বাংলা ভাষার অগ্রণী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ছোটদের জন্য তাঁর স্কুলদিনের যে-কাহিনী শুনিয়েছেন সেখানে হাতছানি দেয় এক বড় জগৎ, যে-বিশালতা প্রত্যেক কিশোর তাদের অন্তরে বহন করে এবং যে সংযুক্তি জীবনকে যোগায় সমৃদ্ধি। আমার স্কুল তাই হয়ে উঠেছে প্রাণরসের ভাণ্ডার, একদিকে এই বই যোগাবে গল্পপাঠের মজা, অন্যদিকে জীবনকে জানবার আনন্দ।
Syed Shamsul Haq was one of the most prolific Bangladeshi poets, lyricists, and writers, born in Kurigram on 27 December 1935 to Syed Siddique Husain, a homeopathic physician, and Halima Khatun. Married to Anwara Syed Haq, a member of the Royal College of Psychiatrists in London, he had a daughter, Bidita Sadiq, and a son, Ditio Syed Haq. Throughout his illustrious career, he was honored with the Bangla Academy Award in 1966, the Ekushey Padak in 1984, and the Independence Day Award in 2000 by the Government of Bangladesh. On 27 September 2016, he passed away from lung cancer at the age of 81.
Haq's extensive literary contributions span poetry, fiction, essays, music lyrics, and verse plays, resulting in a remarkable lifelong output of 39 novels, 7 books of poetry, 5 stories, 12 plays, and 4 translations. Reflecting his profound impact on the nation's culture, his literary works are integral to the curriculum of Bengali literature across school, secondary, higher secondary, and graduation levels in Bangladesh.
কমর পণ্ডিতের পাঠশালা বিদ্যা হয় কাঁচকলা দুই হাতে দুই কলম দিয়ে বসিয়ে রাখে গাছতলা
"ব্রিটিশের রাজ" চলছে তখন। কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুলে ক্লাস ফোরে ভর্তি হতে যাবে বাদশা। ঘন সবুজ রঙের হাফশার্ট আর খাকি রঙের হাফপ্যান্ট পরে খালিপায়ে স্কুলে গেলো সে। হেডমাস্টার ইন্টারভিউ নিয়ে তাকে ক্লাস থ্রি-তে ভর্তি করিয়ে দিলেন।ছেলেটার চোখে স্বপ্ন-কবে সে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হবে আর কবে জুতো পরতে পারবে!! তখন "স্যার" ছিলেন না শিক্ষকবৃন্দ।ছিলেন মাস্টারমশাই। এক বাক্যে ইংরেজি ২৬ টি বর্ণ শেখানো হচ্ছে- A quick brown fox jumps over the lazy dog. শুরু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। রাতের বেলা বোমাবর্ষণ এর ভয়ে সারা কুড়িগ্রাম শহরে জারি হয়েছে ব্ল্যাক আউট। বড়রা আতঙ্কে থাকলেও ছোটদের মনে রোমাঞ্চ। যুদ্ধের সময় সারাবছর লেখার জন্য একেকজনের ভাগে বরাদ্দ হয়েছে চারটি করে খাতা। একই খাতায় প্রথমে কাঠপেন্সিলে, এরপর নীল কালিতে,তারপর ম্যালেরিয়ার হলদে রঙের বড়ি গুলে সবুজ কালি বানিয়ে আগের নীল কালিতে লেখা লাইনের ফাঁকে ফাঁকে সবুজ কালিতে লিখে খাতা বাঁচানোর প্রাণান্ত চেষ্টা ছাত্রদের। সামার ভ্যাকেশন শুরুর আগের দিন ডাকবাংলো আর কালীবাড়ি থেকে ফুল চুরি করে গাঁথা হতো মালা। তারপর ক্লাসে ক্লাসে মাস্টারমশাইদের গলায় মালা পরাবার ধুম পড়ে যেতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ। যুদ্ধ জয়ের আনন্দে বালতিতে করে ছাত্রদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করছেন হেডমাস্টার শ্রী কালিপদ বিশ্বাস আর বলছেন,দিস ইজ ফ্রম দি কিং, দিস ইজ ফ্রম দি কিং.... এমন সব বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত হয়েছে "আমার স্কুল।" প্রত্যাশার চাইতে অনেক বেশি উপভোগ করেছি এই অম্লমধুর গল্পে সমৃদ্ধ স্মৃতিগদ্য।
প্রথম দিন স্কুলে যাবার কথা লেখকের মতো আমার পুরোপুরি মনে নেই। ছেঁড়া মেঘের টুকরোর মতো কিছু কিছু স্মৃতিদৃশ্য মগজে ভেসে উঠে কখনো সখনো। স্কুল প্রবেশের আগেকার কিছু কথাও মনে আছে, যেমন- চক দিয়ে শ্লেট ঘষে বর্ণমালা লেখা, স্কুলে ভর্তির সময় হাত ঘুরিয়ে কান ধরবার ব্যাপারটা, বা স্মর্ণা আপার স্কুলে না যাওয়ার জন্য অসুস্থের ভান বা কান্নাকাটি করা। আমার স্কুল বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ-সাত মিনিট হাঁটার দূরত্বে। কিন্তু তখন মনে হতো আঁকাবাঁকা রাস্তাগুলো বাড়ি থেকে কত দূরে নিয়ে যাচ্ছে আমায়! মাজারের বড় দীঘি পেরিয়ে, সরু এক গলি দিয়ে সৈয়দ বাড়ির ভেতর দিয়ে আমি আর আপা স্কুলে যেতাম। সরু গলির বিকল্প রাস্তা আরেকটা ছিলো তবে সেটা দিয়ে যেতাম না। যদি যাই তাহলে ঠাকুমার ঝুলিতে এতদিন শুনে আসা স্বর্ণমৃগ তথা সোনালী এক হরিণের দেখা কিভাবে পেতাম!?সৈয়দদের পোষা সেই চমৎকার কালো চোখের ছটফটে হরিণ ছিলো আমাদের অপার বিস্ময়। প্রতিদিন যাওয়া আর আসার পথটা আমার দারুণ কাটতো হরিণটা কে নিয়ে নানান গল্প আর কথা বলতে বলতে। কেনো যেনো মনে হতো হয়তো হরিণটাও আমাদের অপেক্ষা করে! নয়তো সে সবসময় রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাড়িয়ে আমাদের দিকে ওমনভাবে তাকাতো কেনো?
প্রথমদিন স্কুলে যাবার সকালটা স্পষ্ট মনে পড়ে। আমার দাদী চিররুগ্ন মহিলা ছিলেন। তাই তৎকালীন নিয়মানুসারে ঔষধের মতো সারাবছর সকাল-সন্ধ্যা হরলিকস খেতেন। আমার হরলিকসের উপর ভীষণ লোভ ছিলো। দাদী প্রায়ই মার থেকে লুকিয়ে নিজের ভাগের অর্ধেকটা আমাকে খাওয়াতেন। সেদিন আর লুকাতে হয়নি, মার সামনেই ইয়া বড় দুধের গ্লাসে হরলিকস খেয়েছিলাম। তাই হয়তো সকালটা এখনো মনে আছে। আপা আমার হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলো। আমার ক্লাস ছিলো দ্বিতীয় তলায়, বোন ক্লাসে এক কোণে বসিয়ে দিয়ে বের হয়ে গেলো। আমি কিছুটা বোকা বোকা ভয়মিশ্রিত মুগ্ধতা নিয়ে ক্লাসটা দেখছিলাম। দেয়ালে নানান ছবি আঁকা ছিলো। এতটুকুই শুধু মনে পড়ছে...।
সৈয়দ শামসুল হকের 'আমার স্কুল' অতি মিষ্টি একখান বই। কি চমৎকার সুন্দর ভাষা আর কি প্রখর স্মৃতিশক্তি লেখকের! পড়বার পর সবাই আমার মতো নিজের শৈশব থেকে আরেকবার ঘুরে আসবেন। যারা লিখতে পারেন, তারা হয়তো লিখেও ফেলতে পারেন নিজেদের শৈশবের মুগ্ধকর স্মৃতির রেশ। আমরা যারা না-লেখক তারা স্মৃতির বই খুলে পড়তে বসে যাবো, নিজেদের গল্পগুলো লেখকের গল্পে খুঁজে পেতে।
একটা মানুষের লেখা এত সুন্দর কিভাবে হতে পারে! বাদশা মিয়ার মতন নিজের ইশকুলের কথাও মনে পড়ে গেল। নাহ, আমার স্কুলের মাথায় সারাদিন কোন আমলকি গাছ মাথা ঘষত না। আশেপাশে ধরলা নদীও বইত না। কিন্তু, মমতায় পূর্ণ কিছু মানুষ বয়ে বেড়াতেন ছোট্ট সেই স্কুলের আঙিনায়। শহরের যান্ত্রিকতা বিবর্জিত সেই স্কুলে খুঁজে পেয়েছিলাম স্বাধীনতার এক ডানা। এই বইটি সকলের পড়া উচিত। এত সুন্দর করে যদি নিজের স্কুল জীবনের কথা লিখতে পারতাম, মন্দ হতো না!
কী সুন্দর, মিঠে আর মোলায়েম এ বইটির গদ্যভাষা; বিষয়বস্তুর খাতিরে যেমন হওয়া দস্তুর ঠিক তেমন। বইয়ে বর্ণিত সময়কালটা দারুণ মূর্ত হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন কুড়িগ্রাম, ব্রিটিশ রাজ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, তখনকার শিক্ষাব্যবস্থা এবং মানুষ ও পরিপার্শ্বের খুব স্পষ্ট একটি চিত্র পাওয়া যায়। এ ধরনের বেশিরভাগ বইয়ের দুটি ত্রুটি লক্ষ করে থাকি। একটি হলো, অনেক কিছুই বানানো মনে হয় (বানানো নয়, কিন্তু লেখক সত্য ঘটনাটাকেই যদি বাস্তব করে তুলতে না পারেন পাঠকের কাছে তবে এ দায় লেখকেরই)। অন্যটি হচ্ছে, গল্পটা শেষ পর্যন্ত যেন নীতিকথার মতো শোনায়। সৈয়দ শামসুল হক ওরফে বাদশা মিয়ার স্কুলজীবনের নানা বর্ণবিশিষ্ট স্মৃতির সমষ্টি ‘আমার স্কুল’ এসব থেকে মুক্ত।
দিনটা খুব আরাম আরাম। শীত আসি আসি করছে। অনেক দিন পর এতো আরাম করে একটা বই পড়লাম। ছোটদের জন্য লেখা বই ছোটবেলায় আমার খুব অদ্ভুত লাগতো। বড় হয়ে এখন এই বইগুলা সবচেয়ে ভালো লাগে। আমার মনে হয় আমরা যত বড় হই আর জীবনের জটিলতায় জড়িয়ে পড়ি এই ছোটবেলার গল্পগুলা আমাদের এসকেপরুট দেয়। বড়বেলা থেকে ছুটি নিয়ে ছোটবেলার সেই গল্পে হাড়িয়ে যেতে ভালো লাগে।
পড়া লেখা জানা কোন মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়,তার শিক্ষা জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কোনটা? সে অনায়াসে বলবে শিক্ষা জীবনের শুরুর সময়টা, যেটা আমরা বিদ্যালয়ে বা স্কুলে পড়ে পার করেছি। এর চেয়ে সুন্দর সময় মানুষের জীবনে কম আসে।
প্রত্যক মানুষের তার শৈশবের বিদ্যালয়ে কাটানোর সুন্দর স্বরণীয় স্মৃতি থাকে। যা মনে করে মানুষ সারাটা জীবন পুলকসঞ্চার করে। লেখক সৈয়দ শামসুল হক তাঁর স্কুল জীবনের স্মৃতি গুলো আমাদের শুনিয়েছেন "আমার স্কুল " বইয়ে।
" কমর পন্ডিতে পাঠশালার বিদ্যা হয় কাঁচকলা দুই হাতে দুই কলম দিয়ে বসিয়ে রাখে গাছ তলা "
লেখকের স্কুল যাত্রা শুরু হয় ক্লাস থ্রি থেকে। এর আগে বাসায় বসে বাবার সাথে পড়ালেখা করতেন বাদশা। স্কুলে ভর্তি হয়ে বাদশার সামনে খুলে গেল নতুন পথ। নতুন স্কুল,নতুন বন্ধু,নতুন শিক্ষক। হৈ হৈ ব্যাপার। এই স্কুলে লেখক ক্লাস থ্রি থেকে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছেন। এই সময়ের মধ্যে অনেক সুখের স্মৃতি, অনেক দুঃখের স্মৃতি মিলিয়ে একগাদা গল্প আমাদের শুনিয়েছেন লেখক। চমকপ্রদ সেসব গল্প পড়তে পড়তে পাঠক হারিয়ে যাবে কুড়িগ্রামের মাইনর ইংলিশ স্কুলে। আহ্, কি চমৎকার।
গল্প পড়তে পড়তে আমার মনে পড়েছে আমার স্কুলের কথা। আমার সেই প্রাইমারি স্কুল "ছনহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় "। আমার জীবনের সোনালী সময় গুলো আমি কাটিয়েছি এই স্কুলে। এত সুন্দর ছিল দিনগুলো,কোন ভাবেই ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।
বেলা দশ বেজেছে তাই সেজেছে ছেলে বাড়ি বাড়ি। যাবে পাঠশালাতে মা খালাতে নামায় ভাতের হাঁড়ি। নামায় ভাতের হাঁড়ি সালোন পুঁটি ভোজন সারা হলে তারা নামবে পথে নদীর সোঁতে ছাত্র দলে দলে।
জীবনের প্রথম স্কুলে যাওয়ার স্মৃতি কার না উজ্জ্বল থাকে? আমি প্রথম যেদিন স্কুলে ভর্তি হই, সেদিন সারাটা স্কুল জুড়ে খুব দৌড়েছিলাম। মনে হয়েছিল, খুব আনন্দকে মাঠজুড়ে ছড়িয়ে দেই। কুড়িগ্রামে বেড়ে ওঠা সৈয়দ শামসুল হক, যিনি বাংলা ভাষার একজন প্রথিতযশা সব্যসাচী সাহিত্যিক, তাঁর শৈশবের মায়ামোড়ানো স্কুলের স্মৃতিকথা আর রফিকুন নবীর অনবদ্য অঙ্কনে সমৃদ্ধ মাত্র ৭৭ পাতার বইখানা একটা রত্ন বিশেষ। সেই ছোটবেলা, সেই নস্টালজিয়া, হাতে নিয়েই অতীতে হারিয়ে যাওয়া, যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে ছোট্ট এক ছেলে মায়ের হাতের রান্না খেয়ে হেঁটে বাবার হাত ধরে রওয়ানা দিয়েছে স্কুলে। সেখানে সব জাঁদরেল মাস্টারমশাই আর নতুন নতুন বন্ধু। কখনো ভয়ে, কখনো শাসনে, কখনো বন্ধুত্বে, কখনো স্নেহে কাটানো স্কুলের দিনগুলি কী সুন্দর, কী নিষ্পাপ! শিক্ষকেরা তখন ছিলেন পিতার মতনই। স্নেহ লুকিয়ে রেখে শাসনটা বেশি দেখালেও সবাই ছিলেন ছাত্র অন্তঃপ্রাণ। কত ছোট ছোট ঘটনা ঘটে যায় স্কুলে। সময়টা ধরা পড়ে স্মৃতিতে। তখন ইংরেজ জামানা, যুদ্ধ চলছে, দুর্ভিক্ষ। একটু একটু করে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে সমাজে। দুর্ভিক্ষ এসেছে। একটু ভাতের জন্য, একটু ফেনের জন্য হাহাকার। কিন্তু সময় থেমে থাকে না। একেকজন মাস্টারমশাই এর একেক রকম শিক্ষা নিয়ে জীবন পথে এগিয়ে চলেন ছোট্ট বাদশা মিয়া। এত দ্রুত কেন যে শেষ হয়ে গেল বইটি! মনোমুগ্ধকর শব্দচয়ন শামসুল হকের, চোখের সামনে যেন ভেসে উঠছিল প্রতিটি দৃশ্যপট। সাহিত্য প্রকাশের এই 'আমার স্কুল' সিরিজটি বাংলাদেশের সাহিত্যে একটা দুর্দান্ত সংযোজন। অনেকেই লিখেছেন এই সিরিজে এবং প্রতিটা বইই অসাধারণ। ছোটরা পড়ে তো মজা পাবেই, একই সাথে সমান উপভোগ্য বড়দের জন্যও।
গল্পের শুরুতেই বাংলাদেশের কি দারুণ বর্ণনা! নীল সাগরের দাঁড়ে পা রেখে ল্যাজ ঝুলিয়ে থাকা ঝুঁটিওয়ালা এক পাখি যেন বাংলাদেশ! কুড়িগ্রাম ঐ ঝুঁটির পেছনে পালকের কোথাও একটা আছে।
কুড়িগ্রামেই লেখকের জন্ম। কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুলে তার পাঠ্যজীবন শুরু। তা নিয়েই এই বইখানি। সবুজ রঙের টিনের দোতলা বাড়ির সেই স্কুল। ছাত্রের আর তাদের সমগোত্রের বাঁদরের হুটোপুটি, চামচিকার লম্ফঝম্পের মাঝে স্কুলের টিনে সারাদিন মাথা ঘষতে থাকা আমলকি গাছের ডাল পিঠে ভেঙে পিঠ থেকে মগজে পড়া চালান দেয়া হত।
১৩ বছরে ম্যাট্রিক দিয়ে তাতে ফার্স্ট হয়ে ছোটলাটের হাত থেকে গোল্ড মেডেল নেয়ার স্বপ্ন নিয়ে ক্লাস ফোরে ভর্তি হতে গিয়ে অবশেষে থ্রি থেকে যাত্রা শুরু করলেন।
ক্লাস সিক্সের আগ পর্যন্ত খালি পায়ে স্কুলে যাওয়া, সর্বদা করজোড়ে মাস্টারমশাইদের সামনে দাঁড়ানো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এর রোমাঞ্চ, চারটে খাতায় পেনসিল, নীল কলম আর ম্যালেরিয়া বড়ি দিয়ে বছর চালানোর উপায়, ব্ল্যাকআউট, দুর্ভিক্ষ, কন্ট্রোল থেকে পাওয়া চাল-জামা, সাদা-লাল কেরোসিন, হিন্দু-মুসলিম বিভেদ চেনার শুরু, ফরিদ স্যারের ট্রান্সলেশন, বঙদেশের ম্যাট্রিকের প্রশ্ন খোদ বঙ্গোপসাগরে ভাসা জাহাজে বসে ছাপানো, কিং এম্পেরোর ভারতবাসীকে নিজের সন্তানদের মতো ভালবাসেন ভেবে গর্ব হওয়া, যুদ্ধজয়ী রাজা ষষ্ঠ জর্জের তরফ থেকে পাওয়া একটি করে রসগোল্লা অন্যদিনের মতো তাড়িয়ে না খাওয়া.....কি দারুণ ছিল বইটা। লিখতে গিয়ে আবার মনে করছি যখন মনে হচ্ছে নিজেই যেন এক্সপেরিয়েন্সড করে এসেছি সব! এত আপন লাগছে সবকিছু!
ফরিদ মাস্টারের ইংলিশ পড়ানোর কায়দা ছিল লা জওয়াব! "A quick brown fox jumps over the lazy dog" এর "পাটকিলা রঙের এক চটপটিয়া শিয়াল, আলসিয়া কুত্তাকে দেয় ডিঙিয়া ফাল" মতো সাহিত্য রসবোধযুক্ত বঙ্গানুবাদ অসাধারণ ছিল।
এত সুন্দর একটা স্মৃতিচারণ লেখার জন্য বাদশা মিয়াকে ধন্যবাদ!
বইখানিতে কি মধুর স্মৃতি মাখানো লেখা! সবচেয়ে ভালো লেগেছে ' স্কুল ছেড়েছি সেই কবে। স্কুল এখনো বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। স্কুলের পড়া শেষ করেছি, নিজের পড়া এখনো শেষ করতে পারি নি। এক জীবন কেন, শত জীবনেও পড়া কখনোই শেষ হবার নয়। '
আমি রিভিউ লিখতে জানি না।আমি কোন কাজই ঠিকঠাক পারি না।
মির্জা গালিবের একটা উক্তি আছে,"জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সাইকেলের মতো চলতে থাকতে হয়।" আমার মনে হয় আমিও চলছি কিন্তু চক্রাকারে। আমি ঘুরে ঘুরে আবার শূন্যে ফিরে আসি।
বন্ধু হারুনের সাথে যখন আমার এলোমেলো অগোছালো আলাপ শেয়ার করি তখন খেয়াল করি ও দুপুরের শান্ত নদীর মতো করে উত্তর দেয়- এই বয়সে মানুষ বারবার তাঁর ছেলেবেলায় ফেরত যায়। আমি অসম্ভব আলসে আর কাজকর্মহীন একটা মানুষ, সারাদিন পেছনের রং হীন একটা শৈশব মনে পড়ে । শহরের স্কুল জীবন আর খুব শাসনে বড় হওয়া মানুষের জীবনে রং চং থাকার তেমন কারন নেই কিন্তু নিরাপদ একটা শৈশব ছিলো।
***এই বইয়ের রিভিউ না,আমার স্কুল জীবনের এলোমেলো কাহিনী মনে পড়ছিলো এই যা।***
খুব ছোট আর সাধারণ একটা বই,যদিও শহরে বড় হয়েছি কিন্তু এই বইটা পড়ার সময় নিজের স্কুল জীবনের গল্প মনে হচ্ছিল বারবার। শহরের স্কুলগুলোর স্মৃতিতে গাছ-পালা,পাখির ডাক,মৌসুমি ফল,বিস্তৃত খেলার মাঠ,নদী এসব নেই আর তাই বৈচিত্র্য কম মনে হয় আমার কাছে।
বইটা পড়ার সময় মনে হলো আমিও আমার স্কুল জীবনের একটা ছোট গল্প লিখি।
বাচ্চাদের জন্য এখন এত সুন্দর সুন্দর বই বের হয় যে দেখলেই পড়তে ইচ্ছা হয়। আমার স্কুল ও এমনি একটি সিরিজ। আমার নিজের স্কুলজীবন অবশ্য খুব আনন্দময় বা স্মৃতিবহুল না। একই স্কুলে দশ বছর পড়েও কেন যেন খুব একটা মায়া জন্মায়নি। তবুও অন্যের স্কুলজীবন এর অম্লমধুর স্মৃতি পড়তে ভালই লাগে। এই বইটিও প্রচ্ছদ দেখে আগ্রহী হয়ে কেনা। কিনতে গিয়েছিলাম ভাগ্নীদের জন্য বই কিন্ত সেই সাথে নিজের জন্যও বাচ্চাদের বই কেনার লোভ সামলাতে পারলাম না। বইটা ভাল। পড়ে মনে হয়েছে, ভাগ্যিস সেইকালে জন্মাইনি! একটা ক্লাস থ্রি এর বাচ্চার সকাল দশটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত স্কুল! ভাবা যায়! সেইসাথে মাস্টারমশাই দের পিটুনি তো আছেই! তার সাথে যোগ হয়েছিল দুর্ভিক্ষ। সব মিলিয়ে খুব সুখকর অভিজ্ঞতা না হলেও বইটা শেষ হবার পর মনে হয়েছে, কেন এমন হুট করে শেষ করে দিল! একদম মাধ্যমিক পর্যন্ত পুরো স্কুলজীবন এর কথা তো লিখতে পারত!