Abu Jafar began his career as sub-editor of the daily soltan. He also worked at the azad, ittefaq, Purbadesh and sangbad, for which he wrote a weekly column, 'Baihasiker Parshvachinta', under the pseudonym 'Alpadarshi'. From 1961 to 1972, he worked as assistant translator at the Bangla Academy.
অপরের জীবনকথা পড়তে কেমন যেন আনন্দ লাগে, নাকী কৌতূহল (?)। আনন্দ লাভের লোভেই হোক আর কৌতূহল মেটাতেই হোক আত্মকথা বরাবরই আমার আকর্ষণ কাড়ে। সেই সুবাদেই দিন চারেক আগে ধরোছিলাম সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীনের আত্মজীবনীগ্রন্থের পয়লা খন্ড। ভূয়োদর্শী এই মানুষটির আত্মজীবনীর প্রথম ভাগও বেশ পৃষ্ঠা সমৃদ্ধ। হিসাবে দাঁড়ায় ৪১০ পাতা।কোথা থেকে শুরু আর কোথায়ই বা শেষ পয়লা খন্ড? জন্ম থেকে শুরু। শেষটায় সময় গিয়ে দাঁড়ালো ১৯৬৮ সালে।
আত্মস্মৃতি পড়বার একটা হ্যাপা বরাবরই পোহাতে হয়েছে আমাকে। শুধু নিজের কথা কেন বলছি? যাঁরা আত্মকথা পড়েন, তাঁরা সকলেই মাথা পেতে নেন এই হ্যাপা। তা হচ্ছে লেখকের আত্মকথা বেশিরভাগ সময়ে শুধুই 'আত্মের' কথাই থেকে যায়। আত্মকথা লিখেয়ে উচা উচা ব্যক্তিগণ ভুলেই বসেন মানুষ শুধু নিজে একা বাস করে না; তার মনন সৃষ্টিতে, জীবনযাপনে না চাইলেও অপরে চলে আসে, আসতে বাধ্য। কিন্তু অনেকের আত্মকথা স্রেফ নিজের তুষ্টিমাখা বুলি বৈ কিছু নয়, যেন নিজে ব্যতীত সক্কলে কীটস্য কীট! এখানেই আবু জাফর শামসুদ্দীন মশাইয়ের সার্থকতা। বইয়ের শুরুটা গাজীপুরের কালীগঞ্জের প্রত্যন্ত এক গ্রামে জন্মানো এক শিশুর বংশলতিকা বিবৃত করে। ঠিক বিবৃত বলা যায় না একে। সেই গ্রামের রূপবর্ণনায় যেন আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখেছেন,
" ভাওয়াল পরগণায় অবস্থিত আমাদের গ্রামটি বর্ষাকালে দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, পশ্চিম ভাগটি হয়ে যায় একটি বিচ্ছিন্ন ছোট দ্বীপ। পশ্চিম অংশেই আমাদের ভিটেবাড়ী। গ্রামের পশ্চিমে বিশাল মাঠ। "
উনিশ শতকেই বাঙালি মুসলমান পরিবারগুলোর অার্থিক অবস্থা পড়তে থাকে। বিশশতকের গোড়াতে অনেক পরিবারের কেবল সম্বল বলতে থাকে ভিটেবাড়ি আর অতীতের উজ্জ্বল রোশনাই। তেমনিই এক পরিবারে জন্মেছিলেন আবু জাফর শামসুদ্দীন। দাদা মওলানা ছিলেন, বাবাও আলেম ছিলেন। সমাজে সম্মান ছিল বটে। কিন্তু পয়সা ছিল না। বাঙালি আর আটদশটি পরিবারের মতোই তাদের পরিবার।
সন্ধ্যায়দাদী গল্প বলেন । ব্রাহ্মণ পন্ডিতের পাঠশালায় পড়তে যান আবু জাফর শামসুদ্দীন। কোনোমতে চলতো সে পাঠশালা। পন্ডিত মশাই মাইনে পেতেন না নিয়মিত। ছাত্রই বা আসে কজন। যারা আসে তাদের মাইনে দেবার ক্ষমতা নেই। এই চিত্র কিন্তু শুধু গাজীপুরের কালীগঞ্জের না। পুরে পূর্ববঙ্গের গ্রামের প্রতিনিধিত্ব করছে এই চিত্র। লেখকের গ্রামে হিন্দু- মুসলমান সমানে সমান। তেমন ঝগড়া - কাজিয়া নেই। ব্রাহ্মণেরা জোতজমির অধিকারী আর খা, মিয়ারা তো আছেই।
গ্রাম বলতেই শহুরে লোকে বোঝে সব আলাভোলাদের আখড়া বিশেষ। অথচ শামসুদ্দীন সাহেবের আত্মকথা খানিকটা ভিন্ন তথ্যই দিচ্ছে। তার গ্রামীণ জীবনের স্মৃতিপথ এতো পরিষ্কার জবানিতে লিখেছেন যে, মনে হচ্ছিল এ যেন 'চিত্রময়রূপ' বর্ণনা ছাড়া কিছু নয়। আবু জাফর শামসুদ্দীনের গ্রামে অধিবাসীদের দারিদ্র আছে অথচ তা প্রকট নয়, হিংসা,মামলাবাজি আছে, প্রেম আছে ( প্রেম নিয়ে দারুণ এক মহিলার গল্প শুনিয়েছেন লেখক তা বিশ্বখ্যাত প্রেমের গল্পগুলোর কাছাকাছি) , ব্যভিচার আছে, ধর্ম আছে কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়ামীর তীব্রতার কোনো লক্ষণ পাই নি।
আবু জাফর শামসুদ্দীন ঢাকায় আসেন বিশশতকের শুরুর দিকে। লজিং হিসেবে লোকের বাড়ি বাড়ি থাকেন তিনি। শুধু আবু জাফর শামসুদ্দীন ই নন, ঢাকায় যারা তখন পড়াশোনা করতেন বেশিরভাগের পড়াশোনা চলতো অপরের বাড়িতে লজিং থেকে। তিনিও অনেকের মতো এভাবেই পড়াশোনা চালাতেন। বাড়িতে তীব্র অভাব, খাবার পয়সা জোটে না, পড়ালেখার খরচা জোগাতে রীতিমত নাস্তানাবুদ হতে হতো আবু জাফর শামসুদ্দীনকে। সেই সংগ্রামের দিনগুলোর কথা নির্দ্বিধায় স্মরণ করেছেন লেখক গত শতাব্দীর বিশের দশকের ঢাকা ছিল কেমন? এর উত্তর আবু জাফর শামসুদ্দীন বেশ ভালো করেই দিয়েছেন। পড়তে গিয়ে ভ্রমণকাহিনীর নির্যাস পাচ্ছিলাম। আবার, অতীতের প্রাচ্যের রহস্য নগরী ঢাকাকে জানার সুন্দর সুযোগ পেলাম।
অর্থাভাবে ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়েও আর পড়াশোনা টা চালিয়ে নিতে পারলেন না আবু জাফর শামসুদ্দীন। আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা এখানেই শেষ।
এবার চাকরির সন্ধানে পাড়ি জমান কলিকাতায়। সেখানেই পরিচয় হয় প্রখ্যাত সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সাথে। সান্নিধ্য আসেন তার। ঢাকাতেই পরিচয় ছিল কবি, 'বিপ্লবী ' বেনজির আহমেদের সাথে। সেই সখ্যতার বশেই পরিচয় ঘটে এমএন রায়ের লেখনীর সাথে,কমিউনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। সেই আগ্রহের জায়গাটি আজীবন ধরে রেখেছিলেন। তিনি কংগ্রেসের একজন গুণমুগ্ধও বটে। বরাবরই গান্ধীকে জিন্নার চে' বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। দেশভাগের জন্য দায়ী মেনেছেন মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দকে।
এই কলিকাতায় ই জানাশোনা হয় কবি নজরুল, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ছোলতান পত্রিকা, আবুল মনসুর আহমদের সাথে। পরিচয় হয় মওলানা আকরম খা, সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিনসহ আরো মুসলিম লীগারদের সাথে। এখানেই পরিচিত হয় যুবনেতা শেখ মুজিবের সাথেও।
শরাফতনামা ওর্ফ প্রত্যায়ন পত্র জোগাড় করে জুটিয়ে নেন প্রকৌশল বিভাগে কেরানির চাকরী। দৈনিক সকাল সন্ধ্যা কলম পিষেছেন বটে। কিন্তু সেই সময়েও দেশ,কাল আর রাজনীতির খোঁজ রাখার বাতিক ছাড়েন নি। সবে তখন শুরু করেছেন। যার রক্তে লেখালেখি আর রাজনীতি সচেতনতার নেশা তাকে দিয়ে কলম পেষানো বেশিদিন গেল না। এবার মুসলিম লীগের মুখপত্র আজাদে সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেন আবু জাফর শামসুদ্দীন। আবুল কালাম শামসুদ্দীনের কাছে শিখলেন বহু কিছু, আর দেশভাগের প্রাক্কালে সাংবাদিকতা পেশার সুবাদেই বঙ্গীয় মুসলিম লীগ রাজনীতি তথা বাংলার রাজনীতির অলিগলির খোঁজ খবরে, নেতাকর্মীদের কাছ থেকে যা জানলেন তা অভিজ্ঞতার ঝুলিকে পূর্ণই করেছে।কিন্তু অর্থের চাহিদা অপূর্ণই রয়ে গেছে।
দেশভাগের আগে 'আজাদ' এর ঢাকা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন। দেশভাগের পর মওলানা আকরম খাঁ ঢাকায় চলে আসেন। আজাদে কর্মরত থাকাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়লে বেতনে না দিয়েই চাকরীচ্যুত করা হয় আবু জাফর শামসুদ্দীনকে। আটটা সন্তানসহ পথে বসার উপক্রম হয়। তবুও থেমে না থেকে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে জঙ জারী রাখেন। এদিকে আবু জাফর শামসুদ্দীন সরাসরি রাজনীতিতে জড়ান নি কখনো। কিন্তু রাজনীতির বাইরেও কখনো থাকেন নি। মওলানা ভাসানীকে খুব কাছে থেকে দেখার, খানিকটা চেনার সৌভাগ্য তার হয়েছিল। কেমন মানুষ ছিলেন এই ভাসান চরের মওলানা, অনেকের কাছে পীর তা কিছু ঘটনা বলে জানাতে চেয়েছেন পাঠককে। '৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা, ভাষা আন্দোলন, '৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, নির্বাচনপরবর্তীকালে নেতাদের ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ যেমন খুব কাছ থেকে দেখেছেন তেমনি সাক্ষী ছিলেন ভাসানী বনাম সোহরাওয়ার্দীর দ্বন্দ্বে ন্যাপ প্রতিষ্ঠার মতো ঘটনারও। নিজেই ছিলেন '৫৭ সালের কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মলনের আহ্বায়ক।
দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রামে পরাজিত হয়ে যখন ঋণে, অভাবে দিশেহারা তখন বাধ্য হয়ে চাকরী নেন আইয়ুবের রাইটার্স গিল্ডে। বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে মগজ বন্ধক দেন তা বহুবার দেখেছেন আবু জাফর শামসুদ্দীন। এরকম দু'একটা স্মৃতি না বলও পারেন নি।কিংবা বাঙলা সাহিত্যের অন্যতম বৃহৎ উপন্যাস " পদ্মা মেঘনা যমুনা" - র রচনার ভাবনা তার এসেছিল টয়লেটে গিয়ে(!) তা বেশ চমকপ্রদ।
আইয়ুবের স্বৈরাচারী শাসনের খুঁটিনাটি, ন্যাপ প্রতিষ্ঠা করতে পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশসহ পুরো পাকিস্তান ভ্রমণের স্মৃতি তো ভ্রমণকাহিনীকে হার মানায়। '৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ আর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নিয়ে লিখলেন (অবশ্য তিনি একে স্বৈরাচার আইয়ুব হত্যা মামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন) তবে আবু জাফর শামসুদ্দীন নিজে ন্যাপ সমর্থক ছিলেন, ভাসানীর কাছের মানুষের একজন তিনি এবং কংগ্রেস নেতৃত্বের প্রতি আস্থার বিষয়গুলো তার মতামতকে প্রভাবিত করেছে গভীরভাবে। এই প্রভাব পক্ষপাতিত্বের রূপ নেয়নি তা হলফ করে বলতে পারবো না।
তবুও আবু জাফর শামসুদ্দীনের " আত্মস্মৃতি " খুবই সুখপাঠ্য একটি বই। যা পাঠককে চিরন্তন গ্রামবাঙলায় সফর করিয়ে এনে দাঁড় করাবে নিষ্ঠুর বাস্তবতার সাথে। পরিচয় করিয়ে দিবে তৎকালীন বঙ্গীয় রাজনীতির কূটকৌশলের সাথেও।