চিত্রশিল্পী ঈশানের কাছে বারবার ফিরে আসে একটি প্রশ্ন। ‘তুমি কি ছবি আঁকতে পারো?’ ক্লাসমেট শ্রীদর্শিনীর সঙ্গে কয়েক বছর লিভ-ইন। তারপর ছাড়াছাড়ি। ঈশানের একলা জীবনে বারবার আসে বিভিন্ন নারী। ওড়না, তটিনীদের মধ্যে কী খোঁজে ঈশান? শ্রী-র সঙ্গে কি আর কোনওদিনই দেখা হবে না তার ? ওদিকে পামেলা আর অনিমেষের ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক জোড়া লাগবে, না কি আরও ভয়ংকর পরিণতি হবে সেই সম্পর্কের ? অটোচালক সাটু টিকলিকে ভালবাসে কিন্তু বিয়ে করতে চায় না। যে-কোনও একটি সুন্দরী মেয়েকে খুন করার জন্য সে পাগল। চিত্রশিল্পী ঈশান আর অটোচালক সাটু, এই দুই মেরুর দু’টি পুরুষের মাঝে আসা যাওয়া করতে থাকে অনেক ঘটনা, অনেক চরিত্র। ‘এইসব আসা যাওয়া’ উপন্যাসে অফুরান জীবনের কোলাজ।
বিনোদ ঘোষাল-এর জন্ম ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ হুগলি জেলার কোন্নগরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। মফস্সলের মাঠঘাট, পুকুর জঙ্গল আর বন্ধুদের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর অভিনয়ের দিকে ঝোঁক। গ্রুপ থিয়েটারের কর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। কর্মজীবন বিচিত্র। কখনও চায়ের গোডাউনের সুপারভাইজার, শিল্পপতির বাড়ির বাজারসরকার, কেয়ারটেকার বা বড়বাজারের গদিতে বসে হিসাবরক্ষক। কখনও প্রাইভেট টিউটর। বর্তমানে একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত। নিয়মিত লেখালেখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ২০০৩ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প। বৃহত্তর পাঠকের নজর কেড়েছিল। বাংলা ভাষায় প্রথম সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার প্রাপক। ২০১৪ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার। তাঁর একাধিক ছোটগল্পের নাট্যরূপ মঞ্চস্থ হয়েছে।
দিনের দ্বিতীয় বই।চরিত্রগুলোর সোজাসুজি কথা বলার ও চিন্তা করার ক্ষমতা দেখে ভালো লেগেছে।প্রথাগত পরিসমাপ্তি না থাকার বিষয়টাও সাধুবাদযোগ্য। (১৫ অক্টোবর,২০২১)
তনহা তো আমরা সবাই। কেউ এলে সব ভরে ওঠে ঠিকই কিন্তু আসল আমি, একাই। নিজেকে ব্যস্ত রাখা সবার সঙ্গে , কিন্তু হৃদয়ের একাকীত্ব - সে তো থেকেই যায়। আজীবন খুঁজে ফেরা ঠিক কী চাই, কাকে চাই, কিসে আমার -আমি তৃপ্ত আর কিসে নয়! হাতড়ে বেড়ানো অনবরত নিজেকে অন্যের আলিঙ্গনে, আদিমতায় আর পালিয়ে বেড়ানো একাকীত্ব আর একঘেয়েমি থেকে। কিন্তু এই সব আসা যাওয়ার মাঝে ফিকে হয়ে যায় সম্পর্কগুলো, মূল্যহীন মানবিকতা মেকি হয়, আর নগ্নরূপে ধরা পড়ে । তখন ভেঙে ছড়িয়ে পড়া ভালোবাসা, আর হারিয়ে যাওয়া মুগ্ধতা দুই-ই কুড়িয়ে জড়ো করা যায়না। অভিমান তখন জীবনের থেকে বড় হয়ে এসে দাঁড়ায়। "মানুষের কোনো গন্তব্য নেই, যাকে আমরা রাস্তা ভাবি সে আসলে আমাদের দ্বিধা।"
সাহিত্যিক বিনোদ ঘোষালের প্রেমের উপন্যাস সব সময় অন্য মাত্রার হয়। প্রেম তাঁর কাছে কোনো বাঁধাধরা নিয়মে, সামাজিকতার দোহাইতে , নারী পুরুষের হরমোনের কারিকুরিতে হয়না। তাঁর চরিত্ররা সাহসী, সাবলীল , সনাতনী যৌনতার শুচিবায়ুতার ঊর্ধ্বে এবং গতানুগতিক নিয়ম বহির্ভূত। "এইসব আসা যাওয়া" তাঁর মনস্তাত্বিক প্রেমের উপন্যাস। এই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রের শেড যেমন আলাদা, প্রতিটি চরিত্রও সমান আকর্ষণীয়। আর সেগুলোকে তিনি উপস্থাপনও করেছেন খুব সাধারণ করে।
এই উপন্যাস একদিকে যেমন আবর্তিত হয় ঈশান ওড়না, তটিনী, অনিমেষ, রায়ানকে ঘিরে , অন্যদিকে উপন্যাসে তেমন সাটু আর টিকলি আসে জীবনের অন্য রঙ মেখে , তাই চরিত্রের কোলাজে ভরে ওঠে উপন্যাস।
শিল্পী ঈশানের তুলিতে হাজারো রঙ, সে মুখ্য চরিত্র, তার চরিত্রের গভীরতাও বেশি। কিন্তু কোথাও সে নিজের আবেগের কাছে পরাভূত, শরীরের আকর্ষণ শেষ হয় যেখানে, সেখানে শুরু হয় তার মনের ক্ষুধা । আর তখন তার চরিত্রের নতুন দিক পাঠকের সামনে আসে, প্রেমিক পুরুষ ঈশান তখন উপন্যাস জুড়ে । আসামের প্রকৃতির মাঝে এসে যখন দাঁড়ায় আর একটি আকর্ষণীয় চরিত্র ওড়না, তখন লেখক নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর নারীর সৌন্দর্যকে এক জায়গায় এনে রাখেন। নরম কোমল ওড়না এখানে মানবমনের প্রেমের প্রতীক, দ্বাদশীর চাঁদের মত তার শরীরের আলো । বড় পেলব চরিত্র ওড়না, তাকে খুব যত্ন করে এঁকেছেন লেখক। ভালোবাসার অভিমানের ভারে হারিয়ে যায় শ্রীদর্শিনী বা জীবন ফেলে এগিয়ে যায় পামেলা। আযৌবন নারীহৃদয়ে আর শরীরে হারিয়ে যাওয়া ঈশানও উদভ্রান্ত হয়ে থাকে নিজেকে খুঁজতে, নিজেকে এই অন্বেষণ তো মানুষের আজন্মের, চিরকালীন।
অন্যদিকে সুন্দরী মায়ের ব্যভিচারিতা শান্তুকে সাটু বানিয়ে দেয় , সে সারা জীবন তাই যাপন করে বিদ্বেষ,অস্থিরতা ও সৌন্দর্যের প্রতি বিরূপতা । তার হৃদয় জুড়ে শুধুই তিক্ততা । টিকলির অসৌন্দর্য্য এখানে বাহ্যিক, কিন্তু হৃদয়ের সৌন্দর্য তাকে রূপবতী করে তুলেছে। তাই কুরূপা টিকলির অন্তর সৌন্দর্য সাটুকে নতুন করে আবার জীবনমুখী করে তোলে, জীবনের সদর্থক দিক আর একবার পাঠকের সামনে আনেন লেখক। তটিনী নিজের নামের মতই উছ্বল বেগবতী । ক্ষনিকের আবেগ আর উছ্বাসে সে স্রোতস্বিনী হয় বটে কিন্তু সম্পর্কের আসা যাওয়ার পথে সেও পরাজিত ক্লান্ত পথিকমাত্র। তটিনী আর সাটুর মুখোমুখি দৃশ্য পাঠকের হৃদস্পন্দনকে বাড়িয়ে দেয়,.....কীভাবে? সে তো উপন্যাস পড়েই জানতে হবে। আর একজনের নীরব উপস্থিতি এই উপন্যাস জুড়ে, সে হলো ঈশানের বাড়ির পাশের অর্জুনগাছ, তাকে ঘিরে সে এক অন্য ঘটনার স্রোত.."।
উপন্যাস জুড়ে যে ভালোবাসার ফল্গুধারা তা গল্পের গতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। নরম রোদ্দুরের মত ভালোবাসা ইতিউতি ছড়িয়ে থাকে উপন্যাস জুড়ে। প্রেমের আসা যাওয়া, সম্পর্কের আসা যাওয়া, আবেগের আসা যাওয়ার মধ্যে দিয়ে উপন্যাস শেষ হয়, কিন্তু ততক্ষণে আমি এই চরিত্রগুলির আশে পাশে স্বছন্দ বিচরণ করছি। লেখকের গল্প সব সময় চোখের সামনে ঘটনা আর চরিত্রদের নিয়ে এসে দাঁড় করায়। গল্পের পাতা থেকে উঠে আসা চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে মনের দোসরও হয়ে যায়। উপন্যাসের শেষে লেখক বরাবরের মত অপ্রত্যাশিত চমক রেখেছেন, যা তাঁর একান্ত নিজস্ব সিগনেচার স্টেটমেন্ট।