#বন্দর_সুন্দরী
লেখক ~ হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
প্রকাশক ~ পত্রভারতী
মূল্য ~ ৩৫০ টাকা
ইতিহাস ও কল্পনা আশ্রিত জবরদস্ত একটা উপন্যাস পড়তে চাইলে ঝাঁপিয়ে পড়ুন এই বইটার ওপর, গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি। হিমাদ্রিকিশোর বাবুর ছোট গল্প আগে বেশ কয়েকটা পড়লেও ইচ্ছে ছিল ওনার দুটো বই পড়ে দেখার। প্রথমটা হল এই বন্দর সুন্দরী। পর্তুগীজ নাবিক ভাস্কো ডা গামার ভারত অভিযানের সমকালে কয়েকটা বিখ্যাত বন্দর নগরীর মধ্যে কালিকট, গোয়া আর তাম্রলিপ্ত বা তমালিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এইসব বন্দরের মান তখন নাবিকরা নির্ধারণ করতেন বন্দর সংলগ্ন গণিকালয় দেখে। "নাবিকদের নাকি বন্দরে বন্দরে স্ত্রী থাকে। স্ত্রী অর্থাৎ বন্দর-গণিকার দল। আর যে বন্দরে গণিকালয় নেই, সে বন্দর আসলে বন্দর-ই নয়। এই বন্দর সুন্দরীরা ঘরছাড়া নাবিকদের রোদে-পোড়া, সমুদ্রের নোনা বাতাসে রুক্ষ দেহকে তৃপ্ত করে, কখনও বা হয়তো তাদের মনকেও।" তমলুকের এমনই এক গণিকালয়ের অপূর্ব সুন্দরী পরিচালক মৎস্যগন্ধা আর পর্তুগীজ নাবিক এস্তাদিও-র প্রেমের গল্প ঘিরে এই উপন্যাস, যার প্লট নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন আমাদের সবার জানা দুঃসাহসী পর্তুগীজ নাবিক, অভিযাত্রী, পর্যটক, আবার কারও মতে এক ছদ্মবেশী জলদস্যু ভাস্কো ডা গামা।
পত্রভারতীর বইয়ের হার্ডকভার বাইন্ডিং, পাতার কোয়ালিটি, ফন্ট সাইজ, ওজন - এইসব নিয়ে আর নতুন করে বলার কিছুই নেই। এক কথায় বইটা হাতে নিলেই একটা সুন্দর অনুভূতি আসবে। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন রঞ্জন দত্ত। ছিমছাম কভার চোখ টানে, তবে আর একটু ক্রিয়েটিভিটির ছাপ রাখা যেত মনে হল। তবে এই বইয়ের প্রধান আকর্ষণ কন্টেন্ট, সেইকারণেই মনে হয় প্রকাশক প্রচ্ছদে বেশি গুরুত্ব দেননি। ৩৫০ টাকা মূল্য দেখে অনেকেই চমকে যেতে পারেন। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, পুরো পয়সা উসুল!
নানা দেশের নানা জাতির প্রায় চারশোজন নারীকে নিয়ে সমুদ্রের বুকে অবাধে বিচরণ করে ভাসমান গণিকালয় "মৃচ্ছকটিক"। কোনও জলদস্যুই এই জাহাজকে আক্রমণ করে না৷ বরং এই ময়ূরপঙ্খীর সামনে বসানো সোনালি গিল্টি করা ময়ুরের উঁচু লম্বা গলা দেখতে পেলেই অন্য জাহাজের ঘরছাড়া নাবিকরা উল্লাসে মেতে ওঠে। তাদের দেহের তৃষ্ণা মেটায় স্বয়ম্ভুনাথের জাহাজ "মৃচ্ছকটিক"। এই জাহাজ থেকেই একদিন স্বয়ম্ভুনাথ দেখতে পেলেন জলের মধ্যে ভেসে আসছে সিন্দুকের মতো একটা কাঠের বাক্স। কী ছিল সেই বাক্সে? জানতে হলে পড়ে ফেলুন এই বই। একবার ধরলে আর রাখা দুঃসাধ্য। "এরপর কী হবে" - এই প্রশ্ন একের পর এক ঘটনার বর্ণনায় পাঠকের মনে দানা বাঁধবে। এই উপন্যাসকে পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বলা না গেলেও সেই উপাদান এর মধ্যে আছে, এবং গল্পের প্রয়োজনেই লেখক অপূর্ব সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন সেইসব দৃশ্যপট।
ইতিহাসকে বিকৃত না করেও যে এমন এক ড্রামাটিক উপন্যাস সাবলীল ভাষায় লেখা যায়, তা এই সুদক্ষ লেখকের দ্বারাই সম্ভব। ভূমিকা থেকে জানতে পারলাম এই ঐতিহাসিক থ্রিলারের জন্য তথ্যসংগ্রহে লেখককে সাহায্য করেছেন এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশনা বিভাগের প্রাক্তন প্রধান, ইতিহাস গবেষক ও সুলেখক শ্রী নির্বেদ রায় এবং আরও কয়েকজন সাহিত্যিক ও গবেষক। যেমন ডিটেলিং, তেমনই পাঠককে ধরে রাখার ক্ষমতা লেখকের। দুর্দান্ত লাগল প্রথম থেকে শেষ অবধি। ��নে হল একটা সিনেমা দেখলাম। উপন্যাসের মোড়কে বন্দর-গণিকাদের জীবনকাহিনীর এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রইল এই বইটা। সবাইকে অনুরোধ করব একবার পড়ে দেখুন। লেখকের আর এক বই "খাজুরাহো সুন্দরী" পড়ার ইচ্ছে বিশাল বেড়ে গেল। ২০১৮ এর বইমেলায় বেস্টসেলার "জীবন্ত উপবীত" পড়ে ফেলেছি ইতিমধ্যেই, রিভিউ দেবো খুব শীঘ্রই।
© অরিজিৎ গাঙ্গুলি