নাবিকদের নাকি বন্দরে বন্দরে স্ত্রী থাকে। স্ত্রী অর্থাৎ বন্দর-গণিকার দল। আর যে-বন্দরে গণিকালয় নেই, সে-বন্দর আসলে বন্দর-ই নয়! তাম্রলিপ্ত বা তমালিকা বন্দর তখন বাংলার প্রধান বন্দরের কৌলীন্য হারিয়েছে। তবু সেখানে কিছু বিদেশি জাহাজ তখনও এসে নোঙর করে। বাণিজ্যের জন্য নয়, বন্দরস্থিত এক গণিকালয়ের টানে। সেটা পরিচালনা করে মৎস্যগন্ধা নামের এক বন্দর-গণিকা। পর্তুগিজ নাবিক এস্তাদিওর জাহাজ একদিন এসে ভিড়ল সেই বন্দরে। তারপর?... মৃতপ্রায় তমালিকা বন্দরের গণিকালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক প্রেম-কাহিনি, একদিকে ভালোবাসা, অন্যদিকে ভয়ঙ্কর এক আখ্যান। ভাস্কো ডা গামার ভারত অভিযানের দুরন্ত সময়ের প্রেক্ষাপটে, তমালিকা বন্দরকে কেন্দ্র করে রচিত এই সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক উপন্যাস 'বন্দর সুন্দরী' শুধু নিছক উপন্যাস-ই নয়, উপন্যাসের মোড়কে বন্দর-গণিকাদের জীবনকাহিনির এক ঐতিহাসিক দলিল।
পর্তুগিজ উপনিবেশ স্থাপনের সময়কালে তাম্রলিপ্তি বন্দরের এক গণিকালয়ের গণিকা মৎস্যগন্ধা আর ভাস্কো ডা গামার একজন আত্মীয় এস্তাদিও যাকে তিনি একটি কাজে পাঠিয়েছিলেন এই বন্দরে, এই দুজনের তাদের পরিচয়, প্রেম কাহিনি এই বইটিতে রয়েছে। এই উপন্যাসে সে সময়কার বন্দরের পরিবেশ, মানুষের কাজকর্ম, চলাফেরা, ব্যবসা, স্বভাব,জাহাজে জাহাজে যুদ্ধের নৃশংসতা, বন্দরের গণিকালয়গুলোর ভেতরকারর পরিস্থিতির অনেক ডিটেইলস পাওয়া যায়। এমনকি দিল্লির হারেম সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম। এটি মূলত ঐতিহাসিক উপন্যাস। কিন্তু একই সাথে এটি প্রেম, সাসপেন্স, থ্রিলের ও অনুভূতি পাঠকে বোধ করায় বিভিন্ন পর্যায়ে। উপন্যাসে মৃচ্ছকটিকম্ নামের একটি সংস্কৃত নাটকের উল্লেখ আছে। যার মূল রচয়িতা ছিলেন 🌿৷ এই নাটকের মঞ্চায়ন গত মাসে রাবিতে নাট্যকলায় দেখেছি। সেই ঘটনা মনে পড়ছিলো। এই বইটা আমার খুব ভাল লাগলো।
#পাঠ_প্রতিক্রিয়া বন্দর সুন্দরী লেখক হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত পত্রভারতী মূল্য:৩৫০ টাকা
সম্প্রতি পড়ে শেষ করলাম হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তের এক অনবদ্য সৃষ্টি-বন্দর সুন্দরী। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ঐতিহাসিক প্রেমকাহিনী বলে মনে হলেও এই গল্প জুড়ে যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র , রহস্য কোনকিছুর অভাব ছিল না। ইউরোপ থেকে জলপথে ভারতে আসেন ভাস্কো দা গামা,ইতিহাস তাকে চেনে নাবিকের বেশে। বাস্তবে কি তিনি এতটুকুই? নাকি বনিকের বেশে কোন মূর্তিমান শয়তান, নিরীহ মানুষের প্রান নিতে যার অসি বিন্দুমাত্রও কাপে না? তবে এ গল্পের নায়ক অবশ্য ভাস্কোর সম্পর্কীয় এস্তাদিও দা গামা! আর নায়িকা? তাহলে তো গল্পের প্রেক্ষাপট কিছুটা বলতেই হয়। রোদ - বাদলে সমুদ্রের বুকে বয়ে বেড়ানো জাহাজ নাবিকদের বন্দরে বন্দরে ভার্যা থাকতো। আর কোন বন্দরের দর নির্ণয় হতো সেই বন্দরের গনিকালয়ের উপস্থিতির উপর। তেমনি এক ভাসমান গনিকালয় মৃচ্ছকটিক, রাতের অন্ধকারে বহু দূর থেকে আলোর সমাবেশে সে ভাসে। চোখের সামনে নিজের বাবার বীভৎস মৃত্যু দেখে বেড়ে ওঠা মৎস্যগন্ধার জীবন কালের আবর্তে হঠাৎ পরিনত হয় জাহাজ বনিতায়। বানিজ্য করতে আসা এস্তাদিও দি গামা বন্দর সুন্দরীর প্রনয়ে এডমিরালের আদেশ লঙ্ঘন করে, ফলে বিপদের ঘন্টা বেজে আসে তার জীবনেও। এই গল্পের চালিকাশক্তি একটি পুথি। কি এমন লেখা থাকতে পারে সাধারণ এক ব্যক্তির পুথিতে যা একান্ত গোপনেই রাখতে হবে?
সবমিলিয়ে গল্পটি আমার কাছে নিছক প্রেমের গল্প মনে হয়নি একেবারেই। গল্পটি বার বার মোড় নিয়েছে কখনো পুথির রহস্যে, কখনো নৃশংসতায়, কখনো বৌদ্ধমঠে , আবার কখনো একটি বানরকে কেন্দ্র করে! সবশেষে একটাই প্রশ্ন, পরিনতি পাওয়া প্রেমে ও কি আক্ষেপ - অনুতাপ থাকে? কেমন হয় এ গল্পের শেষ! অবশেষে, হলফ করে বলতে পারি হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তের তথ্যবহুল বন্দর সুন্দরী অবশ্যই সুখপাঠ্য!
ইতিহাস ও কল্পনা আশ্রিত জবরদস্ত একটা উপন্যাস পড়তে চাইলে ঝাঁপিয়ে পড়ুন এই বইটার ওপর, গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি। হিমাদ্রিকিশোর বাবুর ছোট গল্প আগে বেশ কয়েকটা পড়লেও ইচ্ছে ছিল ওনার দুটো বই পড়ে দেখার। প্রথমটা হল এই বন্দর সুন্দরী। পর্তুগীজ নাবিক ভাস্কো ডা গামার ভারত অভিযানের সমকালে কয়েকটা বিখ্যাত বন্দর নগরীর মধ্যে কালিকট, গোয়া আর তাম্রলিপ্ত বা তমালিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এইসব বন্দরের মান তখন নাবিকরা নির্ধারণ করতেন বন্দর সংলগ্ন গণিকালয় দেখে। "নাবিকদের নাকি বন্দরে বন্দরে স্ত্রী থাকে। স্ত্রী অর্থাৎ বন্দর-গণিকার দল। আর যে বন্দরে গণিকালয় নেই, সে বন্দর আসলে বন্দর-ই নয়। এই বন্দর সুন্দরীরা ঘরছাড়া নাবিকদের রোদে-পোড়া, সমুদ্রের নোনা বাতাসে রুক্ষ দেহকে তৃপ্ত করে, কখনও বা হয়তো তাদের মনকেও।" তমলুকের এমনই এক গণিকালয়ের অপূর্ব সুন্দরী পরিচালক মৎস্যগন্ধা আর পর্তুগীজ নাবিক এস্তাদিও-র প্রেমের গল্প ঘিরে এই উপন্যাস, যার প্লট নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন আমাদের সবার জানা দুঃসাহসী পর্তুগীজ নাবিক, অভিযাত্রী, পর্যটক, আবার কারও মতে এক ছদ্মবেশী জলদস্যু ভাস্কো ডা গামা।
পত্রভারতীর বইয়ের হার্ডকভার বাইন্ডিং, পাতার কোয়ালিটি, ফন্ট সাইজ, ওজন - এইসব নিয়ে আর নতুন করে বলার কিছুই নেই। এক কথায় বইটা হাতে নিলেই একটা সুন্দর অনুভূতি আসবে। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন রঞ্জন দত্ত। ছিমছাম কভার চোখ টানে, তবে আর একটু ক্রিয়েটিভিটির ছাপ রাখা যেত মনে হল। তবে এই বইয়ের প্রধান আকর্ষণ কন্টেন্ট, সেইকারণেই মনে হয় প্রকাশক প্রচ্ছদে বেশি গুরুত্ব দেননি। ৩৫০ টাকা মূল্য দেখে অনেকেই চমকে যেতে পারেন। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, পুরো পয়সা উসুল!
নানা দেশের নানা জাতির প্রায় চারশোজন নারীকে নিয়ে সমুদ্রের বুকে অবাধে বিচরণ করে ভাসমান গণিকালয় "মৃচ্ছকটিক"। কোনও জলদস্যুই এই জাহাজকে আক্রমণ করে না৷ বরং এই ময়ূরপঙ্খীর সামনে বসানো সোনালি গিল্টি করা ময়ুরের উঁচু লম্বা গলা দেখতে পেলেই অন্য জাহাজের ঘরছাড়া নাবিকরা উল্লাসে মেতে ওঠে। তাদের দেহের তৃষ্ণা মেটায় স্বয়ম্ভুনাথের জাহাজ "মৃচ্ছকটিক"। এই জাহাজ থেকেই একদিন স্বয়ম্ভুনাথ দেখতে পেলেন জলের মধ্যে ভেসে আসছে সিন্দুকের মতো একটা কাঠের বাক্স। কী ছিল সেই বাক্সে? জানতে হলে পড়ে ফেলুন এই বই। একবার ধরলে আর রাখা দুঃসাধ্য। "এরপর কী হবে" - এই প্রশ্ন একের পর এক ঘটনার বর্ণনায় পাঠকের মনে দানা বাঁধবে। এই উপন্যাসকে পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বলা না গেলেও সেই উপাদান এর মধ্যে আছে, এবং গল্পের প্রয়োজনেই লেখক অপূর্ব সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন সেইসব দৃশ্যপট।
ইতিহাসকে বিকৃত না করেও যে এমন এক ড্রামাটিক উপন্যাস সাবলীল ভাষায় লেখা যায়, তা এই সুদক্ষ লেখকের দ্বারাই সম্ভব। ভূমিকা থেকে জানতে পারলাম এই ঐতিহাসিক থ্রিলারের জন্য তথ্যসংগ্রহে লেখককে সাহায্য করেছেন এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশনা বিভাগের প্র��ক্তন প্রধান, ইতিহাস গবেষক ও সুলেখক শ্রী নির্বেদ রায় এবং আরও কয়েকজন সাহিত্যিক ও গবেষক। যেমন ডিটেলিং, তেমনই পাঠককে ধরে রাখার ক্ষমতা লেখকের। দুর্দান্ত লাগল প্রথম থেকে শেষ অবধি। মনে হল একটা সিনেমা দেখলাম। উপন্যাসের মোড়কে বন্দর-গণিকাদের জীবনকাহিনীর এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রইল এই বইটা। সবাইকে অনুরোধ করব একবার পড়ে দেখুন। লেখকের আর এক বই "খাজুরাহো সুন্দরী" পড়ার ইচ্ছে বিশাল বেড়ে গেল। ২০১৮ এর বইমেলায় বেস্টসেলার "জীবন্ত উপবীত" পড়ে ফেলেছি ইতিমধ্যেই, রিভিউ দেবো খুব শীঘ্রই।
ইতিহাস নির্ভর বই পড়তে সব সময় ভালো লাগে। তাই সদ্য পরে শেষ করলাম বন্দর সুন্দর। কালের গর্ভ থেকে ক্যালিকাটি ও তাম্রলিপ্তি বন্দর , জাহাজ , বাজার ,পরিবেশ , মানুষজন সব ছবির মতো ফুটিয়ে তুলেছে লেখক , তথ্যের বাড়বাড়ন্ত কখনোই মনে হয়ে নি। মানব প্রেম , পশু প্রেম , বৌদ্ধধর্ম , যুদ্ধ সব মিলিয়ে বেশ সুখপাঠ্য বই, শুধু একটাই অভিযোগ খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলো।