|| বালিকাবধূকে লেখা ছেঁড়াকাটা গদ্য ||
১
পার্শ্ববর্তী পুজামন্ডপের সমস্ত কোলাহল, সমস্ত কলরব এতক্ষণে রাত্রির নিস্তব্ধতার কাছে নতি স্বীকার করিয়াছে! জগত সংসারে রাত্রিকালীন চিরপরিচিত যে নৈঃশব্দ, যাহার সাথে আমাদের পরিচয় সেই আদিমতম কাল হইতে, সেই আবার যেন জাঁকাইয়া বসিয়াছে। এ ঘরে, দেওয়াল ঘড়ির চিরকর্তব্য বোধে টিকটিক করিয়া অন্তহীন সময়ের সাথে তাল মিলাইয়া চলিবার প্রয়াস ভিন্ন আশেপাশে আর কোন শব্দ নাই! মাঝে মাঝে কেবল কিছু দূর হইতে রেলের আওয়াজ ভাসিয়া আসিতেছে, আর বিটি রোড ধরিয়া ভারি ট্রাক-লরীগুলি গো গো শব্দে ছুটিয়া যাইতেছে! দু একটা বাজী এখনো যে সহর্ষে আর্তনাদ করিয়া উঠিতেছে, তাহারা কেবল রাত্রির নিস্তব্ধতাকেই গাঢ় করিয়া তুলিতেছে। এ রজনী শান্ত, শ্যামল, কোমল কিন্তু রহস্যময়ী!
কিন্তু, রজনী যদি সে বালিকা বধূর মতন কোনো কিশোরী হইত, তাহলে বোধকরি এ ঘরে এত নিস্তব্ধতা ছাইত না! তাহার হাতে চুড়িগোছের রিনঠিন আওয়াজ বাজিত, তার চপল পায়ে মলের রুনুঝুন, আর শাড়ির আঁচলের খসখস শব্দের সাথে তাহার ছটফটে কথারা এ ঘরের আনাচ কানাচ ভরাইয়া তুলিত! সে এতক্ষণে সংসারের কাছ থেকে ছুটি লাভ করিয়া ঘরে আসিয়া, দ্রুত হস্তে দোর দিয়া, তবে যেন শ্বাস পাইত! সে কি জানিত, সমস্তটা দিন আমি তাহার অপেক্ষায় থাকি! তাহার আঁচল এখনো চাবির গোছায় ভারি হয় নাই, তাহার মনও এখনো ভারিক্কী হয় নাই, তাই সে সমস্তটা দিন বিরহ সহিবার পরেও কেমন অনায়াসে সরল মনে মুখ ঝামটা দিয়া বলিতে পারিত ‘অমন করে কি দেখছো? আমায় যেন আগে দেখো নি!’ ভাবি, রজনীর ‘চিনি’ ডাকনাম সার্থক, চিনির মতই তার মন, শাদা, মিঠা, ও অল্পতেই গলিয়া যায়!
২
এবারের আশ্বিনের অকাল প্লাবন যেন সময়ের পূর্বেই বাতাসে শীতভাব জাগাইয়া তুলিয়াছে! কিশোরী বধূ রজনী, সেকাল হইলে এতক্ষণে কাঁথা টানিয়া লইয়া গভীর ঘুমে মগ্ন হইয়া যাইত! পালঙ্ক না হোক, এ কিং সাইজ বেডে সে পাশ মুড়িয়া বুকপেটের কাছে পা দুখানি টানিয়া লইয়া নিদ্রা যাইত। ঘরে সেজের বাতি মৃদু আভায় জ্বলিত, তাহার নিষ্কম্প শিখা প্রভায় রজনীর মুখ স্বপ্নাতুর মনে হইত। তাহার সন্ধ্যার সুচারু কবরী, বন্ধন ভাঙিয়া এখন স্রোতস্বিনী নদীর মত বালিশের কিনারা আপ্লুত করিত! দেখিতাম স্বপ্নের মগ্নতায় তার রক্তিম ওষ্ঠপুটে মৃদু বঙ্কিম হাসি ফুটিয়া উঠিয়াছে, ভ্রপল্লবে মাঝে মাঝে শিহরন খেলিতেছে, শ্বাসের গভীরতায় তার নাসারন্ধ্র স্ফুরিত হইতেছে, তাহার বক্ষখানি ধীরললিত ছন্দে ওঠাপড়া করিতেছে! রজনী, তুমি এমনিই সুন্দর স্বপ্নবৎ থেকো চিরকাল, তোমার বড় হয়ে কাজ নেই!
৩
অথচ রজনী যে কোন কোন রাত জাগিয়া থাকে না, তা তো নয়! সেবারে যে সে পূর্ণিমার রাতে দেখা করিয়াছিল! তাও লুকাইয়া, কলাবাগানে! শরৎ আর চন্দ্রাও দেখা করিতে গিয়াছিল একে অপরের সাথে! কেউ দেখিয়া ফেলিলে যে কি কেলেঙ্কারি হইত, সে কথা আন্দাজও করিতেও ভয় হয়!
এবারে লক্ষ্মী পুজার আগের রাতে যেমন জোৎস্না ফুটিয়াছিল, রজনী থাকিলে নিশ্চই সে রাতে ঘুমাইতে পারিত না। দক্ষিনের জানালা দিয়ে রজনীর পায়ে এসে লুটাইত সে শ্বেতশুভ্র আলো! রজনী জাগিয়া ফিসিফিস করিয়া ভালবাসার কথা বলিত। অন্ধকারে তাহার চোখের শাদা যেন নিশির মত মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া জাগাইয়া রাখিত! বুকের পাশটিতে শুইয়া থাকিত সে, হঠাৎ হাওয়া আসিয়া জানালার পর্দা উড়াইলে তাহার মুখে আলো আবছায়ার আলপনা খেলিয়া যাইত! তাহার বুকে কেমন অপরিচিত সুগন্ধ, তাহার হাতে কেমন ঘোর লাগা উষ্ণতার মাদক! বালিকা বধূ রজনী খুনসুটি করিত হয়ত, অন্ধকারেই জিভ ভ্যাঙাইত, বলিত, ‘তোমায় ভালবাসতে আমার বয়েই গেছে!’
৪
রজনীর অমন কথা যে মিথ্যে, সে আমি জানি, অমনটা সে বলেই! কৈশোর এখনো যেন তার যায় নি! কিন্তু এমন কথা শুনলে তাও বুক দুরুদুরু করিয়া ওঠে! রজনীর মনের তল পাই না যেন! বালিকা যে কখন কিশোরী হয়, কখন যৌবনা, সে তাহার রূপবৃদ্ধিতে আন্দাজ চলে, কিন্তু রজনীর মন? সে তো শাদাচোখে দেখা যায় না! রজনী পিতৃগৃহে গেলে মনে হয় দম বন্ধ হইয়া আসিল! কিছু নাই, কোথাও কিচ্ছু নাই, চতুর্দিকে শূন্যতা বোধ হয়! রজনী চিঠি না পাঠাইলে ক্ষোভ হয়, মনে হয়, থাক বাপের বাড়ি! কিন্তু পরক্ষণেই ভয় হয়, রজনীর কি আমার কথা মনেই পড়ে না? না কি, রজনী কি অভিমান করিয়াছে?
৫
রজনী তুমি ফিরিয়া এস। সামনে শীত! তোমার উষ্ণতা ছাড়া এ হিমাক্রান্ত হৃদয় শ্বাস লইতে পারে না! সমস্তটা রাত যখন বাহিরে কুয়াসাবৃত, শিশিরের জল যখন নারিকেল সুপারির গা বাহিয়া নামিয়া আসে, সমস্ত ঘাসজমি যখন শিশির জলে ভিজিয়া, উত্তুরে হাওয়ার দাপটে কুঁকড়াইয়া যায়, তখন তুমি দুইহাতে জড়াইয়া কাছে না টানিলে, তোমার বুকের ওমে তপ্ত না করিলে সে শীত অসহনীয় বোধ হয়। বাহিরে ঘন কুয়াসায় চাঁদের আলো ঘোলাটে হইয়া ঠিকরাইয়া যায়, দশদিক অস্প��্ট বোধ হয়, রাতপাখি বিভ্রান্ত হইয়া ডাকিয়া ওঠে, তখন এ জীবনকে তুমিই কেবল দিশা দেখাইতে পার। রজনী, তুমি আর বালিকা নও, তুমি এখন পরিপূর্ণ বধূ, তোমার প্রণয়, তোমার বাহুডোরের সুনিশ্চিত বাঁধনেই এখন জগত সংসার হইতে মুক্তি মেলে! রজনী তুমি এমনিই থাকিয়ো চিরকাল। তোমার ওই বালিকা, কিশোরী, বধূ, সকল রূপই হৃদয়কে ভরসা দেয়, বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ভালবাসার রসদ জোগায়। রজনী, তুমি এমনিই থাকিয়ো, হৃদয়ে চিরনবীনা এক বালিকাবধূ হইয়া!
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
(কিন্তু না! এখন আর সে যুগ নাই যে বিমল করের বালিকাবধূ উপন্যাসের মত, পিতাঠাকুর আমাদের কৈশোরেই বিবাহ দেওয়া সমুচিত বোধ করবেন! এ কালে পড়ালিখা করিয়া নিজের অন্ন উপার্জনের ব্যবস্থা করিতে করতে কৈশোর তো ভাল, যৌবনও ফাঁকি দিয়া যায়! তাছাড়া, রজনীও তো আর চতুর্দশ বৎসরে বিবাহ করে না আজিকাল! যদিও বা এখন রজনীর সাথে সাক্ষাৎ হয়, কৈশোরের চাপল্য তো আর তাহার থাকিবে না! কিন্তু কল্পনা করিতে সাধ হয়! বালিকা বধূর সাথে ঘর করিয়া তাকে দেখিতে বড় ইচ্ছে হয় যে, কেমন করিয়া এক বালিকা কুসুম হইতে দল মেলিয়া চতুর্দিকে রঙ ছড়াইয়া আপন সুবাসে অন্যের হৃদয় মথিত করিয়া, কোন অশ্রুত অদৃষ্ট জাদুমন্ত্রে একজন নারী একজন ঘরণী হইয়া ওঠে! রজনী, তোমাকে জানিতে বড় সাধ হয়!)