২৭শে অক্টোবর,২০১৭ অরণ্যমন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হোল নতুন থ্রিলার সংকলন - 'প্রহেলিকা'। এটি দুই বাংলার প্রতিষ্ঠিত এবং নবাগত ১৩ জন লেখকের (মৌলিক ও অনুবাদ সাহিত্যের) ১৩টি গল্প নিয়ে করা একটি থ্রিলার সংকলন।বইটিতে সেই লেখাগুলিকে স্থান দেওয়া হয়েছে যেই থ্রিলার গল্পগুলি আগে কোন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। অতয়েব থ্রিলারপ্রেমী পাঠকদের কাছে নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় পাওনা।
বইয়ের শুরুতেই রয়েছে ওপার বাংলার লেখক মুহম্মদ আলমগীর তৈমুরের লেখা গল্প 'বংশালে বনলতা'। লেখক কাহিনীর বিন্যাস খুব সুচারু ভাবে করেছেন এবং মূল গল্পের সাথে ইতিহাস, মহাকাব্য এবং প্রাচীন মিথকে সুন্দর ভাবে মিশিয়ে এমন এক টানটান লেখা পরিবেশন করেছেন যা পড়ে যেকোন থ্রিলারপ্রেমী পাঠক মুগ্দ্ধ হবেন। আমার মতে এটি এই বইয়ের অন্যতম সেরা গল্প। বইয়ের শুরুতেই এমন একটি লেখা পেলে বাকি গল্পগুলি পড়ার প্রতি আকর্ষণ যে তীব্র হবে সে কথা বলাই বাহুল্য।
বইয়ের দ্বিতীয় গল্পটি এসেছে এপার বাংলার জনপ্রিয় লেখক দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের কলম থেকে। তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন একটি দুর্দান্ত সুপার-ন্যাচারাল থ্রিলার - 'নির্বিরোধী ভবতারণ'। কাহিনীতে প্রতিটি চরিত্রের বর্ণনা, সংলাপ এবং তাদের ক্রিয়াকলাপ লেখক এমন সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছে সবকিছু যেন চোখের সামনেই ঘটছে। অত্যন্ত সুখপাঠ্য এবং উপভোগ্য একটি থ্রিলার।
দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের লেখা থ্রিলারগল্প 'মর্গের নেকড়ে ইঁদুর' বিষয় ভাবনায় বাজিমাত করেছে। হলিউডে এই ভাবনার ওপর ভিত্তি করে বেশ কিছু disturbing Movies তৈরি হলেও বাংলায় এই ভাবনা নিয়ে কোন লেখা আগে হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। ঝরঝরে লেখা, টানটান প্লট এবং বিষয় ভাবনায় নতুনত্ব দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের মূল USP, এই কাহিনীতেও এই সবকিছুর উপস্থিতি রয়েছে প্রবলভাবে।
ঋজু গাঙ্গুলি পরিবেশন করেছেন টেকনোলজি বেসড সাই-ফাই থ্রিলার 'প্ল্যান'। কাহিনিটির শুরু থেকেই বেশ চমকপ্রদ ব্যাপার-স্যাপার আছে যা লেখক গল্পের শেষ অবধি ধরে রেখেছেন এবং গল্পের শেষ লাইনটিতে পাঠকদের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে চরম টুইস্টটি। তবে এই গল্পপাঠের অভিজ্ঞতার সাথে পরিচালক Christopher Nolan এর ছবি Inception প্রথমবার দেখার অভিজ্ঞতার বেশ মিল আছে। অনেক কিছুই হচ্ছে কিন্তু কেমন যেন মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে, পুরো ব্যাপারটার সাথে ধাতস্থ হতে বেশ সময় লাগে। এই আর কি !
বইয়ের ১৩টি গল্পের মধ্যে রয়েছে দুটি অনুবাদ গল্প। একটি এডগার অ্যালান পো এর গল্প এবং অন্যটি এডমন্ড হ্যমিল্টন এর। গল্পদুটি অনুবাদ করেছেন অভীক মুখোপাধ্যায় এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদ করা এডমন্ড হ্যমিল্টন এর গল্পটি মন ছুঁয়ে গেছে। এমন সুন্দর একটি গল্প বাছাই করা এবং সেটির সাবলীল ভাবানুবাদ করার সন্দীপনকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। অভীক মুখোপাধ্যায়ের ভাবানুবাদ করা গল্পটি সাইকোল্যজিকাল এবং গল্পের শেষটা চমকে দেবার মতন।
বাকি গল্পগুলির মধ্যে - পার্থ দের 'সংক্রমণ' প্লটভাবনায় বেশ নতুনত্ব দেখিয়েছে, সাগরিকা রায়ের 'রক্তাত্ব হৃদয়' গল্পের শেষের পাতাটি পড়ে শিউড়ে উঠতে হয়, ওয়াসি আহমেদ রাফির 'একজন ব্যাধিগ্রস্থ মানুষ' গল্পে উঠে এসেছে এক সিরিয়াল স্যাইকোপ্যাথের জীবনকাহিনী, শরিফুল হাসানের 'তারানাথ বাবু'; অনুষ্ঠুপ শেঠের 'কুল-দেওতা', মিলন গাঙ্গুলির 'একটি নিখুঁত খুন' এবং বাপ্পি খানের 'ভক্ষণ' কাহিনীগুলির শেষে টুইস্টথাকলেও থ্রিলারভূক পাঠকদের কাছে এই টুইস্টগুলি প্রেডিক্টটেবেল হবে বলে মনে করি। কারণ গল্পের মাঝেই এমন কিছু একটা হতে পারে তার আন্দাজ পাওয়া যায়।
এবার আসি বইয়ের গুণমান প্রসঙ্গে - বইটি পেপারব্যাক, কভার ল্যামিনেট করা (তবে খুব উচ্চমানের নয়), পাতার কোয়ালিটি ভাল, বইয়ের অক্ষর বা ফন্ট সাইজ সহজে পাঠযোগ্য, ছাপাখানার ভূতের উৎপাত অনেক পাতাতেই দৃশ্যমান (এ বিষয়ে আরেকটু যত্নবান হলে ভাল হত)।
পরিশেষে বলা যায়, অরণ্যমন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত নতুন থ্রিলার সংকলন - 'প্রহেলিকা' একবার পড়ে দেখা যেতেই পারে। এতে দুপার বাংলার লেখকদের বেশ কিছু ভাল গল্প/অনুবাদ রয়েছে যা থ্রিলারপ্রেমী পাঠকদের পছন্দ হবে বলে মনে করি। তাহলে আর দেরী কেন?
এই বই নিয়ে যোগ্যতর ব্যক্তিরা ইতিমধ্যেই অনেক ভালো-ভালো কথা লিখে ফেলেছেন। তার সঙ্গে আমার শুধু তিনটি কথা জোড়ার আছে: ১) মুহম্মদ আলমগির তৈমুর-এর লেখা "বংশালের বনলতা" এবং দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য-র "নির্বিরোধী ভবতারণ" শুধু এই বইয়ের নয়, জঁর ফিকশনের সম্পদ ও অবশ্যপাঠ্য। ২) দেবারতি মুখোপাধ্যায় তাঁর কাহিনিতে যে বিষয়টির অবতারণা করেছেন, তা নিয়ে এযাবৎ বাংলায় লেখালেখি হয়েছে বলে মনে হয় না। ৩) অভীক মুখোপাধ্যায় ও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এই বইয়ে এমন দুটি অনুবাদ পেশ করেছেন (যথাক্রমে এডগার অ্যালেন পো এবং এডমন্ড হ্যামিলটন-এর কাহিনির) যাদের তুল্য অনূদিত সাহিত্য পড়ার সুযোগ কমই পাওয়া যায়। তাই, সুযোগ পেলে, এই চমৎকার সংকলনটি সংগ্রহ ও পাঠে তৎপর হোন, এটুকুই বলার।