এ টেল অব টু সিটিজ (A Tale of Two Cities) ইংরেজ ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্সের লেখা একটি উপন্যাস। ফরাসি বিপ্লবের পটভূমিকায় রচিত এই উপন্যাসে নাম ভূমিকায় লন্ডন ও প্যারিস শহরকে চিত্রায়িত করা হয়েছে। এছাড়াও উপন্যাসটিতে ফরাসি বিপ্লব শুরুর সময়ে ফ্রান্সের চাষিদের দুর্দশার কথা, বিপ্লবের প্রথম বছরগুলোয় বিপ্লবীদের নিষ্ঠুরতা এবং একই সময়ে লন্ডনের জীবনের সঙ্গে নানা পার্থক্যের কথা তুলে ধরা হয়। মূলত এ সময় কিছু মানুষের জীবনকেই এ উপন্যাসের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। অনেকে বলে থাকেন, উপন্যাসটিতে চার্লস ডিকেন্সের ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ঘটনার প্রতিচ্ছবি রয়েছে। ৪৫ অধ্যায়ের এ উপন্যাসটি ১৮৫৯ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ৩১ সপ্তাহ ধরে প্রকাশিত হয়। অতি জনপ্রিয় এই উপন্যাসের কাহিনীকে ভিত্তি করে এ পর্যন্ত তৈরি হয়েছে সিনেমা। বহুবার এটি প্রচারিত হয়েছে রেডিওতে এবং টেলিভিশনে। বানানো হয়েছে অনেক নাটক। এমনকি ১৯৫৭ সালে মঞ্চনাটক হিসেবেও উপন্যাসটির কাহিনী পরিবেশিত হয়েছিল। এ পর্যন্ত ‘এ টেল অব টু সিটিজ’ বিক্রি হয়েছে দুইশ’ মিলিয়নেরও বেশি কপি।সারা পৃথিবীতে অনুবাদ হয়েছে পঞ্চাশেরও বেশি ভাষায়
বাংলা ভাষায় অনুদিত বিশ্ব বিখ্যাত গল্পের জন্য anubad লিখে সার্চ করুন।
বিপ্লব পরবর্তী উন্মত্ততা কতোটা ভয়ংকর হতে পারে সেটা সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে এ বইয়ে। আর সে সময়টাতে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের অবস্থাও চমৎকারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
চিরযুগের অভিযাত্রায়, সময়ের অবিরাম স্রোতে পৃথিবী ফেলে যায় তার নীরব, জড় স্মরণিকা। ধূলিমাখা মরুভূমির বিস্মৃত পদচিহ্নের নিচে লুকিয়ে থাকে অগণিত প্রাণের নিঃশব্দ গান, হারিয়ে যাওয়া আশা, নিভে যাওয়া প্রতিটি জীবনের ক্ষীণ আলোর প্রতিধ্বনি। সময় তাদের সবকিছুকে গ্রাস করে নিলেও, অস্তিত্বের গোপন প্রার্থনার কোন এক কোণে নিঃসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকে যেন এক টুকরো অপেক্ষা। অস্তিত্ব রক্ষার দীর্ঘ মিছিলে, রক্তের তরঙ্গে ভেসে আসে কোনো অচেনা মানুষের ক্ষীণ হাসি। সেই হাসিতে রয়েছে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও বেঁচে থাকার অনমনীয় জেদ। চার্লস ডিকেন্সের “এ টেল অব টু সিটিজ” সেই নীরব, ক্ষয়িষ্ণু ইতিহাসের মধ্য দিয়ে এর প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দুঃখ ও আবেগ দিয়ে পাঠকের অন্তর এমন ভাবে স্পর্শ করেছে, যেন তাদের সঙ্গে আমিও সময়ের স্রোতে ভেসে গিয়েছি।
উপন্যাসের সূচনায় ডিকেন্স যেন উন্মোচন করেছেন সময়ের গোপন প্রস্তাবনা। তাঁর সেই কালজয়ী পঙ্ক্তির মাধ্যমে-------
“It was the best of times, it was the worst of times, it was the age of wisdom, it was the age of foolishness, it was the epoch of belief, it was the epoch of incredulity, it was the season of Light, it was the season of Darkness, it was the spring of hope, it was the winter of despair…”
এই বৈপরীত্যই যেন মানবজীবনের প্রকৃত ছন্দ, যেখানেই আলো, সেখানেই ছায়া। যেখানেই উন্মেষ, সেখানেই বিনাশ। এই লাইন গুলো প্রতিধ্বনিত হয়েছে, ইতিহাসের ধূলিঝড়ে মরুর গহিনে হঠাৎ উঠে আসা এক অদৃশ্য বাতাসের মতো, যা পাঠককে প্রথম পৃষ্ঠাতেই আলো ও অন্ধকারের দ্বৈত সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
ভাবতে পারেন? একজন বাবার চোখের সামনে তার ছেলেকে গাড়ির চাকার নিচে পিষে ফেলা হলো! আর সেই অসহায় শোকের মুহূর্তে তার মুখের ওপর ছুঁড়ে দেওয়া হলো অর্থের ঝনঝনে অবমাননা? এমন দৃশ্য কতটা নির্মম, না শুধু নির্মমই নয় এ যেন মানবসভ্যতার আত্মায় দগ্ধ হয়ে থাকা চিহ্নের মতো।
চলুন এই বিস্মৃত ইতিহাসের পর্দা সরিয়ে এবার খুলে বলি আমার পাঠযাত্রার গল্প। ডিকেন্সের এই মহাকাব্যিক উপন্যাস আমার মনকে কোন অজানা স্রোতে ভাসিয়ে নিয়েছিল… .
❍ ফ্ল্যাপ:
বইটির প্রেক্ষাপট হিসেবে লন্ডন ও প্যারিস এই দুই শহরকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যার একদিকে সময় ধীর নদীর মতো প্রবাহিত হচ্ছিল আর অন্যদিকে ইতিহাস জ্বলে ওঠেছিল শ্বাসরুদ্ধ মুহূর্তের অগ্নি শিখার মতো। ঠিক যেন দুটি ভিন্ন জগতের এক অনবদ্য প্রতিবিম্ব। এই অস্থির, রক্তাক্ত আর তুমুল সময়কে অবলম্বন করেই চার্লস ডিকেন্স রচনা করেছেন তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস এ টেল অব টু সিটিজ। যেখানে তিনি শুধু বিপ্লব পূর্ব ফ্রান্সের অন্ধকারই তুলে ধরেননি, দেখিয়েছেন লুসি ম্যানেটের কোমলতা, সিডনি কার্টনের ত্যাগ, ডেফার্জদের সংগ্রাম আর মার্কুইসের নিষ্ঠুরতার বাস্তবিকতা। প্রতিটা চরিত্রই গল্পকে দিয়েছে অনন্য সুর।
গল্পের শুরুটা হয় লুসি ম্যানেটের মাধ্যমে, তার বাবা ডক্টর আলেকজান্দ্র ম্যানেটকে ফিরে পাবার ঘটনার মধ্য দিয়ে। ডক্টর ম্যানেট রাজদ্রোহের অভিযোগে দীর্ঘ ১৮ বছর কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গে বন্দী ছিলেন। অতিরিক্ত নিপীড়ন এবং দীর্ঘ কারাবাস ভেঙে দিয়েছিল ম্যানেটকে। স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল তার, নিজের কন্যাকেও চেনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল সে। এই মিলন, ব্যথা আর দীর্ঘ প্রত্যাশার সংমিশ্রণ, গল্পের প্রথম আলোকে উদ্ভাসিত করে।
ঘটনাক্রমে লুসির জীবনে প্রেম ও আত্মত্যাগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভাব হয় চার্লস ডারনে এবং সিডনি কার্টন নামের দুই পুরুষের। ডারনে ছিল একজন ফরাসি অভিজাত, যে তার পরিবারের নিষ্ঠুর অতীত ত্যাগ করে লন্ডনে নতুন জীবন শুরু করতে চেয়েছিল। প্রেমের আবেশে সে লুসির প্রতি আকৃষ্ট তো হয় কিন্তু বিপ্লবের রক্তঝরা প্যারিস তার ভেতরের দ্বন্দ্বকে জটিল করে তোলে। অপরদিকে, সিডনি কার্টন এক প্রতিভাবান আত্ম-ধ্বংসী আইনজীবী। যে নিজের জীবনের উদ্দেশ্যহীনতা থেকে বেরিয়ে আসে লুসির প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মাধ্যমে। মানুষ ঠিক কত দূর অবধি যেতে পারে ভালোবাসার জন্য আর কোন বিন্দুতে গিয়ে তার ত্যাগ ইতিহাসকেও ছাপিয়ে অমর হয়ে ওঠে তা নিয়ে কারও মনে সংশয় উঠলে তার কার্টনকে পড়া উচিত।
এ টেল অব টু সিটিজ একটি এমন গল্প যা ত্যাগ, প্রেম ও মানবিকতার মিলনে পাঠককে নিঃশব্দে মুগ্ধ করবে। এই আবেগের যাত্রা অনুভব করতে হলে পাঠককে বইটি খুলতে হবে নিজের হাতে।
.
❍ পাঠ পর্যালোচনা:
যদি ইতিহাসের সবচেয়ে দহনময় সময়কে মানুষ আর সম্পর্কের আলোক ছায়ায় মাপা যায়, তবে এ টেল অব টু সিটিজ নিঃসন্দেহে সেই মাপজোকের নির্মমতম উপন্যাসগুলোর অগ্রভাগেই থাকবে। এই উপন্যাসে ডিকেন্স যেন বিপ্লবের স্ফীত ঢেউ ও মানুষের অন্তরের স্পন্দনকে একই সুরে বেঁধে দিয়েছেন। যেখানে রক্তপাত ও মানবিকতা পাশাপাশি নিঃশ্বাস নিয়েছে।
মানবসভ্যতার দীর্ঘ অভিযাত্রায় হাতে গোনা বিপ্লবগুলোর মধ্যে ফরাসি বিপ্লব সেই যুগসন্ধিক্ষণ যেখানে স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শিখা এই ত্রিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সভ্যতার মানচিত্র ও মানুষের অহংকার দুটোই পুনর্লিখিত হয়েছে। ষোড়শ লুইয়ের আমলের ফ্রান্স ছিল তখন গভীর বৈষম্যের আঁধারে নিমজ্জিত এক ক্লান্ত ইউরোপীয় সাম্রাজ্য। যেখানে আভিজাত্যের দীপশিখার নিচে লক্ষ মানুষের দুঃখ আর ক্ষুধা নিভু নিভু শিখার মতো কেঁপে কেঁপে জ্বলত।
অপমানের ভার আর অজস্র শোষণের ঢেউ যখন বুকে আঘাত হানে, মানুষ তখন আর নতজানু হয়ে থাকে না। সময়ের গহ্বরে প্রতিধ্বনি হয়, ক্ষুধা যতবারই মানুষের গভীরে দগ্ধ করেছে, ততবারই সে ভয়কে পিষে মুক্তির পথে হাঁটতে শিখেছে। সেদিন ফরাসি জনতা বাস্তিলের পাথরের পাশাপাশি নিজেদের দীর্ঘ নিঃশব্দতার শৃঙ্খলও ভেঙেছিল। গিলোটিন হয়ে উঠেছিল প্রতিশোধ, ন্যায় আর কখনও কখনও অন্ধ ক্রোধের চরম মুখপাত্র।
এই তুমুল, রক্তাক্ত,অস্থির সময়কে অবলম্বন করেই চার্লস ডিকেন্স রচনা করেছেন তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসটি। বলা হয়ে থাকে, চার্লস ডিকেন্স তার নিজের জীবনের কিছু ঘটনা ও এই উপন্যাসে সংযুক্ত করেছেন। ইউরোপের সেই উত্তাল সময়ে যখন প্রত্যেক দিনের ভাঙন, সংশয়, নতুন আদর্শের লড়াই ও ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের আর্তনাদ ইতিহাসের প্রতিটি খণ্ডে লিখিত হচ্ছিল চার্লস ডিকেন্স যেন কাছ থেকে দেখে দেখে, হৃদয়ে ছুঁয়ে এই উপন্যাস সেখান থেকে রচনা করেছেন। তিনি শুধু বিপ্লব-পূর্ব ফ্রান্সের অন্ধকারই তুলে ধরেননি, ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পের চরিত্রগুলোকেও। যাদের জীবনের স্পন্দন, দুঃখ ও আশা পাঠকের হৃদয়ে সরাসরি এমন ভাবে বেজেছে যেন তাদের ছোঁয়া মাত্রই আমরা তাদের অন্তরঙ্গতায় প্রবেশ করি। বিপ্লব পরবর্তী সমাজের নানা টানাপোড়েন তথা ফ্রান্স ও ই��ল্যান্ডের রাজনৈতিক চিত্র, সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের অন্তর্গত ভয় ও স্বপ্নকে এক অনন্য সাহিত্যরূপে বন্দী করেছেন লেখক।
ডিকেন্সের শৈল্পিক ক্ষমতা অসাধারণ। তিনি একাধিক ঘটনাকে সহজভাবে একত্রিত করে সামাজিক অন্যায়, শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব চিত্রায়ন করেছেন অসাধারণ দক্ষতার সাথে। বাস্তিল দুর্গ, গিলোটিনের ভয়, প্যারিসের রাস্তায় উত্তাল জনতার অবস্থা সবকিছুই চোখের সামনে ফুটে উঠেছে অত্যন্ত সুচারুভাবে। তবে তার চরিত্রগুলোর মধ্যে ভালোবাসা ও মানবিকতা সেই অন্ধকারের মাঝেও আলো ছড়িয়েছে। তিনি ইতিহাসকে কেবল বর্ণনা না করে তার ভেতর দিয়ে খুঁড়ে বের করেছেন মানুষের আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ। .
▪️রিভিউয়ের এ পর্যায়ে এসে গতানুগতিক প্যাটার্নের বাইরে গিয়ে গল্পে আমর হৃদয় স্পর্শ করা একটা মুহূর্তের অবতারণা করার ইচ্ছেকে দমিয়ে রাখতে পারছিনা। অনেকে হয়তো গল্পটা পড়েছেন, অনেকে হয়তো পড়বেন জানিনা স্পয়লার হচ্ছে কিনা। শুধু জানি এই অংশের ঘোর থেকে আমার পাঠক সত্তা কখনো বের হতে পারবেনা। আমার এখনও মনে হয় আমার হৃদয়ের একটা অংশ সেখানে মিশে গিয়েছে, রয়ে গিয়েছে সে মুহূর্তটিতে…
▫️কার্টনের শেষ প্রহর:
পরদিন সকালে, প্যারিসের রাস্তাগুলো জনতায় ভরে ওঠে। সেদিন ৫২ জন বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার কথা। ছয়টি গাড়িতে করে তাদের গিলোটিনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কার্টন সেই মেয়েটির সঙ্গে তৃতীয় গাড়িতে ওঠে। এখনো মেয়েটি তার হাত শক্ত করে ধরে আছে। তরুণী সেই মেয়েটি আশা করে, এই নতুন প্রজাতন্ত্র দরিদ্রদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে। সে স্বপ্ন দেখে, তার ভাই/বোন অনেকদিন বাঁচবে ও ভালো জীবন পাবে। সে এও ভাবে, স্বর্গে কার্টনের এর জন্য তার অপেক্ষার সময়টা, কি অনেক দীর্ঘ মনে হবে? জবাবে কার্টন কোমলভাবে উত্তর দেয়, “সেখানে সময়ের কোন বেড়াজাল নেই আর দুঃখও নেই।” প্রথম গাড়ি থেকে কয়েদি নামানো শুরু হল। আলখেল্লা পরা জল্লাদরা তৈরি। প্রথম বন্দিকে নেওয়া হল গিলোটিনে। বিদ্যুদ্বেগে নেমে এল চকচকে ফলাটা। 'ঘ্যাঁচ!' গড়িয়ে পড়ল একটা মাথা। উপস্থিত মহিলারা গুনল, 'এক।' 'ঘ্যাঁচ!' মহিলারা গুনল, 'দুই।' এরপর শুধু ঘ্যাঁচ! ঘ্যাঁচ! ঘ্যাঁচ! উল বুনতে বুনতে গুনে চলেছে মহিলারা, 'তিন... চার... পাঁচ..... প্রথম গাড়ি শেষ। দেখতে দেখতে দ্বিতীয় গাড়িও। এবার পালা তৃতীয় গাড়ির। কারটন নামল গাড়ি থেকে। পেছনে সেই মেয়েটাও। এখনো সে হাত ধরে রয়েছে কার্টনের। মেয়েটাকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাল কার্টন। যাতে তরুণী মেয়েটি পেছনে গিলোটিনের বীভৎস দৃশ্য দেখতে না পারে। 'একটুও ভয় করছে না আমার', বলল মেয়েটা। 'মনে হচ্ছে তুমি যেন অমরলোক হতে নেমে এসেছ আমাকে নিয়ে যেতে। তোমার হাত ধরে আছি বলে একটুও ভয় করছে না আমার।' 'তোমার সময় এলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে শুধু', বলল কার্টন। 'অন্য কোনো দিকে তাকিয়ো না। অন্য কারো কথা ভেবো না। চোখের পলকে শেষ হয়ে যাবে সব।' 'ওরা তাড়াতাড়ি করবে তো?' 'হ্যাঁ। তুমি কিছু টেরই পাবে না।' অবশেষে কাঁধে একটা হাতের ছোঁয়া পেয়ে চমকে উঠল মেয়েটা। 'সময় হয়েছে?' জিজ্ঞেস করল সে। এবার আর জবাব দিল না কার্টন। মেয়েটার একটা হাত তুলে ঠোঁটে ছোঁয়াল। শেষবারের মতো দুটো আয়ত চক্ষুর দৃষ্টি মেলে তাকাল মেয়েটা। ভয়ের লেশমাত্র নেই সেই দৃষ্টিতে। আছে শুধু গভীর প্রশান্তি আর অপরিসীম প্রবল বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল সে। এগিয়ে গেল গিলোটিনের দিকে। কার্টনকে সে এখন আর দেখতে পাচ্ছে না । মনে হল, যেন অদৃশ্য এক অবয়ব তার সামনে দণ্ডায়মান। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপলক সেদিকে তাকিয়ে রইল মেয়েটা। উল বুনতে বুনতে মহিলারা গুনল 'বাইশ।' এবার কার্টনের পালা। দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেল কার্টন। ভণ্ড বিচারকদের ভাবগম্ভীর মুখ, আলখেল্লা পরা জল্লাদদের রক্তলোলুপ দৃষ্টি আর শত-সহস্র জনতার উল্লাস ছাপিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা দৃশ্য। এক মা তার সন্তানের কাছে রূপকথার গল্প বলছে। দুঃসাহসী এক বীরের গল্প। সেই বীরের নাম সিডনি কার্টন।
বিশ্বজয়ের হাসি ফুটে উঠল কারটনের মুখে। থমকে দাঁড়িয়ে অপসৃয়মাণ সুদূরের দিকে দৃষ্টি মেলে তাকাল একবার। বুক ভরে শ্বাস টানল। তারপর বীরের মতোই উঠে পড়ল বেদিতে। হঠাৎ মনে হল, ভয়ঙ্করভাবে কেঁপে উঠল পৃথিবীটা। সেইসঙ্গে সুতীব্র গর্জন করে ছুটে এল উত্তাল উদ্দাম সমুদ্রের ঢেউ। ভাসিয়ে নিয়ে গেল সবকিছু। তারপর শুধু মৃত্যু, নিথর স্তব্ধতা।
মহিলারা গুনল, 'তেইশ।'
মৃত্যুর সময় সিডনি কার্টনের বিখ্যাত উক্তিটি ছিলো,
“It is a far, far better thing that I do, than I have ever done; it is a far, far better rest that I go to than I have ever known.” .
❍ অনুবাদ নিয়ে অনুভূতি কথন:
অনবদ্য এই উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ বহু প্রকাশনীতে উন্মুক্ত হয়েছে। মূল কপিটি প্রায় ৫৮২ পৃষ্ঠার হলেও, আমি যে কয়েকটা অনুবাদ পড়েছি সেগুলো ছিল মূল উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত আকারের উপস্থাপন। বাংলা পরিমার্জিত অনুবাদ গুলো পড়ে আমি তৃপ্তি পাই নি। তাই পরে ইংরেজি উপন্যাসটাই পড়েছি। তবে আশার কথা হলো, এ বছরই সম্ভবত নিয়াজ মোর্শেদ সম্পাদিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে এই উপন্যাসের ৪৯৫ পৃষ্ঠার সংস্করণটি, যদিও সেটা পড়া হয়নি তবে পৃষ্ঠার সংখ্যা আর আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে অনুবাদ কপিটি নিয়ে আমি আশাবাদী। .
❍ প্রস্থান বিন্দু…
গিলোটিনের ছায়া যখন শহর গিলে নিচ্ছিল, তখন এককজন মানুষের ত্যাগই প্রমাণ করেছিল মানবতার আলো কখনো সম্পূর্ণ নিভে যায় না। মানব হৃদয় এক অদ্ভুত রহস্যময় জিনিস। সহিংসতার উত্তাল ঢেউ যখন সবকিছু গ্রাস করে, তখনো কোন এক কোণে নিভু নিভু হয়ে ভালোবাসার আলো জ্বলে থাকে। কার্টনের ত্যাগ সেই আলো, যা অন্ধকারের গভীরে দাঁড়িয়ে বলেছে,
মানুষ যতদিন ভালোবাসতে পারে, ততদিনই সভ্যতা বেঁচে থাকে। মানবতার প্রতি এক নিঃশব্দ আশা ডিকেন্স রেখেছেন সিডনি কার্টনের মাধ্যমে। যখন শহরের রাস্তাঘাট রক্তে ভাসছে, তখন এক মানুষের ভালোবাসা প্রমাণ করেছে, বিনাশের মাঝেও আলো জন্মায় আর নৈরাজ্যের ভিড়েও মানবিকতার জন্য কেউ না কেউ নিজের জীবন দিয়ে পথ দেখিয়ে যায়।
বৃহৎ একটা উপন্যাসের অতি সংক্ষিপ্ত উপন্যাস। অনুবাদকের মাথায় তিন চারটে কাঠাল ভাঙতে পারলে ভাল্লাগতো😒 এই অখাদ্য হনুবাদটি পড়ে স্রেফ বইটার কাহিনি জানা গেছে। ডিকেন্সের দর্শন, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ কিংবা কালজয়ী উক্তিগুলোর দেখা পাওয়া গেলো না।
চার্লস ডিকেন্সের লেখা এ টেল অফ টু সিটিজ উপন্যাসটি এ যাবৎকালের সর্বাধিক বিক্রীত উপন্যাস। ফরাসি বিপ্লব পূর্ব নৃশংসতা এবং এর পরবর্তী সামাজিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে এর পটভূমি। ফরাসি বিপ্লব পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সামন্তবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ ও নির্যাতন-নিপীরনের বিরুদ্ধ্যে ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়। তবে পটভূমির সূচি ‘সাম্য, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্বে’র আবেদন কতটুকু পূরণ হ���়েছে সেটা দেখার বিষয়। ‘এ টেল অফ টু সিটিজ’ উপন্যাসে ‘সাম্য, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্বে’র সহবস্থান ঘটে নি। যদি সহবস্থান ঘটত তবে এতো সংঘাত, হানাহানি, মারামারি ঘটত না। উপন্যাসে বিপ্লবের শুরুর সময়ে ফ্রান্সের চাষিদের দুর্দশার কথা, বিপ্লবের বছরগুলোতে বিপ্লবীদের নিষ্ঠুরতা এবং একই সময়ে লন্ডনের জীবনের সঙ্গে নানা পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। এখানে টু সিটিজ বলতে লন্ডন আর প্যারিসকে বুঝানো হয়েছে। লন্ডন থেকে প্যারিসের পথে কাহিনী শুরু। একজন ব্যাংকার কেবল তারুণ্যে পা দেওয়া একজন মেয়েকে নিয়ে লন্ডন থেকে প্যারিস গমন করে। সেখানে মেয়েটি প্রথমবারের মতো তার বাবাকে দেখতে পায়। অথচ সে এতদিন ধরে জেনে এসেছে তার বাবা বেঁচে নেই। মূল কাহিনী শুরু হয়েছে এর পর থেকেই। মেয়েটিকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের গণবিপ্লবের উপর বইটি রচণা করা হয়েছে। পটভূমির দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা শুধু মাত্র বিশৃঙ্খলা দেখতে পাবো কিন্তু এই বিশৃঙ্খলার মাঝে ভালোবাসার ছোঁয়া দিয়েছে মূল চরিত্রগুলো। শৈল্পিক ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী যার যবনিকা ঘটেছে লন্ডন ও প্যারিসে।
বিশ্বব্যাপী বইটির প্রায় ২০ কোটি কপি বিক্রির হিসাব পাওয়া যায়। For more book reviews visit my blog
I can't believe how cleverly Dickens presented the French Revolution.The rebellion,the people and the lords- all are so finely measured under a single novel so elegantly that it's sure to make you think...
বিপ্লবের নেশায় মানুষ কতটা হিংস্র হয়ে উঠতে পারে, কত নিরীহ মানুষকে মৃত্যু বরণ করতে হতে পারে, ব্যক্তিগত আক্রোশে কত নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে তার এক অসাধারণ কাহিনী।
১৭৭৫-৯০ সালের মধ্যে শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে ফরাসি বিপ্লবের সময়কার পটভূমিতে এই উপন্যাস।টু সিটিজ বলতে প্যারিস আর লন্ডনকে বুঝানো হয়েছে।বিপ্লবের সময় অনেক নিরপরাধ মানুষও যে সাজা ভোগ করে সেটা তুলে ধরা হয়েছে এই দারুণ উপন্যাসটিতে।আমার পড়া চার্লস ডিকেন্স এর প্রথম উপন্যাস এটা 💓