সমাজে যে দ্বৈত মানদন্ডে নারীর মূল্যায়ন হয় তার দৃপ্ত প্রতিবাদ - ‘সারা’। জীবনে প্রবঞ্চিত, প্রতারিত হয়ে সালেহারা আত্মহননের পথ বেছে নেয়, সাকিনারা নির্যাতিতা, নিপীড়িতা হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরে; কিন্তু সারা জীবনের বঞ্চনাকে দু’পায়ে দলে মাথা তুলে দাঁড়ায়, সংগ্রামে হয় ঋজু। আত্মপ্রত্যয়ে হয় অনমনীয়, প্রতিবাদে হয় প্রখর, মমতায় হয় মহীয়সী। সে সুন্দরী, শিক্ষিতা, সাহসী। স্বাধীন অস্মিতা ও দুর্বার মনোবল নিয়ে সে সমাজের বাধার প্রাচীর ভেঙ্গে দেয়ার সংগ্রামে ব্রতী হয়। জীবনের পাঠ নিয়ে সে এগিয়ে যায়, কেননা সে জানে কোন প্রতিকূলতায় জীবনের বহমান স্রোত থেমে থাকে না। নিরবধি গতিই তার পরিণতি। সমাজে নির্যাতিত, অবহেলিত, প্রতারিত হাজার নারীকে মাথা তুলে দাঁড়াবার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে যে একজন নারীর প্রয়োজন - সারা তারই প্রতিভূ। তার তিক্ত কষায়, অম্ল মধুর জীবনেরই আলেখ্য - আমলকির মৌ।
দিলারা হাশেমের জন্ম ২৫ আগস্ট ১৯৩৬ সালে, যশোরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে ইংরেজী সাহিত্যে বি. এ. অনার্স ও ১৯৫৭ সালে এম. এ. সম্পন্ন করার আগে থেকেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছোট গল্প লেখার মধ্য দিয়ে সাহিত্য জীবন শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ঘর মন জানালা’, যা পাঠক ও সমালোচক মহলে বিপুল সমাদর পায়। পরবর্তীতে এই গ্রন্থটি রুশ ও চীনা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ‘ঘর মন জানালা’ ১৯৭৩ সালে চলচ্চিত্র হয়েও মুক্তি পায়। উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্যে ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৭২ সাল থেকে আমেরিকায় বসবাস শুরু করেন। প্রবাসী হয়েও লেখিকা বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর শেকড়ের টান অক্ষুন্ন রেখে নিরবচ্ছিন্নভাবে বাংলা সাহিত্য চর্চ্চা করে গেছেন। ইতালি, ফ্রান্স, হল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানী, চেকোস্লোভাকিয়াসহ ইউরোপের বহু দেশ এবং চীন, জাপান ও কমিউনিস্ট শাসনামলে সোভিয়েট ইউনিয়ন সফরকারী লেখিকার সাহিত্যে চরিত্র ও বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য পাঠককে আকৃষ্ট করে; তবে তিনি মূলত নগর জীবন ও বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশার ছবিটিই তুলে আনেন। ১৯৮২ সালে ভয়েস অব আমেরিকায় যোগ দেন। অবসরে যান ২০১১ সালে। ২০ মার্চ ২০২২ সালে ৮৬ বছর বয়সে ওয়াশিংটনের নিজ বাসায় মৃত্যু হয় দিলারা হাশেমের।
আমলকীর মৌ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই লেখা। বইটির প্রকাশকাল ১৯৭৮। রাজনৈতিকভাবে চরম অস্থিরতার ভেতর এটি রচিত হলেও, এটি কোনোভাবেই তথাকথিত রাজনৈতিক উপন্যাস নয়। উপন্যাসিক দিলারা হাশেম কৌশলে ও সচেতনভাবেই ঐ সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে এড়িয়ে সামাজিক-পারিবারিক জীবনকে তিনি উপজীব্য করে তুলেছেন এই উপন্যাসে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে যারা হাফ ছেড়ে বসেছেন কেবল তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দিলারা দেখিয়ে দিলেন একটা যুদ্ধের মিমিংসা হতে এখনো বাকী, সে যুদ্ধ হল নারী স্বাধীনতার যুদ্ধ কিংবা আরও ব্যাপকভাবে বললে, মানবতার মুক্তির যুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হল, নারী স্বাধীন হয়েছে কি? মুক্ত হতে পেরেছে কি সমাজের বোধ-বুদ্ধি? এসব প্রশ্ন নিয়েই যেন হাজির হল আমলকীর মৌ। দিলারা হাশেম দেখিয়ে দিলেন, পুরুষকেন্দ্রিক সভ্যতাসৃষ্ট এথিকস, ভ্যালুস, ল- সর্বপরি একটি আপাদমস্কক সমাজ ব্যবস্থা- তার হাতে যেমন নারীরা বন্দি, বন্দি তেমন পুরুষরাও। একটু আগে আমি যে এটাকে অরাজনৈতিক উপন্যাস বললাম এখন সেটা ফিরিয়ে নিচ্ছি। আমলকীর মৌ চরমভাবে রাজনৈতিক একটি উপন্যাস। এখানে একজন গেরিলা যোদ্ধার মতো একজন নারী যোদ্ধা যে জীবনযুদ্ধ শুরু করেছেন সেই যুদ্ধকে কোনভাবেই কোনও মহান যুদ্ধের চেয়ে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। ঐ নারীর জীবনযুদ্ধের সাথে জড়িয়ে আছে কোটি কোটি প্রাণের মুক্তি। এবং এই প্রাণ শুধু নারীদের নয়, পুরুষদেরও।