নিঃশব্দ উপন্যাসটি তেমনই কিছু গল্পের গাঁথুনি। ধীরে ধীরে শেলাই বুণে চিত্রপট তৈরি করেছি উপন্যাসটিতে। দীর্ঘ এই উপন্যাসের শুরুটা আমাকে শেষ এমনকি মাঝখানটা নিয়েও ভাবাতে পারেনি, আমি লিখে চলেছিলাম ওই সব জীবনের গল্প যা সমাজে আজও জীবন্ত। সামাজিক চেতনার বাইরে আঞ্চলিক এমনকি আন্তর্জাতিক সীমানা পার করে জাতিসত্ত্বার কথা তুলে ধরেছে। গল্পে আশির দশকের শেষের দিকের চরিত্রগুলো কথা বলেছে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত অথবা স্বেচ্ছা নির্বাসিত মানুষের সম্পর্কে একই ভাবে প্রকাশ করেছে ফিরে আসার আকুতিও। ভাষা দেশাত্মবোধ ও ভাষা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবিস্কার করেছি নিষ্পাপ এক শিশুকে, বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে ফুটফুটে শিশুটি যখন কথা বলার শক্তি হারায় তখন তার পাশে বাবা নেই, বেশ আগে হারিয়ে গিয়েছিল মা। এরপরে একে একে ভালবাসার সবাই। আমি বিস্ময়ে ভাবি, কি হচ্ছে লেখাটা? শেষ পর্যন্ত কী দাড়াতে পারে গল্পটা। আমি জানতামনা ছোট শিশুর চরিত্রটিই অবশেষে নাম হয়ে শোভা পাবে বইটির মলাটে। নিঃশব্দ উপন্যাসটির সাথে চরম ভাবে অবিচার করে চলেছিলাম প্রায়। দৃশ্যপটগুলোর আনকোরা ভাবনা থেকে আমি ছুটে গিয়েছিলাম উল্যেক্ষিত স্থানগুলোতে। গোপালগঞ্জ, খুলনা, সীমান্তঘেরা সাতক্ষীরা, ইছামতী নদী ও পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার, বারাসাত, বসিরহাট, হাসনাবাদের বেশ কয়েকটি গ্রামে। নব্বইয়ের শুরুর দিকের সাথে বর্তমান অবস্থান মেলানো কতটা দুরহ ছিল তা হয়ত এই পথে না হাটলে বুঝতে পারতাম না। নিঃশব্দ কথা বলেছে আঞ্চলিকতার বাইরে গিয়েও পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও সমাজচিত্রের গভীরের কথা। নিঃশব্দ বেড়ে ওঠে জীবনের প্রয়োজনে বেঁচে থাকা শেখাতে। কে জানে এমন হাজারো নিঃশব্দ ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজে, যার বা চোখের কোণ বেয়ে অঝরে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধাঁরা।
গল্প লেখা অনেকটা খিদের মত, এই খিদে আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় গল্প গাঁথুনিতে, এক ঘেয়ে গল্পের বাইরে মানবতা, সামাজিকতার চিত্র তুলতে ভালবাসি। মাঝে মাঝে মনে হয় যাপিত জীবনের এত এত গল্প শুধু আমার হবে কেন? হৃদয়ের পটে আটকানো গল্পগুলো হয়ে উঠুক সবার।
তাই গল্প বলি, মাটির গল্প, মানব পটের গল্প। প্রেম, দ্রোহের বাইরেও সমাজের গল্প, সম্প্রীতির গল্প। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ও বৃষ্টিভেজা মেঠোপথে হেটে মনে হয় মেঘ হব, গল্প করবো মেঘের সাথে। বলে কয়ে বৃষ্টি ঝরাবো। শুভ্র পবিত্রতার গল্পে মানুষের কথা বলতে গিয়ে ঘুরি তেপান্তরে। আলাদা মানুষ, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সাথে। সুনীলের একনিষ্ঠ ভক্ত আমি। ভালবাসি সৈয়দ সামসুল হকের কবিতা। বিশ্ব নাগরিক হিসাবে স্বপ্ন দেখি সম্প্রীতির চেতনার কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলা সাহিত্য ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বজুড়ে।
চমৎকার প্রচ্ছদের স্বাস্থ্যবান একটি উপন্যাস। লেখকের প্রথম মৌলিক উপন্যাস। একজন লেখকের প্রথম কাজের পর্যালোচনা করতে কিছুটা সাহসের প্রয়োজন হয়। লেখক যদি সমসাময়িক কেউ হন তাহলে তো ষোলকলা পূর্ণ! কোনরূপে লেখককে নিরুৎসাহিত না করে ভাল না লাগার ব্যাপারগুলো তুলে ধরা কিংবা ইতিবাচক দিকের প্রশংসা করে পরবর্তী কাজের জন্য লেখককে উৎসাহিত করার ব্যাপারটা ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। আমি অতি নিরীহ পাঠিকা। লেখকের প্রশয়ে এখানে সেই দুঃসাহসিক কাজ করার চেষ্টা করেছি।
প্রথমেই ২৫৪ পাতার বড়সড় উপন্যাস লেখার উদ্যোগকে বাহবা দিতে হয়। লেখনী অত্যন্ত সাবলিল আর বেশ ঝরঝরে যা উপভোগ করতে কোনো বেগ পেতে হয়না। গল্পের চিত্রায়ন আর চরিত্রের গঠন শক্তিশালী না বললে ভুল হবে। কদাকার গ্রাম্য রাজনীতি, মানব সম্প্রদায়ের মাঝে ধর্ম নামক বাহ্যিক ব্যাবধান যা ধরাছোঁয়া বা অতিক্রম করা যায়না আর ক্ষণেক্ষণে বদলে যাওয়া দুর্বল মানবচরিত্র বর্ণনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে একটি উপন্যাস। একটি বই পড়ার পর গল্পের কোনো চরিত্রের প্রতি তীব্র ক্ষোভ কিংবা শ্রদ্ধা জন্মালে বুঝতে হবে চরিত্রবুননে লেখক সফল হয়েছেন। এই উপন্যাসের ঘৃণ্য চরিত্র রহমান সরদার। বাবা মোজাফর সরদারের কাছে পাওয়া আঘাতের পর সুস্থ হয়ে যদি রহমানের হিংসাত্মক মনোভাবের পরিবর্তন ঘটতো তবে বলা যেত, "নাহ, এসব শুধুমাত্র নাটক কিংবা সিনেমাতেই ঘটে!" যা হোক, রহমানের চরিত্রবদল হয়নি। অর্থাৎ লেখক এক্ষেত্রে বেশ পরিপক্বতার পরিচিয় দিয়েছেন। অপুর বাকশক্তি হারানোর শোকে ভারতী দেবীর ভাগ্যে ঘটে যাওয়া অপ্রত্যাশিত ঘটনায় উমা কিংবার শোভার বদলে যাওয়াটাও সাজে। শিক্ষাদীক্ষার আলো বঞ্চিত মানুষ এক্ষেত্রে অপুকে অপায়া ভাববে তাতে আর আশ্চর্য কি! এসব ছোটখাটো বিষয়ও লেখকের দৃষ্টি এড়ায়নি। এদিক দিয়ে লেখক বেশ প্রফেশনাল আচরণ করেছেন।
এতো প্রশংসার পরেও তিনতারা কেন?? এতক্ষণ বলছিলাম ক্ষুদ্র পরিসরের কথা। এবার আসি সামগ্রিক বিচারে। একটি স্বাস্থ্যবান উপন্যাসে যে গুণটি থাকা আবশ্যক সেটি হল পাঠককে পাতার পর পাতা টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। লেখার শুরুর দিকে লেখকের এই গুণটি অনুপস্থিত ছিল। অনাবশ্যক কিছু বর্ণনা গল্পকে শুধু দীর্ঘায়ত করেছে। অক্টোপাস উপমার পুনঃপুনঃ ব্যাবহার কিছুটা বিরক্তিরও উদ্রেক ঘটিয়েছে। আর গল্পের সুখীসুখী সমাপ্তিটাও বড্ড বেশি সিনেমাটিক হয়ে গেছে। অন্যভাবে কিভাবে উপসংহার টানা যেত?? জানিনা। সেই উত্তর লেখককে খুঁজে বের করতে হবে।
লেখকের পরবর্তী লেখার জন্য শুভকামনা।
বিঃ দ্রঃ - বই বাঁধাইয়ের ব্যাপারে নালন্দা প্রকাশনীর আরেকটু যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। অতিমাত্রায় শক্ত বাঁধাইয়ের জন্য বই মেলে ধরে পড়তে রীতিমত বেগ পোহাতে হয়েছে।
একজন মানুষ কি নিজে থেকে বদলে যায় ? নাকি আশেপাশের মানুষেরা তাকে বদলে যেতে বাধ্য করে?..... ক্ষেত্র বিশেষে দুটোই ঠিক। সময়ের সাথে সাথে সাথে চলমান জীবনে পরিবর্তন আসে। আর এটা মেনে নিয়ে নিজেদের বদলে ফেলার নামটাই বেচে থাকা। গল্প পটে সে কথাটাই বলতে চেয়েছে 'নিঃশব্দ'। পাল্টে যাওয়া সেসব মানুষের প্রতিচ্ছবিই বহন করেছে নিঃশব্দের একেকটা চরিত্র।
নিঃশব্দ সাইফুদ্দিন রাজিবের লেখা প্রথম উপন্যাস। পশ্চিমবঙ্গের গোপালনগরে বিভূতিভূষণ স্মৃতি জাদুঘরে বসে, প্রথমবারের মতো নিজের লিখা ছাপার অক্ষরে দেখার টান অনুভব করেন তিনি। যার ফলশ্রুতিতে ২০১৭ বইমেলায় আসে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ। এরপরেই বড় ক্যানভাসে (নিঃশব্দ) একে ফেলেছেন আশির দশকের শেষদিকের দেশান্তরী কিছু মানুষদের সামাজিক চিত্র।
বর্তমান সময়টা যখন থ্রিলার আর অনুবাদের পাল্লা ভারী । কিছু মৌলিক ভালো উপন্যাস মাঝেমাঝে উকি দিলেও, যখন তাদের পেজ দেড়শ'র গণ্ডি পেরোয় না। তখন সামাজিক পটে লিখা দীর্ঘ উপন্যাস 'নিঃশব্দ' আলাদা একটা মর্যাদা আদায় করে নেয় নিজে থেকেই। আর সেই সাথে গল্পটা যদি হয় মন ছুঁয়ে যাবার মতো, তাহলে তা একজন পাঠকের জন্য ষোলকলা পূর্ণ।
আমাদের সমাজে আজো জীবন্ত কুসংস্কার, হিঃসা, জাতি ভেদাভেদের চিত্র যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা আলোকপাত করতে চেয়েছেন লেখক। তেমনি বিপরীত চরিত্র এঁকে বুঝিয়ে দিয়েছেন এ সমাজে দু ধরনের মানুষই বিদ্যমান। দু মলাটের মাঝে দুটো চরিত্রকে দাড় করিয়ে দিয়ে পুরো সমাজের চিত্র ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তিনি। চেষ্টা করেছেন জাত, ধর্ম ডিঙ্গিয়ে সম্প্রীতির গল্প বলতে। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির খণ্ডখণ্ড চিত্র বুনে দিয়েছে একটি গল্পে। যেখানে প্রেম-বিরহ, পাওয়া-হারনো, আনন্দ-বেদনা, ভালো-মন্দ সব মিশে গিয়েছে একে অপরের সাথে। . . কাহিনী সংক্ষেপ::
মাতৃতুল্যা ভারতী দেবী মরে যাবার পরে আশেপাশের আপন মানুষদের পালটে যেতে দেখলো 'অপু'। তারা মনে করেন ভারতী দেবী মারা যাবার জন্য সে'ই দায়ী। মনেই বা করবেনা কেনো ! যে মহিলা স্বামী হারিয়ে, ছেলেদের থেকে বঞ্চিত হয়ে, অভাবের সাথে লড়াই করে দিব্যি বেচে ছিল। সে কি না হঠাত অজ্ঞান হয়ে গেল অপুর বাকশক্তি হারানোর কথা শুনে ! আর রাত পেরুনোর আগেই চলে গেল না ফেরার দেশে। অথচ এমনটা তো হবার কথা নয়। সংসারের নির্মম পরিহাস যে মানুষটিকে কিছুই করতে পারেনি। রক্তের সম্পর্কহীন দুই বছরের এক শিশুর বিরল রোগে আক্রান্ত হবার কথাতে, তার এমন হবে কেনো ? সমাজের কুসংস্কারের বেড়া জালে জড়িয়ে থাকা কিছু অশিক্ষিত মানুষ মনে করে অপু পানোতি, অসুর, অপয়া। নাহলে দৃঢ় প্রাণশক্তির স্ব অভিমানী ভারতী দেবীর অধ্যায়টা এভাবে হুট করে শেষ হতোনা। নিকৃষ্ট সমাজের মানুষদের পাল্টে যাওয়া ব্যবহারে ছোট শিশুটির দুচোখ তার একমাত্র আপনজন বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। এদিকে অপুর বাবা সোমনাথ গিয়েছে বাংলাদেশে। যাত্রাকালে বলেছিল মাত্র পনের দিনের ব্যাপার। কিন্তু দেখতে দেখতে তা দুবছর ঘুরিয়ে গেল। কিন্তু তিনি ফিরে এলেন না। অনেক জায়গায় খবর লাগিয়েও কোনো খোজ পাওয়া যাচ্ছেনা তার।
লেখক অপুর জীবনের চলমান চিত্র যখন বর্তমানকে স্থির করে লিখে চলছেন। ঠিক তখনি পাশাপাশি বলে গিয়েছেন সোমনাথ এর অতীতের গল্প। যেখানে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক তরুণ।
সোমনাথ বাবা মারা যাবার খবর পেয়েই ছুটে আসে ফকিরহাটে। নিজের আপনজন বলতে শেষ মানুষটাকে শেষবারের মতো চোখের দেখা দেখতে। কিন্তু নিয়তির বিধানে সেও আটকে যায় এখানে। যে পরিবারটাকে উপরে টেনে তুলেছিলেন তার পিতা সৌমেন বিশ্বাস।
মোজাফফর সরদারের এখানে কিছুদিন থেকে সবকিছু গুছিয়ে ফিরে যাবে বলে ভেবে নেয় সোমনাথ। কিন্তু দেখতে দেখতে সময় কেটে যায়। অথচ মুখ ফুটে বলা হয়না ফিরে আসার কথা ।ওদিকে সরদার পরিবারের আবদার বেড়েই চলছে তার কাছে। এরমধ্যে একদিন রহমান সরদার আপদারের বদলে আদেশ করে বসলে, সে অবজ্ঞা করে। মালিক হয়ে সেটা সহ্য হয়না রহমানের। সে হিসেবে খাতা ছুড়ে ফেলে দিলে, সেটা দেখতে পায় পিতা মোজাফফর। ছুটে এসে তিনি আঘাত করে বসে রহমানকে। মাসের পরে মাস সেই গ্লানি টেনে যখন সে সুস্থ হয়, তখন থেকেই প্রতিশোধগ্রহণের ইচ্ছা জাগে তার। মনে মনে ছক একে রাখে সোমনাথকে খুন করার। ঘটনাচক্রে সেই প্রতিশোধের স্পৃহা আরো দ্বিগুণ করে দেয় ভাগ্যরেখা। যেখানে সোমনাথ নীরব দর্শকমাত্র। এভাবেই গল্প পৌঁছে যায় মাতৃহীন আট মাস বয়সের শিশুকে নিয়ে ভারতে পালিয়ে আসার স্মৃতিতে।
গল্পের প্রথম অংশ স্ল�� আগালেও, মধ্যে এসে গতি বেড়ে যায়। এর পিছনে কারণটা সম্ভবত একটা টুইস্ট। তা হলো, সোমনাথ কাকে বিয়ে করেছিল ? অপুর মা কে? আর কেনোই বা পালিয়ে আসতে হলো ভারতে? এই ভাবনাটাই পাঠকে দোলাচলে দুলিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায় শেষ পর্যন্ত। . . পাঠ-প্রতিক্রিয়া::
প্রথমেই আসি নেতিবাচক কিছু দিকে। পড়তে পড়তে কিঞ্চিত অস্বস্তিতে ভুগছিলাম যেসব কারণে :-
একজন লেখকের লিখায় যে গুণটা সবথেকে বেশি থাকা প্রয়োজন, তা হলো পাঠককে পাতার পরে পাতা টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। গল্পের প্লট যেমনি হোক, লিখার ভঙ্গী এমন হওয়া উচিত, যেন পাঠক শেষ পর্যন্ত পড়ে যাওয়ার মতো আকর্ষণ থাকে লিখায়। অথচ নিঃশব্দে এটি ছিলনা। গল্পের প্লট, কাহিনী চিত্র খুব ভালো ছিল। কিন্তু লিখনী খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হয়নি আমার।
এরপরে যে সমস্যাটি হয়েছে, তা হলো শব্দের ব্যবহার। প্রথম বাক্যে যেখানে শেষ হয় 'গিয়েছিল' দিয়ে। পরের বাক্য সেখানে শেষ হয়েছে 'রাখল' দিয়ে। এমন সেম অবস্থা প্রায় সব জায়গাতে ছিল। যেটা ভালো লাগেনি। এটা লেখকের লেখার আর্ট হতে পারে। কিন্তু একই প্যারাতে দুধরনের টেন্স না দিলে পড়ে আরাম পাওয়া যেত বলে মনে হয়।
প্রথম দিকে 'যদিও', 'তা নয়', 'ততক্ষণে' এমন কিছু মুদ্রাদোষ দেখতে পেয়েছিলাম। পরের দিকে না থাকলেও প্রথম কিছু অংশে পরিমানটা বেশি।
উপমা হিসেবে 'অক্টোপাস' শব্দের বারবার ব্যবহার বিরক্ত লেগেছে। উপমার চেঞ্জ আনলে বেশি ভালো লাগতো।
একটা চরিত্রের বিশেষ যে বৈশিষ্ট্য, সেটা তাকে যতবার ফোকাস করা হয়েছে, ততবার বলা হয়েছে। যার কোনো দরকার ছিলনা। একবার তাকে পরিচয় করিয়ে দেবার সময়ই তো সেগুলো বলা হয়েছে। বারবার বলার প্রয়োজন খুঁজে পাইনি।
লেখক শেষটা হ্যাপি এন্ডিং করতে চেয়েছেন। তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু সবাইকে একসাথে মিলিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা সিনেমাটিক মনে হয়েছে আমার।
এগুলো কি নেগেটিভ দিক? উত্তর হবে 'না'। এসব সমস্যার কারণে একবারের জন্যেও পড়ার গতি আটকে যাবেনা। লেখক একবার বলেছিলেন, তার লিখার দুর্বল অংশ তুলে ধরলে, আগামী লিখায় সেগুলোর দিকে খেয়াল রাখবেন। তাই পড়ার সময় যেসব বিষয় আমার চোখে লেগেছে, বা যার কারণে কনসেন্ট্রেশন ধরে রাখতে সমস্যা হচ্ছিল, সেগুলো তুলে ধরলাম।
এবারে আসি, নিঃশব্দ শেষ করার পরের অনুভূতি...
নিঃশব্দ সামান্য কিছু ত্রুটির ভিতরে অসামান্য এক স্নিগ্ধ গল্প। প্রথম লেখাতেই সাইফুদ্দিন রাজিব দেখিয়ে দিয়েছেন তার লিখার বৈচিত্র্য। গল্পের প্লট, কাহিনী এগিয়ে যাবার ভঙ্গি, সব মিলিয়ে অসাধারণ। লিখার ধরণ পরিপক্ব হলে বলতে পারতাম, বর্তমান সময়ের অতুলনীয় লিখা। পড়ার সময় বারবার হারিয়ে গিয়েছি চরিত্রগুলোর মাঝে। দোল খেয়েছি তাদের সাথে। নস্টালজিক হয়ে পরেছি তাদের অতীত স্মৃতিচারণায়। ডুবে গিয়েছিলাম কিছু বাক্যে। যেখানে ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কোনো নারী কন্ঠ বলে ওঠে,
"...কেন বৃষ্টি ভালো লাগেনা তোমার? ঝুম বৃষ্টি। ঘন ফোঁটার মুষলধারে বৃষ্টি। যে বৃষ্টিতে ভাবনারা দোল খাবে, অব্যক্ত কোনো বিভ্রমে জীবনের স্বপ্ন দেখবে.... "
"... যার ভাবনায় বিকেলগুলো সন্ধ্যা হয়, রাতগুলো নির্ঘুম সকাল হয়ে ফিরে আসে, অথচ সে কোনোদিন একটিবার ফিরেও তাকায় না... "
"আমার একটুক সুখ তুমি, তুমি তোমার মতই ভালো। "
সেজন্য বলতে বাধ্য। নিঃশব্দ শুধু সামাজিকতার দায়বদ্ধতেই থমকে থাকেনি। ছুটে বেড়িয়েছে প্রেম ভালোবাসায়। পিছু ফিরে তাকিয়েছে দেশেরটানে। তুলে ধরেছে প্রতিনিয়ত চোখের সামনে থেকেও, আড়াল হয়ে যাওয়া কিছু মানুষের গল্প। যা পাঠকদের নিজে স্থান থেকে সরিয়ে হারিয়ে নিয়ে যায় কল্পনাবিলাসে।
নালন্দার প্রকাশককে তাদের প্রোডাকশন নিয়ে বরাবরই উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখেছি। কিন্তু আমার কাছে আলাদা বা চোখে পড়ার মতো বিশেষ কিছু মনে হয়নি। বাইন্ডিং অনেক হার্ড, এজন্য পেজ মেলে পড়তে সমস্যা হচ্ছিল। তাছাড়া লাইনের মধ্যবর্তী স্পেস কম হয়ে গিয়েছে। অন্তত প্যারা থেকে প্যারার দূরত্ব বেশি হওয়া উচিত ছিল । ২৫৪ পেজের বইয়ের মুদ্রিত মূল্য যখন ৪৫০ টাকা হয়, তখন আরো বেটার কিছু হতে পারত।
রেটিং:: ৩.৫/৫ (কাহিনী রেটিং ৪.৫/৫) গুডরিডসে যেহেতু আংশিক মার্ক দেবার উপায় নেই, তাই খুব বড় সমস্যায় ভুগছি। '৩' তারকা দিলে অবিচার করা হবে। আবার '৪' দিলেও বেশি হয়ে যাবে।
"গাহি সাম্যের গান- যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম-ক্রীশ্চান।" উপন্যাস টা পড়ার পর থেকেই কাজী নজরুল ইসলামের এই লাইনগুলোই মাথায় ঘুরছে শুধু। কেন যেন মনে হচ্ছে এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে এরচেয়ে ভালো উপমা আর হতেই পারেনা। . পাশাপাশি দুটি দেশ, দুই বাংলা। মাঝখানে কাঁটাতার। ধর্মীয় ভিত্তিতে দেশভাগের পরে এখন ধর্ম আলাদা, ভূখণ্ড আলাদা, শাসন ব্যবস্থা আলাদা। তবুও কোথায় যেন এই দুই প্রান্তের মানুষ এখনও মিলেমিশে এক হয়ে আছে। উপমহাদেশের ইতিহাসে হিন্দু মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। সেই ব্রিটিশ শাসন আমল থেকেই তারা কখনও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, একতাবদ্ধ হয়ে লড়াই করেছে, অথচ পরে থাকতে হয় আলাদা মানচিত্রে। দেশভাগের পরেও ধীরে ধীরে আলাদা আরো আলাদা হয়েছে। কখন সাম্প্রদায়িক কারণে আবার নিজেদের প্রয়োজনে। কিন্তু তবুও কোথায় যেন তাদের একটা মিল রয়ে গেছে। কালে কালে ভারতবর্ষের ইতিহাস লেখা হলে কখনওই এই দুই সম্প্রদায়ের একটিকে বাদ দিয়ে লেখা সম্ভব না। তারা একে অপরের পরিপূরক। ঠিক তেমনিভাবে দুই প্রান্তের দুই সম্প্রদায়কে নিয়ে, দুই প্রান্তের গল্প নিয়ে এগিয়েছে এই উপন্যাস। . লেখক সাইফুদ্দিন রাজিবের লেখা প্রথম মৌলিক উপন্যাস নিঃশব্দ। পশ্চিমবঙ্গের গোপালনগর বিভূতিভূষণ স্মৃতি জাদুঘরে বসে তিনি প্রথমবারের মতে নিজের লেখা ছাপা অক্ষরে দেখার স্বপ্ন বুনেছিলেন। তিনি গল্প করতে ভালোবাসেন, মাটির গল্প, মানব পটের গল্প। গল্প করেন প্রেম দ্রোহের বাইরেও সমাজের গল্প, সম্প্রীতির গল্প। বিশ্ব নাগরিক হিসেবে স্বপ্ন দেখেন সম্প্রীতির চেতনার কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলাসাহিত্য ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বজুড়ে। লেখক নিজের সেই স্বপ্ন, সেই চেতনাকে "নিঃশব্দ" উপন্যাসের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। পুরো উপন্যাস জুড়ে লেখক কখনও তুলে ধরেছেন এদেশের মানুষের গল্প, সুখ-দুঃখ। কখনও তুলে ধরেছেন কাঁটাতারের ওপারে থাকা মানুষের জীবন-ব্যবস্থা, হাসি-কান্না। . নামকরণে সার্থকতাঃ প্রতিটি গল্প, উপন্যাস, কবিতায় নামকরণ অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। কোন উপন্যাস, গল্প, কবিতা না পড়লেও সেটির নামের মাধ্যমে বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমরা একটু হলেও ধারণা করতে পারি। নিঃশব্দ উপন্যাসে প্রতিটি চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ এবং বেশ কয়েকটি মূল চরিত্র থাকলেও, তার মধ্যে অপু চরিত্রটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সম্পূর্ণ উপন্যাস। যার সাথে কোন না কোনভাবে জড়িয়ে আছে এই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র। অপু যেন ঠিক নির্দিষ্ট কোন ভূখণ্ডের নয়, কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নয়, সে দুই দেশের, দুই সম্প্রদায়েরই আপন। সে ধর্ম, জাত, গোত্র, দেশ বোঝেনা। সে শুধু বোঝে ভালোবাসা, মায়া, আদর, স্নেহ। সে নিরবে সবকিছু দেখে, সে বোঝে অবহেলা কি, কিন্তু কিছুই বলেনা। শুধু নিরবে চোখের পানি পড়ে। তার নতুন পরিচয় হয় নিঃশব্দ। সে চোখের কোণে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর অর্থ ঠিকই জানে। এই ছোট্ট শিশুটিকে কেন্��্র করে যেহেতু পুরো উপন্যাস, সেক্ষেত্রে উপন্যাসের নাম নিঃশব্দ যথাযথ হয়েছে। . কাহিনী-সংক্ষেপঃ ভারতী দেবী একজন রীতিমতো জীবন যুদ্ধে লড়াই করা শক্ত সামর্থ মহিলা। যিনি সারাটা জীবন তীব্র অভাব, অসহ্য যন্ত্রণার সাথে লড়াই করে জীবন সংগ্রামে এগিয়েছেন। হঠাৎ স্বামীর মৃত্যু, চোখের সামনে আপন দাদা-বৌদির আত্মহত্যা, ছেলেদের দূরে থাকা, তীব্র অভাবে সংসার টানা এতকিছুর পরেও তিনি একটুও ভেঙ্গে পড়েননি। অথচ সেই মহিলা একটি শিশুর হঠাৎ বাকশক্তি হারিয়ে ফেলার কথা শুনে অজ্ঞান হয়ে যান। কিন্তু কেন? এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলো না! শিশুটিতো ভারতী দেবীর রক্তের সম্পর্কের কেউ না। তাহলে কেন? . অপুর বাকশক্তি হারানো ঘিরে আশেপাশের মানুষদের আচরণ, ভাবভঙ্গি খুব দ্রুত বদলে যেতে থাকে। সমাজের কুসংস্কারে আটকে থাকা মানুষেরা মনে করে অপু অপয়া। ওর উপর অসুর ভর করেছে, ওর সংস্পর্শে যে কারো সর্বনাশ হতে পারে। অবহেলায়, অনাদরে পিতৃ-মাতৃহীন অপু খোঁজে একটু আশ্রয়, একটু ভালোবাসা। সমাজের নির্মম-নিষ্ঠুর আচরণ, মানুষের পাল্টে যাওয়া সে বোঝে। নীরবে চোখের জল ফেলে, ছবি আঁকে। এতো অবহেলায় সব মানুষের ভিড়ে সে তার বাবাকে খুঁজে। অপুর বাবা মা কোথায়? কি হয়েছে তাদের? . মোজাফফর সরদারের আড়তে কাজ করতেন সোমনাথে বাবা সৌমেন বিশ্বাস। তাদের দুজনের মধ্যকার সম্পর্ক ছিলো ভাইয়ের মতন। হঠাৎ সৌমেন বিশ্বাসের মৃত্যু হলে মোজাফফর সরদার কিছুটা ভেঙ্গে পড়েন। সৌমেন বিশ্বাস অনেক বিশ্বস্ত মানুষ ছিলেন। সরদারের ছেলেরাও এই ব্যবসা পুরোপুরি ধরে রাখতে পারবেনা। তারও বয়েস হয়েছে। হঠাৎ বাবার মৃত্যুতে সোমনাথ ভেঙ্গে পড়ায় এবং সরদারের ব্যবসার কথা চিন্তা করে সোমনাথ সেখানে কিছুদিন থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সোমনাথের কাছে সরদার বাড়ির আবদার আস্তে আস্তে বাড়তেই থাকে। এদিকে মোজাফফর সরদারের বড় ছেলে রহমান একটু উগ্র প্রকৃতির। সোমনাথের সাথে তার একটি ঘটনার রেশ ধরে বাড়াবাড়ি হলে মোজাফফর সরদার ছেলেকে গুরুতর আঘাত করে। সেই থেকে সোমনাথের প্রতি একটা প্রতিশোধের নেশা জাগে রহমানের মনে। ঘটনাচক্রে সোমনাথ ও সরদার পরিবারে এক নতুন মোড় আসে যেটা রহমানের প্রতিশোধস্পৃহাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। সোমনাথ ও তার আটমাসের ছেলেকে খুন করতে উদ্যত হয় সে। ভাগ্যের ফেরে সোমনাথ তার ছেলেকে নিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। . পাঠ-প্রতিক্রিয়াঃ একজন যতই ভালো কিছু করুক, তারমধ্যে একটু খারাপ থাকলে সেটাই সবার আগে নজরে আসে। এক্ষেত্রেও প্রথমেই খারাপ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করি। আমার মনে হয়েছে প্রথমদিকে কাহিনী একদম স্লো। মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছিলো খুব। ভীষণ অসুস্থও ছিলাম তখন, তার উপর কাহিনীর এই ধীরতায় বিরক্তই হয়েছিলাম একটু। তারপর কয়েকটা বানান ভুল ছিল চোখে পড়ার মতো। ২৪৪ পৃষ্ঠায় "কিন্তু অপু যে এতদিনে বড় হয়ে গেছে সেটা উত্তম বুঝি জানেনা।" এখানে উত্তম নামের জায়গায় যথাসম্ভব পরশ হবে। ২৪৫পৃষ্ঠায় "কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো তার বাবা মা দুজনেই তাকে না জানিয়ে ভারতে গিয়েছে। ছোট মা খুলে বলে কেন তারা ভারতে গিয়েছেন। কার খোঁজে গিয়েছে না।" এখানে ১ম ও ৩য় বাক্যে সম্ভবত গিয়েছেন হবে। গিয়েছে না শব্দটা বেখাপ্পা মনে হচ্ছে, এটা কোন অর্থবহন করে না।
এই খারাপগুলো চেয়ে যে অসংখ্য ভালো দিক আছে এইবার সেগুলো বলি। প্রথমদিকে কাহিনী স্লো হলেও পরবর্তী তে লেখক সেটা পুষিয়ে নিয়েছেন। একশ পৃষ্ঠার পর(তারচেয়ে বেশি বা কমও হতে পারে) থেকে রুদ্ধশ্বাসে পড়ে গেছি। তারপর কাহিনী এতো আকৃষ্ট করেছিলো যে চোখের পাতা ফেলতে পারছিলাম না। প্রথমদিকে লেখা কিছুটা অপরিপক্ব মনে হলেও শেষের দিকে পরিপক্ব বলেই মনে হয়েছে। গল্পের প্লট, লেখার ধরণ ছিলো অসাধারণ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ভালোবাসা বিষয়টাই লেখক উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। আসলে ভালোবাসার বিষয়গুলো লেখক এতো অসাধারণ ও গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো আমি নিজেই সেই ভালোবাসার আবেশে জড়িয়ে যাচ্ছি। আর ঘৃণা, অবহেলাগুলো এতো তীব্রভাবে তুলে ধরেছেন যে যা সত্যি হৃদয়কে নাড়া দিয়ে যায়। প্রতিটি ভালোবাসার কাহিনী লেখক এতো জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছেন যে পড়তে পড়তে মুগ্ধ হয়েছি। সাধারণত প্রেম কাহিনী গুলো ন্যাকা ন্যাকা ধরণের হয়। সেগুলোতে কেবলমাত্র দুটি নরনারীর প্রেমের কথা উল্লেখ থাকে। কিন্তু সে সম্পর্ক ছাড়াও যে আরো অনেক রকম সম্পর্ক থাকতে পারে লেখক সেটাই উপন্যাসে অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। . আমাদের সমাজে কুসংস্কার যে কতটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে এবং তার প্রভাব যে কতটা ভয়ঙ্কর সেই বিষয়টা এই উপন্যাসে ভালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এ উপন্যাসে পরশ আর সুকুমার চরিত্র দুটি খুবই ভালো লেগেছে। রক্তের সম্পর্ক না থাকার পরেও, ছেলে হয়েও পিতৃ-মাতৃহীন অপুকে যে ভালোবাসা তারা দিয়েছেন, আগলে রেখেছেন তা সত্যিই অতুলনীয়। উপন্যাসের শেষটা ভালো ছিলো। পড়ার সময়ে মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম আর কিছু হোক না হোক অন্তত শেষ পর্যন্ত নিষ্পাপ ছেলেটার যেন একটা গতি হয়। সবশেষে উপন্যাসটি আমার কাছে অনেক সুপাঠ্য মনে হয়েছে। খুবই ভালো লেগেছে, অসাধারণ একটি উপন্যাস। . যে কারণে উপন্যাসটি পড়বেনঃ বর্তমানে যেখানে অনুবাদের ছড়াছড়ি, সেখানে মৌলিক লেখাগুলো প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটা যাও লেখা হচ্ছে সেগুলোও সঠিক মূল্যায়ন, সমালোচনা-আলোচনার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ছে। অধিকাংশ লেখকই তাই মৌলিক লিখতে চাইনা। আর লিখলেও বেশিরভাগ সময় তা সুপাঠ্য হয় না। সেক্ষেত্রে প্রথম বারেই ২৫৪পৃষ্ঠা লেখা সহজ কথা নয়। নিজ ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে মৌলিক লেখার কোন বিকল্প নেই। তাই অন্তত আলোচনা-সমালোচনা করার জন্য হলেও বইটি পড়া উচিত। লেখক এখানে দেশ, ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোত্র নির্বিশেষে ভালোবাসার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যে অসাধারণ বর্ণনা দিয়েছেন সেজন্য হলেও বইটি পড়া উচিত। বইটির প্রচ্ছদ এককথায় অসাধারণ।
যারা বই সংগ্রহে রাখতে ভালোবাসেন, সাজাতে ভালোবাসেন তারা এত সুন্দর প্রচ্ছদের কারণে বইটি কিনতে পারেন।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে হিন্দু ও মুসলিম শব্দ দুটি একে অপরের পরিপূরক। কোনো একটাকে বাদ দিয়ে এই অঞ্চলের ইতিহাস লেখা অসম্ভব। শতশত বছর ধরেই এই ধর্মের দুই ধর্মের মানুষ সহাবস্থান করে আসছে। কখনো কাধে কাধ মিলিয়ে দেশ গড়ার কাজে ঝাপিয়ে পড়েছে। আবার কখনো নিজেরাই দেশকে ভেঙে নিজেদের মত সুখে থাকার চেষ্টা করেছে। তা সে যাই ঘটে থাকুক, ভারতবর্ষে মুসলিম আর হিন্দু যেন দেহ আর আত্মার মত। লেখক সাইফুদ্দিন রাজিবের লেখায় চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে এই সমগ্র বিষয়টি।
ভারতী দেবী একজন খেটে খাওয়া মানুষ। অল্প বয়সে স্বামীকে হারানোর পরে ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে সংগ্রাম করে বাচতে হয়েছে। সেই ছেলেরা বড় হয়ে মাকে ভুলে গিয়ে নিজেদের মত সুখি হলো। ভারতী দেবী সুখের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তার সুখের জীবন শুরু হয়েছিলো। নিজের পেটের সন্তান যা করেনি, তাই করেছিলো অপরের ছেলে পরশ। অবশেষে শেষ জীবনে সুখ খুজে নিয়েছিলেন সোমনাথের ১ বছর ৮ মাসের সন্তান অপুর মাঝে। সেই সুখ স্থায়ী হতে পারতো, কিন্তু বিধাতা হয়ত কপালে অন্য কিছু লিখে রেখেছেন।
সৌমেন বিশ্বাস আর মোজাফফর যখন একত্রে আড়তদারি শুরু করে তখন মোজাফফর মালিক আর সৌমে�� তার ম্যানেজার থাকলেও মোজাফফর সৌমেনকে কখনো তেমন চোখে দেখেন নাই। ব্যাবসার হিসাবের কিছুই বোঝেন না মোজাফফর। ব্যাবসার সব হিসাব সব সৌমেনের কাছেই থাকত। বিনিময়ে প্রয়োজনের বেশি এক টাকাও নেয়নি সৌমেন। পরিবারের সবাই ওপার বাংলায় চলে গেলেও নিজের দেশ ছেড়ে কোথাও যায়নি সৌমেন। ছেলে সোমনাথকে উচ্চশিক্ষিত করে তুলেছে। সেই সৌমেনের অকাল মৃত্যুতে ভেঙে পরে মোজাফফর। সৌমেন তার জন্য যা করেছে তার কোনো তুলনা হয় না। সেও চেষ্টা করেছে সাধ্যমত তার জন্য কিছু করার। সৌমেনের বেতনের টাকা জমিয়ে এগার বিঘা জমি কিনে রেখেছে। পিতার প্রতি মোজাফফর সরদার আর তার পরিবারের ভালোবাসা দেখে বিমোহিত হয়ে যায় সোমনাথ। কিভাবে সে মোজাফফরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে! মাস্টার্সের পড়া লস দিয়ে মোজাফফরের আড়ত দেখলো এক বছর। দুই ধর্মের দুই পরিবারের এই সম্পৃতি আমার কাছে এই উপমহাদেশের আয়না হয়েই ফুটে উঠেছে। সুখ যেখানে থাকে, সেখানে দুঃখ দানা বাধতে সময় নেয় না। সেটা নাহয় আপনাদের জন্য তোলা থাক।
মানুষ তার জীবনে সুখ খুজে বেড়ায়। কিন্তু জীবন চলে আপন গতিতে। সুখ আর দুঃখ নিয়েই জীবন। গল্পে দুই বাংলার মানুষের জীবনের একটা সেতুবন্ধন ঘটিয়েছেন লেখক। দুইটা আলাদা টাইমলাইনে বয়ে চলা গল্পে কখনো মূল চরিত্র অপু, আবার কখন মূখ্য চরিত্র অপুর পিতা সোমনাথ।
খারাপ লাগাঃ খারাপ লাগা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে লেখার ফ্রন্টের কথা। এত দাম দিয়ে একটা বই কিনে পাঠক যদি পাইরেটেড বই পড়ার ফিল পায় তাহলে কেউ খুশি হবে বলে মনে হয় না। বইটা ৩০০ পৃষ্ঠার কাছাকাছি হওয়া উচিত ছিলো। ছাপার মান আরও ভালো হতে পারতো। লেখকের গল্প বলার ভঙ্গি একটু অগোছালো মনে হয়েছে। আরও সাবলিলভাবে গল্পটা বলা যেত বলে মনে হয়। কিছু জায়গায় মনে হয়েছে যে, লেখক যা বোঝাতে চাচ্ছেন তা বোঝাতে পারছেন না। ফলে লাইনের পর লাইন লিখে যাচ্ছেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আরও হাইলাইট করা দরকার ছিলো কিন্তু সেটা না করে অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে বেশি টেনে নেওয়া হইছে বলে আমার মনে হয়। বেশ কিছু জায়গায় ধোয়াশা থেকে গেছে, যার কোনো ব্যাখ্যা পাইনি। প্রথমদিকে মনোযোগ ধরে রাখা কষ্টকর ছিলো। জোর করে পড়ে গেছি।
ভালো লাগাঃ প্রথমদিকে মনোযোগ না রাখতে পারলেও অর্ধেক পার হওয়ার পরে আর থেমে থাকতে হয়নি। গল্পের ভিতরে হারিয়ে গেছিলাম। অনেক লেখককে দেখেছি একটা মাত্র চরিত্রের উপরে ফোকাস করতে। অনেকগুলো চরিত্র একত্রে টেনে নেয়া দুরূহ কাজ। সেই কাজটা করার চেষ্টা করেছেন লেখন। পুরোপুরি সফল না হলেও ব্যার্থ হয়েছেন এমন দাবি করতে পারবো না। তাছারা আপনাকে বলে রাখি, এটা লেখকের প্রথম উপন্যাস। গল্প বলার ভঙ্গি বা প্রথমে বিরক্ত লাগলেও গল্পের জোরেই আমাকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছেন। নিধি চরিত্রটা খুব অল্প সময়ের জন্য থাকলেও তার গভিরতা অনেক। যুগ যুগ ধরে এই অঞ্চলের মানুষরা বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে পাশাপাশি থেকে শান্তিতে বাস করছে। নিধি যেন এই সকল মানুষের প্রতিনিধি। অন্য ধর্মকে শ্রদ্ধা করে নিজের ধর্ম পালন করেও যে ধার্মিক হওয়া যায়, নিধি যেন তার জলন্ত উদাহরন। সবশেষে প্রচ্ছদের কথা না বললে নয়। শুধু ঘরের শোভা বর্ধনের জন্যও বইটা কেনা যায়।
বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিকের যুগ কি শেষ! মাথার ভিতরে মাঝেমধ্যে এমন চিন্তা ঘুরপাক খায়। যারা গত হয়েছেন তাদের মত কি কেউ হতে পারবেন না? এই দ্বন্দ হয়ত আরও চলবে। তবে নিঃশব্দ দিয়ে লেখক আমার আশঙ্কা অনেকটাই দুর করেছেন।
সবমিলিয়ে বলা যায় “নিঃশব্দ” একটি আশা জাগানিয়া জীবনধর্মী উপন্যাস। লেখক তাঁর উপস্থাপনাভঙ্গি নিয়ে আরও সচেতন হলে বইটির সাহিত্যমান অন্য একটি মাত্রা পেতে পারতো। লেখক সাইফুদ্দিন রাজিব সামনে অবশ্যই সেটা পারবেন। আরও চর্চা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে পরবর্তী উপন্যাস নিয়ে পাঠকদের হাজির হবেন বলে আশা রাখছি।
শেষ করলাম সময়ের সাড়া জাগানো তরুণ লেখক সাইফুদ্দিন রাজিবের আলোচিত উপন্যাস ‘নিঃশব্দ’ । তরুণ এই সুনীল গবেষকের রচনায় চোখে পড়ার মতো একটি গুণ আছে । সেটি হলো, লেখকের আনকোরা ও একক রচনারীতি । কারো সাথেই মেলে না বিন্দুমাত্র। সাম্প্রতিক সময়ের অধিকাংশ তরুণ লেখক যেখানে প্রয়াত একজন জনপ্রিয় লেখক-অনুকৃত রচনারীতির দোষে দুষ্ট সেখানে এটি একেবারে চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। যদিও এর মানে এই নয় যে এই ইউনিক স্টাইলে লেখক শতভাগ পাঠকতৃপ্তি আনতে পেরেছেন। কারণ স্টাইলটা ইউনিক হলেও তাতে রসের কিঞ্চিত ঘাটতি বোধ হয়। অর্থাৎ পাঠককে ধরে রাখার কৌশলটা আরেকটু রপ্ত করা দরকার (সেটা লিখতে থাকলে এমনিতেই চলে আসবে বলে আশা করা যায়)। আরেকটি জিনিস লক্ষনীয়, লেখকের মধ্যে সংলাপের চেয়ে কাহিনী বর্ণনার প্রবণতা একটু বেশি। অন্য লেখকরা যা করে থাকেন : চরিত্রগুলোর সংলাপের মাধ্যমে সেগুলোকে ফুটিয়ে তোলেন, লেখক নিজে কথা বলেন কম। কিন্তু এখানে লেখক নিজেই গল্পটা বলেছেন মূলত । এত মোটা একটি উপন্যাসে ডায়ালগ খুবই কম। হয়ত এটি লেখকের ভেতরের গল্প বলার প্রচন্ড আগ্রহের কারণে হয়েছে । হয়ত তিনি গল্পের মধ্যে তীব্রভাবে ঢুকে পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডায়ালগ বেশি থাকলে যে সেটি সুখপাঠ্য হয় এতে নিশ্চয় কেউ দ্বিমত করবেন না। অবশ্য লেখক যদি তাঁর বর্ণনাভঙ্গিকে আরেকটু আকর্ষনীয় করতে পারেন তাহলে ডায়ালগধর্মী কথাসাহিত্যের জগতে সাইফুদ্দিন রাজিবের ন্যারেটিভধর্মী লেখার স্টাইলটাও নতুন সংযোজন হতে পারে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, ডায়ালগ কম হলেও সেগুলো মোক্ষম ছিল। যার মুখে যেমন কথা মানায় তার মুখে তেমন বুলিই তুলে দিয়েছেন লেখক । কাহিনীর বিশ্বস্ততা বজায় রাখার জন্য লেখকের চেষ্টা ছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতই ঐকান্তিক। তিনি যেমন কেতুপুর গ্রামের জেলেদের সঙ্গে থেকেছেন, মাছ ধরেছেন রাজিবও তেমন কাহিনী সংঘটনের স্থলগুলোতে গিয়েছেন, কাছ থেকে তাদের জীবনযাত্রার প্রণালী দেখেছেন। এবং সন্দেহ নেই রাজিবের দেখার চোখ খুবই তীক্ষ্ণ। এমনকি মোজাফফর সাহেব যখন ফ্যামিলি বৈঠকে কথা বলে তখন তার মুখ দিয়ে ‘হাজেরান মজলিশ’ শব্দটি বের করে দেখিয়েছেন খুঁটিনাটি বিষয়ও তাঁর নজর এড়ায় না।
উপন্যাসটি পড়ে কেউ যদি একটা শব্দে তার সারসংক্ষেপ টানতে চান তাহলে বলবেন, ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ । কিন্তু গল্পের শিরোনাম, ভূমিকা থেকে যা বোঝা যায়, লেখকের গল্পের মূল বিষয় তাঁর নিজের মতে-অনাঞ্চলিকতাবাদ অথবা অন্যার্থে অপুর করুণ জীবনকাহিনী বর্ণন। সেক্ষেত্রে বলব, লেখক গল্পটির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। লেখক অপুকে এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বানাতে চেয়েছেন তা ভূমিকা পড়ে বা উপন্যাসের শিরোনাম দেখে বোঝা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে লেখকের সাফল্য উজ্জ্বল নয়। যদিও অপু আছে কাহিনীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কিন্তু গল্পটা অপুময় হয়ে ওঠেনি । গল্পটা হয়ে গেছে সোমনাথের। এই গল্পের প্রোটাগনিস্ট দাঁড়িয়েছে সোমনাথ, এন্টাগনিস্ট রহমান আর নায়িকা নাসিমা। বোবা অপু পাঠকমনে তেমন সহানুভূতি জাগাতে পারেনি। কারণ অপু কে, কোথা থেকে তার উৎপত্তি এটা খোলাসা করার আগেই লেখক উপন্যাসের অর্ধেক ব্যয় করে ফেলেছেন। অপুর ভবিষ্যত নিয়ে যতটা না দুশ্চিন্তা ছিল তার চেয়ে শেষ পর্যন্ত সোমনাথ-নাসিমার কী হয় তা জানতেই আগ্রহ ছিল বেশি। বিভুতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’ উপন্যাসের ক্ষুদে চরিত্র অপুর পাশে ‘নিঃশব্দ’র অপুকে বড় বেশি ম্রিয়মাণ মনে হয়। সেই অপু যেভাবে পাঠকের হৃদয়কে জুড়ে বসেছিল, পুরো গল্পের উপর একছত্র দখল নিয়ে ফেলেছিল এই অপু সেভাবে গল্পটা চালাতে পারেনি। এই অপু গেছে কোল থেকে কোলে, পিঠ থেকে পিঠে। মাঝে মধ্যে শোভার অনাবশ্যক দুর্ব্যবহার পাঠকমনে কিছুটা করুণার উদ্রেক করলেও তার অসুস্থতায় ভারতী দেবীর মৃত্যু সহ পরশ, সুকুমারদের ভালোবাসা সেই করুণার আর্দ্রতাকে অনেকখানি শুকিয়ে দিয়েছে।
সারান্তে যেটা মনে হল, লেখকের সাহস আছে। ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিমত থাকলেও এই সাহসটুকুকে সম্মান করি । কারণ বারুদ থাকলে আগুন জ্বলবেই। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি দেখানোর জন্য সোমনাথের সাথে নাসিমার বিয়ে দিয়েছেন উভয়কে স্বধর্মে স্থির রেখে। যদিও ইসলামি আইন অনুযায়ী কোনো মুসলমানের সাথে পৌত্তলিকের বিয়ে যে বৈধ নয় এটা বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের প্রায় সব মানুষের জানা । তারা এই নিয়ম মান্যও করে। এদেশের মানুষ ব্যক্তিজীবনে ধর্ম পালন করুক বা না করুক সামাজিক জীবনে তা কঠোরভাবেই পালন করে । যেমন দেখা যায়, কেউ হয়ত নামাজ-রোজা করে না কিন্তু আত্মহত্যাকারীর জানাজা বয়কট করেছে । ‘নিঃশব্দ’ একটি সামাজিক উপন্যাস যেখানকার সব চরিত্রের ক্রিয়াকলাপ বাস্তবসম্মত, সেখানে লেখক এমন ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ড কেন কায়েম করলেন তা বোধগম্য নয়। সোমনাথের সাথে নাসিমার বিয়ে হয়ে গেল অথচ দুজনের কেউই ধর্মান্তরিত হলো না! নাসিমার পাশে বসে তার বিয়ে দিল তার ছোটবোন রুহানি আর সোমনাথের বন্ধুরা । এই বিয়ের খবর শুনে নাসিমার মা এমন ভাল জামাই আর পাবেন না ভেবে খুশি হলেন-এমন নির্বিকার কখনোই ছিল না এদেশের রক্ষণশীল গ্রামীণ মুসলিম সমাজের মানুষ। বিশেষত এটি যে সময়ের কাহিনী তখন তো আরো নয়। লেখক এস্থলে প্লটটাকে ভিন্নখাতে নিয়ে গিয়ে শৈল্পিক মুন্সিয়ানা দেখাতে পারতেন। এক্ষেত্রে লেখককে পরামর্শ দেব অগ্রজ সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের দিকে নজর বুলানোর। যেমন : নাট্যকার মুনীর চৌধুরী ‘মানুষ’ নাটিকায় হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতি দেখিয়েছেন দাঙ্গার সময় মুসলমানের বাড়িতে হিন্দু ডাক্তারের আশ্রয় নেওয়া এবং তার দ্বারা গৃহকর্তার অসুস্থ শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার মাধ্যমে। পর্দানেশীন গৃহকর্তী সেই ডাক্তারকে বাঁচান তাকে স্বয়ং নিজের সাথে একান্তে পর্দার আড়ালে নিয়ে। এই নাটিকায় এক সাথে মুনীর দেখালেন এদেশে হিন্দু-মুসলমান একে অপরের জীবন বাঁচানোর পরিপূরক অথচ তাদের ক্রিয়াকলাপ কোনো ধর্মরীতিতে আঘাত করে না । ভাল হতো যদি এই উপন্যাসে রাজিবও সাপ মেরে লাঠি অক্ষূণ্ন রাখার অভিনব কোনো টেকনিক দেখাতেন ।
এই উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট চরিত্র রহমান সরদারের আচরণও কিছুটা দ্বিধান্বিত করে ।পাতার পর পাতা জুড়ে সে সোমনাথের ক্ষতি করার চেষ্টা করে গেছে কিন্তু তার উপযুক্ত কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি ।তাকে সুস্থ করার জন্য ঢাকা থেকে ভারত অব্দি ছুটে বেড়িয়েছে সোমনাথ ।তখন সে সোমনাথের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করেনি । অবশ্য তার অসুস্থ হওয়ার পেছনে পরোক্ষভাবে সোমনাথ দায়ী । কারণ সে সোমনাথকে লাঞ্চিত করার সময় তার বাবা লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে । কিন্তু এখানে সোমনাথের কোনো হাত ছিল না যার জন্য সে সোমনাথের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে । আর একারণে রহমান সর্দার সোমনাথের ক্ষতি করতে উঠে পড়ে লেগেছে এমন কিছুও বলা নেই কাহিনীতে । উপন্যাস থেকে যেমন দেখা যায়, নাসিমার সাথে সোমনাথের বিয়ের পর থেকেই সে সোমনাথকে ‘নমঃর ঘরের নমঃ, চাঁড়ালের ঘরের চাঁড়াল’ বলে সোমনাথের প্রাণনাশের চেষ্টায় প্রবৃত্ত হ। তবে কি সে খুব ধর্মভীরু? মোটেও না, তার দোষে যখন তার স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে চলে যায় তখন সে নিজেই এক হিন্দু নারীর সাথে যৌনজীবন শুরু করে ।এখানে তার কোনো নীতি খুঁজে পাওয়া গেল না ।কিন্তু আমরা জানি ভিলেনেরও নিজস্ব নীতি থাকে । তার নীতি সবার চোখে হয়ত কুনীতি কিন্তু তার নিজের চোখে সে অপরাধী থাকে না এবং তার নিজস্ব নীতির দ্বারা তার প্রতিটি কাজ কর্মের ব্যাখ্যা করা যায় । কিন্তু এখানে রহমান সর্দারের সোমনাথের পেছনে লাগতে গিয়ে কারাবরণ করা, স্ত্রীহত হওয়া এমনকি খুন করার মতো সিরিয়াস ঘটনা ঘটানোর পেছনে কোনো উপযুক্ত মোটিভই দেখানো হয়নি । যার ফলে ভিলেন হিসেবে সে ওজস্বিতা হারিয়ে এক বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হয়েছে । যদিও লেখক কোথাও তাকে উন্মাদ হিসেবে পরিচিত করিয়েও দেননি । তবু রহমান সর্দারকে ধন্যবাদ দিতে হয় এজন্য যে বলতে গেলে সে একাই ২৫৪ পৃষ্ঠা পর্যন্ত উপন্যাসটিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে। কাহিনীতে দুই একটা মৃদু টুইস্টিং-ক্লাইম্যাক্স বা মাঝে মধ্যে যে একটুখানি গতি এসেছে তার পেছনে মূল অবদান রহমান সর্দারের, ক্ষেত্রবিশেষে নাসিমার । সোমনাথ এক ‘ঘরোপকার’ ছাড়া বীরোচিত আর কিছুই করেনি, বরঞ্চ পুরো উপন্যাস জুড়ে সে শুধু তাড়া খেয়েই গেছে । ‘ঘরোপকার’ বললাম এজন্য যে, সে মোজাফফর সর্দারের ঘরের উপকার করেছে কৃতজ্ঞতাবোধ আর তার পিতৃদেবের সুনাম ধরে রাখার তাড়না থেকে ।
তবে রাজিবের যে ভিন্নভাবে দেখার চোখ আছে, দেখানোর অঙ্গুলি আছে, তার মনে যে নতুন কিছু করার তীব্র স্রোত বইছে তা উপন্যাসটির প্লট নির্বাচন ও সেটিংস থেকেই অনুভব করা যায়। এক্ষেত্রে তিনি সচেতনভাবে সমসাময়িক তরুণ লেখকদের ধারা থেকে গা বাঁচিয়ে ভারসম্পন্ন ও সারসম্পন্ন একটি বিষয় বেছে নিয়ে আশ্চর্যরকম দেদীপ্যমানভাবে অবস্থান করছেন।
এককথায় সারমর্ম টানতে চাইলে বলতে হবে, রাজিবের লেখায় স্ফুলিঙ্গ আছে। উল্লিখিত খুচরো বিষয়গুলি নজরে এনে তাঁর লেখনী অব্যহত রাখলে দ্রুতই এক দাবানল সৃষ্টি করবেন এই তরুণ ঔপন্যাসিক।
মরণশীল এই মানব জীবনে সত্যিকার সুখের খোজ পেতে সবটুকু সুখ বিকিয়ে দিয়ে আমরা ছোপ ছোপ অনুভূতি কিনে রাখি।।। পরম সুখের কিংবা পরম বেদনাময় যে অনুভূতির কথা চিৎকার করে সবাইকে জানাতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু জগতের নিখাদতম যে অনুভূতিগুলো, সেগুলো কি কোন ভাষায়, কোন শব্দে প্রকাশ করা যায়?... যায় না। সেগুলো হয়ে রয় নিঃশব্দ। শব্দ কোনদিন তা প্রকাশ করতে পারে না, শব্দ কোনদিন তার নাগাল পায় না... আর তাই নিঃশব্দে অনেক কিছুই বলা হয়ে যায়। হৃদয়ের কথাগুলো নিজের ইচ্ছেমত বের হয়-- যার কোন দৈন্য থাকে না, ক্ষোদ বা কষ্ট কোনকিছুর লেশমাত্র থাকে না। দুঃখ-কষ্টেরা গুনে গেঁথে বের হয় না, ইচ্ছেমত বের হয়ে যায়। কিন্তু সেখানে কোন প্রশ্ন থাকেনা। "নিঃশব্দ" তেমনি নিঃশব্দে বলে যাওয়া সব উপাখ্যান।।।
গল্পটা মোজাফফর সরদারের। কিছু শুভ্রতা, কিছু সৌন্দর্য এখন ভ্রম মনে হয়। মনেহয় এরা কোন পরবাসী দৃশ্য। ইট-কাঠের পৃথিবীতে এরা এখন আর বাস করে না। তেমনি শুভ্রতামিশ্রিত এক দৌর্দন্ডপ্রতাপশালী নাম মোজাফফর সরদার।
জগতের সবকিছু তো ঐশ্বরিক নয়। কিছু নিজেদের সৃষ্টি। সুতরাং সেই সৃষ্টিতেও প্রকৃতি এক নিয়ম করে রেখেছে। আর তাইতো বাতির নিচেই থাকে অন্ধকার। আলোর ছায়াতেই ভীষণ কুৎসিত ভাবে হেসে উঠে আঁধার। তেমনি সৌন্দর্যের ছায়াঢাকা এক পশুর নাম রহমান সর্দার। এই গল্পটা রহমান সর্দারের।
এই গল্পটা নাসিমার। রাগান্বিত চেহারায় নাসিমাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগে, অগ্নিমূর্তি রূপ ধারণ করলে না জানি কি হবে। এ সময়ে বাঁ পাশের ভ্রূর উপরে ঘাম জমে নাসিমার, চোখের পাতা কাঁপে। রাগে-ক্ষোভে মন হয়তো বলে সামনের মানুষকে খুন করি, কিন্তু চেহারা ঠিক সেই অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে না। কিছু কিছু মেয়েদের গোঁফরেখা টের পাওয়া যায়। রাগে সেগুলোও যেনো উর্ধ্বমুখী। নাকের নিজে পশমে কেমন যেনো বিন্দু বিন্দু ঘামের আস্তরণ, আত্মিক চেতনাবোধ হারিয়ে প্রবল রাগে সে যা বলতে চায় সেই ঘামবিন্দু তা প্রকাশ করে না... কিন্তু এই নাসিমার হঠাৎ কেনো এমন হলো!? ভালোবাসা বুঝি এমন হয়? এমন রহস্যময়। এমন অপাঠ্য। এমন গন্তব্যহীন কিংবা অদম্য?
নিধি বলেছিলো, খুব কষ্ট পেলে ঝুম বৃষ্টিতে কাঁদতে। একমাত্র বৃষ্টিই পারে সকল দুঃখ দূর করে পবিত্র করতে, চারদিকে শুভ্রতা ছড়াতে। নিধি বলে, "কখনো মানুষ কাদেঁ। সেই কান্নাও জল, কিছু কান্না হয় আনন্দের কিছু কান্না কষ্টের। মানুষ সেই কান্না লুকাতে বৃষ্টি ভেজে, তার চোখেরজল বৃষ্টির জলের সাথে একাকার হয়ে যায়। কোনটা বৃষ্টি আর কোনটা অশ্রু বোঝার উপায় থাকেনা। অথচ প্রত্যেকটা ফোটারই একটা অর্থ থাকে। অব্যক্ত অর্থ।" বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটার যে আলাদা নাম থাকতে পারে সেটা যেন জগতে একমাত্র নিধিই জানে...। এই গল্পটা নিধির।
আর সোমনাথ...! এক অপেক্ষা আর বিভ্রমে কেটে যাচ্ছে যার একটা জনম। অন্যরকম এক বিভ্রম, সে বিভ্রমের অর্থ কী অথবা গভীরতা কতটুকু তা তার জানা নেই। নিজের কাছে নিজের মনের উত্তর খুজে না পেলে কি বলবে সে? অথবা কি বলার থাকে?
কিংবা এই গল্পটা ভারতী দেবীর, উমার, সুকুমারের। উত্তম,শোভা,পরেশ কিংবা আমাদের নিঃশব্দের।
অথবা এই গল্পটা জীবনের, বেচে থাকার। আমাদের বেঁচে থাকাগুলোর রহস্য আমরা উন্মোচন করতে পারিনা, সেই বেচে থাকায় অনেক প্রশ্নের উত্তর নেই। অনেক কষ্ট থাকে যার কোন বিশ্লেষণ নেই। ভাবনার করিডোর পেরিয়ে সেই প্রশ্ন আজীবন মানুষের মনে উকি দেয়, বলে এটা কেনো হলো, ওটা কেনো? এই কেনকে জয় করেই আমরা আমাদের পথ চলি, যে পথ জীবনের জন্য...
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ এই বই আপনাকে চোখের জল নাকের জল এক করাবে না, শ্বাসরুদ্ধ কিংবা হাসির খোরাক জোগাবে না, চলমান জীবনের গল্প বলবে। এই জীবন যেমন আমাদের খুব আপন প্রাত্যহিক জীবনের কথা বলবে, যার বাসিন্দা সোমনাথ, নাসিমা, নিধি, মোজাফফর চেয়ারম্যান, রহমান, রুহানি। তেমনি বলবে সেই জীবনের কথা যে জীবন থেকে যায় আমাদের চোখের অন্তরালে। যাদের দুঃখ আমরা ছুঁয়ে দেখিনা কখনো। জানা হয়না কেমন আছেন সীমান্ত পেরিয়ে দেশান্তরী হওয়া সংখ্যালঘুরা! কেমন আছেন ভারতী দেবী, উমা, সুকুমার? কেমন আছে উত্তম,শোভা,পরেশ কিংবা আমাদের নিঃশব্দেরা???
লেখকের সৃষ্ট কিছু চিত্রকল্প, কিছু সৌন্দর্য যেনো চোখে ভাসছিলো-- "আড়তের পেছনে ফাকা জায়গায় খাটারি পাতা, সেখান থেকে স্পষ্ট আকাশ দেখা যায়। সন্ধ্যা ছাড়তেই নিজের কক্ষ থেকে বালিশ নিয়ে ওই খাটারিতে আধ শোয়া হয়ে বসে সোমনাথ। আকাশে তখন পরিষ্কার রুপালী চাঁদের আলো, মাঝে মাঝে টুকরো মেঘের দল উড়ে উড়ে চাঁদ কে অতিক্রম করে, কিন্তু মনে হচ্ছে উল্টোটা। ভাবনার বিভ্রমে আটকা আকাশের চাঁদ দ্রুত ছুটে চলছে মেঘের উল্টো দিকে। কখনো তা বড় বড় মেঘকে অতিক্রম করে। চোখের পলক ফেললে চাঁদ তার আগের জায়গায় চলে আসে। তারাদের দল চাঁদ ভয়ে চুপসে আছে, হয়তো একটু পরে মেঘমালা ঘনীভূত হয়ে চাঁদ কে আড়াল করে বৃষ্টি ঝড়াবে। খুব বৃষ্টি হবে, মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে টিনের চালে এমন শব্দের সৃষ্টি করবে যাতে অন্যকিছু শোনা না যায়, অন্যদিকে মন ঘুরে না যায়।
লেখকের দেয়া বন্ধুত্বের সংগাটা মনে গেথে গেছে-- "আসলে বন্ধুত্ব এমন। বন্ধুত্বের আকাশের রঙ কখনো বিবর্ণ হয় না, ঘুরেফিরে কোন না কোন রঙ চারদিক রঙিন করে তোলে।
ভালবাসা সংগায় বাধা যায় না। তবুও শুদ্ধতম ভালবাসার যে চিত্রকল্প লেখক একেছেন, তা যেনো খুব করে নিজের একান্ত আপন অনুভূতি বলে মনে হচ্ছিলো-- "কোন কোন মানুষের প্রতি গভীর টান অনুভূত হয়, যে টানের নাম থাকে না। তাকে গভীরভাবে অনুভব করা হয়, কিন্তু ছুঁয়ে দেখা হয় না। যার ভাবনায় বিকেলগুলো সন্ধ্যা হয়, রাতগুলো নির্ঘুম সকাল হয়ে ফিরে আসে অথচ সে কোনদিন একটিবারও ফিরে তাকায় না। তার অবহেলায় ভাবনা হারায় না, বরং উল্টো রঙ ছড়ায়। সেই রঙের নাম স্বপ্ন। সে রঙের আভা ভালবাসা!
একটা অপ্রিয়তার কথা বলি। আমরা পাঠকরা চাই, গল্প আমাদের অভিকর্ষের চেয়েও বেশী বলে তার দিকে টেনে রাখুক, বইয়ের পাতাগুলো সম্মোহনের মতো করে আমাদের কাছ থেকে সময় কেড়ে নিক, বইয়ের সাথে আমরা ছুটি আলোর চেয়েও বেশী গতিতে,,, এই বইয়ে এই টান, এই সম্মোহন, এই গতি কিছুটা অনুপস্থিত ছিলো। আশা রাখি পরবর্তীতে থাকবেনা।
পরবর্তী সংস্করণে একটা বুকমার্ক ফিতা চাই বইয়ে। বেশ কিছু জায়গায় দুটো পাতার গোড়ালির অনেকটাই একসংগে জোড়া লাগানো ছিলো, পড়তে অসুবিধে হয়েছে। কিছু বানান ও মিসটেক ছিলো আশা রাখি পরবর্তী সংস্করণ তা কাটিয়ে উঠবে।
আপনি যদি আগে দর্শনধারী, পরে গুণ বিচারীও হন, তবুও এই বই আপনার জন্যে। হিমেল হকের আঁকা প্রচ্ছদটাই যেনো বলছিলো- জগতের সবচে গভীর যে অভিব্যাক্তি, তাতে কোন শব্দ নেই। শব্দ তাদের ছুঁতে পারে না। সে জগৎ শব্দহীন, নিঃশব্দ।।।
বইঃ নিঃশব্দ - A Novel by Saifuddin Rajib লেখকঃ সাইফুদ্দিন রাজিব প্রকাশনীঃ নালন্দা মূল্যঃ ৪৫০ (মূদ্রিত মূল্য) রকমারি মূল্যঃ ৩১৫
ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক প্রভাব বলয়ের অবক্ষয়ে প্রতিনিয়ত কত মানুষের জীবন যায়। কেউ আবার কোনমতে নিজের জীবনটা নিয়ে পালিয়ে বাঁচে। এই বাঁচাকে কখনোই বুক চিতিয়ে বেঁচে থাকা বলে না। বরং মাথা নিচু করে কটু কথা শুনে বেঁচে থাকতে হয়। নিজের জন্মভিটে ছেড়ে বুকে পাথর চেপে বেঁচে থাকা মানুষগুলোই জানে তারা কেমন আছে। কালে কালে এই চলে যাওয়া, পালিয়ে যাওয়ার ধাঁরা থেমে নেই। বাংলাদেশে এর গোড়াপত্তন হয়েছিলো ব্রিটিশদের দেশ ভাগ করে রেখে যাওয়ার সময় থেকেই। যেটা পরবর্তিতে চলছে, বাংলাদেশ হবার পরেও এখনো তার রেশ টেনে ধরা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ থেকে মুলত সেই জীবন বাঁচানো আবার নিজ ইচ্ছেতে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়াদের বেশীরভাগই আবার হিন্দু। নিঃশব্দ উপন্যাসে মুসলিম মা ও হিন্দু বাবার ঘরে জন্ম নেওয়ার পরে বাবা-মাহীন বেড়ে ওঠা চার বছরের কথা না বলতে পারা শিশুটিকে আবর্ত করে চমৎকার হৃদয়স্পর্শী একচিত্র ফুটে উঠেছে। আর সেইসাথে গল্পে আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে মেয়ের রোমান্স, হিন্দু-মুসলিম পারিবারিক সৌহার্দ্য, সামাজিক দায়িত্ববোধ, এবং জাতিস্বত্ত্বাকে দারুণ ভাবে ফুটে উঠেছে বইয়ে।
কাহিনি সংক্ষেপঃ সোমনাথ-রহিমার ঘরে জন্ম নেওয়া শিশু অপু পশ্চিমবঙ্গের ইছামতী কোলঘেষা বরুনহাট গ্রামে বাবার মাসি/মামি ভারতী দেবীর কাছে বেড়ে উঠতে থাকে। তারই কোন এক সময়কালে গল্পের শুরু করেছেন লেখক। বাগেরহাটের ব্যবসায়ী মোজাফফর সরদারের কর্মচারীর ছেলে সোমনাথ হটাত করে বাবার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে বাগেরহাটে চলে আসে। বাবার হাতে গড়া মোজাফফর সরদারের ব্যবসা ততদিনে বেশ ভালই চলছিল। সোমনাথের বাবা সৌমেন বিশ্বাস আর মোজাফফর সরদার পরস্পর খুব ভাল বন্ধুও ছিল। বাবা নির্ভর ওই ব্যবসা কাঁচা হাতে পড়ে ক্ষতি হয়ে যেতে পারে দেখে নিজে দায়িত্ব নেয়। এরপরে বাবা-মাহীন সোমনাথ মুসলিম পরিবারের মাঝে নিজের আপন পরিবার খুঁজে পায়।
বছরান্তে সরকারী চাকুরী হলে সে ঢাকায় চলে যায়। ঘটনাচক্রে মোজাফফর সরদারের মেয়ে নাসিমার সাথে সোমনাথের বিয়ে অতঃপর সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু ধর্মীয় বিভীষিকার ���িকার আটমাস বয়সী অপুকে সঙ্গে নিয়ে কনকনে শিতে ইছামতী নদীতে কলার ভেলায় চেপে দেশ ছাড়ে সোমনাথ। জায়গা হয় ভারতী দেবীর কাছে। মধ্যবয়স্ক এই বিধবা তার তিন ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যাস্ত। তিনছেলে বড় হয়ে মাকে একা রেখে চলে গেলে যায়, পরবর্তিতে ভারতী দেবী মেয়ে উমাকে বিয়ে দেন বাংলাদেশ থেকে আসা সুকুমার এর সাথে। আর ছোট থেকে মানুষ করা ভাইয়ের ছেলে পরশকেও বিয়ে দেন বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা করতে আসা দীননাথ কৈরীর মেয়ে শোভার সাথে। বিয়ে দিয়ে তাদের ও আলাদা করে দেন ভারতী দেবী। সোমনাথ ও তার ছেলে অপু বাংলাদেশ থেকে এখানে পাড়ি দেয়ায় তাকে একা থাকতে হয়নি। এক সময় সোমনাথ পারিবারিক কাজে বাংলাদেশে ফিরলে বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে অপু কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে। এরপরেই শুরু হয় কুসংস্কারের নতুন অধ্যায়। প্রায় সবার কাছেই অপু হয়ে হঠে অপয়া। লেখক এখানেও কিছু মানুষকে স্রোতের বিপরীতে রেখে কুসংস্কারের সংস্কার করার চেষ্টা করেছেন। সেই দলে সুকুমার, পরশ অন্যতম।
বইটির কয়েকটি অংশে পাঠকের দৃষ্টি বিবেচনায় প্রেম নিয়ে এসেছেন। যেমন সোমনাথ-নিধি। পরবর্তিতে পরকীয়া প্রেম দেখিয়েছে শোভা-উত্তমের মাঝে।
রহস্যে ভরা সামাজিক উপন্যসে ছিল কিছু, প্রশ্ন যার জন্য পড়তে হবে বইটিঃ ১. সোমনাথ কেনো জেলে যায়? ২. নাসিমা কোথায়? ৩. অপু কি ফিরে পাবে বাবা-মাকে? ৪. পরিবারের অন্য সদস্যরা কোথায় আছে? ৫. রহমান সরদার যার জন্য এতো সমস্যার সম্মুখীন হতে হলো তার কি হবে? ৬. রুহানিই বা কি করছে এখন? ৭. শোভা কি ফিরে আসবে পরশ এর জীবনে? ৮. উমা কি তার ভুল বুঝতে পারবে যে অপু অপয়া নয়? ৯. দেশ ত্যাগি মানুষরা সব বিক্রি করে চলে যায়, দেশ কি পায়? তারাই বা সুখি কি হয়? ১০. সোমনাথ কে সবাই মেনে নিবে? ইত্যাদি...
ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়াঃ লেখকের প্রথম উপন্যাস 'নিঃশব্দ'। নতুন হিসেবে উপন্যাসটি বেশ ভালো লেগেছে। কাহিনী চিত্রায়ন করেছেন দারুণভাবেই। তবে শুরুতে কিছুটা অগোছালো ছিল, অনভিজ্ঞতার স্পষ্ট ছাপ ছিল। দুয়েক যায়গায় বানান ভুল চোখে পড়েছে। বর্ননা, চরিত্রগুলোকে একাধিকবার পরিচয় করিয়েছেন। ২৫৪ পৃষ্ঠার ৫০ পৃষ্ঠা যাবার পরেই মুলত পাঠক গল্পের ধারার মাঝে ঢুকতে পারবে। যেভাবে তিনি শুরু করেছিলেন শেষের দিকের মনে হয়েছে দ্রুত শেষ করতে চেয়েছেন। কাহিনীতে চরম খিদে ছিল। আরো আলোচনা হতে পারতো শেষ দিকে। তবে মৌলিক কাহিনীচিত্রের বুননটা দারুণ ছিল। হাসি-কান্নার সংমিশ্রণে রচিত হয়েছে বইটি।
অনেকদিন পর এমন একটি বই পড়লাম। প্রতিটা চরিত্রই বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল এবং চোখে পড়ার মতো। কিছু কিছু চরিত্রে নিজেকে আবিস্কার করেছি। কিছু চরিত্রে মনে হয়েছে মানুষ হিসাবে যদি সুকুমারের মত হতে পারতাম!
ভালো লাগা কিছু লাইনঃ ১। অনেক ভালোবাসার নাম থাকতে নেই, কিঞ্চিৎ বিশ্বাসেই মিটমিট করে ভালোবাসার সেই পিদিম জ্বলতে থাকে। ২। ঈশ্বর তাদের সত্যিই ভালোবাসে। ভালোবাসে বলেই তারা দিনে তিনবারের জায়গায় দুবার খেয়েও বেঁচে থাকে। ৩। আমরা খুব দুঃখ পেলে আকাশের দিকে তাকাই, কিন্তু কেন? আকাশ কি কথা বলতে পারে? ৪। কোনো কোনো মানুষের প্রতি গভীর টান অনুভূত হয়, যে টানের নাম থাকে না। তাকে গভীরভাবে অনুভব করা হয়, কিন্তু ছুঁয়ে দেখা হয় না। ৫। আমি চাই, আমার অন্তত আরেকজন ভাবার মানুষ বাড়ুক, যে আমাকে নিয়ে চিন্তা করবে। ৬। তার যেন কোন কিছু হারায়নি, অথবা যা হারিয়েছে তা তার কখনো ছিলও না। ৭। এখানে দুঃখ আছে হয়তো, কষ্টও আছে, কিন্তু নিশ্বাস নেবার মতো যতটুকু শক্তি সে এখানে পাচ্ছে তা গত সাড়ে চার বছরে ভারতে পায়নি। হয়তো পাবেও না।
বই পড়ুন, বইয়ের সাথেই থাকুন। বইটি কিনতে অর্ডার করতে পারেন রকমারিতে। রকমারি লিঙ্কঃ
লেখা গড়পড়তা। জীবনমুখী সাহিত্য হিসেবে চলে। বিষয় বাছতে গিয়ে মনে হচ্ছে ভুল করেছেন। সামনে আবেগকে নিয়ন্ত্রন করে লেখার চেষ্টা করতে হবে। না হলে সমসাময়িক অন্যদের সাথে এক কাতারে গিয়ে পড়বেন।
'Nisswabda' an appealing fiction of bunch society.
Reviewed of Zulfiqar Parvez Vice Principal London Grace International School ------ Dreams get deviated everyday, most of us do not know what will happen tomorrow. Someone can die all too suddenly and the scar too gets healed within months. But the affliction of having to leave your age old homeland is to be carried along till death and this is a kind of sin. But not every sin has its punishment. Some sin takes place to bring peace. Emerging writer Saifuddin Rajib has woven the story of such peace and conflict. The readers grow to trust a writer only after having read his peace. This is a time consuming process in itself. But when the writer has his first break, the entire worries creep in. 'Nisswabda', a novel of 258 pages, cannot be presented by the author or publisher within a word limit of a hundred or two. Depicting the anecdotes within the stories is often impossible which causes some writers and their enriched works to nip in the bud. But I believe the readers will find out this novel out of their own faith. This is because the picture or plot it presents has appeared to be a banyan tree to me. It is manifest exquisitely all over that the writer has taken to field research to depict the social scenario of the late eighties. The moment we lay our hand on the novel, what we find most attractive is the cover itself and the title. Once we finish reading the novel, we come back to assess how successful the cover designer is. It is as if the plot itself were manifest in the cover. With the name 'Nisswabda' that finds a place in the cover, we have the lineaments of a child. It looks like this child you see is literally the protagonist. It is later that the child loses the faculty of speech having been down with an incurable disease called 'Hypoglossal Neuritis'. From that perspective the naming might have been somewhat successful but the writer did not remain confined to that alone. On each and every page throughout the novel, he has spread a sort of social message that has rather moved me as a reader. The writer seems to have run his pen with conviction breaking the religious harmony, social-familial responsibility, prejudices and caste practice. The second and third central characters Somnath and Bharati Devi have displayed a deep sense of responsibility. The protagonist of the simultaneously narrated novel is a child Opu who is born into a family consisting of a Muslim mother and a Hindu father. Government official Somnath is forced to move to West Bengal with his eight-month old baby on a cold night by crossing over the Isamoti by a mere raft having left his wife back in Bangladesh as a result of social catastrophe. The family of Mojaffor Sordar from Bagerhat was pulled up with both hands first by Saumen Bishwas and later by his son Somnath Bishwas. But having been a victim of oppression from a member of that same family, Somnath is compelled to leave the country to save his lone child.
The next most important character in the novel is Bharati Devi. This widow clenched with the Octopus of poverty has displayed the highest magnitude of responsibility and motherly feeling, be it towards her own brother or her nephew Parash or later towards the child Opu. Despite being in misery all her life, just when her personal misery seems to be on the wane, she fails to restrain her shock as she finds Opu losing his faculty of speech at the hospital. Having overcome all atrocities of life, Bharati Devi herself is a world in the novel itself. At this point in the novel, any reader may begin to feel frozen. Wink may come to a halt. But the whole scenario starts changing after her demise, the child Opu is to put up with the pangs of life at every step as he tries to find out Bharati Devi and his missing father. Though he becomes a stigma by collocation, there are still some people to hold him with care. The writer appears successful here in his depiction of social prejudices and the opposite side to perception through his skillful penning. On the flip side of the story, the writer has shown the family of Mojaffar Sordar with his two wives and four children. That the novel "Nishwabdo" is like a banyan tree when it comes to fellow feeling, religious harmony and social commitment, the family of Mojaffar Sardar is a blatant example of that. There we see Rahima Begum find love in the mere act of making bettle just as the sterile Nurani Begum gets a child as adorable as Aqib. In the background of "Nishwabdo" is depicted how familial love can spread its branches all over. The sheer commitment towards society that Mojaffar Sarder displays after being elected the Chairman can become an example to follow for anyone who is leading from the front. Saifuddin Rajib has shown how justice and injustice can be sorted out with dexterity.
My personal opinion is how successful Saifuddin Rajib will become as a writer can only be known in the course of time. But any reader will wait for his next creation once he goes through "Nishwabdo". One aspect of his writing that has really caught my notice is his linguistic deviation. He may have resorted to dialects to meet the requirements of a character, but the description seems to contain a combination of the language of Bangladesh and West Bengal. Though the novel centers on a plot involving both the areas, the writer does not sound novice for the spontaneity of his presentation. In a word, "Nishwabdo" is a novel swarming with social messages.