যে আমলে ব্যান্ড সঙ্গীত কে বলা হত অপসংস্কৃতি, বলা হত বখাটে আর ড্রাগ এডিক্টদের চিল্লাচিল্লি, সেই আমলে আমি বাংলা একাডেমীর মত ‘কুলীন সাহিত্য সমাজ’ কে রীতিমত যুদ্ধ করে বুঝিয়ে ছেড়েছিলাম যে এটি এমন এক সঙ্গীত যার ইতিহাস আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আবেগের সাথে জড়িয়ে আছে। এমন অপসংস্কৃতির জন্য ওনারা সরকারী পয়সা খরচে রাজী ছিলেন না,(তার উপরে আমার ঝুটিবাঁধা চুল আর ছেড়া জিন্সে দেখতে বখাটে হিপ্পিদের মত লাগতো) তাই ইন্টার্ভিউ বোর্ডের বিখ্যাত গুণীজনেরা অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করলেন- কি ভাবে? আমি বলেছিলাম আচ্ছা ঠিক আছে, ১৯৭১ সালের ১লা আগস্টে নিউ ইয়র্কের মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে বাংলাদেশের জন্য জর্জ হ্যরিসন, এরিক ক্লাপটন, বব ডিলান, বিলি প্রিসটন, রিংগো স্টার, ওস্তাদ আলি আকবর খান, আল্লারাখখা, লেওন রাসেল এবং রবি শঙ্কর যে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ করেছিলেন সেই ইতিহাস কে অস্বীকার করেন। গীটার নিয়ে জর্জ হ্যরিসনের হেঁড়ে গলার গান –‘বেংলাডেস বেংলাডেস’ কে অস্বীকার করেন। ওনারা বললেন- তা কি করে সম্ভব! অস্বীকার করেন মুক্তিযোদ্ধা আজম খান কে। ওনারা বললেন- তা কি করে সম্ভব! আমি বললাম তা হলে আমার এই স্বপ্নটাও সম্ভব। এরপর সরকারের টাকায় ১৯৯৭ সালে বাংলাএকাদেমি থেকেই বের হয়েছিল এই ‘অপসংস্কৃতির বই’ – বাংলাদেশে ব্যান্ড সঙ্গীত আন্দোলন। আমাদের ব্যান্ড সঙ্গিতের উপর লিখিত প্রথম এবং একমাত্র ইতিহাস গ্রন্থ। এই গ্রন্থ শুধুমাত্র ব্যন্ড সঙ্গিতের ইতিহাস নয় বরং আমি শুরু করেছিলাম বাংলা গানের আদি ইতিহাস দিয়ে, সেই খৃষ্টীয় ৮ম থেকে ১৫ শতাব্দীর চর্যাপদ থেকে। ফলে এই গ্রন্থ পড়লে ব্যন্ডের সঙ্গে সঙ্গে সংক্ষেপে বাংলাগানের আদি ইতিহাসটাও জানা হয়ে যাবে। এখন ২০ বছর পর বইটির নতুন প্রচ্ছদে ২য় সংস্করণ বের হতে যাচ্ছে প্রকাশনা সংস্থা- শব্দশৈলী থেকে। প্রথম প্রচ্ছদটা করেছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী মরহুম কাইয়ুম চৌধুরী। এবার করেছে সাজিদ শুভ। আমি ইতিহাসের প্রথম অংশটা লিখে রাখলাম, পরবর্তী অংশটা লিখবে পরের প্রজন্ম।
পয়লা বৈশাখের এক কাকডাকা ভোরে জন্ম নিয়েই দেখে, বাংলাদেশে চলছে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ফুলছড়ি, বাহাদুরাবাদ ঘাটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনির অবস্থানের ওপর যখন ইন্ডিয়ান মিগ থেকে বোমা ফেলা হচ্ছিল, তখন মুক্তিযোদ্ধা বাবার সঙ্গে বাঙ্কারে বসে শিশুটি বলছিল, 'আল্লাহ্, রক্ষা কর'—গল্পটি শিবলীর মায়ের কাছে শোনা। তখন যুদ্ধ না বুঝলেও নব্বইয়ের দশকের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের ভেতর দিয়েই তাঁর বেড়ে ওঠা। ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালেই স্বৈরশাসকের জেল জুলুম আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে চলে আসেন নাটোর থেকে ঢাকায় । অভিনয়ের উপর এক বছরের ডিপ্লোমা কোর্স শেষে গ্রুপথিয়েটার নাট্যচক্রের সঙ্গে মঞ্চনাটকে কাজ করতে করতেই ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকেন শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমে।অভিভাবকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে একদল গানপাগল তরুণ ব্যান্ড সংগীতের মাধ্যমে বাংলা গানের ধারায় যে-পরিবর্তন এনেছে, শিবলী তাদেরই অন্যতম। যুগযন্ত্রণার ক্ষ্যাপামো মজ্জাগত বলেই প্রথা ভাঙার যুদ্ধে শিবলী হয়ে ওঠেন আপাদমস্তক 'রক'। আধুনিক জীবনযন্ত্রণাগ্রস্ত তারুণ্যের ভাষাকে শিবলী উপস্থাপন করেছেন অত্যন্ত সহজসরল 'রক' এর ভাষায়। তাঁর সাফল্য এখানেই । তাই অল্প সময়ের মধ্যেই শিবলী পরিণত হয়েছেন এদেশের ব্যান্ড সংগীতজগতের কিংবদন্তি গীতিকবিতে । শিবলীর লেখা (প্রায় ৩০০) জনপ্রিয় গানের মধ্যে কয়েকটি: জেল থেকে বলছি | কথা-সুর: শিবলী, ফিলিংস /নগরবাউল তুমি আমার প্রথম সকাল | তপন চৌধুরী-শাকিলা জাফর কষ্ট পেতে ভালবাসি | আইয়ুব বাচ্চু (এলআরবি) হাসতে দেখো, গাইতে দেখো | আইয়ুব বাচ্চু কত কষ্টে আছি | জেমস পালাবে কোথায় | জেমস একজন বিবাগি | জেমস রাজকুমারী | আইয়ুব বাচ্চু হাজার বর্ষা রাত । সোলস পলাশী প্রান্তর। মাইলস কী ভাবে কাঁদাবে তুমি (যতটা মেঘ হলে বৃষ্টি নামে) | খালিদ (চাইম) আরও অনেক অনেক গান......... 'কমপ্লিট ম্যান' খ্যাত ঝুঁটিবাঁধা সেঞ্চুরি ফেব্রিকসের দুর্দান্ত সেই মডেল শিবলী ছিলেন তাঁর সময়ের ফ্যাশন-আইকন।তিনি একজন সফল নাট্যকার। বিটিভির যুগে তাঁর লেখা প্রথম সাড়া জাগানো নাটক 'তোমার চোখে দেখি'(১৯৯৫)। আরও লিখেছেন- রাজকুমারী, হাইওয়ে টু হেভেন, গুড সিটিজেন, নুরু মিয়া দ্যা পেইন্টার, যত দূরে থাকো, বৃষ্টি আমার মা,রান বেইবি রান,আন্ডারগ্রাউণ্ড,শহরের ভিতরে শহরসেকেন্ড চান্স,স্পন্দন,মিলিয়ন ডলার বেইবি,দ্যা ব্রিফকেস।নিজের লেখা নাটক 'রাজকুমারী'তে(১৯৯৭) মির্জা গালিব চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় এখনও অনেকের মনে থাকার কথা।শিবলীর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো 'ইচ্ছে হলে ছুঁতে পারি তোমার অভিমান' (১৯৯৫), 'তুমি আমার কষ্টগুলো সবুজ করে দাও না'(২০১০), মাথার উপরে যে শূন্যতা তার নাম আকাশ, বুকের ভেতরে যে শূন্যতা তার নাম দীর্ঘশ্বাস'(২০১৪)।বাংলা একাডেমী প্রকাশ করেছে তাঁর 'বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত আন্দোলন'(১৯৯৭) নামে ব্যান্ড সংগীতের ওপর লিখিত প্রথম এবং একমাত্র গবেষণাধর্মী প্রবন্ধগ্রন্থ।শিবলী'র কাহিনী সংলাপ এবং চিত্রনাট্যে ও গীতিকবিতায় প্রথম পূর্ণদৈঘ্য চলচ্চিত্র 'পদ্ম পাতার জল'(২০১৫)।শিবলী'র প্রথম এবং বেস্টসেলার উপন্যাস- দারবিশ (২০১৭)।স্বভাবজাত বোহেমিয়ান, ঘুরেছেন ইউরোপে সহ পৃথিবীর পথে পথে।।
১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বইটি শব্দশৈলী পুনঃপ্রকাশ করেছে। কিন্তু নতুন এই সংস্করণে বিগত দুই দশকের ব্যান্ডসঙ্গীতের হালচাল নিয়ে কোনো অধ্যায় করা হলো না। খুবই অপেশাদার কাজ।
বইয়ে প্রধান উদ্দেশ্য- ইনফরমেশন ডাম্প করা। অমুক ব্যান্ড অতো সালে অমুক এলবাম- অমুক গান বানিয়েছে জাতীয় তথ্যে ভরপুর। এই পাতাগুলো দাঁতে দাঁত চেপে অতিক্রম করেছি। আর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাথে বাংলাদেশের ব্যান্ডসঙ্গীতের সংযোগ ও পার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ আশা করেছিলাম। হতাশ হয়েছি।
বাংলাদেশের ব্যান্ডসঙ্গীতের শুরুর সময়কার নানা তথ্যের প্রয়োজনে বইটি ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্য কোনো ইচ্ছা বুকে নিয়ে পড়তে বসলে হতাশ হতে হবে।
ব্যান্ড সঙ্গীত কথাটা শুনলেই এক সময় পশ্চিমা সংস্কৃতির কথা মাথায় আসতো। আমাদের এখানে এটাকে অপসংস্কৃতি বলা হত। কিন্তু এই ব্যান্ড সঙ্গীতই এখন আমাদের কত আপন, কত কাছের। বাংলাদেশে এর যাত্রা স্বাধীনতার এক দশক আগে শুরু হলেও একাত্তরের পর ফুলে ফেঁপে উঠে। আর এক্ষেত্রে যে মানুষটি অবদান রাখেন তিনি গুরু আজম খান। অস্ত্র ছেড়ে গিটার তুলে নেয়া মানুষটিই আমাদেরকে ব্যান্ড সঙ্গীতের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। আস্তে আস্তে এত যোগ দিয়েছে সোলস, মাইলস, রেনেসাঁ, ফিডব্যাক এর মত ব্যান্ড। পেয়েছি বাচ্চু ও জেমস এর মত লিজেন্ড। যারা ব্যান্ডের ঊর্ধ্বে গিয়ে স্বনামে পরিচিত। পেয়েছি হেভি মেটাল ওয়ারফেজ। আস্তে আস্তে গত ২০ বছরে পেয়েছি আর্টসেল, নেমেসিস, লালন বা চিরকুট। কিন্তু শুরুতে এই যাত্রাটা এত মধুর হয়নি। কীভাবে ব্যান্ড সঙ্গীত এই পর্যায় তার বিস্তারির ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এই বইতে। শুধু তাই নয়। বাংলা সঙ্গীতের শুরু থেকে নিয়ে বর্তমান সময় অব্দি ইতিহাসও জানা যাবে।
পাঠ পতিক্রিয়া- ইদানীং পছন্দের বিষয়গুলোর ওপর লেখা নন ফিকশন পড়তে বেশ ভালো লাগছে। এটিও ভালো লেগেছে। বইটি রিপ্রিন্ট করার জন্য শব্দশৈলী কে ধন্যবাদ। যারা ব্যান্ড সঙ্গীত ভালোবাসেন তাদের জন্য অবশ্য পাঠ্য। বাংলাদেশে এরকম তথ্যবহুল ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাস নিয়ে আর কোনো বই নেই সম্ভবত।
অনেক তথ্যসমৃদ্ধ বই, যারা ব্যান্ড মিউজিক ভালবাসেন বা ফলো করেন তাঁদের সংগ্রহে রাখার মত।
শিবলী ভাই কষ্ট করেছেন অনেক, তা বোঝা যায় ইনফরমেশনগুলো দেখে।নিজে অনেক বড় গীতিকার বলে নব্বইয়ের দশকের সব বড় ব্যান্ডের শিল্পীদের সাথে তাঁর সম্পর্কও ভাল, তাঁদের কাছ থেকেও নিশ্চয় অনেক তথ্য নিয়েছেন বইয়ের জন্য।
বইতে ছবিগুলোর কোয়ালিটি বেশি ভাল না, কিছু কিছু ছবি অপ্রয়োজনীয়ও মনে হয়েছে। আমরা যারা তাঁর গানের কথার ভক্ত আমরা সবাই জানি তিনি কতটা কাছের সব বড় বড় মিউজিশিয়ানদের, এত ছবির হয়তো দরকার ছিলনা। সবচেয়ে বড় কথা ছবিগুলোর প্রিন্ট ভাল হয়নি।
আগামীতে আরো বই চাই এই বিষয়ে। আমি আশা রাখব সেই বই হবে কিছুটা স্মৃতিচারণ, আত্মজীবনী টাইপ। ব্যান্ডগুলোর ভিতরের কথা, তাঁদের স্ট্রাগল, বানিজ্যিক সাফল্য বা ব্যর্থতা এইসব টপিক নিয়ে!!
বইটা মোটেও সুলিখিত না। কেউ স্কিম করতে চাইলে করতে পারে, কিন্তু রসের জন্য তো না-ই, জ্ঞানের জন্যও এই জিনিস পাঠ করা উচিত কিনা—আমার সন্দেহ আছে। রেফারেন্সগুলো একে অন্যের সাথে ক্ল্যাশ করসে প্রচুর।
বইটি যথেষ্ট পুরনো বটে কিন্তু অনেক তথ্যবহুল। সত্যি বলতে বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক নিয়ে আমার ধারনা খুবই কম ছিলো । তবে এই বইটি পড়ার পর আখন খুব ভালো ধারনা হয়েছে। লেখক অনেক যত্ন করে সব ইনফরমেশন দিয়েছেন বইটিতে। মিউজিক লাভারদের জন্য বইটি পড়া উচিত।