ঢাকার পুরনো ইতিহাস গৌরবময়। অষ্টাদশ শতকে পৃথিবীর সেরা শহরগুলির মধ্যে একটি ছিল ঢাকা এবং সেরা শহরের ক্রমসংখ্যায় ঢাকার স্থান ছিল দ্বাদশ। কিন্তু ঢাকা নিয়ে লেখালেখি হয়েছে কম।
ড. মুনতাসীর মামুন গত সতকের সত্তরের দশক থেকে ঢাকাচর্চা শুরু করেন। গত চার দশকে তিনি এককভাবে ঢাকা নিয়ে প্রচুর কাজ করেছেন।
১৯৯৩ সালে ড. মামুনের ঢাকা বিষয়ক কোষগ্রন্থ "ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী" প্রকাশিত হয়। এটি ছিল ছিল ঢাকা বিষয়ক প্রথম কোষগ্রন্থ। বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছিল গ্রন্থটি। তারপর প্রকাশিত হয়েছে এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় খন্ড।
এই তিন খণ্ড পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করে প্রকাশিত হয়েছে এই অখণ্ড সংস্করণ।
Muntassir Mamoon (Bangla: মুনতাসীর মামুন) is a Bangladeshi author, historian, scholar, translator and professor of University of Dhaka. He earned his M.A. and PhD degree from University of Dhaka. Literary works
Mamoon mainly worked on the historical city of Dhaka. He wrote several books about this city, took part in movements to protect Dhaka. Among his historical works on 1971 is his Sei Sob Pakistani, in which many interviews with leading Pakistanis was published. Most of them were the leading Pakistani characters during the liberation war of Bangladesh.
জন্ম এবং পরিবার মুনতাসীর মামুনের জন্ম ১৯৫১ সালের ২৪ মে ঢাকার ইসলামপুরে নানার বাড়িতে। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার গুলবাহার গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মিসবাহউদ্দিন এবং মায়ের নাম জাহানারা খান। পিতামাতার তিন পুত্রের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। তিনি ১৯৭৫ সালে বিয়ে করেন। তার স্ত্রী ফাতেমা মামুন একজন ব্যাংকার। মুনতাসির মামুনের দুই ছেলে মিসবাহউদ্দিন মুনতাসীর ও নাবীল মুনতাসীর এবং কন্যা রয়া মুনতাসীর।
কর্মজীবন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই দৈনিক বাংলা/বিচিত্রায় সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন মুনতাসীর মামুন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক পদে কর্মরত আছেন। এর পাশাপাশি ঢাকা শহরের অতীত ইতিহাস নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। এছাড়া তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের 'মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ গবেষণা ইন্সটিটিউটে' সন্মানিক প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে ১৯৯৯-২০০২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কৈশর থেকে লেখালেখির সাথে জড়িত হয়ে ১৯৬৩ সালে পাকিস্তানে বাংলা ভাষায় সেরা শিশু লেখক হিসেবে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার পর অনুবাদ, চিত্র সমালোচনা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রচনা করেন অনেক বই। তাঁর লেখালেখি ও গবেষনার বিষয় উনিশ, বিশ ও একুশ শতকের পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ ও ঢাকা শহর।
সাংগঠনিক কর্মকান্ড স্বাধীন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ডাকসুর প্রথম নির্বাচনে মুনতাসীর মামুন ছিলেন সম্পাদক। একই সময়ে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি। ডাকসুর মুখপত্র "ছাত্রবার্তা" প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদনায়। তিনি বাংলাদেশ লেখক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও যথাক্রমে প্রথম যুগ্ম আহ্ববায়ক ও যুগ্ম সম্পাদক। তিনি জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ড ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এবং জাতীয় আর্কাইভসের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। ঢাকা নগর জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ঢাকার ইতিহাস চর্চার জ্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সেন্টার ফর ঢাকা ষ্টাডিজ (ঢাকা চর্চা কেন্দ্র)। এ কেন্দ্র থেকে ঢাকা ওপর ধারাবাহিক ভাবে ১২টি গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি বাংলা একাডেমীর একজন ফেলো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও সিনেটের নির্বাচিত সদস্য হয়েছেন কয়েকবার। '৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির তিনি একজন প্রতিষ্ঠাতা ও সক্রিয় সদস্য। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী ফাতেমা মামুন প্রতিষ্ঠা করেছেন মুনতাসীর মামুন-ফাতেমা মামুন ট্রাস্ট। এ ট্রাস্ট গরিব শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদের নিয়মিত সাহায্য করছে।
সাহিত্য কর্ম মুনতাসীর মামুনের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২২০+। গল্প, কিশোর সাহিত্য, প্রবন্ধ, গবেষনা, চিত্র সমালোচনা, অনুবাদ সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই মুনতাসীর মামুনের বিচরণ থাকলেও ইতিহাসই তার প্রধান কর্মক্ষেত্র। ।
পুরস্কার বাংলা একাডেমী পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, সিটি আনন্দ আলো পুরস্কার, একুশে পদক, নূরুল কাদের ফাউন্ডেশন পুরস্কার, হাকিম হাবিবুর রহমান ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক পুরস্কার, ইতিহাস পরিষদ পুরস্কা, অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার, অলক্ত স্বর্ণপদক পুরস্কার, ডঃ হিলালী স্বর্ণপদক, প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৬৩), মার্কেন্টাইল ব্যাংক স্বর্ণপদক, এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অর্লিয়েন্স শহর তাঁকে 'অনারেবল ইন্টারন্যাশনাল অনারারী সিটিজেনশিপ' প্রদান করে।
পুরান ঢাকাইয়ারা এগুলো নিশ্চয়ই চিনবেন! না চিনলেও অবাক হবো না। এসব খাবারের চল তো উঠে গেছে সেই বিশ শতকেই।
ঢাকাও যে তার জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছে ধীরে ধীরে। পৃথিবীর একমাত্র শহর যা চারবার রাজধানী হবার গৌরব লাভ করেছে, কিন্তু তার চিহ্ন রয়েছে শহরের গায়ে সামান্যই। প্রাচীন 'ডাবেকা' রাজ্যই হোক, ঢাকেশ্বরী দেবী বা ঢাক গাছের নামেই নাম হোক - এই ঢাকা শহরের ইতিহাস বহু বহু বছর পুরোনো। মুঘল আমলে বাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকার যে বৈভব, তা পুনরুজ্জীবিত হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশ আমলে।
উনিশ-বিশ শতকের ঢাকা কেমন ছিল? ফরাসি কুঠি তখন উঠে গিয়েছে, ইংরেজরা জাঁকিয়ে বসেছে। কাশ্মির - দিল্লী - সিলেট ঘুরে আবদুল হাকিমের উত্তরসূরিরা বেগম বাজারে গোড়াপত্তন করেছেন বিখ্যাত নবাব পরিবার। নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন আলোকচিত্র তুলেছিলেন ফ্রিৎজ কাপ।
অভিজাত কুট্টিরা ফেজ টুপি পরে, মগওয়া সুপারি আর জনকপুরি খয়ের দেওয়া সাঁচীপান আর কাফুরী পান মুখে দিয়ে মোরগ লড়াই আর বুলবুলির লড়াই করাতেন। অতিথি আপ্যায়নে কেমন পান সাজানো হয়েছে তা দিয়ে বিচার করা হত সম্ভ্রান্তবংশের ভদ্রতা। দোসাদ, ভিস্তি, বাজিয়া, ধারি, কান্দু'র মত সম্প্রদায় ও নানা পেশাজীবিরা ঘুরে বেড়াতেন ঢাকার পথে।
ঢাকার একপাশে তখন ধান-মন্ডাইয়ের মাঠ বা ধানমন্ডি গ্রাম। ইডেন স্কুল, ঢাকা মাদ্রাসা ও ঢাকা কলেজ শিক্ষাকে এগিয়ে নিচ্ছে। চকবাজারের কাছে ছিল পাগলা গারদ, পুরোনো মুঘল দূর্গে চালু হয়েছে ঢাকা জেল। চকবাজারে আশুরার দিন লাঠি ও তরবারি খেলা হত। হিন্দু-মুসলিম সবাই অংশ নিতেন জন্মাষ্টমীর বিশাল মিছিলে। ঈদের সকালে বের করা হত বর্ণাঢ্য ঈদ মিছিল। ঠাকুরবাড়িতে আয়োজিত হত তিনদিনের ঝুলন উৎসব। বারবনিতাদের নাচ-গান, অঢেল চন্ডু সেবন ও মদ্যপানে রঙ্গিন হয়ে উঠতো ঢাকার রাত্রি। ঢাকার এই বাঈজি পাড়া থেকেই এসেছিলেন ঢাকার প্রথম নারী অভিনেত্রী লোলিটা, যার অংশগ্রহণে নির্মিত হয়েছিল ১৫ হাজার টাকা বাজেটের প্রথম ঢাকাইয়া চলচ্চিত্র 'দি লাস্ট কিস।'
এই শহরের সাথে জড়িয়ে আছে নীলচাষের নাম। নীলকরদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা ব্যাংক, তাদের ইমেজ বাঁচাতে চালু হয় ঢাকার প্রথম সংবাদপত্র 'ঢাকা নিউজ'। কাছাকাছি সময়েই বাংলা সংবাদপত্র 'ঢাকাপ্রকাশ'ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ঢাকার প্রথম বাংলা মুদ্রনযন্ত্র 'বাঙ্গালা যন্ত্র'তে ছাপা হত এই পত্রিকা, যে ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়েছিল 'নীলদর্পন'ও৷
ঢাকা বিখ্যাত ছিল মসলিন আর জামদানির জন্য, সিপাইপেড়ে ঢাকাই বস্ত্রশিল্পের জন্য। তারজালির সুক্ষ্ম কাজের জন্য। আঠারো শতকে আগা বাকের শুরু করেন মুচমুচে একরকম ছোট রুটি বাখরখানি তৈরী, যা একান্ত ঢাকাইয়া সৃষ্টি। শশরঙ্গা সবজি একমাত্র ঢাকায়ই রান্না করা হত। পৌষ মাঘ মাসে ভোরের আলো ফোটার আগে কুয়াশায় বসে দুধ ফেটে সেই ফেনা তোলা দুধ খাওয়া হতো। এর নাম ছিল নামাশ। পনেরো সের ওজনের পরসন্দ কাবাব, দোগাশা ও মোতাজান বিরিয়ানি, তেহারি, তোরাবন্দি, দম পোখতের মতো আরো কত ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রচলন ছিল ঢাকায়, যার কিছু টিকে আছে কিছু হারিয়ে গেছে।
যখন শ্রীপান্থের 'কলকাতা' বইটি নিয়ে পোস্ট করেছিলাম, আদি ভাইয়া জিগ্যেস করেছিলেন 'ঢাকা পড়েছেন?' কিছুটা থমকে গেলাম, লজ্জিতও হলাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর সত্যজিৎ রায় কলকাতার প্রতি যে ভালোবাসাটা জাগিয়ে তুলেছেন, তা ঢাকার জন্য অনুভব করি না যে! ঢাকার ইতিহাস না জানার গ্লানি থেকেই অবশেষে সংগ্রহ করলাম অখন্ড 'ঢাকা-স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী'। সচিত্র বইটির পাতার পর পাতা উলটে কেবল অবাক হচ্ছিলাম, হারিয়ে যাচ্ছিলাম। ঢাকার অলিগলির রহস্যের চাবি মুনতাসীর মামুন আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। কতটা গৌরবময় ছিল আমাদের ঢাকা আর তা কীভাবে ধীরে ধীরে নিভে এলো। পুরো বইটি যদিও আমি পড়েছি, তবে তা 'পড়া শেষ হয়েছে' বলতে পারি না। এটাকে বলা যায় ঢাকার অভিধান, চিরজীবন একটু একটু করে বইটা পড়ে যেতে হবে।
বইঃ ঢাকা - স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী লেখকঃ মুনতাসীর মামুন প্রথম অখন্ড প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারী ২০১৫ প্রকাশনায়ঃ অনন্যা প্রচ্ছদ, অংকন ও অঙ্গসজ্জাঃ হাশেম খান পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ৬৪৬ মূল্যঃ ১৬০০/-
প্রায় ১৩ বছর কাটিয়েছি পুরোনো ঢাকায়। যেহেতু বেশ ইতিহাসবহুল একটা জায়গায় ছিলাম, তাই ঢাকা নিয়ে জানার আগ্রহ আগে থেকেই ছিল। আগ্রহটা আরো প্রকট হয় 'ঢাকায় ফাগুন' বইটা পড়ার পর। এক শিক্ষকের কাছে এই আগ্রহ প্রকাশ করায় উনিই আমাকে মুনতাসীর মামুনের 'ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী' বইটা পড়তে বলেন। আমার মতো যাদের ঢাকা নিয়ে বেশ আগ্রহ আছে, তাদের কাছে এইটা সুখপাঠ্য। ঢাকাকে বলা যায় ইতিহাসের আঁতুড়ঘর। এর প্রতিটা পরতে পরতে রোমাঞ্চকর ইতিহাস। ঢাকার ইতিহাস অন্তত হাজার বছরের। তারমধ্যে এ বইয়ের পাতায় পাতায় উঠে এসেছে চারশ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকার অনেক না জানা উপাখ্যান। মুনতাসীর মামুন অবশ্যই সুলেখক। তাঁর মতামতের সাথে অনেকের বিরূপ প্রতিক্রিয়া থাকলেও, লেখার ধরন অবশ্যই প্রশংসনীয়। তাঁর ঢাকা সমগ্র ১,২,৩ কে এক মলাটে আনা হয়েছে এবার৷ শব্দের সাথে শব্দ বুনে তিনি বলে গেছেন ঢাকার গৌরবজ্জ্বল ঝলমলে ঐতিহ্যবাহী দিনগুলোর কথা। তিনি এখানে তুলে ধরেছেন একটি বিশেষ সময়ে কোন কোন এলাকা বা জীবনযাপন কেমন ছিল, ঢাকার উল্লেখযোগ্য মানুষ, খাবার, দর্শনীয় স্থান, উৎসব ইত্যাদি৷ এখস্নে আবার তৎকালীন অনেক দুর্লভ আলোকচিত্রও সংযুক্ত করা হয়েছে।