মুক্তিযুদ্ধের নির্মাণ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ইসলাম যে ডিসকোর্স হিসেবে হাজির ছিলো, তার অনুপুঙ্খ অনুসন্ধানের একটা প্রয়াস 'মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম'। ইতিহাসের হাত ধরে ঐতিহ্য নির্মিত হয়; ইতিহাসের পাঠ তাই নির্মোহ হওয়া সময়ের দাবি। চিন্তাশীল লেখক পিনাকী ভট্টাচার্য মহান মুক্তিযুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠের যাপিত ধর্ম আল-ইসলামের অবস্থান ও বয়ানকে উপস্থাপন করতে তথ্য ও প্রমাণের সাগর পাড়ি দিয়েছেন। অবগুন্ঠন উন্মোচনের এক ইতিহাসের সফরে আপনাকে স্বাগতম।
বিশ্বের সবচেয়ে মানসম্মত অভিধান হিসেবে ধরা হয় অক্সফোর্ড ডিকশনারিকে। প্রতি বছর এই অভিধানের নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। প্রতি সংস্করণে বিগত বছরের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ জরিপ করে উল্লেখ করা হয়। আমার যতদূর মনে পড়ে ২০১৪ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারি মতে সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ ছিলো 'সেলফি'। বাংলাদেশে পরিস্থিতি চিন্তা করলে আমার ধারনা গত দশ বছরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ হতে পারে 'চেতনা'। কথায় কথায় এই চেতনা আমাদের নাড়া দেয়। চেতনা শব্দটা পুরাতন হলেও 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা' নামক শব্দদ্বয় থেকে চেতনা শব্দের এই জনপ্রিয়তা। বর্তমান দেশের পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিশব্দ হলো ইসলামী চেতনা। কিন্তু ৮৫% মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে ইসলামী চেতনা কি আসলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিশব্দ? এটাই ব্যাখ্যা করা চেষ্টা করেছেন লেখক পিনাকী ভট্টাচার্য।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের দেশে একটা বয়ান আছে। সেই বয়ানে ইসলাম অনুপস্থিত। আমাদের বিশ্বাস করানো হয়েছে ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে অপ্রাসঙ্গিক ছিলো। এভাবেই তৈরি হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য নির্মাণ। ইসলাম শুধু যে অনুপস্থিত তা নয়; কখনো আসামী, কখনো পরাজিত। কিন্তু গল্পটা আসলে উল্টা। বলা যায় ১৮০ ডিগ্রী বিপরীত। আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধে ইসলামের অবদান নিয়ে কখনো কোনো গবেষনা হয়নি। প্রচলিত ধারনার বশবর্তী হয়ে কেউ হয়ত এর প্রয়োজন বোধ করেন নাই। মুক্তিযুদ্ধে ইসলামের ভূমিকা কি ছিলো, কীভাবে ইসলামের বয়ান মুক্তিযুদ্ধকে শক্তিশালী করেছে, অবদান রেখে সাহায্য করেছে তা কখনো বিশ্লেষণ করে দেখা হয়নি। তাহলে, শিরোনাম থেকে যে প্রশ্নটা জাগে, তার উত্তর পেতে নিশ্চিতভাবেই প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে একটা নতুন বয়ান অনুসন্ধানে নামতে হবে। যদি তাই হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের সামনে প্রশ্ন হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, প্রেরণা, আকাঙ্ক্ষার ভাষা, যুদ্ধের ন্যায্যতা নির্মাণ ও পরিচালনায় উপাদান ও আশ্রয় হিসেবে ইসলাম কোথায়, কতটুকু উপস্থিত ছিলো? তার ব্যাপ্তি ও গভীরতা কতটুকু? শুধু ব্যাপকতার নিরিখেই নয়, পাশাপাশি ইসলাম এই বয়ান সংগঠনে কতটা নির্ধারক ভূমিকা রেখেছে, তা স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা থেকে যুদ্ধকালীন সময়ের দলিল, রাজনৈতিক প্রচার-পুস্তিকা ও ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সুসংহতভাবে দেখানো সম্ভব কি না? লেখক তা বেশ জোরালোভাবেই দেখাতে পেরেছেন বলা যায়। আর তা এমন ক্ষেত্র উন্মোচন, যা দেশের জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার বয়ানের ঐতিহাসিক অসারতার বাইরে এসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পুনরায় পাঠ করার নতুন প্যারাডাইম তৈরি করতে সক্ষম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে যেসব লেখাপত্র আছে, তা বোধগম্য কারনেই বাংলাদেশের ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানকে কখনোই আলোচনাে অন্তর্ভুক্ত করে না। সেই দুটি উপাদান হলো- ১/ পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন নিজেদের দাবি-দাওয়া জনগোষ্ঠির কাছে যে ভাষায় হাজির করে তাকে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিন্দুতে উপণীত করেছে সেই সমস্ত ভাষ্য, কর্মসূচি, প্রচার-পুস্তিকা। ২/ মুক্তাযুদ্ধের সময়ে যে বয়ান ও ভাষ্যকে আশ্রয় করে যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে।
পিনাকী ভট্টাচার্য এই দুটি উপাদানকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন।
বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইসলামী চেতনা যে একে অপরের পরিপূরক সেটা নতুন ভাবে পাঠক সমাজের কাছে তুলে ধরেছেন লেখক। বইয়ের শেষে জনপ্রিয় কলামিস্ট গৌতম দাসের "মুক্তাযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম: প্রসঙ্গ কথা" নামক পরিশিষ্ট এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ অলংকার। এই অংশে তিনি ৪৭ এর দেশ বিভাগ, দেশ বিভাগের পূর্ব ও পরবর্তী মুসলিম লীগ, ৭১ এর আগে পাকিস্তান সম্পর্কে বাংলাদেশিদের ধারনা প্রভৃতি বিষয়ের পোস্ট মর্টেম করেছেন। নিখুত বিশ্লেষনে এই উপমহাদেশের রাজনীতি নিয়ে আপনাকে নতুন ভাবে ভাবতে বাধ্য করবে।
নতুন প্রকাশনী হিসেবে গার্ডিয়ান প্রকাশনী অল্প দিনেই অসাধারন কিছু বই দিয়েছে পাঠক সমাজকে। প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদের পরে এই বইটা আশা করা যায় পাঠক সমাজে নাড়া দিবে। সেক্যুলার পন্থিদের মাথাব্যথার কারন হবে সেটা বলা বাহুল্য। বইয়ের প্রচ্ছদ, পেজ, বাইন্ডিং অসাধারন। সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, অনেকদিন পরে একটা বই এক বসায় শেষ করলাম।
গতকালও নিয়ন আলো নামক এক অনলাইন পোর্টালে দেখলাম, শেখ মুজিবের একটা উক্তির অংশভাগ উদ্ধৃতিচিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করে শিরোনাম করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হল ধর্মনিরপেক্ষতা। এরকমভাবেই সেক্যুলার সমাজ গত কয়েক যুগ ধরে ইসলাম আর বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, আমাদের (অন্ততপক্ষে আমাকে) বিশ্বাস করিয়েই ছেড়েছিল যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর ইসলাম দুইটা ভিন্নতর জিনিশ। তারা খুব সুচারুভাবে তাদের লেখনী, চিত্রকর্ম, চলচ্চিত্র, উপন্যাস ইত্যাদির মাধ্যমে এসব প্রচার করেছে।
তারা খুব সুন্দরভাবে প্রচার করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে ইসলাম বিরোধীতা করেছিলো, তারা আমাদের এতদিন চোখ বন্ধ করে ভাবতে বাধ্য করিয়েছে যে রাজাকার বলতে তসবি, দাড়ি আর টুপিকেই বোঝায়।
কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস ভিন্ন কথাই বলে। আজ আমরা যারা এই বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে বসবাস করছি, তাদের মধ্যে স্বাধীনতার এই ধর্মীয় প্রশ্নে মতামতে ব্যাপক ফারাক। আমরা আজ সঠিক ইতহাসের অভাবে একচোখা আর নিজেদের অজান্তেই স্ববিরোধীতা করছি। কব্জির গোড়ায় মাউথপিস পেলেই সবাই চিৎকার করে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” বলে গলা ফাটায়, কিন্তু তারাই আবার যখন মুক্তিযুদ্ধে ইসলামের ভূমিকা থাকার প্রশ্নে নাক সিঁটকায়, তখন অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা (অবশ্য, মনে মনে, গালি দেওয়া অবৈধ নয়😜)।
শুধু বাংলাদেশ কেন? স্বয়ং পাকিস্তান সৃষ্টির মূলেও ধর্ম তথা ইসলাম ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিলো। বিপত্তিটা যে কোথায় তা সবাই জানে।
আসলে, আমাদের ইতিহাসের একটা বিরাট অংশ, আমাদের সংবিধান অনেককিছুই রচিত হয়েছে নাস্তিক, ইসলাম বিদ্বেষী, সেক্যুলারিস্ট আর প্রথাবিরোধী মানুষ দ্বারা। তারাই এতকাল আমাদের বুঝিয়েছে রাজাকার মানেই দাড়ি টুপি ওয়ালা কেউ একজন। জঙ্গি মানেই মাদ্রাসার ছাত্র। যদিও আর্টিজানে হামলাই সব প্রমাণ করে দিয়েছে, বেহারা কিন্তু সুর পালটে নতুন গীত তখনই ধরেছে, কৌশলে।
যাইহোক, ইসলামকে জানা এবং মানার মধ্যে শেখ মুজিবের মধ্যে কোনোই কমতি ছিলনা, বরং, তাঁর পারিবারিক ইতিহাস যা বলে শেখ মুজিবের আত্মা কাঁপতো অন্যায় সামান্য পরিমাণে হলেও। পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতি যে অন্যায় হয়েছিল, তিনি আল্লাহর নাম নিয়েই সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ (আন্দোলন) ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর বহু উক্তি ঘেঁটে কাড়ি কাড়ি উদাহরণ টানা যাবে যে তিনি জনগণের ওপর আল্লাহকেই সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী ভাবেন।
শুধু প্রশ্ন একটা জায়গাতেই, কেন? কি জন্য তাঁদের ইসলামের প্রতি এতো বিদ্বেষ? কেন তারা অস্বীকার করতে চায় যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম আর ইসলাম দুইটা পরস্পর বিরোধী? এর জবাব হয়ত তারাই ভালো জানেন। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে তারা ইতিহাসকে বিকৃতি করা ছাড়া আর কিছু করছেনা।
লেখক, গবেষক, চিকিৎসক পিনাকী ভট্টাচার্যকে ধন্যবাদ। আল্লাহ ওনার জ্ঞানান্বেষণ যেন সারাজীবন জারি রাখার তৌফিক দান করেন।
চেতনা কাকুদের জন্য ঈদ উপহার [মুখবন্ধ] মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের দেশে একটা বয়ান হাজির আছে। সেই বয়ানে ইসলাম অনুপস্থিত। আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হয়েছে ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে অপ্রাসঙ্গিক ছিল। ইসলামপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধী ছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি প্রায় সকল চলচ্চিত্র এবং নাটকে ইসলামকে,ইসলামের পোষাক পরিচ্ছদকে দেখানো হয়েছে স্বাধীনতা বিরোধীদের লেবাস হিসেবে। ফলে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম ইসলাম এবং ইসলামপন্থীদের স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবেই ঠাহর করে আসছে। অন্যদিকে ইসলামপন্থীরাও এ বিষয়ে তেমন মাথা ঘামাননি। এ সুযোগে আমাদের সুশীল সমাজের জ্ঞানপাপীরা ইতিহাসকে বদল করেছেন ইচ্ছেমতো। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে ইসলাম এবং ইসলামপন্থীদের সম্পর্কে খারাপ ধারণার জন্মদিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন। করে যাচ্ছেন উদ্ভট সব বয়ান। পিনাকী ভট্টাচার্য রচিত “মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম” বইটি সে সকল সুশীলদের মুখে কুলুপ সেঁটে দিতে সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।
মুক্তিযুদ্ধের চেনা জানা গল্পের বিপরীত দিকে এই বইয়ের অবস্থান। কি সেই চেনা-জানা গল্প? অমুক্তিযোদ্ধা আর সুবিধাবাদী সো-কল্ড বুদ্ধিজীবিদের বানানো স্যেকুলার মুক্তিযুদ্ধের গল্পই আজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সত্য এখন মিথ্যা আর মিথ্যা এখন সত্য। পিনাকি ভট্টাচার্য কিভাবে এই সাহসী কাজ করলেন সেটাই এক রহস্য। যারা মুক্তিযুদ্ধের রঙ্গ-চঙ্গা বানানো কাহিনীর চেতনায় বুদ হয়ে আছে তাদের জন্য এ এক বড় আঘাত। কিছু বিষয়ের উপস্থাপনা আবেগি। মোটের উপর গৌতম দাসের সারাংশ পুরো মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে আর আওয়ামী লীগের ভূমিকাকে বেশ ভালোভাবেই তুলে এনেছে। এখনকার আওয়ামী লীগের সাথে তখনকার আওয়ামী লীগকে মেলাতে বেশ কষ্টই হবে।
ছয় দফার আন্দোলনের সঙ্গে যে ইসলামের কোনো বিরোধ নেই, সেটাই সব সময় দাবি করা হয়েছে। সেই সব প্রোপগন্ডা মোকাবিলা করতেই আওয়ামীলীগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,তারা নির্বাচিত হলে কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করবে না।
বাম দের প্রোপগন্ডা ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করেছেন লেখক ।ভারতের হিন্দুত্ববাদ নিয়ে মাঝেমধ্যে বলা হয়েছে যা অমূলক মনে হয়েছে।
আমাদের দেশের যে অংশ রাজনৈতিক চিন্তা ধারা রাখে তাদের সবার মধ্যেই কম বেশি চেতনা বিদ্যমান|
আর গত 10 বছরের চেতনায় ইসলাম অনেকটা খাচায় বন্দী হয়ে গেলো বলা চলে| গত 10 বছরে আমরা যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দেখতে পাই সেখানে ইসলামের অনুপস্থিতি বেশ চোখে পড়ে| ধর্মভীরু মুসলিম বাঙালি থেকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি হওয়ার প্রান্তে এখন|
যাইহোক যাদের ধর্মনিরপেক্ষতা ভাল লাগে তারা সেটা মেনেই চলুক আমার তাতে সমস্যা নাই|
তবে মুক্তিযুদ্ধ আর ইসলাম কে যেভাবে সাংঘর্ষিক ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছিলো তা আমাকে পীড়া দেই| এমন একটা বই এর দরকার ছিল আসলে| সঠিক ইতিহাস জানা জরুরী !!
বই প্রসংগে বলতে গেলে পড়ার শুরুর দিকে বই টি যতটা প্রাঞ্জল ছিল,শেষের দিকে যেন ততটাই গাম্ভীর্য পূর্ণ হয়েছে(ব্যক্তিগত অভিমত) প্রাঞ্জল হলে পড়ে আর ও মজা পেতাম !!
মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস রাজনৈতিক সমন্বয়হীনতা ও অবিশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে যে ৪৭ এর দেশ ভাগ হয়েছিল কিন্তু দেশভাগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয় দ্বিজাতি তত্ত্ব অর্থাৎ ধর্মভিত্তিক বিভাজনের রাজনীতি।দ্বিজাতি তত্ত্বের গেরাকলে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হয় পশ্চিম পাকিস্তান যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্বসূত্র হিসেবে অনেকে মনে করে। ১৯০৬ সালে যখন মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলমান জনগোষ্ঠীর সার্বিক সহায়তা প্রদান করা। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে 'মুসলিম লীগ' মুসলমানদের সহায়তা প্রদানে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল যা পরবর্তীতে পূর্ব বাংলার জনকণ্ঠস্বর হিসাবে উপস্থিত হয়েছিল শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের "কৃষক প্রজা পার্টি" এবং পরবর্তীতে আওয়ামী মুসলিম লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠন যা বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। তাছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র ধর্ম ব্যতীত অন্য কোন ভাবে মিল ছিল না এমনকি পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের ভৌগলিক সীমানার দূরত্ব ছিল প্রায় ১২০০ মাইল।
দি প্রিন্স বই এর লেখক নিকালো ম্যাকিয়াভেলী এর মতে বিজিত কোন রাজ্যে পুরোপুরি শাসন ও নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে হলে ওই রাজ্যের ১. ভাষা ও সংস্কৃতি পুরোপুরি ধ্বংস করতে হবে ২.নতুবা ওই রাজ্যে ওই জনগোষ্ঠীর সাথে বসবাস করে ওই জনগণের সাথে মিশে যেতে হবে ৩.সর্বশেষ বিজিত রাজ্যের তাবেদারি শাসক বসিয়ে নিজেদের ফায়দা লুটতে হবে পশ্চিম পাকিস্তান নিকালো মেকিয়াভেলির প্রস্তাবিত স্ট্র্যাটেজের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণের যত চেষ্টা চালিয়েছিল তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল।
উপরোক্ত প্রেক্ষাপট উল্লেখ করার অন্যতম কারণ হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধ ধর্মকেন্দ্রিক নয় বরং রাজনৈতিক ও উপনিবেশকারী অপশক্তির হাত দেখে মুক্তির সংগ্রামের আন্দোলন ।
কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বয়ানে অনেক ক্ষেত্রে ইসলামকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হয় যা ঐতিহাসিকভাবে ভুল মনে হয় । কিন্তু তারপরেও ধর্মীয় নামধারী কতিপয় পাকিস্তানপন্থীর পরিপ্রেক্ষিতে পুরোপুরি একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীকে মুক্তিযুদ্ধের পরিপন্থী দাঁড় করানোটা সমীচীন নহে।
তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল যেমন জমিয়ত উলামা ইসলাম এবং অন্যান ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পুরোপুরি সমর্থন আদায় করেছিল তাছাড়া দেওবন্দ মাদ্রাসা এমনকি পাকিস্তানের অনেক ওলামা পরিষদ ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রামকে সমর্থন জানিয়েছিল।
"মুক্তিযুদ্ধের বয়ান ইসলাম "বইয়ের লেখক পিনা���ী ভট্টাচার্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইসলামের ভূমিকা এবং মুক্তিযুদ্ধের সাথে ইসলামের সংঘর্ষ নয় বরং জোরালোভাবে সংহতি ও সংগতিপূর্ণ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রধানতম লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার কিন্তু পরবর্তীতে কিভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির মূলনীতি যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র হল তার বিবর্তনের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠনের নেতাদের বক্তৃতায় ইসলামী মূল্যবোধের উপস্থিতের ইতিহাস ও বর্ণনা করেছেন। রাজাকারদের রাজাকার হয়ে ওঠার চমকপ্রদ ও তথ্যপূর্ণ বয়ান তিনি হাজির করেছেন। জামাতে ইসলাম, নেজামে পার্টি ও মুসলিম লীগ তাদের দ্বারা গঠিত আল বদর, আল সামস ও অন্যান্য রাজাকারদের রাজনৈতিক সংগঠনের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেছেন (যদি উক্ত সংগঠনের প্রায়ই মুসলিম ছিল তথাপি তারা ছিল খুবই ক্ষুদ্র অংশ যা পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীকে রিপ্রেজেন্ট করে না) তাছাড়া অন্যান্য ধর্মীয় মতাবলম্বী যেমন হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ যে স্বাধীনতার বিরোধী অপশক্তি ছিল তাও বর্ণনা করেছেন।
বইয়ের পরিশিষ্ট অংশে গৌতম দাসের একটা প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইসলাম কোন অপ্রাসঙ্গিক ও অপরিচিত বয়ান নয় বরং বরং ইসলামী চেতনা ও মূল্যবোধ মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ ত্বরান্বিত করেছিল।
বইঃ মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম লেখকঃ পিনাকী ভট্টাচার্য প্রকাশকঃ গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স সময়ঃ ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৩ (রাত ৩:৩০)
আমি অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ার সময় আমার একজন শিক্ষক ক্লাসে সবাইকে রাক্ষস এর প্রতীকী ছবি আঁকতে বলেছিলেন। আমাদের প্রত্যেকের ছবিতে আমরা বড় দাত ও শিং সহ যতটা বিদঘুটে করে একটা ছবি আঁকা যায় একেঁছিলাম। স্যার জিগেস করেছিলেন, -তোমরা কি কেউ রাক্ষস দেখেছ? -না স্যার। -তাহলে রাক্ষসের দাত বড় এবং শিং থাকে এটা তোমরা কেনো একেঁছ?
আমরা কিছুক্ষণ চুপ ছিলাম। আসলেই তো! আমরা যা বাস্তবে দেখিনি তা কল্পনায় আমাদের মনে বাচ্চাদের বই, কার্টুন কিংবা অন্য কোনো উপায়ে এসেছিল বলেই আমরা শিং এবং বড় দাতওয়ালা কাউকে একেঁছিলাম। ঠিক একইভাবে আজ যদি আপনি আমাদেরকে রাজাকার এর ছবি আঁকতে বলেন, আমরা টুপি মাথায় দেওয়া, লম্বা দাঁড়িসমেত পাঞ্জাবীওয়ালা মোল্লার ছবি একে দেবো নিঃসন্দেহে। অথচ আমাদের এবং তার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ ই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রাজাকার কেমন ছিলো তা দেখিনি। তাহলে এই যে টুপি-দাড়ি-পাঞ্জাবীওয়ালা মোল্লাকে আমরা রাজাকার এর প্রতিচ্ছবি হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিলাম তা আমাদের মনে কিভাবে এলো? রাজাকার এর বৈশিষ্ট্য কি শুধু টুপি-দাড়ি-পাঞ্জাবী? ইসলামপন্থীরা কি তাহলে রাজাকার ছিল/মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষশক্তী ছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হ্যাঁ/না তে দেওয়া হলে আপনি কখনোই সন্তুষ্ট হতে পারবেন না যতক্ষণ তার পেছনে যৌক্তিক ব্যাখা ও প্রমাণ না পাবেন।
লেখক এই বইতে প্রচলিত ধারণার বাইরে এসে এসব প্রশ্নের উত্তর ব্যাখাসহ আমাদের দেখিয়েছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে আওয়ামীলীগ এর রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী সংবিধান প্রণয়নসহ বাকশাল গঠনকালেও আওয়ামীলীগ সরকার ইসলামকে ধারণ করেছে। এছাড়া আওয়ামীলীগের নীতি নির্ধারনী রাজনৈতিক দলিল, স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচারণা, মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারি ঘোষণা ও নির্দেশনাবলী, মুক্তিযুদ্ধকালীন আওয়ামী সরকারের মুখপাত্র ‘জয়বাংলা’ পত্রিকা সহ মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন চিঠিপত্রের বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামীলীগ এবং বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ ইসলামকে ধারণ করেছে এবং যুদ্ধ জয়ে ইসলাম দারুণ ভূমিকা রেখেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলাম, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি হিসবে কাজ করেছে এ কথা সর্বজনবিদিত হলেও ক'জন জানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি হিসেবে যুদ্ধ করেছিল? তাই একথা বলার কোনো অবকাশ নেই যে ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি ছিলো। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ।
আবার, অমুসলিম ত্রিদিব রায়, বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো পশ্চিম পাকিস্তানী সমর্থক হলেও কোনো এক অজানা কারণে পাকিস্তানী সমর্থকদের শুধু ইসলামী লেবাসেই দেখানো হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলার মানুষ কেনো শান্তিকমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস কমিটিতে যোগ দিয়েছিলো তার কারণ বিশ্লেষণ করতে গেলে জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম ও মুসলিম লীগ ছাড়াও তিনটি প্রধাণ শ্রেণির আবির্ভাব হয়। প্রথমত, দুর্ভিক্ষকবলিত বাংলায় দৈনিক নগদ তিন টাকা ও তিন সের চালের লোভে অনেকেই নিরুপায় হয়ে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধকবলিত দেশে পাক-সেনাদের ভয়ে পলায়নরত মানুষ আত্মরক্ষার সু্যোগ হিসেবে রাজাকার বাহিনীতে নাম লিখিয়েছিল। তৃতীয়ত, এক শ্রেণির সুবিধাবাদী লোক জোরপূর্বক সম্পত্তি দখল এবং পূর্ব শত্রুতার ফায়দা লুটে নেওয়ার জন্য রাজাকার বাহিনীতে নাম লিখিয়েছিল। সুতরাং, আমাদের প্রচলিত ধারণার সাথে প্রকৃত অবস্থা যে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো তা বোঝার জন্য বোধ করি খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হবেনা। একটু সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করলে সহজেই বোঝা যায় কোনো একটি শ্রেণি শুধুমাত্র একপেশেভাবে আমাদের মনে সেই রাক্ষসের কাল্পনিক ছবি স্থিরভাবে ধারণ করানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন যেসব রাজাকার ধৃত হয়েছিল কিংবা, যারা পরবর্তীতে আত্মসমর্পণ করেছিলো তাদের অধিকাংশের ই পরনে কোনো ইসলামি চিহ্ন ছিলোনা। এমনকি অনেকের মুখে স্বাভাবিক কোনো দাড়িও ছিলোনা। এছাড়া রাজাকারদের আইডি কার্ড, রাজাকার ক্যাম্পের ছবি, মুক্তিবাহিনীর হাতে ধৃত রাজাকার ও আত্মসমর্পণের সময়ের রাজাকারদের যে সকল ছবি আমরা দেখি সেখানে অধিকাংশের মুখে ই দাড়ি ছিলো না, ইসলামি লেবাস ছিলো না। তাই, এই বইটি পড়ার পর আপনার মাথায় এখন যে রাজাকারের কাল্পনিক চিত্রটি আছে তা অনেকাংশে ই মলিন হয়ে যাবে।
আমাদের স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর সেই তিন নীতি কেনো আমাদের সংবিধান এর চারটি মূলনীতিতে পরিবর্তন হলো তার চমৎকার একটি ব্যাখা তুলে ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক স্বীকৃতির তাৎপর্য সেখানে দারুণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি দেশ স্বাধীনের ক্ষেত্রে আলেমসমাজের ভূমিকা, বিভিন্ন মাদ্রাসার অবদান ও সরকার ও জনগনের বিভিন্ন কাজের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষনের মাধ্যমে পিনাকী ভট্টাচার্য দেখিয়েছেন যে রাক্ষসের ছবি আমরা মনে ধারণ করেছি, রাক্ষসটা আসলে সবসময় সেরকম ছিলো না। তাই, আজ যেমন সবার রাক্ষসের ছবি একইরকম হয়েছে তা কোনো একটি শ্রেণির উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কার্যক্রমের সাফল্য বৈ কিছুই নয়। বরং এই বইটি পাঠের পর রাক্ষসের ছবিতে বৈচিত্র আসবে এবং প্রকৃত সত্য সম্পর্কে পাঠক জানতে পারবে। তবে, এই বইটি পাঠ করে রাক্ষস সম্পর্কিত ছবিটি সম্পূর্ণ বদলে যায় না। কারণ, ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বা বিপক্ষে কাজ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে হোক আর বিপক্ষেই হোক, কাজ করেছে আমার আপনার মতো একদল মানুষ। বিপক্ষ দলে এ কে এম ইউসুফ, গোলাম আযমের মতো ইসলামি লেবাসধারী রাজাকার যেমন ছিলো তেমনি, ইসলামি লেবাসবিহীন কিংবা অমুসলিম রাজাকার ও ছিলো। ঠিক তেমনি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যেমন ছিলো তেমনি অধিকাংশ ই ছিলো মুসলিম এবং তার একটি বিশেষ অংশ ছিলো ইসলামি লেবাসী মুক্তিযোদ্ধা। এই দলটি দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের সর্বস্ব উৎসর্গ করে দিতে কুন্ঠিত হননি। সুতরাং, শুধুমাত্র ইসলাম নয়, কোনো ধর্মই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ/বিপক্ষের শক্তি নয়। ধর্মকে পুজি করে যেসব ধর্মব্যবসায়ীরা নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করেছে কিংবা যে শ্রেণির মানুষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছে তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত এবং কোনো বিশেষ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে প্রকৃত রাক্ষসের ছবিগুলো সবার মনে স্থির করার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।
মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম! এখানে এটা আমাদের ভাবনায় একটা যতি চিহ্ন টেনে দেয়। আমাদের থামতে হয়, কারণ এটাও আন্দাজ করে নেয়া যাচ্ছে যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামক আমাদের চেনা-জানা বয়ানের পুনরাবৃত্তি এই বইয়ের উদ্দেশ্য হবার কথা নয়। ইসলামকে মুক্তিযুদ্ধের সাথে যেভাবে বিরােধাত্মক বা বিপ্রতীপ সম্পর্কের ছাঁচে ঝালাই করে আস্ত একটা জাদুঘর প্রকল্প খাড়া করা হয়েছে, এই বইটি তাকে আরেক প্রস্থ দীর্ঘতর করার কোনাে প্রয়াস নয়। বরং, এটা খােদ সেই পাটাতন খুলে দেখানাের চেষ্টা, যার উপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে ধর্মরিপেক্ষতার আড়ালে ইসলাম বিরােধী একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বয়ান প্রতিনিয়ত পুনরুৎপাদন করা হয়।
এই যে যতি ও বিরতি, থেমে নতুন করে দেখা এবং সেখান থেকে প্রস্থান-রেখা ও সূচনা-বিন্দু নির্ণয় করা, জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিমণ্ডলে এর একটা নাম আছে। পদ্ধতিগত দিক বিবেচনায় যাকে ছেদটানা বলে আখ্যায়িত করা হয়। মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম বইটি বাংলাদেশে এই ঘটনা ঘটাবে।
তাহলে, শিরােনাম থেকে যে প্রশ্নটা জেগেছে, তার উত্তর পেতে নিশ্চিতভাবেই প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে একটা নতুন বয়ান অনুসন্ধানে নামতে হবে। যদি তাই হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের সামনে দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট , প্রেরণা, আকাক্ষার ভাষা, যুদ্ধের ন্যায্যতা নির্মাণ ও পরিচালনায় উপাদান ও আশ্রয় হিসেবে ইসলাম কোথায়, কতটুকু উপস্থিত ছিলাে? তার ব্যাপ্তি ও গভীরতা কতটুকু?
ব্যাপকতার নিরিখেই নয়, পাশাপশি ইসলাম এই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে কতটা নির্ধারক মকা রেখেছে, তা স্বাধীনতা-সংগ্রামের সূচনা থেকে যুদ্ধকালীন সময়ের দলিল, নাতক প্রচার-পুস্তিকা ও ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সুসংহতভাবে দেখানাে সম্ভব কি না?
লেখক তা বেশ জোরালােভাবেই দেখাতে পেরেছেন বলা যায়। আর তা এমন একটা ক্ষেত্র উন্মােচন, যা দেশের জাতীয়তাবাদী সেকুলার বয়ানের ঐতিহাসিক অসারতার বাইরে এসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পুনরায় পাঠ করার নতুন প্যারাডাইম তৈরি করতে সক্ষম।
আজকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাকে যেভাবে প্রচার করা হয় তাতে মনে হয় যেন আমাদের জীবন-যাপনের জন্য ধর্ম এক প্রকার বোঝা। অথবা ধর্ম হচ্ছে কিছু নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান সর্বস্ব মতবাদ ছাড়া আর কিছুই না। কিন্তু বাংলাদেশের জন্ম যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তার আনুষ্ঠানিকতায় আর দলিলপত্রে ইসলামী আদব-লেহাজ-পরিভাষা যে পরিমাণে ব্যবহার করা হয়েছিল তা দেখলে স্বকৃত নোমান গংরা একশ বার মাটিতে আছাড় খাবে। 'মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম' বইটিতে পিনাকী ভট্টাচার্য এগুলোর দলিল সংকলন করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে এসকল পরিভাষার ব্যবহার বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভারতের সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়ার কারণে এই অতীত স্মৃতিগুলো অনেকাংশেই ম্লান হয়ে গিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সেই ম্লান হয়ে যাওয়া বয়ানের স্মৃতিগুলোকেই পিনাকী ভট্টাচার্য তার এই বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন। পরিশিষ্টে গৌতম দাসের লেখাটা বইটাকে পূর্ণতা দান করেছে। যারা এই বইটা নতুন পড়বেন তাদের জন্য পরামর্শ থাকবে পরিশিষ্ট অংশটা আগে পড়ার জন্য।
তবে বইটা আমার জন্য সুখপাঠ্য ছিল না। মাঝেমধ্যে একটা লাইন বোঝার জন্য দুই-তিনবার করে পড়তে হয়েছে। টেক্সট ফরম্যাটিং-এও তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় নি। ক্যারেকটার স্পেসিং অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল; কোথাও কম, কোথাও বেশি। সেই সাথে প্যারাগ্রাফের ইনডেন্টেশনেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ তারতম্য ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা যে চিঠিগুলো অন্তর্ভূক্ত হয়েছে সেগুলোকে লেখা হয়েছে ইটালিক হরফে যা দৃষ্টিকটু লাগছিল। অর্থাৎ সম্পাদনায় তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্সের থেকে এরকমটা আশা করিনি।
দীর্ঘ সময় ব্যাপী আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ইসলামিক কনসেপ্ট অনুপস্থিত।তাহলে কি মুক্তিযুদ্ধে ইসলামের কোন ভূমিকা ছিল না?অবশ্যই ছিল।সেটা কেন কীভাবে ইসলাম আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে জড়িয়ে আছে তারই ব্যাখা খুব চমৎকার ও শৈল্পিক বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন লেখক।বইয়ের প্রতিটি লাইনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে প্রতি পৃষ্ঠার শেষাংশে রেফারেন্সও দেয়া হয়েছে পাঠকের বোধগম্যের জন্য। সর্বোপরি বইটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় চেতনা ও ধর্মীয় আদর্শ, মূল্যবোধের এক নীরব সাক্ষী। লেখক পিনাকীদাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম একটা বইয়ের জন্য।❤️
মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম" বইটিতে দেশের আলেম সমাজের যে অংশ আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে ছিলেন তাদের নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। নানা প্রমান আর তথ্য উপাত্তের উপর নির্ভর করে বইটি সাজানো। তবে বইটিতে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং হলো রাজাকারদের নিয়ে আলোচনাটা। অধিকাংশ মানুষ কেন রাজাকার হয়েছে তার সুন্দর একটা বিবরণ আছে বইটিতে। একই সাথে বর্তমান রাজনীতি নিয়ে যারা সচেতন তারা শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হককে নিয়ে কিছু সুন্দর তথ্য পাবেন। 😉 আগে থেকে বলে দিলাম না। কখনো বইটি পড়লে তা জানতে পারবেন। . বইটি পড়লে চিন্তা করার মত কি পাবেন তা বলতে পারলাম না। তবে নতুন কিছু বিষয় অবশ্যই জানতে পারবেন
লেখক এই বইয়ে অসাধারণ ভাবে দলিল প্রমাণ সহকারে মুক্তিযুদ্ধ যে কোন ইসলাম বনাম "সেক্যুলারিজম " এর লড়াই ছিল না তা প্রমাণ করেছেন। তবে বই টি দৈর্ঘ্যে আরো বড় হলে ভাল হত।
বইয়ের অনেক বিষয় নিয়ে আপত্তি থাকলেও ভিন্ন বয়ানে মুক্তিযুদ্ধকে দেখার একটা প্রয়াস বইটা। আর বিশেষ পরে বইয়ের শেষে যুক্ত করে দেয়া গৌতম দাসের প্রবন্ধটা।
বিশ্লেষনধর্মীভাবে বইটিতে যেভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে ইসলামের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাথে ইসলামের এমন গভীর সম্পর্ক কোন লেখক তুলে ধরেননি।