হৃষ্টপুষ্ট, সুমুদ্রিত এবং শোভন অলংকরণে সমৃদ্ধ এই সংকলনে যা-যা আছে তা হল~ উপন্যাস— জীবন্ত উপবীত গল্প— ১. রোলাং ২. বিল্লি মহল ৩. প্রজাপতির পাখা ৪. মহাশোলের টোপ ৫. বিপরীত বিহার ৬. এক্লাকুন ৭. মেডুসার মুক্তো এই লেখাগুলোর বিশেষত্ব ত্রিবিধ। তাদের এভাবে চিহ্নিত করা চলে: প্রথমত, প্রতিটি লেখাই ভয়াল রসের। সেই ভয়ও শারীরবৃত্তীয় প্রকৃতির— যাকে ইংরেজিতে আমরা বডি-হরর বলে থাকি। সচরাচর বাংলায় এমন লেখা ডার্ক ফ্যান্টাসি গোত্রভুক্ত হয় (সৈকত মুখোপাধ্যায়ের লেখার সংকলন 'ঈশ্বরের নষ্ট ভ্রূণ' স্মর্তব্য)। এখানে কিন্তু প্রতিটি লেখাই একান্তভাবে বাস্তব চরিত্র নিয়ে, বাস্তব অথচ একজটিক পটভূমিতে রচিত। দ্বিতীয়ত, লেখাগুলো প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্যই রচিত। যৌনতা এবং বীভৎসতা এদের প্রধান উপজীব্য। তাই সেই ধরনের লেখা পড়ার মতো মানসিক প্রস্তুতি না থাকলে এ-বই পড়া উচিত হবে না। তৃতীয়ত, এতে অলৌকিক কাহিনির আধিক্য থাকলেও বাস্তবের ক্রূরতারও অভাব নেই। সেই সূত্রেই উঠে এসেছে ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের জীবনযাত্রা নিয়ে বিচিত্র কিছু তথ্য ও ভাবনা। বইটির একটিই ত্রুটি। লেখা এত অমসৃণ ও রুক্ষ যে পড়ার অভিজ্ঞতাটি সুখদায়ক হয় না। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর এই লেখাগুলোর প্রায় সবক'টিই পড়েছিলাম। কিন্তু এখন বই হিসেবে পড়তে গিয়ে মনে হল, এই রুক্ষতার জন্যই লেখাগুলো ধীরে-ধীরে, বেশ কিছুটা সময়ের ব্যবধানে পড়লে হয়তো ভালো লাগবে। অলমিতি।
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তর লেখা জীবন্ত উপবীত, একটি উপন্যাস, এবং সাতটি গল্প দিয়ে সাজানো। অনেক প্রত্যাশা নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম, পড়ে খানিকটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে।
উপন্যাসটির নামে এই বইএর নামকরণ, এবং সেটি প্রকৃত ভাবেই যথার্থ। এই উপন্যাস লেখকের এই বইএর সেরা রচনা আমার মতে। উপন্যাসটি তন্ত্র ভিত্তিক উপন্যাস, এবং গল্পের পরিণতি অনুমান করা গেলেও, লেখক শেষ অব্দি পাঠককে ধরে রাখতে সক্ষম।
সাতটি গল্পের কথা একে একে বলি:
রোলাং: আবার তন্ত্রভিত্তিক গল্প, এবং এই গল্পেও লেখকের লেখনী খুবই ভালো। ভয়ের চেয়ে বীভৎসতা বেশি, কিন্তু গল্প যথেষ্ট উত্তেজনাময়।
বিল্লি মহল: লেখকের গল্প ভাবনা খুব ভালো, কিন্তু শেষে এসে যেন বড্ড তাড়াহুড়ো করলেন। এই গল্প উপন্যাস হলে বোধহয় ভালো হতো।
প্রজাপতির পাখা: আবার খুব ভালো ভাবনা। লেখনীও প্রশংসার প্রাপ্য। ডায়েরি ফরমাটের লেখা পড়ে খানিকটা শঙ্কুর মতো অনুভূতি হচ্ছিল! কিন্তু শেষটা আবার ভালো লাগেনি, বা বলা ভালো হজম হয়নি।
মহাশোলের টোপ: এই বইয়ে শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প। সোজা কথায় বারবার পড়ার মতো গল্প। কিছু কিছু গল্প মানুষের একবার পড়লেই মনে থেকে যায়। এই গল্প সেরকম। এবার শেষটাও বেশ জম্পেশ।
বিপরীত বিহার: অত্যন্ত ইউনিক রচনা। যৌনতা এবং রহস্য, দুই মিলিয়ে এই গল্প বেশ ভালো।
এক্লাকুন: মাচু পিচু গল্পের প্রেক্ষাপট! কিন্তু চমক ওইটুকুই। শেষটা লেখক একদমই ভালো করতে পারেননি। কেমন যেন একটা। আমার মতে বইয়ে সবচেয়ে দুর্বল ছোটগল্প।
মেডুসার মুক্তো: গল্পের প্রেক্ষাপট খুবই ভালো। লেখনী ভালো। শেষ অব্দি উত্তেজনা ধরে রাখতে পেরেছেন লেখক। শেষটাও মন্দ লাগেনি এবার।
মোটের উপর, আমার মত বেশি প্রত্যাশা নিয়ে যদি এই বই পড়তে বসেন, আশাহত হবেন। গল্পগুলি ইউনিক, কিন্তু কোথাও যেন লেখক সেগুলিকে পূর্ণতা দিতে ব্যার্থ। তাও কিছু গল্প সত্যি ভালো। একবার পড়ে দেখতে পারেন বইটা।
একটি উপন্যাস এবং সাতটি বড়গল্প মিলে এই সংকলটি । খুব ডার্ক এবং প্রাপ্তমনস্ক পাঠকদের কাছে অবশ্যপাঠ্য হিসেবে বেশ জনপ্রিয় এই বইটি । তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে বইটি পড়ে ।
সংকলনের একমাত্র উপন্যাসের নামেই এই সংকলনটির নামকরণ করা হয়েছে - ‛জীবন্ত উপবীত’ । বাকি গল্পগুলি হলো - ১. রোলাং ২. বিল্লি মহল ৩. প্রজাপতির পাখা ৪. মহাশোলের টোপ ৫. বিপরীত বিহার ৬. এক্লাকুন ৭. মেডুসার মুক্তো
এইগুলির মধ্যে ‛জীবন্ত উপবীত’ এবং ‛রোলাং’ একদম আলাদা লেভেলের লেখা , বলতে পারি বাংলা ডার্ক ফ্যান্টাসি জঁনরার শ্রেষ্ঠ লেখাগুলোর মধ্যে বিনা দ্বিধায় একে রাখা যেতে পারে । বাকি গল্পগুলির মধ্যে ‛মহাশোলের টোপ’ বেশ ভালো, এছাড়াও ‛বিপরীত বিহার’ গল্পটিও বেশ । ‛এক্লাকুন’ এবং ‛মেডুসার মুক্তো’ এই দুটি লেখার প্লট একদম ইউনিক, বেশ ভালো লেগেছে পড়তে । আমার ব্যক্তিগতভাবে তেমন ভালো লাগেনি ‛বিল্লি মহল’ এবং ‛প্রজাপতির পাখা’ , বারবার মনে হয়েছে গল্পদুটো যেন এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করার মতোই নয় ।
যাইহোক, সবমিলিয়ে বইটি বেশ টানটান এবং রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা পরিবেশন করতে সক্ষম ।
একটি উপন্যাস এবং সাতটি বড়গল্প মিলে এই সংকলটি । খুব ডার্ক এবং প্রাপ্তমনস্ক পাঠকদের কাছে অবশ্যপাঠ্য হিসেবে বেশ জনপ্রিয় এই বইটি । তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে বইটি পড়ে ।
সংকলনের একমাত্র উপন্যাসের নামেই এই সংকলনটির নামকরণ করা হয়েছে - ‛জীবন্ত উপবীত’ । বাকি গল্পগুলি হলো - ১. রোলাং ২. বিল্লি মহল ৩. প্রজাপতির পাখা ৪. মহাশোলের টোপ ৫. বিপরীত বিহার ৬. এক্লাকুন ৭. মেডুসার মুক্তো
এইগুলির মধ্যে ‛জীবন্ত উপবীত’ এবং ‛রোলাং’ একদম আলাদা লেভেলের লেখা , বলতে পারি বাংলা ডার্ক ফ্যান্টাসি জঁনরার শ্রেষ্ঠ লেখাগুলোর মধ্যে বিনা দ্বিধায় একে রাখা যেতে পারে । বাকি গল্পগুলির মধ্যে ‛মহাশোলের টোপ’ বেশ ভালো, এছাড়াও ‛বিপরীত বিহার’ গল্পটিও বেশ । ‛এক্লাকুন’ এবং ‛মেডুসার মুক্তো’ এই দুটি লেখার প্লট একদম ইউনিক, বেশ ভালো লেগেছে পড়তে । আমার ব্যক্তিগতভাবে তেমন ভালো লাগেনি ‛বিল্লি মহল’ এবং ‛প্রজাপতির পাখা’ , বারবার মনে হয়েছে গল্পদুটো যেন এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করার মতোই নয় ।
যাইহোক, সবমিলিয়ে বইটি বেশ টানটান এবং রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা পরিবেশন করতে সক্ষম ।
২১৬ পাতার বই।সব মিলিয়ে মোট ৮ টি গল্প আছে। সমস্ত গল্পের নাম আর সারমর্ম বলে মজা নষ্ট করছি না। প্রায় প্রতিটা গল্পতেই একটা গা রিরি করা ব্যাপার আছে। বইটি বিভৎস রসের প্রাচুর্যে টইটম্বুর। অনেক গল্প পড়ার পর সেটাকে হজম করার জন্য অনেকক্ষন করে থামতে হয়েছে। প্রচণ্ড রুচিশীল হলে এই বই হাত না দেওয়াই শ্রেয়।
উপন্��াস "বন্দর সুন্দরী" ভালো লাগার পরেই এই লেখকের যে বই হাতে তুলে নিতে বাধ্য হই, তার পিছনে আর একটা কারণ ছিল যে ২০১৮ বইমেলায় এই বই বেস্টসেলার হয়। এছাড়াও অনেক জায়গাতেই বইটার রিভিউ পাই। নাম আর প্রচ্ছদের আকর্ষণও ভালোই চোখ টেনেছিল। "জীবন্ত উপবীত" হচ্ছে একটি উপন্যাস, কিন্তু আরও সাতটি বড়গল্প স্থান পেয়েছে এই বইতে, যেগুলোর প্রত্যেকটাই প্রকাশকের ভাষায় "ভয়ংকর-বীভৎস-অদ্ভুত। বাংলায় ডার্ক ফ্যান্টাসি বা অন্ধকার কল্পকথা। এই বই রাতে না পড়াই ভালো।" যদিও আমি রাতেই পড়েছিলাম সবকটা গল্প। সেই প্রতিক্রিয়াই জানাব এবার।
পত্রভারতীর হার্ডকভার বই কিভাবে যে এত হালকা হয় বুঝি না। পাতার কোয়ালিটি মনোরম, ফন্টও চোখের পক্ষে ভালো। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন অগ্নিভ সেন। প্রত্যেক গল্পের শুরুতেই রয়েছে একটা করে স্কেচ। তবে এবার আসি মূল বিষয়ে - কন্টেন্ট।
"জীবন্ত উপবীত" উপন্যাসের মূল চরিত্র ডাক্তার নবারুণ। অতীতের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর শহরে ডাক্তারির পাট চুকিয়ে তিনি এখন যাচ্ছেন সিনিয়র ডাক্তার অম্বরীশ ঘটকের তৈরি মফস্বলের এক নার্সিং হোমে। নবারুণের স্ত্রী মালবিকাও অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় অতীতের সেই ঘটনার চাপ নিতে না পেরে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। সেই থেকেই নবারুণ একা। অম্বরীশ বাবুর কাছে এসে সমস্ত ঘটনা খুলে বলার পর তিনি আশ্বস্ত করেন যে লোকচক্ষুর ভয় এড়িয়ে নবারুণ যেন ওনার নতুন নার্সিং হোমে কাজ শুরু করেন, যা উদ্বোধন হবে কয়েকদিন পর। ততদিন পুরনো নার্সিং হোমেই একটা থাকার ব্যবস্থা হয় নবারুণের। অম্বরীশ বাবুর কথা অনুযায়ী এই পুরনো নার্সিং হোমে দুজন পেশেন্ট থাকার কথা। কিন্তু নবারুণ একদিন দেখতে পেলেন তিনতলার জানলা টেনে বন্ধ করল তৃতীয় একজন। বিল্ডিং এর পিছনে থাকা পাঁচটি পাঁচরকমের গাছ আর তাদের নিচে একটা লাল বেদী থেকে নবারুণের মাথায় সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল। যে অম্বরীশ স্যার আগে ভগবানেই বিশ্বাস রাখতেন না, তাঁর চেম্বারে একজন সন্ন্যাসীর ছবি দেখেই আশ্চর্য হয়েছিল সে। কিন্তু এরপর নবারুণের সামনে যে বিস্ময় অপেক্ষা করেছিল, তা গল্পের ক্লাইম্যাক্সে যে রুদ্ধশ্বাস মোড় নিল, সেই স্পয়লার দিয়ে প্লটের উত্তেজনা নষ্ট করব না। বেশ ভালো লাগল এই উপন্যাস, ভয়ও পেলাম ভালোই।
এরপরের গল্প "রোলাং" আমার বেস্ট লাগল এই বইতে। বলতে পারেন বেশ ভয়ঙ্কর লাগল, যা রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সিল্করুটের চীন সীমান্তে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থিত লাকাং মঠ, যা তিব্বতি তন্ত্রসাধনার পীঠস্থান। শবসাধনাও নাকি এখানে হয়। ছবি তোলার নেশায় নির্বাণ এসেছে এই মঠে। সাথে ব্রিটিশ দম্পতি রবিন আর জুলিয়াও এসেছে ওদের নিজেদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাজে। কিন্তু চীন সীমান্তে এই মঠ অবস্থিত হওয়ায় একটা বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে যায় সেই দম্পতির সাথে৷ মঠাধ্যক্ষ পেংবু লামার বয়স একশো বছর। আর একজন প্রাচীন লামা আছেন এই মঠে যাঁর বয়স নাকি পাঁচশো বছর। নাম তার চোগস সাঙ। গল্পের মোড় ঘোরে যখন রবিনের করুণ আকুতিতে সাড়া দিয়ে বৃদ্ধ লামা এক সাংঘাতিক কথা দিয়ে বসেন রবিনকে। কিন্তু সাথে রাখেন একটি শর্ত। যার অন্যথা হলেই বিপদ। কী ছিল সেই শর্ত? কী ছিল সেই আশ্বাস? জানতে হলে বীভৎস ভয়াবহ এক ক্লাইম্যাক্সের মধ্যে দিয়েই যেতে হবে পাঠককে। এমন ইউনিক প্লট বহুদিন পড়িনি, তারিফের যোগ্য সত্যিই!
তৃতীয় গল্প "বিল্লি মহল"। ঐশিকা যাচ্ছে কবুতর মহলের উদ্দেশ্যে যেখানে থাকে তার প্রেমিক ছোটরাজা চান্দেল সিং। পথে সে দেখতে পায় বেশ কয়েকটা দু তিন বছরের বাচ্চার নিখোঁজ হওয়ার ছবি। মাস তিনেক আগে মাণ্ডুর এই প্রাসাদ নগরীরই ছবি তুলতে এখানে প্রথমবার এসেছিল পেশায় ফটোগ্রাফার ঐশিকা। তখন তার জানা ছিল না এই আসা তার জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন এনে দেবে। তাকে আবার ছুটে আসতে হবে এখানে। প্লটের বিল্ড আপ খুব আঁটোসাঁটো হলেও ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে যেন মুখ থুবড়ে পড়ল গল্পটা। পড়ে মনে হল সময় নষ্ট করলাম।
"প্রজাপতির পাখা" গল্পটি আবর্তিত হয়েছে নৃসিংহ চৌধুরি আর ডক্টর শেফিল্ডের দিনলিপির ওপর ভিত্তি করে। দুটো অ্যাঙ্গেল থেকে গল্পের প্লট বিল্ড আপ বেশ প্রশংসার যোগ্য। নৃসিংহ বাবু বিভিন্ন ধরনের প্রজাপতি ধরতে এসেছেন মেঘালয়ের গাড়ো পাহাড়ে। আর সেখানেই আর একজন একই শখের মেক্সিকান ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ হয়৷ কিন্তু সেই ব্যক্তির অদ্ভুত দাবির মধ্যে দিয়ে গল্পের বাঁক ঘুরতে শুরু করে৷ খুব দ্রুতগতিতে গল্প এগোয় এবং ক্লাইম্যাক্সও রুদ্ধশ্বাস ভাবে শেষ হয়। তবে কল্পবিজ্ঞান গল্পের সহজ ফরমুলা ব্যবহার না করে লেখক হয়তো আর একটু চমক দিতেই পারতেন এই গল্পে৷ তাহলে অনেকদিন মনে থেকে যেত।
"মহাশোলের টোপ" গল্পটা ছোটর মধ্যে বেশ জমপেশ। পাঠক হিসেবে অনেকে শেষটা আন্দাজ করতে পারলেও গল্প এগিয়েছে বেশ দ্রুতগতিতে৷ কোথাও কোনও মেদ নেই লেখায়। রাজাবাবুর কালিদহে মহাশোল মাছ ধরতে কলকাতা থেকে পাড়ি দিয়েছে রমানাথ তার বিশেষ উপায়ে তৈরি টোপ নিয়ে। বারোবছর অন্তর এই মাছ ধরার প্রতিযোগীতা হয়। কিন্তু কোনওবারেই রাজাবাবু ছাড়া অন্য কেউ সেই মাছ ধরতে পারে না। ধরা হয়ে গেলে পরেরদিন আবার নতুন মাছ ছাড়া হয় কালিদহে, যা আবার বারো বছর পর ধরা হয়। রমানাথের ভাগ্যে কি আছে সেই মহাশোল মাছ? রাজাবাবুকে এড়িয়ে তার হাতে ধরা দেবে সে? উত্তর আন্দাজ করতে পারলেও তার মাঝেই লুকিয়ে আছে এক রহস্য, যা গল্পের পরতে পরতে উন্মোচিত হয়। বেশ ভালো লাগল এই প্লট।
"বিপরীত বিহার" গল্পের নাম শুনেই বুঝতে পারছেন এটা একটা প্রাপ্তবয়স্ক গল্প। লেখকও তার সমস্ত উপাদান হাজির করেছেন এই গল্পে, কোথাও কোনও ফাঁক নেই। অগ্নিভর ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন আর কল্পনাশক্তি যখন মিশে যায় এক চরম মুহূর্তে, তখনই ছুটে আসে একটা তীর। প্লট হিসেবে একটু দুর্বল, শেষে জোর করে মেলানোর একটা অভিপ্রায় লক্ষ্য করা গেল। তবে একবার পড়ার জন্য ঠিক আছে।
"এক্লাকুন" আর "মেডুসার মুক্তো" গল্পদুটোরই প্লট বিল্ড আপ ইউনিক। সহসা এইরকম গল্প পাওয়া যায় বলে মনে হয় না। খুব ভালো ফিনিশিং না হলেও পড়তে মন্দ লাগেনি।
সব মিলিয়ে এই বইয়ের বেস্টসেলার হওয়ার কারণ আছে৷ বিভিন্নরকমের ভয় পাওয়ানোর প্লট চাইলে বইটি বেশ ভালো। কোনও বইয়ের সব গল্পই যে দুর্দান্ত হবে, এমন গ্যারান্টি লেখক বা প্রকাশক কেউই দিতে পারেন না। তবে এই বইয়ের জন্য ভালোর দিকেই কাঁটা বেশি হেলে রইল আমার দৃষ্টিতে।
বিচিত্র রসের বিভিন্ন গল্পের সমাহারে রচিত হয়েছে এই বইটি। সাতটি গল্প ও একটি উপন্যাস রয়েছে বইটিতে। প্রথমেই রয়েছে উপন্যাস ‘জীবন্ত উপবীত’। বিশিষ্ট ডাক্তার নবারুণবাবুর গায়ে লেগে থাকা মিথ্যা হত্যার কলঙ্ক নিয়ে তিনি যখন পর্যুদস্ত, হারিয়েছেন নিজের সঙ্গিনীকেও, তখনই তাঁর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন শিক্ষকের হাসপাতালে ডাক পেলেন চিকিৎসক হিসেবে। একজন সাধারণ প্রফেসর কীভাবে এই বিপুল প্রতিপত্তির অধিকারী হলেন, তাও বড় বিস্ময়ের। আদ্যপান্ত নাস্তিক শিক্ষক ডাক্তার ঘটক অবশ্য তাঁর প্রিয় ছাত্রের কাছে এই উন্নতির ব্যাপারে রাখঢাক করেননি। নাস্তিক কীভাবে বিশ্বাসী হয়ে উঠলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভাবনায়, তাঁর কথা শুনিয়ে নবারুণের জীবনেও উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিলেন। পরিচয় হল তাঁর গুরু সাধকের সঙ্গে, যিনি অবলীলায় নবারুণের ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিলেন। কিছু, নির্দিষ্ট উপাচারের পরে তাঁর সাধনা অনন্য পর্যায়ে যাওয়া ও ডাক্তার ঘটকের আরো উন্নতির কথার মাঝেই এসে পড়ল গ্রাম্য মেয়ে শ্যামা। তাঁর করুণ আকুতি বদলে দিল নবারুণের ভাবনা। বিশেষ উপাচার কি সম্পন্ন হল, জীবন্ত উপবীতই বা কী? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর উপন্যাসটি পড়লেই পাওয়া সম্ভব যা, লেখক নিজগুণে ফুটিয়ে তুলেছেন সাবলীলভাবে। প্রথম গল্প ‘রোলাং’। সমগ্র গল্প জুড়ে রয়েছে সিল্করুটের লাকাং মঠ। গ্যাংটক থেকে সেখানে এসে পৌঁছেছে নির্বাণ, রবিন ও জুলিয়া। চিন সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় গুলিবর্ষণের ঘটনা এখানে বিরল নয়। আচমকা গুলি বিনিময়ে প্রাণ যায় জুলিয়ার। তাঁর সঙ্গী রবিনের আগ্রহে মৃত জুলিয়ার দেহে প্রাণসঞ্চারের আশ্বাস দেন মঠের এক অতিবৃদ্ধ লামা। বিশেষ পদ্ধতিতে চলতে থাকে পূজা। কিন্তু, এরপরেই ঘটে ভয়ংকর এক ঘটনা। তিব্বতীয় তন্ত্রসাধনা পদ্ধতি ‘রোলাং’ নিয়ে আসে এক ভয়ংকর সময়, যা জানতে হলে গল্পটি পড়তে হবে। আমার এই গল্পটি ভালো লেগেছে। দ্বিতীয় গল্প ‘বিল্লি মহল’। নাম শুনেই বোঝা যায় যে, বিল্লি তথা বিড়ালদের মহলের কথা বলা হয়েছে অথবা এমন কোনও মহল যেখানে, বিড়ালদের আধিক্য বেশি। ঈশিকার সাথে বিয়ে হয় এই হাভেলির ছোটরাজার। কিন্তু, তাঁর মায়ের আপত্তিতে গৃহপ্রবেশ সম্ভব হয়নি। তিনি সন্তানসম্ভবা শুনে হাবেলিতে ঢোকার অনুমতি পেলেও তাঁর সন্তানের জন্ম হওয়ায় বাধ সাধে তাঁর শাশুরিমা। কিন্তু, কেন? শহরের বাচ্চা হাপিস হওয়ার সাথেই বা এর কী সম্পর্ক? বিল্লিমহলের রহস্যই বা কী? এই সমস্ত বিষয়কে লেখন গল্পের বাঁধনে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন যে, সম্পূর্ণ জানতে হলে গল্পটি পড়ে দেখতে হবে। তৃতীয় গল্প ‘প্রজাপতির পাখা’। বিভিন্ন দুস্প্রাপ্য প্রজাপতির বর্ণনা পাওয়া যায় এই গল্পে। তাঁর সাথেই শোনা যায় বিভিন্ন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ডঃ শেফিল্ড, ক্যালিপ্টা, মিসেস মীনাক্ষী, নৃসিংহ চৌধুরী ও ও অন্যান্য। কল্পনার সাথে বিজ্ঞানের মিশেলে এই গল্পটি লেখার চেষ্টা করেছেন লেখক। শক্তির স্থানান্তরের তত্ত্ব এসেছে লেখনীর শেষে। মোনার্ক প্রজাপতির পাখার এমন কি বিশেষত্ব, কিংবা সত্যিই কি তা কোনও প্রজাপতি নাকি অন্য কিছু, এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে গল্পটি পাঠ করতে হবে, যা মোটেও স্বাদে ব্যাঘাত ঘটাবে না। চতুর্থ গল্প ‘মহাশোলের টোপ’। কালিকাপুর জমিদারবাড়ির জলাশয়ে অবস্থিত মহাশোল ধরার বিশয় নিয়েই এই গল্প এগিয়েছে। জমিদারবাড়ির সদস্য ছাড়া এই মাছ কেউ আগে ধরতে না পারলেও সে ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে এসেছেন রমানাথ। কি এই টোপের বিশেষত্ব যা, কেবল জমিদারের বংশজরাই জানেন? রমানাথ কীভাবে সেই মিথকে ভুল প্রমাণিত করবেন এক সাধুর সহযোগিতায়, তা সহজ শব্দে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। পঞ্চম গল্প ‘বিপরীত বিহার’। ভারতবর্ষের বিভিন্ন মন্দিরগাত্রেই দেখা যায় রমণক্রিয়ার বিভিন্ন ছবি। এই গল্পেও সেই রমণক্রিয়ার একটি বিশেষ পদ্ধতির কথা উল্লিখিত হয়েছে। গল্পের মূল চরিত্র অগ্নিভ কীভাবে ট্যুরিষ্ট হিসেবে এসেও এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে নিজের ফেলে আসা অতীতের মিশেলে তৈরি করলো বিস্ময়কর এক সময়, তাঁর অদ্ভূত বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। বিপরীত বিহারের আঁচড়, মৃত্যু-সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে লেখকের কলমের ছোঁয়ায়। ষষ্ঠ গল্প ‘এক্লাকুন’। ইনকা সভ্যতার কাহিনিকে আশ্রয় করেই এই গল্প লিখেছেন লেখক। এক্লাকুনরা ছিলেন দেবতার সেবিকা। রাজা ও রানি ছাড়া কেউ তাদের সাথে সাক্ষাত করতে পারতেন না। কথক ও হারবার্ট এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। এক্লাকুন সাজে সজ্জিত কুমারীর প্রতি যৌন লালসা চরিতার্থ করার বাসনার পরিণতি কি ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা লেখক গল্পে তুলে ধরেছেন। কিন্তু, এই সব কি মায়াবী কিছু নাকি, বৈজ্ঞানিক কোনও ভিত্তি রয়েছে এর পিছনে, তা জানা যাবে গল্পের শেষেই। এই গল্পটি আমার বেশ ভালোই লেগেছে। অন্তিম গল্প ‘মেডুসার মুক্তো’। আরাওয়াক জনজাতির বিশেষ আবিষ্কার এই মুক্তো। এই মুক্তোর শিকড় সন্ধানেই ওই বিশেষ আরওয়াক দ্বীপে পৌঁছায় মৃগাঙ্ক। কিন্তু, ভয়ঙ্কর অপদেবী মেডুসার সাথে তার সম্পর্ক কী? কী এই মুক্তোর বিশেষত্ব? সত্যিই কি সেটি মুক্তো, নাকি অন্য কিছু? তাঁর বর্ণনায় লেখক মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।
সমস্ত দিক দিয়ে এই বইটি আমার সুখপাঠ্য বলেই মনে হয়েছে। বিজ্ঞান ও সংস্কারের দোলাচলে লিখিত এই বইয়ে অলৌকিকতার যে ছোঁয়া রয়েছে তা, লেখনীকে অনন্য মাত্রা দান করেছে।
রহস্যরোমাঞ্চ ঘরানার লেখা পড়তে যে আমি প্রচণ্ড ভালোবাসি, তা অনেকেই জানেন। এ বাবদ অনেক লেখকের লেখাই পড়ে থাকলেও, কোনও অজ্ঞাত কারণে এর আগে এই সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তের কোনও বই-ই পড়া হয়ে ওঠেনি।
সম্প্রতি পড়ে শেষ করেছি “জীবন্ত উপবীত”। বইটি ডার্ক এবং ভয়ঙ্কর, সেটা স্পষ্ট করে প্রচ্ছদেই লেখাও আছে। এককথায় বলতে হলে বলব, এ বই পড়ে সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যাওয়া একেবারেই সম্ভব নয়। বইটিতে আছে একটি উপন্যাস ও সাতটি ছোটো গল্প। আলাদা করে আলোচনা করার আগে বইটি পড়ে সবার আগে এবং সবচেয়ে বেশি যা ভালো লেগেছে, সেইটে বলি। আমার মতে বইয়ের সবচেয়ে স্ট্রং পয়েন্ট - প্লট। এরকম চমৎকার, বৈচিত্র্যময়, জমাটি প্লটের একত্র সমাহার আমার মতো পাঠকের কাছে লোভনীয় ব্যাপার! একদম অচেনা কিছু নয়, অথচ বাঁধা গতের এপিঠ-ওপিঠ না হয়েও কী মুন্সিয়ানায় গল্প নির্মাণ করা যায়, দেখিয়ে দিয়েছেন লেখক।
জীবন্ত উপবীত – মফস্বল শহর, দুই ডাক্তার ও এক তান্ত্রিক, কিছু অসহায় মানুষ আর এক অনপনেয় অতীত অন্ধকার। ভয়, আতঙ্ক, রাগ… ডার্ক ও তীব্র অনুভব জাগায়।
রোলাং – সিকিমের এক প্রাচীন মঠ ও প্রাচীনতর মন্ত্র। কী আছে মৃত্যুর পর?
বিল্লি মহল – মধ্যপ্রদেশের মাণ্ডু নগরীর হাভেলি প্রাসাদ ইতিহাস ছাড়াও আরও কী অভিশাপ ধরে রেখেছে? ডার্ক গল্পের শেষ কিন্তু শুভবোধে।
মহাশোলের টোপ – পুরোনো গ্রাম, সাবেক জমিদারবাড়ি, মাছ ধরার কম্পিটিশন। নিরীহ এই পটভূমিকায় আচমকাই চমকপ্রদ মোচড়।
বিপরীত বিহার – এক মন্দিরশহরে, অতীত বর্তমান মিলিয়ে চলমান ফ্যান্টাসি গল্প। এই গল্পটি আমার তুলনায় বেশ দুর্বল লেগেছে।
এক্লাকুন - মাচুপিচুর অজানা সংস্কৃতি, মানুষের লোভ, লৌকিক-অলৌকিকের দোলাচল। এটিও অতীত বর্তমান জুড়ে ফ্যান্টাসির চলাচল, কিন্তু এটি গল্প হিসাবে জমাটি।
মেডুসার মুক্তো – নেটিভ আমেরিকান গোষ্ঠীর মধ্যে গিয়ে পড়ে মুক্তোব্যবসায়ী কোম্পানির কর্মচারী এক যুবক। যে রহস্যময় মুক্তোর ছবি তাকে নিয়ে গেছিল সেখানে, কোথা থেকে আসে আসলে সেই অবিশ্বাস্য বড় সাইজের সুন্দর মুক্তোর মালা?
না, আর কিছু বলে দেব না। বরং বইটির দ্বিতীয় যে বৈশিষ্ট্য আমার বিশেষ করে পছন্দ হয়েছে, তা বলি – লেখকের পরিমিতিবোধ। আজকাল বহুক্ষেত্রেই দেখি, তন্ত্রমন্ত্র বা বডি হরর নিয়ে গল্প লিখলেই একগাদা বিকট লেভেলের ভয়াব��� জিনিসের অবতারণা করা হয়। একইসঙ্গে আরেক প্রবণতা হল আবেগপ্রধান ও ফেনিল বর্ণনার প্রকোপ। ব্যক্তিগতভাবে পাঠক হিসাবে এই দুটোই আমার বেজায় নাপসন্দ্। অতিরিক্ত বীভৎস রসের বর্ণনায় সেই ‘ব্রহ্মাস্ত্রের উপর পাটের দড়ি’ মার্কা ব্যাপার হয়ে যায়, পুরো অভিঘাতটাই লেবু অতিরিক্ত কচলে তেতো হয়ে বসে থাকে। তেমনি ক্ষণে ক্ষণে দীর্ঘ আবেগী বর্ণনা, সে যত সুন্দর ভাষায়, যত সাজানো গোছানোই হোক না কেন, থ্রিলারের গতি ও একমুখিনতার বারোটা বাজিয়ে দেয়। হিমাদ্রিবাবুর লেখা এই দুই দিক দিয়েই দারুণ সংযমের পরিচয় দেয়, তিনি সেটুকুই লেখেন যেটুকু পাঠকের চোখের সামনে দৃশ্যগুলো নিখুঁত ফুটিয়ে তোলে, তারপরও পাঠককে খোঁচা মেরে শিহরণ বা ইমোশন জাগানোর কোনও প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা তাঁর লেখায় অনুপস্থিত।
একইসঙ্গে বইয়ের যে দিকটা আমার কিঞ্চিৎ হতাশা জাগিয়েছে সেটিও বলি। এটির ভাষার চলন বড়ই সরল মনে হয়েছে আমার, যা কিশোরপাঠ্য লেখার ক্ষেত্রে হয়তো প্লাস পয়েন্ট, কিন্তু বড়দের লেখায় অধিকতর ভাষার লাবণ্য ও জটিলতর নির্মাণ বইয়ের সাহিত্যগুণ বৃদ্ধি করবে বলেই আমার ধারণা।
রহস্য রোমাঞ্চ বা ডার্ক – এই ধরণের লেখা যাঁদের ভালো লাগে, পড়ে দেখুন।
---
বই – জীবন্ত উপবীত লেখক – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত প্রকাশক – পত্রভারতী মুদ্রিত মূল্য – ২৪৯/-
হে রহস্যপ্রেমী পাঠক,আপনি কি সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত এমন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক বিষয়ের ওপর লিখিত বইয়ের সন্ধানে আছেন,যার প্রতিটি পাতায় রয়েছে আশাতীত রোমাঞ্চের হাতছানি?তবে,শুধু রোমাঞ্চে কি মন ভরে?এমন গল্প চান,যাতে চলমান শব্দরাজি আপনাকে অদ্ভুত এক ভয়াল পরিণতিতে টেনে নিয়ে যেতে চায়?বা,অভাবনীয় অথচ শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে থাকা একটা আতঙ্ক গ্রাস করে ফেলতে চায় আপনার সমগ্র সত্তাটুকু?তাহলে,এই বই আপনারই জন্য লিখিত।অপেক্ষা শুধু হাতে তুলে নেওয়ার।একটি উপন্যাস এবং সাতটি গল্পে সুসজ্জিত এই হার্ডকভার যে আপনারই পথ চেয়ে আছে। #উপন্যাস "জীবন্ত উপবীত" তন্ত্রসাধনা যে শিক্ষিত মানুষের জীবনকেও কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে,বদলে দিতে পারে চাওয়া-পাওয়া,ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা,তার সার্থক উদাহরণ এই লেখাটি। #গল্প ১)"রোলাং" বৌদ্ধধর্ম ও তার গোপন আচার অনুষ্ঠান যাদের আগ্রহের বিষয়,এ গল্প তাদের কাছে জহরত।তিব্বতী তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের শবসাধনার ওপর ভিত্তি করে লিখিত গল্পের ভয়াবহ পরিণতি মনকে বিষাদগ্রস্ত করে ফেলে,আর সেখানেই লেখকের কৃতিত্ব। ২)"বিল্লি মহল" আপাত সাধারণভাবে বহমান গল্পের মারাত্মক মোড় পরিবর্তন এবং অভিনব বিষয় নির্বাচন বিস্মিত করে। ৩)"প্রজাপতির পাখা" হ্যাঁ,দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মধ্যে এমনভাবে কল্পবিজ্ঞানকে মিশিয়ে দিতে এলেম লাগে বইকি!এ গল্প পড়ার পর মনে হয়,সত্যিই গল্পই ছিল তো! ৪)"মহাশোলের টোপ" মাছধরা ও মাছের টোপের ওপর অগাধ জ্ঞান রয়েছে আপনার?তা,সত্বেও সংকলনের এই সর্বজনপাঠ্য গল্পের ভয়ঙ্কর ট্যুইস্ট দেখে হতবাক হয়ে যাবেনই,এই গ্যারান্টি রইল। ৫)"বিপরীত বিহার" 'খাজুরাহো সুন্দরী'র পর প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গম ভাস্কর্য নিয়ে আরেকটি রোমহর্ষক গল্প।শেষে এর সাথে অতিপ্রাকৃত ঘটনা মিশে লেখাটিকে আরো জীবন্ত করে তুলেছে। ৬)"এক্লাকুন" প্রাচীন ইনকা নগরী 'মাচুপিচু'র প্রেক্ষাপটে অভিশপ্ত মমি,মন্দিরকে কেন্দ্র করে লিখিত গল্পের রহস্যোদঘাটন হলেও তা বড়ই মর্মান্তিক। ৭)"মেডুসার মুক্তো" সাদা পিংপং বলের সাইজের মুক্তোর খোঁজে ফ্লোরিডা থেকে হাইতিতে গিয়ে যে ভয়ঙ্কর অমানবিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হল মৃগাঙ্ক,তা পড়লে শিউরে উঠবেন আপনিও।তবে এই গল্পে ছাপার ভুলে সাপের বিষের প্রতিষেধক অ্যান্টিভেনমকে বারবার অ্যান্টিভেনাস পড়তে হয়েছে,যা অত্যন্ত বিরক্তি উদ্রেককারী,পত্রভারতীর থেকে এটা আশা করিনা।
সবমিলিয়ে,প্রত্যেকটি গল্পই এক সে বাঢ়কর এক।আর প্রচ্ছদেই বাজিমাত করা এমন জমজমাট সংকলন কালেভদ্রে একটা হাতে আসে।তাই দেরি না করে নানা স্বাদের ভয়ে শিহরিত হন আপনিও।যদিও ব্যাককভারে সতর্কবাণী রয়েছে,'রাতে পড়বেন না',তবুও নৈশপাঠের জন্যই শুভেচ্ছা রইল।
একটি উপন্যাস আর সাতটি ছোট গল্প নিয়ে এই "জীবন্ত উপবীত" বইটি। উপন্যাসের নামেই বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে। বইটি পড়ে বেশ মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে আমার। সব গল্প সমান ভাবে ভালো লাগেনি। উপন্যাসটাও বেশি জমজমাট লাগেনি আমার কাছে। বিল্লি মহল গল্পটাও একদম ভালো লাগেনি। সবথেকে ভালো লেগেছে ডায়েরি আকারে লেখা প্রজাপতির পাখা গল্পটি পড়ে, অনেকটা প্রফেসর শঙ্কুর ভাইব পেয়েছি। আর মেডুসার মুক্তো এই গল্পটিও বেশ লেগেছে। এছাড়াও মহাশোলের টোপ আর বিপরীত বিহার গল্প দুটিও সুন্দর। ইনকা সভ্যতার পটভূমিতে লেখা এক্লাকুন গল্পটি এভারেজ লেগেছে। ভূত-প্রেত, তন্ত্র-মন্ত্র, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী আর রহস্য; বিচিত্র সব বিষয়ের উপর লেখা এই গল্পগুলো। আর হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তর গল্পে শুধু কাহিনী না কাহিনীতে বর্নিত বিচিত্র বিষয় আর পূর্ব ইতিহাস নিয়েও আলোকপাত করা থাকে যার জন্য আমার ব্যাক্তিগত ভাবে হিমাদ্রি স্যারের লেখা পাঠ করতে ভালো লাগে। পত্র ভারতী থেকে প্রকাশীত বইয়ের প্রচ্ছদ আর ওভারঅল প্রোডাকশন উন্নতমানের। প্রতিটি গল্পের শুরুতে একটি করে সুন্দর চিত্র গল্পটির প্রতি পাঠকদের আকর্ষণ আরো বাড়াবে বলেই আমি মনে করি।
দুটো তিনটে গল্প পড়ার পর আর এগোতে ইচ্ছা হয়নি, জীবন্ত উপবিত এবং বিল্লি মহল এই দুই গল্পে যেভাবে বিড়াল নামক নিরীহ প্রানীকে খলচরিত্রের সঙ্গে একাত্ম করার বিরক্তিকর প্রচেষ্টা লেখক করেছেন, বর্তমান সমাজ এবং সময়, দুয়ের ক্ষেত্রেই যথেষ্ট বালখিল্যতার পরিচয় বহন করে।
অনেক সময় তথাকথিত ভালো বই হাতে নিলেও পড়া শেষ হয়ে ওঠে না | কিন্তু লেখকের ক্ষেত্রে সেই কথা একেবারেই প্রযোজ্য নয় | বই হাতে নিলে অজানার জানা না হওয়া পর্যন্ত নিস্তার নেই | বীভৎসতা , তন্ত্র , প্রতিহিংসা র মতন ভিন্ন ভিন্ন রসে টইটুম্বুর এই বই | কিছু চরিত্র লেখকের লেখনীর গুনে চোখের সামনে ভাসে ,বইয়ের পাতা ওল্টানোর সাথে সাথে আবার ভয়াল রসে গা ছম ছম করে ওঠে | এক বিচিত্র আনন্দের সুখময় সুপাঠ্য বই |