চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে অ্যালফ্রেড হিচককের সৃষ্টির সংগে বাংলার মানুষের পরিচয় অনেকদিনের। কিন্তু তাঁর ছবিতে যে ভয়, সাসপেন্স, রহস্য প্রভৃতি দেখা যায় সেগুলির উদ্ভব কোথা থেকে, তার সন্ধান করতে হলে হিচককের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। যে অন্তর্মুখী, সন্ত্রস্ত এবং স্বার্থপর মানসিকতা থেকে হিচকক ছবিতে মানুষের মনের অন্ধকার দিকগুলো তুলে আনতেন বা তাঁর ছবিতে বিভিন্ন বৈপ্লবিক এবং অভাবনীয় দৃশ্যগুলোর চিত্রগ্রহণের সময়ে ক্যামেরার ফোকাসের বাইরে নিরন্তর যা ঘটে চলত, সেইসব ঘটনাও ছবির সাসপেন্সের তুলনায় কিছু কম নয়। অথচ হিচককের জীবন ও শিল্পের এই দিকগুলো নিয়ে বাংলা ভাষায় চর্চা যদিও কিছু হয়ে থাকে, তা এতই নগণ্য যে তাকে ধর্তব্যের মধ্যে নেওয়া যায় না। সেই অভাব পূরণ করতে হিচককের জীবন ও সৃষ্টিতে সাসপেন্সের বাতাবরণ, ক্যামেরার বাইরে ঘটে থাকা চমকপ্রদ ঘটনাবলি, হিচককের অন্ধকার মানসিকতা, নিঃসঙ্গতা, অভিনেত্রীদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সর্বোপরি এদেশের বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র-স্রষ্টা সত্যজিৎ রায়ের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে হিচককের বিনি সুতোয় গাঁথা সম্পর্ক – এইসব দিয়েই সাজানো হল সাসপেন্সের সম্রাট হিচকক।
সাসপেন্স সম্রাট হিচকক পড়ে শেষ করলাম। শেষ করলাম বলতে যতটুকু শেষ করতে ইচ্ছা হয়েছে আরকি! বইটার শেষের কিছু অংশ পড়িনি। তাতে রয়েছে হিচককের প্রতিটি চলচিত্রের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। অনেকে হয়তো ওই অংশকটুকুর জন্যই এই বই সংগ্রহ ও সংরক্ষন করতে আগ্রহী হবেন! আমি অবশ্য স্পয়লার খাবার ভয়ে পাশ কাটিয়েছি।
বইতে সাজানো আছে চিত্র পরিচালকের জীবনের নানা দিক। এ ধরণের উপন্যাস টানা পড়া কঠিন, কেন না তাতে একই কথা ফিরে আসে বারবার, এবং বৈচিত্র্য যতই থেকে থাকুক প্রসঙ্গ যদি একই থাকে তাহলে চলে আসে একঘেয়েমি। এই বইতে অবশ্য হিচকককে পাশ কাটিয়ে বিবিধ আনুসাঙ্গিক প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তাতে ক্ষীণভাবে জাড়ানো চলে মানুষ হিচকককে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ "সত্যজিৎ রায়"-কে টেনে লেখা পরিচ্ছদটি। যার আপাতদৃষ্টিতে তেমন কোনও প্রয়োজন ছিল না বলেই আমার বিশ্বাস।
বইয়ের বর্ণনাভঙ্গি ছিল সাবলীল ও সুন্দর। লেখক প্রসেনজিৎ দাশগুপ্তর কোনও বই আমি এর আগে পড়িনি। কিন্তু তার লেখনীতে কোনও প্রকার জড়তা দেখতে পাইনি। টানা ঝরঝরে লেখা। পড়ার জন্য আদর্শ।
মুভি নির্মাণে হিচকক-এর আধুনিক ও সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি যেমন শ্রদ্ধা জাগিয়েছে মনে, তেমনই আবার তার হঠকারিতা এবং ব্যক্তিচরিত্র বড় পীড়া দিয়েছে। বিশেষ করে চলচিত্রের নায়িকাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার। কিংবা তাদের অশালীন মন্তব্য করা কিংবা ক্ষেত্র-বিশেষে অসম্মতিতে জোর পূর্বক চুমু, বা, জড়িয়ে ধরার বিষয়গুলো বিশেষ সুবিধার মনে হয়নি। অর্থাৎ, মানুষ হিচকক আমার চোখে নিচে নেমে গেছেন অনেকখানি। এর কৃতিত্ব বিবরণদাতা প্রসেনজিৎ দাশগুপ্তর ঘাড়ে কতটা বর্তায় সেই আলোচনা প্রশ্নাতীত। হয়তো বা লেখক চেয়েছেন নিরপেক্ষ ভাবে সব সত্যিটা পাঠকের সামনে তুলে ধরতে। কিংবা তার চোখ দিয়ে দেখেই আমার এই মনোভাব। নির্দিষ্ট করে কিছু বলা উচিত হবে না। তাই বলছিও না।
বইটা পড়ে হিচককের কিছু সিনেমা দেখার আগ্রহ জেগেছে। যদিও মনে হয় না আজকের দিনে দাঁড়িয়ে রুদ্ধশ্বাস সিনেমটোগ্রাফি আর ঐন্দ্রজালিক কম্পিউটার কারিগরির ভিড়ে সে বস্তু চূড়ান্ত মহার্ঘ কিছু বলে মনে হবে। কিন্তু তবুও দেখে ফেলতে পারি কেবলমাত্র তার সিনেমার সাসপেন্স-সেন্সের যে প্রলোভন কিংবা প্রয়োগ রয়েছে, সেটুকুর জন্য। ও বস্তু দিন এবং কালের সঙ্গে কমে না, আবেদন একই থাকে।
এধরণের বইয়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত তাড়াতাড়িই পড়লাম "সাসপেন্স সম্রাট হিচকক"। হঠকারী এই মানুষটিকে ভালবাসতে না পারলেও তার সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা জেগে থাকবে অবশ্যই। তবে তার অস্কার না পাবার বিষয়টিকে আমি ইতিবাচক ভাবেই দেখছি। অস্কার পেলে দম্ভ কোন উচ্চতায় গিয়ে ঠেকত সেটা ধারণা করা খুব বেশি কঠিন কিছু নয়।