এই বইমেলায় আমি শুধু থ্রিলার উপন্যাসগুলো সংগ্রহ করেছিলাম। তার মাঝে কিভাবে যেন এই উপন্যাসটা ঢুকে গিয়েছিল। আমি আসলে জানতামও না যে এটা থ্রিলার না, সামাজিক উপন্যাস। যাই হোক ছুটিতে এসে মেঘলা আকাশের নিচে উঠোনে বসে পড়ছিলাম উপন্যাসটা। পড়তে পড়তে দেখি আমার মনের ভাবটা টের পেয়ে যেন আকাশটাও বদলে যাচ্ছিল একটু একটু করে। শেষ করতে করতে এক পশলা বৃষ্টি রাঙিয়ে গেল চারপাশ। ঠিক আমার বিষন্ন মনটার মত মুখ ভার করে। এখনো তাই রয়ে গেছে, আমার মতই মন খারাপের মিশেলে কালো হয়ে।
লেখকের এটাই প্রথম লেখা পড়া আমার। কেমন যেন একটা ছায়া পেলাম জনপ্রিয় আরেকজন প্রয়াত উপন্যাসিকের। হয়ত আমার মনের ভুল, হয়তোবা কিছুটা আছে। তবে কালে কালে লেখক আরো পোক্ত হবেন তার আভাস এখনি পাওয়া যাচ্ছে। যথেষ্ট গোছানো আর ছন্দময় লেখা। লেখার বাঁকে বাঁকে কিছুটা রাজনৈতিক বা অন্ধকার জগতের আভাসও পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে ভালো লাগা- মন্দ লাগার একটা ছন্দমধুর লেখনি। ভালো লাগবে আশা করি সবার।
চরিত্রগুলো একটাও অচেনা মনে হয়নি। সবাই কেমন যেন একটা আপন আপনে ঘেরা ছিল। বিশেষ করে মা শাপলা চরিত্রটা এখানে অনেক আপন লেগেছে। ঠিক যেন আমার নিজের মা, যে কিনা সব সুখ দুঃখে আগলে রাখে পরিবারটাকে।
শেষটায় একটু দোষত্রুটি না বললেই না। আদী প্রকাশনির বইগুলো মান হারাচ্ছে দিনকে দিন। অসম্ভব সুন্দর একটা প্রচ্চদ আছে বইটার। কিন্তু প্রথম পৃষ্ঠা উল্টালেই একই সাথে মন ভালো আর খারাপ দুটোই হয়ে যায়। এত সুন্দর বইটার পাতাগুলো কিন্তু কী বাজে আর যাচ্চেতাই বাধাই। এই বাধাইয়ের জন্য বইটা দু-এক বার পড়লেই পৃষ্ঠা খুলে চলে আসবে। সাথে চাপের জন্য পৃষ্ঠাগুলোর আঁকাবাঁকা হয়ে যাওয়া তো আছেই। আর দামটাও তুলনামূলকভাবে একটু বেশি। তবে সেটা দামী এবং ভালো কাগজ দেবার জন্য হতে পারে। কিন্তু বাধাইয়ের ব্যাপারটাও বিবেচনায় রাখা উচিত।
লেখকের সাথে আমার প্রথম পরিচয় 'পদ্ম বলে, এসো' এর মাধ্যমেই। প্রথমেই কিছু কথা বলে নিই। এই গল্পে আপনি মূল চরিত্র হিসেবে কাকে ধরবেন? অন্যায়ের সাথে আপোষ না করে টিকে থাকতে চাওয়া অপুর, নাকি নতুন জীবনে প্রবেশ করে ধুঁকতে থাকা এক সময়ের দোর্দন্ড প্রভাব ও প্রতাপশালী মাহতাব? দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে 'ক্রাইং নিড' হিসেবে জাগরণের শাফকাত নাকি ছেলেবেলায় বিভীষিকাময় এক পরিস্থিতির সাক্ষী হওয়া আদিলের? রেণুর গল্পটা শুনলে আপনি ভুগতে থাকবেন অব্যক্ত এক আর্তনাদে। বিভিন্ন চরিত্রকে যত্ন নিয়ে সাজিয়ে দেয় রেণু। কিন্তু নিজের জীবনটাই যে সাজাতে পারলো না বেচারী! স্বামীর জন্য লুতফার চাওয়া খুব বেশী কিছু না। শুধু গোসলের পর তোয়ালেটা যেন একটু এগিয়ে দিতে পারে আদিলকে। সেটুকুও কি পূরণ হবে না তার? সবকিছু পেছনে ফেলে সামনের দিকে চলছে মল্লিকা। কিন্তু এটা কি ওর নতুন জীবনের শুরু নাকি অযথাই নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে নেয়া। চোখের জলের মূল্য চুকাতে গিয়ে রেণুর সাথে বড় অন্যায় করেছে মেয়েটা- পড়তে গিয়ে মানতেই হবে আপনার। অনেকদিন, অনেকদিন পর একটা চমৎকার সামাজিক উপন্যাস পড়লাম। মনের একটা ক্ষুধা মেটালেন যেন রাফিউজ্জামান সিফাত। রেটিং চাইলে বলব আমার পক্ষ থেকে লেখক পাচ্ছেন ৮.২/১০। তবে ভবিষ্যতের পাওয়াটা যেন এর চাইতেও বিশাল হয়, গভীর হয়। মানবীয় আবেগ ছোট ছোট বাক্যে সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলার জন্য লেখকের মুনশিয়ানাকে কৃতিত্ব দিতেই হচ্ছে। তবে কিছু জিনিস দৃষ্টিকটু। গতিশীল গাড়িটা যখন একটা স্পিডব্রেকারের মুখোমুখি হয়, ছন্দপতনটা আরোহীদের ভালো লাগে না। একটু অস্বস্তিবোধ হয় বৈকি! বেশ কিছু বানান ভুল চোখে পড়েছে। পড়তে পড়তে তাই কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক করেছে। বাকিটা বেশ মসৃণ গতিতেই চলেছে। পদ্মের কথায় কেউ আসতে পারলো নাকি না, সেটা পাঠকেরাই যাচাই করে নেবেন। লেখকের প্রতি শুভকামনা।
ঘোর লাগা গল্প। " শহরের ফুলের দোকানীরা যদি মন খারাপ করে থাকে তবে বুঝে নিও রেণু আজ শহরেরও মন খারাপ " " সম্পর্কপর মূল্য বুঝতে আমরা আনাড়ি। জীবনটাইতো কেটে যায় সম্পর্কের মূল্য বুঝতে। তারপরও বুঝা হয়ে উঠে না। একটা জীবন হয়ত সম্পর্ক বুঝে উঠার জন্য খুব কম " মনে ধরেছে :') প্রচ্ছদ এক অন্যরকম ভালো লাগা দেয়। . "সুঁই" এর ব্যাপারটা আমার কাছে প্রচন্ড রকম বাজে লেগেছে। বর্তমানে এসব ছোট ছোট থেকেই বড় পরিণতি গুলো দেখি। তাই এসব অনুপ্রাণিত না করাই ভালো। . আর ধন্যবাদ অটোগ্রাফের জন্য :)
মনে হল যেন অনেকদিন পর টানা ঘোরের মধ্যে থেকে একটা উপন্যাস পড়লাম। এ শহরের কোটি মানুষের মধ্যে মোটাদাগে দুটো পরিবারের প্রাত্যহিক জীবন নিয়ে লেখা এই উপন্যাস আসলে কোন জনরায় পড়বে? কোথায় যেন শুনেছি প্রেম সফল হয়ে গেলে তা নিয়ে উপন্যাস হয় না, উপন্যাস হয় ব্যর্থ প্রেম নিয়ে। অপু - রেণু, আদিল - লুৎফা কিংবা মল্লিকা, শাফকাতের গল্পে যে প্রিয় মানুষ থেকে দূরে থাকবার হাহাকার, হারিয়ে ফেলবার যন্ত্রণা কিংবা কাছে না পাবার আর্তনাদ, তাতে যেন একে যেন কোন বিরহের, প্রেমের উপন্যাসই মনে হয়!
আসলে কি তাই? রেণু অপুর ছোট্ট সংসারে যে বুনোর প্রেমের গল্প, লুৎফা আদিলের মাঝে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা, তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগের যে মন্ত্র, আমার মত যারা "এধরণের" ভালোবাসার কাঙাল তাদের বুকে যে তা কী বিশাল হাহাকারের ঢেউ তোলে, কী বিষাদের করুণ সুর বাজায় তা আমরা মাত্রই জানি।
এ উপন্যাসে নেই কোন একক চরিত্রের গল্প কিংবা মহানায়কচিত বীরত্ব। নেই বিত্তের চাকচিক্য, অর্থের ঝনঝনানি। আছে মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প, আছে ভালোবাসা, প্রেম, বিচ্ছেদ, সংসার, সমাজ-রাজনীতি। সব মিলিয়ে এক আটপৌরে উপন্যাস, সুখপাঠ্য অবশ্যই।
আমার পড়া রাফিউজ্জামান সিফাতের প্রথম বই এটি। অনেকেই লেখায় হুমায়ূন আহমেদের লেখার বড়সড় ছোঁয়া পেয়েছেন, আমার কাছে অমন মনে হয়নি। হুমায়ুন আহমেদ কিংবদন্তি, উনার ছায়া তার পরের জেনারেশনের অনেকের মাঝে থাকবে সেটা স্বাভাবিক। হয়ত সামান্য ছায়া আছে তবে তা কোনভাবেই লেখকের নিজস্বতা, স্বকীয়তা ফুটে উঠবার পথে অন্তরায় বলে মনে হয়নি অন্তত আমার মনে হয়েছে।
এই উপন্যাস কি ফ্ল-লেস বা নির্ভুল? মোটেও না, টুকটাক অনেক জায়গায় অসামাঞ্জস্য লেগেছে, কিছু অংশ মনে হয়েছে না থাকলেও কাহিনীর কিছু আসত যেত না। কিন্তু তা নেহায়েতই টুকটাক, যৎসামান্য। সেটুকুকে আমি বেনিফিট অফ ডাউট দিতেই চাই, কারণ অনেক অনেকদিন পর এক হাসিকান্নামাখা যাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল আমাকে - পদ্ম বলে, এসো। চেয়েছিলাম এক বসায় পড়ে ফেলবো, ব্যস্ত জীবনের পাল্লায় পরে পারিনি, দুদিন তিনরাত লেগেছে। ���েষ করে কেমন শুন্য হয়ে থমকে ছিলাম, চরম হাহাকারের ভেতরে আবিষ্কার করেছিলাম নিজেকে, ইচ্ছে করছিল কাউকে প্রাণ খুলে বলে কী দারুণ একটা বই-ই না শেষ করলাম মাত্র! খুব কষ্টে নিজেকে দমন করেছি ফোনটা হাতে তুলে নেওয়া থেকে। প্রিয় ব্যান্ড Def Lepperd এর একটা গানের লিরিকের মত করে বলতে হয়, I got your number on my wall, but I ain't gonna make that call. Cause divided we stand babe united we fall. কোন বই যদি আপনাকে এই লেভেলের ইমোশনাল টাচ দিতে পারে, তবে তাকে বেনিফিট অফ ডাউট দেওয়াই যায়!
* বইয়ের প্রচ্ছদটা চমৎকার, বই পড়ার আগ্রহ অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয় এমন প্রচ্ছদ। বাঁধাই, পৃষ্ঠা, প্রিন্ট সবই বেশ মনকাড়া। অবশ্য সেটি স্পেশাল অর্ডার দিয়ে প্রকাশকের কাছ থেকে সরাসরি ইথার ভাই ম্যানেজ করেছেন বলেই কী না জানি না। কিন্তু হাতে ধরে পড়ে বেশ আরাম পাওয়া গিয়েছে। * এই বইয়ের নাম পদ্ম বলে, এসো কেন? এই প্রশ্ন মাথায় এসেছিল, বই পড়ে জবাব পাইনি। লেখককে গুডরিডসে টুকটাক এক্টিভ দেখে এই প্রশ্ন রেখে গেলাম!
দুইজনের সম্পর্কের ছাড়াছাড়ি দিয়ে শুরু করে একেবারে স্বৈরাচিরী সমাজের এক বিচিত্র চিত্র তুলে ধরেছেন সিফাত ভাই। একে একে একেছেন কয়েকটা জীবন আর তাদের জীবন-ধারা। যেখানে আছে একই সাথে বাস্তব সমাজের নিউ ট্রেন্ড থেকে শুরু করে আমাদের ডিএনএ-তে পোক্ত জায়গা করে নেয়া স্বভাবগত ভুল গুলো। যে ভুলের ফলেই আজ আমাদের সমাজ এমন দোষিত আর বিষাক্ত।
আধা পড়া হয়েছে, আর একদিন হুট করেই হারিয়ে ফেললাম বইটা। কোথায় রেখে এসেছি তাই মনে পড়ল না আর। আসলে আপু নামের সাথে আমার সম্পর্ক গুলো এমনই হয়। হোক সেটা বই কিংবা মানুষ। একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, অপু নামটা যেন একটা মন্দ ভাগ্য বা অদ্ভুত স্বভাবের কারো নামই হয়। অনন্ত আমার নজরে পড়া অপুদের বেলায় এমনটাই দেখেছি। এদের সত্য মিথ্যাগুলো শুধু মাত্র এদের কাছেই থাকে। বাকিরা আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে আর গোসিপ বানিয়ে তুন্দুল রুটির মতো ফুলে উঠে সাহায্য করে শুধু। অদ্ভুত খামখেয়ালীপনা আর স্বাভাবের এই আপুরাই কেনও যে আমার এত প্রিয় আমি জানি না। প্রতিবারই আপুরা আমাকে কাঁদিয়েছে, হাসিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় যেটা করেছে, তা হলো আমাকে শিখিয়েছে। হ্যা শিখিয়েছে। আজ আমি যা তা কোনও এক অপুরই প্রতিচ্ছবি। কে সেই অপু? সে আমার গোপন।
বই- পদ্ম বলে, এসো লেখক- রফিউজ্জামান সিফাত ধরন- সামাজিক উপন্যাস রেটিং- ২/৫
🌻সার-সংক্ষেপ একটা পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের জীবন ও পারিপার্শ্বিক বিষয় নিয়ে কাহিনী আবর্তিত হয়। চরিত্রগুলো যেন সব পরিচিত, আশেপাশের। খুব আটপৌরে গল্প, উচ্চ বিত্তের ঝলক নেই, উচ্চমর্গীয় সার্কাজম নেই, নেই নায়োকেচিত বীরত্ব। এই সাধারণের মাঝেই কাহিনীটি গোছানো শব্দের বুননে অগ্রসর হয়েছে। ভালোবাসা, প্রেম, বিচ্ছেদ, সংসার, সমাজ-রাজনীতির একটা সুন্দর সংমিশ্রণ।
উপন্যাসে মূল চরিত্র নির্ধারণ করা কষ্টসাধ্য। একেকটা চরিত্রের বিশেষত্ব একেক দিকে। আবার সব মিলালে খুব সাধারণ। রেণুর গল্পটা শুনলে বুকের মধ্যে কি যেন একটা জমাট বাধা অনুভূতি আসবে। বিভিন্ন চরিত্রকে যত্ন নিয়ে সাজিয়ে দিলেও নিজের জীবনটাই যে সাজাতে পারলো না, বেচারী! আবার লুতফার সামান্য চাওয়া, স্বামীকে গোসল শেষে তাঁতের গামছাটা তুলে দেওয়া, যেন দুর্গম পাহাড় জয়ের চেয়েও কঠিন। সমাজের অন্যায়ের সাথে অপুর লড়ে চলার দৃঢ় প্রত্যয়, স্বপ্নবাজ শাফকাত, জীবনের এপিঠ ওপিঠ দুই চিত্র ধরে ফেলা মাহতাব সাহেব, সব চরিত্র আপনাকে একটা সুন্দর গল্প দেবে।
📑পাঠ পতিক্রিয়া- তবে কিছু জিনিস দৃষ্টিকটু। কাহিনী কিছু জায়গায় অকারণে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। হূমায়ন আহমেদের লেখার ছাপ খুবই প্রকট। এক জায়গায় প্রায় হুবুহু কপি পেয়েছি। যদি আপনার হূমায়ন আহমেদ বেশ পড়া থাকে না পড়ার সাজেশন থাকবে। কারণ একই জায়গা আপনি ভ্রমণ করতে পছন্দ করবেন না নতুনত্ব আশা করে।