain, the elation, the helplessness and the sheer joy of Alohan, that's the beauty of it. Yes, you will feel the emotion. আর এখানেই গৌতমদা জিতে গেছেন, গল্পের শেষে কখন চোখটা ভিজে এসেছিল টের পাইনি। যারা পড়েননি পড়ে দেখতে পারেন। I loved it, আর এখনও বোধ হয় গুগল প্লেস্টোরে এটি পাওয়া যাবে, সুতরাং অনলাইন পড়ার ক্ষেত্রেও অসুবিধে নেই। (বানান ভুল থাকবে ইবুক version টি তে, সেগুলোকে একটু সয়ে নিতে হবে ব্যস)। That's all I have to say. Cheers.