ছোট একটা নাটক অথচ কি সুন্দরভাবেই না প্রতীক, রূপক আর সংকেতের মাধ্যমে আধুনিক জীবনের সমস্যাকে তুলে ধরেছেন নাট্যকার! যক্ষপুরীর কাহিনী হয়েও তাই নাটকটি বর্তমান ধনতান্ত্রিক যন্ত্রসভ্যতার প্রতিটা দেশের কাহিনী, যন্ত্রের উপর প্রকৃতির জয়ের অনবদ্য আখ্যান।
যক্ষপুরীকে নাট্যকার এমন এক দেশরূপে এঁকেছেন যেখানে মানুষ শুধু কাজ আর যন্ত্রের পিছনেই ছোটে, রাজা সোনার তাল দিয়ে ঘর ভর্তি করেন, শ্রমিকরা সারাদিন কাজের পর সন্ধ্যায় মদের নেশায় ডুবে থাকে। তাদের জীবনে অবকাশ নেই, আনন্দ নেই, আকাশ দেখার ফুসরত নেই, ফুল-ফল-প্রকৃতির রূপ তাদের অচেনা। যেখানে মানুষ নিজ নামে নয় বরং পরিচিত হয় তার সংখ্যা বা পদবি দ্বারা, যেখানে রাজার কথাই শেষ কথা, রাজা যেখানে মানুষকে ছেঁকে খনির কাজের উপযুক্ত করে। সেখানে রাজার লোভের কোনো শেষ নেই, তাইতো প্রজাদের মতো রাজাও বঞ্চিত প্রকৃতি থেকে, যন্ত্র দ্বারা চালিত সে, লোভ দ্বারা বদ্ধ সে। বেশিরভাগ শ্রমিক বাধ্য হয়ে সেখানে কাজ করলেও অনেকে আছে যারা সোনার লোভেও সেখানে কাজ করে, রাজার আছে ‘মাথা কেনা' অধ্যাপকের দল যারা মানুষকে বানিয়ে তোলে যন্ত্রের দাস, আছে যাজকবাহিনী যারা ধর্মের নামে মানুষকে রাখে পদানত। কিন্তু একদিন সেখানে আসে নন্দিনী, আসে প্রেম নিয়ে, ভালোবাসা নিয়ে, প্রকৃতির রূপ নিয়ে, তার কানে-গলায় রক্তকরবী ফুল সবাইকে মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির কথা। আর আছে রঞ্জন, যারা একত্রে সকল অনিয়মকে অস্বীকার করে, মানুষকে যন্ত্রের পরিবর্তে প্রকৃতির গান শোনায়। তাইতো একসময় রাজাও পরিবর্তিত হয় কিন্তু সর্দারের দলের তাহলে তো বিস্তর ক্ষতি, তাইতো শুরু হয় যন্ত্র আর প্রকৃতির লড়াই।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে লেখা এই নাটকটিতে নাট্যকারের সমাজ ও প্রকৃতি ভাবনা স্পষ্ট হয়। তিনি দেখান বর্তমান কারখানা জীবনের বদ্ধ মানবজীবনকে, দেখান লোভী রাজাকে যারা লোভের বশবর্তী হয়ে মনুষ্যত্ব হারিয়ে রূপান্তরিত হয় একেকটা যন্ত্রে। কিন্তু লেখক আশাবাদী ,তাইতো তিনি সৃষ্টি করেন নন্দিনী চরিত্রটি যে হাজির হয় প্রেম, প্রাণ ও প্রকৃতিকে নিয়ে যার মাধ্যমে স্বয়ং যন্ত্র সভ্যতার ধারক লোভী রাজাকে নিয়ে আসেন প্রকৃতির পথে। কিন্তু তিনি যে যন্ত্রের বিরোধী নয় বরং যন্ত্রের মানুষের প্রভু হওয়ার বিরোধী তাও স্পষ্ট হয় নন্দিনী আর রাজার কথায় তাইতো নন্দিনী রাজাকে শুধু পৃথিবীর বুক চিরে খনিজ সম্পদ তুলে পৃথিবীর অভিসম্পাত নেওয়ার পরিবর্তে পরামর্শ দেয় পৃথিবীর বুক থেকে পৃথিবীর দান ফসল ফলাতে। মোটকথা রবীন্দ্রনাথ নাটকটিতে প্রতীক ও রূপকের সাহায্যে একদিকে যেমন বর্তমান সভ্যতার এক অন্ধকার দিক তুলে ধরেন ঠিক তেমনি রক্তকরবীর মাধ্যমে অপরাজেয় প্রেম ও প্রাণের জয়ও ঘোষণা করেন।