Hasan Azizul Huq (Bengali: হাসান আজিজুল হক) is a Bangladeshi writer, reputed for his short stories. He was born on 2 February, 1939 in Jabgraam in Burdwan district of West Bengal, India. However, later his parents moved to Fultala, near the city of Khulna, Bangladesh. He was a professor in the department of philosophy in Rajshahi University.
Huq is well known for his experiments with the language and introducing modern idioms in his writings. His use of language and symbolism has earned him critical acclaim. His stories explore the psychological depths of human beings as well as portray the lives of the peasants of Bangladesh.
He has received most of the major literary awards of Bangladesh including the Bangla Academy Award in 1970.
মৃত মানুষকে চিতায় পুড়তে সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু লেখক উপন্যাসের ষড়াননের পিসি চরিত্রটির চিতায় দাহ হবার দৃশ্যের যে বর্ণনা করেছেন সে যেন আমার অভিজ্ঞতাকেও ছাপিয়ে গেছে।
বলছি হাসান আজিজুল হকের শেষ উপন্যাসে নিয়ে। নাম তরলাবালা। প্রথম অংশবিশেষ প্রকাশিত হয়েছিল নাঈম হাসান সম্পাদিত ছোটকাগজ নিরন্তর-এ। তারপর দীর্ঘবিরতি শেষে প্রকাশকের অনুরোধে আরও খানিকটা লিখলেন। তুলে দিলেন প্রকাশকের হাতে। ইচ্ছে ছিল দ্বিতীয় পর্ব লেখার। কিন্তু হলো না। এর মাঝেই আগুনপাখিখ্যাত লেখক হাসান আজিজুল হক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। শেষ করার পর কি যে একটা আক্ষেপ অনুভব করলাম যারা পড়বেন তারাই হয়তো বুঝতে পারবেন।
গল্পটা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের। ভাটি অঞ্চল। চারিদিকে হাওড়, নদী। একপাশে দূরে ছোট ছোট পাহাড়। সময়টা আইয়ুব শাসন আমলের শেষ দিকে। লেখক এই ছোট্ট বইটাতে দুইটা বড় ক্যানভাস ধরেছেন। একদিকে ক্ষয়িষ্ণু হিন্দুদের সামাজিক অবস্থা আর অন্যটায় এক গ্রাম্য নারীর মনোজগতের ধুকে ধুকে নিঃশেষ হয়ে আসা অনুভূতি। নিয়মের বেঁচে থাকায় নিয়মিত স্বপ্নের ক্ষীণ হতে হতে নিভে আসার উপাখ্যান।
হাসান আজিজুল হক সেই লেখকদের মাঝে একজন যিনি অল্পকথায় বুঝিয়ে গেছে্ন অনেক কিছু। এইজন্য হয়তো উনি লিখেছেনও খুব অল্প। উপন্যাসের পাতা থেকে ঘুরে আসি একটু।
"লোকে বলে পাগল (ষড়ানন), গাজন ফাজন কবে উঠে গেছে গাঁ থেকে-গাঁয়ে আর হিঁদুই বা কই, সাতচল্লিশের আগেই তো জমিদারবাবুরা, চৌধুরীরা আর সব লেখাপড়াজানা বাবুরা এখানকার বাস তুলে কলকাতায় চলে গিয়েছিল, তারপরে বড় বড় তিন চারটে ধাক্কায় বাকিরা গেল। সোনারুপো গরু-ছাগল আর সোমত্ত সোমত্ত মেয়ে নিয়ে গেলে নাচার ষড়াননরা ছাড়া গাঁয়ে আর কে থাকে?"
সবাই গেলেও কিছু তথাকথিত অন্ত্যজ শ্রেণীর হিন্দুদের যাবার না ছিল জায়গা না ছিল সামর্থ্য। সামর্থ্য বা যেটুকু ছিল তাও কেঁড়ে নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। আবার একটু চোখ বুলাতে হবে বুঝে নিতে।
"সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলে পিসি আর একবার কথা বলে, মোদের মাঠকোঠার উত্তরে আছে দুই বিঘা ভিটা জমিন, বেগুন কুমড়ো লাউশাক এইসব হয়। একবার ষড়ানন বিক্কিরি করতে চাইছিল। তবে পারেনি বিক্কিরি করতে। আয়ুব খান রাজা হিন্দু জমি রেজিস্ট্রিরি বন্ধ করে দিছিল। আগে রাজার কাজির হুকুম হইলে তবে বিক্কিরি করা যাইব।"
উপন্যাসের আলোকে এই ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু জনগোষ্ঠীর যে সামাজিক কোণঠাসা অবস্থার কথা লেখক জানিয়েছেন তার ভেতর সত্যতা ছিল। যার খোঁজ মিলে ইতিহাসের নথিতে। "The government of Pakistan passed an executive order titled “Enemy Property (Custody and Regulation) Order II of 1965” under the provisions of Emergency powers and the “Defense of Pakistan Rules” on Sept. 9, 1965."
তবু এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী মানুষের সাথে সংখ্যাগুরুদের হৃদয়ের বন্ধনে ঘুণ ধরে না। '৬৯ এর জন অভ্যুত্থানে ষড়ানন জনজোয়ারের ভেসে যায়। রোজ লাশ পড়ে। গুলিতে মাথা থেতলে যাওয়া আওলাদ চাচার মৃত্যুতে তার সৌভাগ্যকে হিংসা করে ষড়ানন, কদম আলি, তমিজ চাচার কবরের মাঝে বসে দিগন্ত ওঠা সূর্যের অপেক্ষায় রাত পার করে দেয়। সাম্প্রদায়িকতার বিষ বাষ্প গলে গিয়ে কি এক নেশার নামে গ্রাম, মফস্বল, উপশহ্ শহরের মানুষগুলো ছুটতে থাকে জাতি, ধর্ম, অবস্থান সব ভুলে।
কিন্তু উপন্যাসে বড় অংশে আছে তরলাবালা মনোজগৎ। যা তরলাবালার ভাঙা স্বপ্নের মত ডুবে যাবার মত। যেখানে একটি কিশোরী শিকড় ছিড়ে এসে শিকড় ছড়ায়। অতীত ডুবে যায় অন্ধকারের ধোঁয়ায়। বর্তমান অনবরত পিষতে থাকে। যেন অন্য এক জগত থেকে উঠে আসে তরলাবালা আবার ডুবে যায়।
এত ছোট একটা উপন্যাস। তবুও কি বিশাল বড়! ধরতে গিয়েও ধারণ করতে পারিনি। শেষ পাতায় বাড়িয়েছে আক্ষেপ। ইশ! শেষ হলো না। ষড়াননের কি হলো জানা গেল না। তরলাবালা কথা শেষ হল না। শুধু শেষ হয়ে গেল লেখকের নিঃশ্বাস। বছর বছর নতুন বই প্রকাশ করেননি। যখন তাগিদ এসেছে ভেতর থেকে শুধু তখনই লিখেছেন। তাতে জাত চেনাতে অসুবিধা হয়নি ছোটগল্পের রাজপুত্র হাসান আজিজুল হকের। শেষের রেশ রেখে গেছেন। আর এভাবে থেকে যাবেন ওনার সৃষ্ট পাঠক থেকে পাঠকের ভাবনায় নির্মিত কল্পনার জগতে।
শ্রদ্ধেয় লেখক হাসান আজিজুল হকের সাথে আমার পরিচয় "হোমিওপ্যাথ এলোপ্যাথ" নামের একটা ছোট গল্প দিয়ে। এর বাইরে লেখকের কোন লেখা পড়ার সুযোগ হয়নি। এই প্রথম লেখকের কোন উপন্যাস পড়লাম,সেটা প্রিয়াক্ষী ঘোষ দিভাইয়ের সুবাদে । তাও সর্বশেষ উপন্যাস। এই সর্বশেষ কথাটা বড্ড বুকে লাগে।
উপন্যাসের নাম "তরলাবালা"। একটা অজপাড়া গায়ের এক নারীর গল্প। তার যাপিত জীবনের গল্প। একটা বিপন্ন দেশের গল্প। সর্বোপরি তরলাবালার সংগ্রামের গল্প,যেখানে তার সঙ্গী হয় স্বামী ষড়ানন এবং এক বুড়ো পিসি।
আমার ভীষণ ভালো লেগেছে গল্পটা। ছোট্ট একটা উপন্যাস অথচ কি ভীষণ মায়াময়। কোন লেখা পড়ার ক্ষেত্রে কয়েকটা জিনিস আমি খেয়াল করি,সেগুলোর হচ্ছে লেখকের বাক্য লেখার ধরন,শব্দের প্রয়োগ আর গল্প বলার শৈলী। এই বইটাতে ও সেসব খেয়াল করেছি এবং অবাক হয়েছি এত চমৎকার ভাবে লেখক সেসব করেছেন।
তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, লেখক এই বইটার দ্বিতীয় খন্ড লিখতে চেয়েছিলেন,সেটা আর হলো না। এই দুঃখ কি ভোলার মতো।
পরে কোন এক সময় সুযোগ পেলে তিনি দ্বিতীয় পর্ব লিখবেন মনে করে "তরলাবালা" প্রকাশকের হাতে দিলেন, কিন্তু সে সুযোগ আর আসলো না। কী এক তৃষ্ণা জেগে রইলো বইটা শেষ করে। কখনো জানাই হবে না লেখক কী ভেবেছিলেন দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে বা আদেও কি সে অবসর তিনি পেয়েছিলেন?
"আগুন পাখি" "সাবিত্রী উপাখ্যান" লেখক হাসান আজিজুল হক এর বিখ্যাত দুটি উপন্যাস। নারী চরিত্র প্রধান উপন্যাস দুটিতেই দুই রকম জায়গা থেকে দুই জন নারীর সংগ্রাম করে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার গল্প।সাথে অন্যান্য চরিত্রের বলিষ্ঠ উপস্থিতি। একই রকম নারী চরিত্র প্রধান উপন্যাস " তরলাবালা"। ছোট থেকে শিব পূজা করে স্বামী ও সন্তানের স্বপ্ন দেখে তাদের সুস্থ তা কামনা করে বড় হয়ে ওঠা এক নারী, মায়ের সংসার থেকে স্বামী সংসারে এসে মায়ের মত পিসির ছায়াতলে থেকে নারী থেকে স্ত্রী ও মা হয়ে ওঠা এক নারীর গল্প।
ছোট্ট একটা পটভূমি তাতে সরব হয়ে থাকা মাত্র তিনটা চরিত্র। চরিত্র গুলো নিয়ে লেখকের বাড়াবাড়ি কি, সামান্যতম কোন বিশ্লেষণ বা বর্ণনার ছটা নাই। চরিত্র গুলো নিজ নিজ জায়গা থেকে তাদের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন লেখকের গুণে। গ্রাম্য পরিবেশ, দারিদ্রতা, সমাজ ব্যবস্থা, মানুষের জীবন - জীবিকা, সরকার ব্যবস্থা, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি -- সব কিছু লেখক কি দারুণ নীরবে বুঝিয়ে দিলেন শুধু চরিত্র গুলোক আচার আচরনে। জন্মের মত সুন্দর ব্যাপরটা, মৃত্যুর ভয়াবহতা কি আশ্চর্য সাবলীলতায় প্রকাশ করে গেলেন।
গল্প উপন্যাস লেখক লিখবেন, পাঠক পড়ে তৃপ্তি পাবেন এটাই অনেক। কিন্তু এমন উপলব্ধি করাতে পারলেন কজন লেখক!
ছোট্ট এই বইটা নিয়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া কীভাবে জানাবো ঠিক বুঝতে পারছি না। হাসান আজিজুল হকের মতো একজন লেখকের লেখা নিয়ে বিশ্লেষণ করতেও সাহস থাকা লাগে। আমি লেখকের প্রথম ও একমাত্র বই পড়েছিলাম, আগুনপাখি। বইয়ে লেখকের লেখা, ভাষার কারুকার্য ভীষণ মুগ্ধ করেছিল। ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম লেখকের লেখার। বিশাল বিস্তৃতির সেই বইয়ের তুলনায় “তরলাবালা” খুবই ছোট, কিন্তু ভারী এক উপাখ্যান।
লেখকের লেখাতে নারী চরিত্র প্রাধান্য পায় বেশি। এখানে যেমন তরলাবালা প্রধান চরিত্র হয়ে উঠেছে। সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় অনেক হিন্দু দেশান্তরী হয়ে ওপারে জায়গা করে নিলেও কেউ কেউ সেই সুযোগ পায়নি। ষড়ানন কিংবা তরলার পরিবার তাদের মধ্যে একজন। কিশোর বয়স পেরিয়ে যখন যৌবনের দিকে তরলাবালা ধাবিত হয়, তখন বিবাহ সূত্রে নতুন এক সম্পর্কে বাঁধা পড়ে।
বাড়ি ছেড়ে নতুন এক পরিবেশে যাত্রা! যেখানে মানিয়ে নিয়ে চলতে হবে। টিকে থাকতে হবে। শ্বশুরবাড়িতে তরলার কেউ নেই। স্বামী ও পিসি শাশুড়িকে নিয়ে নতুন সংসার। সেখানেই এক কিশোরীর নতুন জীবনে প্রবেশের লড়াই।
তখন আইয়ুব খানের শাসনকাল। সেই সময় একটি অধ্যাদেশ জারি হয়, কোনো হিন্দু তাদের জমি বিক্রি করতে পারবে না। ফলে অনেক জমি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ষড়াননদের জমিও এমন হয়ে ওঠে। আইয়ুব খানের শাসনে আগুনের উত্তাপ ছড়ায়। যা ঢাকা, শহর পেরিয়ে এই অজপাড়াগাঁয়েও আঁচ লাগে। বুলেটের গু লিতে কারো মাথার খু লি উড়ে যায়, বুক থেকে র ক্ত ঝরে। মুক্তিযু দ্ধের আগের সেই সময়টাকে খুব সুন্দর করে ধারণ করেছেন লেখক।
হাসান আজিজুল হক কখনও বেশি কথা লেখেন না। অল্প কথাতেই অনেক কিছু বুঝিয়ে দেন। গভীরে প্রবেশ করেন। যা হয়তো মানুষের মনে দাগ কাটে। বইটি যেমন তরলাবালার জীবনের গল্প, তেমনই এক অদ্ভুত সম্পর্কের বন্ধন। স্বামীর সাথে স্ত্রীর সম্পর্ক মানসিক। কথা না হলেও এই সংযোগ যেন অনেক বেশি তীব্র।
পিসির সাথে ষড়ানন বা তরলার বন্ধন এক অন্যরকম সম্পর্কের বয়ান করে। যে সম্পর্ক একদিন শেষ হয়। মানসিক সম্পর্ক আজীবনের, কিন্তু যমদূত একদিন জীবন নিয়ে টান দেয়। তারপর? সব কি এভাবেই শেষ হয়ে যায়!
বইয়ে চিতায় শব পোড়ানোর বর্ণনা লেখক স্পষ্টভাবে দিয়েছেন। দিয়েছেন মানুষের মানসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেই সময়ের জীবনধারণের গল্প। যা হয়তো আমাদের উপলব্ধি করতে শেখাবে।
পরিশেষে, প্রতিটি প্রাণীই তো বাঁচতে চায়। আমরা যাদের হুমকি মনে করি, তাদের মেরে ফেলতে দ্বিধা করি না। অথচ বাঁচার অধিকার সবার আছে। তারাও হয়তো আমাদের হুমকি মনে করে, তাই আক্রমণ চালায়। কে জানে! তাদের মনের ভাব তো বোঝার কম্য আমাদের নয়।
❝Properties not connected with any ❛enemy firm❜ as defined in that rule, were to be vested in the deputy custodian of Enemy Property (Lands and Buildings) with effect from the date of this order. No person could transfer any land, building or movable property so vested in the deputy custodian, by sale, exchange, gift, will, mortgage, lease, sub-lease or any other manner or transfer land, building or movable property from this date.❞
১৯৬৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ❝Defence of Pakistan Rule❞ এর ❝Enemy Property❞ তে উপরের অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। আইয়ূব খানের শাসনামনলে হিন্দু জমি রেজিস্টার করা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে তখনকার হিন্দুরা তাদের জমি বিক্রির অধিকার হারিয়ে ফেলে।
তরলাবালা, এক হিন্দু নারী। পনেরো বছর বয়সে বিয়ে হয় ষড়াননের সাথে। ষড়ানন ও তার পিসিকে নিয়েই তরলাবালার সংসার। গল্পটা তরলাবালার, ও তার যাপিত জীবনের। শশুড়বাড়ির শত বছরের ঐতিহ্যের, সম্পদের শেষ দিকে তাদের জীবন। বিঘে বিঘে জমিনের শেষ দিকে শুরু হয় তরলাবালার জীবনের গল্প। সেখানে নেই বিলাসিতা। বিলাসিতা করার যেটুকু সম্পদ বাকি তাও সরকারের দেয়া হুকুমের ফলে বে-দখল হবার পর্যায়ে। গল্পটা ভেঙ্গে পড়া একটা দেশের। যেখানে ক্ষমতার আসনে আইয়ূব খান। হিন্দু সমাজ যেখানে ভেঙে পড়ছে। তবুও ভাটি অঞ্চলের কিছু মানুষ আছে একসাথে। তাদের ধারণা যত গন্ডগোল মিছিল তো হয় ঢাকায়। এখানে তাদের কিছু হবে না। কিন্তু ধারণা তো সবসময় বাস্তবের সাথে মিলে না। ভাটি অঞ্চলেও আন্দোলন এর রেশ আসে। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলন তরলাবালা-ষড়াননের ভাটি অঞ্চলেও উত্তাপ ছড়ায়। ষড়াননও সেই উত্তাপে গা ভাসায়। গ্রামের আওলাদ চাচার মাথায় গুলি লাগে। কদম আলি ও তমিজ চাচার দুই কবরের মাঝে ষড়ানন পার করে দেয় ভোর। একসময় পরপারে চলে যায় ষড়াননের পিসি। তাকে চিতায় পোড়ানোর সময় ষড়াননের ভেতর যে দুঃখের চিতা জ্বলতে থাকে তার শেষ নেই। এদিকে তরলাবালা এক সন্তান হারিয়ে পরপর দুই সন্তানের জননী হয়। সাথে তার মনের আক্ষেপ নিয়ে কাটায় দিন। পিসির সাথে কাটানো সময়, তার ছায়ায় থাকা জীবন যখন পিসির মৃত্যুতে শেষ হয়ে গেল, তখন শুরু হবার পালা তরলাবালার আরেক জীবন। এই জীবনে কী হবে তার? মনের আক্ষেপ, দুঃস্বপ্ন আর মন খারাপ করা দিনের শেষ হবে? পিসির কথার ঝুলি নিয়ে ষড়ানন কীভাবে থাকবে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া: প্রায় এক যুগ পূর্বে রচিত এক উপন্যাস ❝তরলাবালা❞। লেখক অর্ধেক লিখে রেখে দিয়েছিলেন। এর একটি অংশ প্রকাশ পায় ছোটকাগজ ❝নিরন্তর❞ এ। এরপর প্রকাশকের অনেক বলার পরে লেখক আবার শুরু করেন লেখা। লেখকের ইচ্ছা ছিল এর দ্বিতীয় পর্ব লিখবেন। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য সেটা আর পেলাম না। এর আগেই আমাদের আগুনপাখি খ্যাত লেখক ❝হাসান আজিজুল হক❞ আমাদের ছেড়ে পারি জমান অদূরে। লেখকের সর্বশেষ উপন্যাস এটি। গল্পটা যুদ্ধের আগের। আইয়ূব খানের শাসন চলে। চলে সংখ্যালঘুদের উপর নানা হুকুম। সেই অস্থিরতার মাঝেই লেখক এক গ্রামীন নারীর যাপিত জীবনের কথা তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন তরলাবালার মনের কথা। তার আক্ষেপের কথা। সাথে পরাধীন একটি দেশের অস্থিরতার কথা বলেছেন। মাত্র ৭৮ পৃষ্ঠার ছোট্ট একটি উপন্যাসে লেখক সে সময়কার চিত্র এত দারুণ ভাবে তুলে ধরেছেন! উপন্যাসে চরিত্র খুব বেশি না। খুব বেশি সংখ্যক চরিত্রের সমাগম থাকলে মাঝে মাঝে যেমন খেই ফারিয়ে ফেলি তেমন খুব অল্প চরিত্রের আগমনে পড়তে একঘেয়ে লাগে। এক্ষেত্রে একদমই সেটা হয়নি। তরলাবালা, ষড়ানন আর পিসিকেই উপন্যাসে বিচরণ করতে দেখা যায়। আর তাদের উপস্থিতি যথাযথ ছিল। প্রত্যেকের চরিত্রই লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে। চিতায় ভস্ম হয়ে যেতে কখনো দেখিনি। তবে এখানে পিসির চিতায় ভস্ম হবার যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন তা গা শিউরে ওঠার মতো। প্রতিটা লাইন পড়েছি আর কল্পনা করতে যেয়েও নিজেকে আটকিয়েছি। গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ধরন বেশ ভালো লেগেছে। সেই আমলের মানুষের অবস্থা, তাদের একত্রে থাকা, তাদের জীবনধারণ লেখক স্বল্প পরিসরে তুলে ধরলেও বর্ণনার ধরনে তা অনেক বেশি গভীর লেগেছে। আসলে এমন একজন লেখকের বই নিয়ে কিছু বলতে গেলেও চিন্তা হয়, ভয় হয়। তাই আর কিছু বলছি না। শুধু আক্ষেপ রয়ে যাবে এর পরবর্তী ভাগ লেখক লেখার সুযোগ পেলে কী লিখতেন? কীভাবে কাটত পিসিবিহীন ষড়াননের জীবন? তরলাবালার মনোজগতের আর কী কী-ই বা জানতে পারতাম? অস্থির থেকে শান্ত পরিস্থিতিতে আসা কী দেখতে পেত ষড়ানন? জানা হবে না আর।
প্রচ্ছদ: সাধারণ প্রচ্ছদ। কিন্তু উপন্যাসের নারী চরিত্রের সাথে একদম মিলে যায়।
আইয়ুব বিরোধী গণ-আন্দোলনের বাতাস ছুঁয়ে যায় প্রসব বেদনায় কাতর তরলাবালার আঁতুড় ঘরের বন্ধ জানালা। ভগবান শিবের বাহন, তরতাজা ষাঁড়টি গগণে উদ্ধত শিং দিয়ে আনতে চায় ধ্বংসলীলা, খোয়াব দেখা তরলাবালা। কাঁধে করে একটি-একটি লাশ নিয়ে গ্রামে ফিরে তার স্বামী, পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়া লাশ, তাজা আর নির্ভীক। ইঁদুরের গর্ত, দাঁড়াশের হিস-হিস শব্দে ভাঙ্গা কাঁচা-ঘুম। নীল আকাশে সোনালী চিলের বিজয় উল্লাস, আইয়ুব রাজার পতন, আবারো পোয়াতি হয় তরলা। বুক বাঁধে সে, পিসির বাঁকানো লাশ উঠে আসতে চায় চিতার গনগনে শিখার উত্তাপে।
হাসান আজিজুল হকের সর্বশেষ, হয়তোবা সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘তরলাবালা’। ইস্পাত কঠিন নারী মূর্তির সূক্ষ্ম বুনন ফুটে উঠে আঁটসাঁট বাক্যে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, চেপে ধরে গলা, পড়তে হয় অস্বস্তি নিয়ে। বিরামহীন এক দীর্ঘ বাক্য শেষের অবসাদ আর ক্লান্তি জেঁকে বসার আগেই বাঁধনটা একটু হালকা করে দেন লেখক। উৎফুল্ল হই আমরা এবং অনুধাবন করতে পারি হাসান আজিজুল হক কেন হাসান আজিজুল হক।
'হায়, তবে কি স্বপ্নই--দীর্ঘ ক্লান্তিকর --- স্বপ্নই কি সরু সুতোর মতো সমস্ত জীবনভর চলতে থাকবে আর জীবনের সব ঘটনাই সেই স্বপ্ন --- সুতোর সঙ্গে গিঁট পর্যন্ত পৌঁছুবে? তারপর মৃত্যুর অন্ধকারের মধ্যে সেঁধোবে-- অন্ধকারের সমুদ্রে মিশে যাবে।'