হোমসনামা-য় এই প্রথমবার দুই মলাটে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে ‘শার্লক’ নামের সেই প্রতিষ্ঠানটিকে, যার আবির্ভাবের পরে পৃথিবীটা আর আগের মত ছিল না। হোমস, তাঁর স্রষ্টা, তাঁর সময়, সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সিনেমা, থিয়েটার, কমিকস, কার্টুন, বিজ্ঞাপনে হোমসের অতলান্তিক প্রভাব নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি রয়েছে হোমস গবেষণা, ভিক্টোরীয় ইংলন্ডের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, যানবাহন, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড সহ অপরাধ বিজ্ঞানের নানা অজানা কথা, অচেনা বাঁক। এক কথায় এই বই সেই মানুষটাকে গভীরভাবে চেনাবে যার সামনে দাঁড়িয়ে তাবড় তাবড় লেখক, পরিচালক, আঁকিয়ে আর গোয়েন্দারা বলতে বাধ্য হন: "গুরু, তুমি ছিলে বলেই আমরা আছি”।
সূচি – গোয়েন্দাদের আদিগুরু – প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত প্রথম অধ্যায়: ডা ডয়েল ছেলেবেলা ডাঃ জসেফ বেল ডা স্যাকার ও মি হোপ শার্লকের পূর্বসূরিরা পো-র পায়ে পায়ে ব্যর্থ গোয়েন্দা ও সফল প্রচেষ্টা হঠাৎ আলোর ঝলকানি অভিযান ও হত্যা আবার সে আসিল ফিরিয়া ফিনিক্স পাখির জীবন আতঙ্কের উপত্যকা এবং পিংকারটনরা শেষ অভিবাদন গোয়েন্দা আর্থার কোনান ডয়েল প্রেততত্ত্ব এবং হুডিনি ডয়েলের টুকিটাকি দ্বিতীয় অধ্যায়: স্বয়ং শার্লক শার্লকের জীবনযাপন অজ্ঞাতবাস, প্রেম, বৌদ্ধধর্ম ইত্যাদি ওয়াটসনের কথা বুলেটটা ঠিক কোথায় লেগেছিল? আবার ওয়াটসন ... সহযাত্রা, বিবাহ এবং স্ত্রীগণ ওয়াটসনের সালতামামি শার্লক হোমসের টুকিটাকি তৃতীয় অধ্যায়: লণ্ডন - হোমসের হোমটাউন বেকার স্ট্রিটের সেই বাড়িটা লন্ডনের পথে পথে অপরাধ বিজ্ঞান, ফরেনসিক ও শার্লক হোমসের সময়ের সমাজ চতুর্থ অধ্যায়: হোমসের দোস্ত ও দুশমন হোমস কাহিনির সিধু জ্যাঠা ও অন্যান্য অপরাধের নেপোলিয়ন ও অন্যান্য শার্লক হোমস ও স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড পঞ্চম অধ্যায়: হোমসের হরেকরকম শিল্পীর চোখে গবেষণায় প্যাস্টিশে হোমস সভা কমিক্সে কার্টুনে বিজ্ঞাপনে ডাকটিকিটে থিয়েটারে পর্দায় প্রদর্শনী, মূর্তি ইত্যাদি বাংলায় হোমস একনজরে পরিশিষ্ট: হোমসের জীবনপঞ্জি কাহিনিপঞ্জি (প্রকাশকাল অনুযায়ী) হোমসের লেখালেখি সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৮১, কলকাতা। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পি. এইচ. ডি. তে সেরা ছাত্রের স্বর্ণপদক প্রাপ্ত। নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া Bacillus sp. KM5 এর আবিষ্কারক। বর্তমানে ধান্য গবেষণা কেন্দ্র, চুঁচুড়ায় বৈজ্ঞানিক পদে কর্মরত এবং হাবড়া মৃত্তিকা পরীক্ষাগারের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জার্মানী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গবেষণাগ্রন্থ Discovering Friendly Bacteria: A Quest (২০১২)। তাঁর কমিকস ইতিবৃত্ত (২০১৫), হোমসনামা' (২০১৮),মগজাস্ত্র (২০১৮), জেমস বন্ড জমজমাট (২০১৯), তোপসের নোটবুক (২০১৯), কুড়িয়ে বাড়িয়ে (২০১৯),নোলা (২০২০), সূর্যতামসী (২০২০), আঁধার আখ্যান (২০২০) ও নীবারসপ্তক (২০২১) এই সব দিনরাত্রি (২০২২), ধন্য কলকেতা সহর (২০২২), আবার আঁধার (২০২২), অগ্নিনিরয় (২০২২), হারানো দিনের গল্প (২০২৪), সিংহদমন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪), আরও একটি প্রবন্ধ সংকলন (২০২৫) সুধীজনের প্রশংসাধন্য। সরাসরি জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ঝাঁকড়া চুলো পিটার (২০২১)। বাংলাদেশের আফসার ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ম্যাসন সিরিজের বাংলাদেশ সংস্করণ (২০২২, ২৩), মৃত্যুস্বপ্ন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪) । সম্পাদিত গ্রন্থ সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১৭, ২০১৮) ফুড কাহিনি (২০১৯), কলকাতার রাত্রি রহস্য (২০২০) সত্যজিৎ রায়ের জন্ম শতবর্ষে একাই একশো (২০২২), কলিকাতার ইতিবৃত্ত(২০২৩), বিদেশিদের চোখে বাংলা (২০২৪) এবং কলিকাতার নুকোচুরি (২০২৫)
২০১৮-র বইচই ওয়েবসাহিত্য সম্মানে ভূষিত, বাংলায় নন-ফিকশন চর্চায় জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার বিচারে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এই বইটি পড়ে ফেলেছিলাম আগেই। কিন্তু ল্যাদজনিত কারণে তার রিভিউটি পেন্ডিং ছিল। আজ সেটা পেশ করা গেল। আমার বক্তব্য নিম্নলিখিত পয়েন্ট-বাই-পয়েন্ট, 'ফ্যারা-বাই-ফ্যারা' আকারে পেশ করলাম।
প্রথমত, বাংলায় এই বই অদ্বিতীয়। শার্লক হোমসের জন্য বাঙালির ভালোবাসা যতই গভীর হোক না কেন, দ্য গ্রেট ডিটেকটিভ ও তাঁর স্রষ্টাকে নিয়ে বাংলায় এমন কোনো বই ছিল না। নানা প্রবন্ধ সংকলনে হোমসের বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে চর্চা হয়েছে। সুকুমার সেন, আনন্দ বাগচী প্রমুখের চেষ্টায় এই কলকাতা শহরে হোমসিয়ানা চর্চার জন্য একটি স্বল্পায়ু ক্লাবও জ্বলে উঠে নিভে গেছে। কিন্তু হোমসের সামগ্রিক আখ্যান ও বিস্তার নিয়ে একটিও বই ছিল না বাংলায়। আজ অবধি। এখন এই বইটির মাধ্যমে আপনি শার্লক হোমস কে, কী, কেন, কবে, কখন, কোথায়, ও কীভাবে ছিলেন, তার প্রায় সবটাই সংক্ষেপে জেনে নিতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, স্যার আর্থার কোনান ডয়েল শুধু শার্লক হোমসের স্রষ্টাই ছিলেন না, তাঁর নিজের জীবনের নানা ঘটনা নিয়েও বেস্টসেলার কাহিনির সিরিজ বানানো যায়। অথচ সেই মানুষটিকে নিয়ে বাংলায় সেভাবে চর্চা হয়নি। এক-আধটা প্রবন্ধে কিছু অনুচ্ছেদ, কোনো গল্পে (সৌভিক দাস-এর থ্রিলার "তোমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে" উল্লেখ্য) কিছু কৌতূহলোদ্দীপক লাইন, এতদিন অবধি এই ছিল আমাদের ডয়েল-চর্চার পরিধি৷ কিন্তু এই বৃহদাকার গ্রন্থের প্রায় সত্তরটি পৃষ্ঠা ডয়েলকে নিয়ে ব্যয় করে সেই অভাব আংশিকভাবে হলেও পূরণ করেছেন লেখক। এই ধারায় আগামী দিনে আরও প্রাবন্ধিক ও পাঠক আগামী দিনে চর্চায় উৎসাহী হলে পথিকৃতের সম্মান ডক্টর কৌশিক মজুমদারেরই প্রাপ্য থাকবে।
তৃতীয়ত, প্রাবন্ধিক ও গবেষক প্রসেনজিৎ দাশগুপ্তের লেখায় হোমস চর্চা যতটুকু হয়েছে, তাতেও তিনি একান্তভাবে আর্থার কোনান ডয়েলের সৃষ্টি এক গোয়েন্দা হয়ে এসেছেন। এই বইয়ে লেখক কিন্তু সেই চরম দুঃসাহসী পদক্ষেপটি নিয়েছেন, যা এখনও শার্লকিয়ানা বা হোমসিয়ানার জগতে মারমুখী আমরা-ওরা বিভাজন ঘটায়। কী করেছেন তিনি? ব্যারিং গুল্ড ও লেসলি ক্লিংগারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে লেখক 'দ্য গেম' খেলেছেন। এতে হোমস ও ওয়াটসন রক্তমাংসের মানুষ, ডয়েল ওয়াটসনের লিটার্যারি এজেন্ট, এবং বিভিন্ন কাহিনিতে উঠে আসা চরিত্র ও ঘটনা বাস্তবের নাটকীয় চেহারা মাত্র। এই ধারণার ভিত্তিতে, আর্থার কোনান ডয়েলের লেখা চারটি উপন্যাস ও ছাপ্পানটি গল্পের এক কালানুক্রমিক বিন্যাস করা হয়েছে। তাতেই উঠে এসেছে হোমস, এবং ডয়েলের ক্যানন (অর্থাৎ প্যাস্টিশ বাদ দিয়ে, শুধুমাত্র মূল কাহিনিতে বিধৃত)-এ ঠাঁই পাওয়া নানা চরিত্রের জীবনকাহিনি।
চতুর্থত, শুধু ক্যানন নয়, এই বইয়ে লেখক সংক্ষেপে ফুটিয়ে তুলেছেন হোমস প্যাস্টিশের বিপুল বিস্তারের অন্তত একটি অংশ। বাংলায় অধিকাংশ পাঠক এখনও হোমসকে নিয়ে লেখা প্যাস্টিশ ও প্যারডির সম্ভার সম্বন্ধে অন্ধকারে আছেন। এমনকি হোমসকে নিয়ে যে অন্য কেউ লিখতে পারে, সেই সম্ভাবনা সম্বন্ধেও তাঁরা ওয়াকিবহাল নন, এ-বিষয়ে আমি ভুক্তভোগী। এই বই, অমিত দেবনাথের অনবদ্য অনুবাদে 'তথাপি শার্লক'-এ ধৃত একঝাঁক প্যাস্টিশ, এবং আরও কিছু প্রয়াস বাঙালি পাঠককে এই অনাস্বাদিত ভাণ্ডারের সন্ধান দিলে বড়ো ভালো হবে।
পঞ্চমত, শুধু তথ্য, তত্ত্ব, এবং কল্পনা নয়। হোমসের সঙ্গে জড়িত অজস্র ছবি, টুকরো খবর, কার্টুন ইত্যাদিতে এই বই একটি কালেক্টর্স আইটেম হয়ে উঠেছে। এত ফটো, এমন পরিষ্কার ছাপা (যদিও বহু টাইপো আছে, সে-কথা পরে), এবং বড়ো আকারের জন্যই বইটা নিজের কাছে রাখতে ইচ্ছে করে। আর একবার বইটা খুলে পাতা ওলটাতে শুরু করলেই অত্যন্ত সহজ লেখনী আপনাকে বাধ্য করবে বইটা পড়তে। তাই বুঝতেই পারছেন, বইটা কিনবেন না বলে যদি ঠিক করেই ফেলে থাকেন, তাহলে ওটা থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ। বইটা হাতে নিলে মতিভ্রম হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু এই বইয়ের কি কোনো সীমাবদ্ধতা নেই? অবশ্যই আছে। ১) বেশ কিছু নামের বানানে মারাত্মক ভুল দেখে পিলে চমকে উঠেছে। বিশেষত, প্রসেনজিৎ দাশগুপ্তের ভূমিকা 'গোয়েন্দাদের আদিগুরু'-তে রয়েছে কয়েকটি বেদরদি টাইপো, এবং একটি হরেন্ডাস তথ্যগত ভ্রান্তি। ২) মূল লেখাতে এমন বেশ কিছু কথা এসেছে যা তথ্য নয়, বিশুদ্ধ স্পেকুলেশন। 'দ্য গেম'-এর মতো করে সেগুলো গল্প হিসেবে পড়তে গেলে আবার অন্য তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এটা চাপের ব্যাপার। ৩) হোমসের বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চারের বিশ্লেষণ করে তার নানা ট্রোপ, টাইপ, সমকালীন স্টিরিওটাইপিং, এবং কলোনিয়াল মানসিকতার প্রভাব দেখাতে গিয়ে লেখক এমন বেশ কিছু চার্ট, ছক ইত্যাদি দিয়েছেন যা বইকে শ্লথ করেছে। যেকোনো সময়েই সাহিত্য সেই কালের প্রেজুডিস ও বায়াসকে প্রতিফলিত করে। এর বেশি ওখানে বলার দরকার ছিল না। তার বদলে বাংলা সাহিত্যে হোমসের ছায়া ("গুরু তুমি ছিলে বলেই...!") এবং তার থেকে বেরিয়ে অন্য ঘরানায় লেখালেখি (পিনাকী রায়-এর ব্যোমকেশ ও হোমসকে নিয়ে লেখা 'দ্য ম্যানিকিয়ান ডুও' পশ্য) নিয়ে একটা আস্ত অধ্যায় দিলে দিল একেবারে তরর হয়ে যেত।
শেষ বিচারে এটাই বলব, যদি আপনি শার্লক হোমস, তাঁর নানা অ্যাডভেঞ্চার, সেই সময়ের লন্ডন, আর্থার কোনান ডয়েল, এবং ডয়েলের পর হোমসকে নিয়ে একটাই বই পড়তে চান, তাহলে বাংলায় এর চেয়ে ভালো কিছু আপনি পাবেন না। শুধু এই বই পড়াই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে আপনাকে ইংরেজিতে আরও অনেক বই পড়তে হবে এই সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গেলে। কিন্তু প্রথম পাঠ হিসেবে এই বইয়ের কোনো বিকল্প হয় না। পড়ে ফেলুন।
বেকার স্ট্রিটের ওই গোয়েন্দা এবং তার ল্যাংবোট ডঃ ওয়াটসনকে রক্তমাংসের মানুষ কল্পনা করে বহু গবেষক যে হোমসের জন্ম-মৃত্যু-বংশ পরিচয়-কর্মকাণ্ড নিয়ে বিবিধ তত্ত্ব দিয়েছেন, কৌশিক মজুমদার সেগুলো পরিবেশন করেছেন একপাতে। আর্থার কোনান ডয়েলের লেখা চারটি উপন্যাস ও ছাপ্পান্নটি গল্প থেকে নানা যোগসূত্র কল্পনা করে গবেষকদের দাঁড় করানো এসব তত্ত্বের আওতা দেখে স্রেফ তাজ্জব বনে যেতে হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে (যেমন ধরা যাক লোলা মনটেজের কথা। জোসেফ বেল নামের বাস্তবের এক চিকিৎসকের অনুকরণেই যে হোমসের সৃষ্টি, সে কথা আজ অনেকেরই জানা। কিন্তু আইরিন অ্যাডলার নামের চরিত্রটির মূল প্রেরণাও যে ছিলেন একজন লোলা মনটেজ, যিনি বাস্তবে ছিলেন বাভারিয়ার রাজা লুডউইগের প্রণয়িনী, সে তথ্য আমরা কজন জানি?)। ক্যানভাসারের ভাষায় বলতে গেলে, এই বইটি পড়লে আপনি জানতে পারবেন শার্লক হোমস এবং আইরিন অ্যাডলারের পুত্র সন্তানের কথা (নিরো উলফ, মার্কিন লেখক রেক্স স্টাউটের সৃষ্ট এই চরিত্র নিজেও গোয়েন্দা), জানতে পারবেন হোমস কবে কোথায় কীসের ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন, জানতে পারবেন যে মঞ্চনাটকে হোমসের সহকারী বিলি নামক ছোকরার ভূমিকায় একদা অভিনয় করেছিলেন চার��লি স্পেনসার চ্যাপলিন।
হোমসকে নিয়ে এসব দারুণ তথ্যের সমাহার ছাড়াও রচয়িতা স্যার আর্থার কোনান ডয়েলকে নিয়েও বেশ বিস্তারিত আলাপ আছে হোমসনামায়। হোমসের চাইতে অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘরানার উপন্যাস লেখাতেই আগ্রহ বেশি ছিলো ডয়েলের, অথচ অর্থের প্রয়োজনে তাকে বারবারই ফিরে আসতে হয়েছে হোমস রচনায়।
এছাড়া, দুনিয়ার নানা প্রান্তে (এমনকি বাংলাভাষী কলকাতাতেও) হোমসকে নিয়ে চর্চা বা মাতামাতি প্রসঙ্গেও লম্বা আলোচনা করেছেন কৌশিক মজুমদার। সিনেমা, মঞ্চ, বিজ্ঞাপণ, কার্টুন; নানা ক্ষেত্রে হোমসের পদচারণার একটা বেশ কালানুক্রমিক ছবি ফুটে ওঠে পাঠকের সামনে তখন। তার সাথে হোমসের সঙ্গে জড়িত অজস্র ছবি, খবরের কাগজের টুকরো; সব মিলিয়ে গোটা বইটাই হয়ে উঠেছে সংগ্রাহকদের জন্য একটা দারুণ লোভনীয় বস্তু।
চমৎকার বই, নিখাদ সাড়ে চার। প্রচুর তথ্যের সমাহারটা যথেষ্ট টানটান ভাব ধরে রেখে করা যেতো মনে হয়েছে, কিছু পুনরাবৃত্তিও এড়ানো যেতো আরেকটু ভালো সম্পাদকের হাতে পড়লে।
আমি একসময় চিন্তা করতাম বাংলায় বিভিন্ন গবেষক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা নিয়ে পিএইচডি করে; কিন্তু আসলে কিভাবে করে। কৌশিক মজুমদার এর লেখা হোমসনামা পড়ে আমি বুঝতে পারছি আসলে একজন লেখকের লেখা নিয়ে কিভাবে গবেষণা হয়। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের রচিত শার্লক হোমস আমার এই পর্যন্ত পড়া এবং সবচেয়ে বেশি পড়া বইগুলোর মধ্যে একটি। কিন্তু আমি কখনোই চিন্তা করি এই গল্পগুলো থেকে হোমস সম্পর্কে এত তথ্য বের করা সম্ভব। লেখক এই বইয়ে হোমসকে এই যাবৎ হয়ে যাওয়া গবেষণার বিষয়গুলো খুব সুন্দর ভাবে সাজিয়ে পরিবেশন করেছেন। হোমসের জন্ম, পিতা মাতা কে ছিল? হোমসের স্ত্রী ছিল কিনা, ওয়াটসনের জীবন প্রভৃতি। আর বইয়ের শুরুতে পাবেন ডয়েলের জীবনকাহিনী বোনাস হিসেবে। খুব আশ্চর্য জনক তথ্য ডয়েল হোমসকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। বাকিটা বল্লাম না। এই বইয়ে আরো আছে হোমসের প্যাস্টিশে। কিছু কিছু প্যাস্টিশের বর্ণনা পড়ে আমার এখন ঐ প্যাস্টিশে পড়ার ইচ্ছে হচ্ছে। হোমসকে নিয়ে হয়েছে কমিকস, কার্টুন আর দেয়া সিনেমা ও টিভি পর্দার লিস্ট। কিভাবে এমনকি মর্ডান শার্লকের টিভি সিরিজ এ আসা তার পিছনের কাহিনী। আরো আছে হোমসের কেসের ধরন, অপরাধীর ধরন। এক কথায় যারা শার্লক হোমস কে ভালবাসেন তাদের জন্য এটি একটি অবশ্যই সংগ্ৰহণযোগ্য বই।
নন-ফিকশন বই খুব বেশি পড়া হয়নি এখন পর্যন্ত। তবে এই ছোট্ট লিস্টে সবচেয়ে ভারী নামটি বোধহয় কৌশিক মজুমদারের "হোমসনামা"। বইয়ের লেখক এর স্থলে গবেষক দেখে অনেকে হয়তো কিছুটা বিভ্রান্ত হতে পারেন, তবে এত তথ্য সমৃদ্ধ একটি বইয়ের লেখককে গবেষক না বললে আমার কাছে কেমন একটা ঘাটতি থেকে যায় বলে মনে হলো।
পাঠ পরিক্রমা শুরু করবার পূর্বে হোমসের পরিচয় দেবার জন্য বইটির প্রথম কয়েক লাইন ধার করলাম।
"একটি নাম কীভাবে পৃথিবীর যেকোনো ভাষায় সার্বজনীনভাবে গৃহীত হয়ে বিশেষণে পরিণত হতে পারে, সেটি বোঝা যায় 'শার্লক হোমস'-এর কথা ভেবে দেখলে। যে হতভাগ্যরা গোয়েন্দা সাহিত্যের রস থেকে বঞ্চিত, অর্থাৎ সাহিত্যের এই ‘জঁর'টি বিশেষ পছন্দ করেন না এবং এড়িয়ে চলেন, তাঁদের কাছেও কিন্তু ‘শার্লক হোমস' শব্দবন্ধটি অপরিচিত নয়, এটি গোয়েন্দা বা ডিটেকটিভের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠায়। অনুসন্ধিৎসার অপর নাম শার্লক হোমস। কিংবা শুধুমাত্র ‘শার্লক' অথবা 'হোমস' বললেও কাজ চলে।"
হ্যা ঠিক এমনই প্রসিদ্ধ শার্লক হোমসের গল্পগুলো। স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বুড়ো সবার কাছেই শার্লক হোমস একজন আদর্শ গোয়েন্দা যার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতায় অবাক হয়নি এমন কোন মানুষ পাওয়া যাবে নাহ।
তবে শার্লক হোমস এতটা জনপ্রিয় হলেও হোমসের যিনি হর্তাকর্তা অর্থাৎ আর্থার কোনান ডয়েল সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি আলোচনা করতে দেখা যায় নাহ লেখক মহলে। তাই আমাদের মতো হোমস জ্বরে আক্রান্ত পাঠকবৃন্দ কেমন একটা অন্ধকারেই রয়ে যান বছরের পর বছর। এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নিয়ে ২০১৮ সালে কলকাতার বুকফার্ম এবং বাংলাদেশের বাতিঘর থেকে প্রকাশিত হয় হোমসনামা।
বইটির আলোচ্য বিষয়ঃ বইটির নাম হোমসনামা রাখা হলেও হোমসের জন্মদাতা আর্থার কোনান ডয়েল কে নিয়েই মূলত বইটি লিখেছেন কৌশিক মজুমদার। হোমসের আদি অন্ত সবকিছু তো আছেও তাছাড়াও হোমস কিভাবে আসলো, হোমসের গল্পগুলো কিভাবে এত জনপ্রিয়তা পেলো, হোমস চরিত্রটিকে আর্থার কার থেকে ধার করেছেন কিংবা হোমস ছাড়াও আর্থারের যেসব জগদ্বিখ্যাত বই আছে সবগুলো নিয়েই সম্যক ধারনা দেওয়া হয়েছে বইটিতে।
এছাড়াও বইয়ে আর্থারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও পরিষ্কার ধারনা দেওয়া হয়েছে। আর্থার যে শুধু কাগজের পাতায় ই একজন জগদ্বিখ্যাত গোয়েন্দার রুপকার ছিলেন তাই কিন্তু নয়, আর্থার ও একজন দারুণ গোয়েন্দা ছিলেন। তাকে ঠিক গোয়েন্দা বলা সমীচীন হবে কিনা জানিনা, তবে আর্থার বেশ কিছু কেস নিজ মেধার দ্বারা সলভ করেছেন যার প্রত্যেকটির বর্ননা দেওয়া হয়েছে বইটিতে।।
এছাড়াও আর্থার যে পরলোকত্বে অনেকটা সময় গবেষনা করেছেন তারও সুবিশেষ বর্ননা দেওয়া আছে বইতে।
মোদ্দাকথা, শার্লক হোমস সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্যের ফুলঝুরি নিয়ে বসেছিলেন এই বইয়ে। প্রত্যেকটি গল্পের পেছনের গল্পগুলো দারুণভাবে তুলে ধরেছেন কৌশিক মজুমদার। নক ফিকশন হলেও পড়তে একটুও বিরক্তি আসার মতো নয়।
খুবই যত্ন নিয়ে, হোমসের ওপর রীতিমত গবে ষণা করে লেখা। এই বইটার মাধ্যমে কৌশিক মজুমদার মহাশয়ের লেখার সাথে আমার পরিচয়। খুব সাবলীল ও মনোগ্রাহী রচনাশৈলী। আমার ভালো লে। অন্য হোমস প্রেমীরা পড়লেও আশা করি ভালো লাগবে।
শার্লক হোমস্ এর শুরু থেকে শেষ , ���ার উৎস তার চরিত্র গঠন সেখালের স্কটল্যান্ড ই়ার্ডের সামগ্রিক একটা চিত্র ফুটে উঠেছে এই বই তে। অনেক অজানা তথ্য লেখকের সমন্ধে।।আমরা যারা ছোট থেকে শার্লক হোমস্ এর কাহিনী পড়ে বড় হয়েছি তাদের জন্যে যথেষ্ঠ ভালো একটা বই।
This book has everything that you want to know and the things you didn’t know you wanted to know about the greatest fictional detective Sherlock Holmes.