বিলাসী শরৎচন্দ্রের অন্যতম জনপ্রিয় ছোটগল্প। গল্পটি হতে কিছু হাস্যরসাত্মক উক্তিগুলো উত্থাপন করা যাক:
"যে ছেলেদের সকাল আটটার মধ্যে বাহির হইয়া যাতায়াতের চার ক্রোশ পথ ভাঙিতে হয় (চার ক্রোশ মানে আট মাইল নয়, ঢের বেশি) বর্ষার দিনে মাথার উপর মেঘের জল পায়ের নিচে এক হাঁটু কাদা এবং গ্রীষ্মের দিনে জলের বদলে কড়া সূর্য এবং কাদার বদলে ধুলার সাগর সাঁতার দিয়া স্কুল ঘর করিতে হয়, সেই দুর্ভাগা বালকদের মা-সরস্বতী খুশি হইয়া বর দিবেন কি, তাহাদের যন্ত্রণা দেখিয়া কোথায় যে তিনি লুকাইবেন, ভাবিয়া পান না"।
"কার বাগানে আম পাকিতে শুরু করিয়াছে, কোন বনে বঁইচি ফল অপর্যাপ্ত ফলিয়াছে, কার গাছে কাঁঠাল এই পাকিল বলিয়া, কার মর্তমান রম্ভার কাঁদি কাটিয়া লইবার অপেক্ষামাত্র, কার কানাচে ঝোপের মধ্যে আনারসের গায়ে রং ধরিয়াছে, কার পুকুরপাড়ের খেজুরমেতি কাটিয়া খাইলে ধরা পড়িবার সম্ভাবনা অল্প, এই সব খবর লইতেই সময় যায়, কিন্তু আসলে যা বিদ্যা— কামস্কাটকার রাজধানীর নাম কী এবং সাইবেরিয়ার খনির মধ্যে রূপা মেলে না সোনা মেলে- এসকল দরকারি তথ্য অবগত হইবার ফুরসতই মেলে না। কাজেই এক্সামিনের সময় এডেন কী জিজ্ঞাসা করিলে বলি পারশিয়ার বন্দর, আর হুমায়ুনের বাপের নাম জানিতে চাহিলে লিখিয়া আসি তোগলক খাঁ। তারপর প্রমোশনের দিন মুখ ভার করিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া কখনোবা দল বাঁধিয়া মতলব করি, মাস্টারকে ঠ্যাঙানো উচিত, কখনোবা ঠিক করি, অমন বিশ্রী স্কুল ছাড়িয়া দেওয়াই কর্তব্য"।
"তাহার নাম ছিল মৃত্যুঞ্জয়। আমাদের চেয়ে সে বয়সে অনেক বড়। থার্ড ক্লাসে পড়িত। কবে সে যে প্রথম থার্ড ক্লাসে উঠিয়াছিল, এ খবর আমরা কেহই জানিতাম না- সম্ভবত তাহা প্রত্নতাত্ত্বিকের গবেষণার বিষয়"।
"সে প্রদীপটা আমার হাতে দিতেই তাহার উৎকন্ঠিত মুখের চেহারাটা আমার চোখে পড়িল। আস্তে আস্তে সে বলিল, একলা যেতে ভয় করবে না তো? একটু এগিয়ে দিয়ে আসব?
মেয়ে মানুষ জিজ্ঞাসা করে, ভয় করবে না তো। সুতরাং মনে যাই থাক, প্রত্যুত্তরে শুধু একটা 'না' বলিয়াই অগ্রসর হইয়া গেলাম।"
"শুনিয়াছি নাকি বিলাত প্রভৃতি ম্লেচ্ছদেশে পুরুষদের মধ্যে একটা কুসংস্কার আছে, স্ত্রীলোক দুর্বল এবং নিরুপায় বলিয়া তাহার গায়ে হাত তুলিতে নাই। এ আবার একটা কী কথা! সনাতন হিন্দু এ কুসংস্কার মানে না। আমরা বলি যাহারই গায়ে জোর নাই, তাহারই গায়ে হাত তুলিতে পারা যায়। তা সে নরনারী যাই হোক না কেন।"
"এবং আমরা কখনও-বা একসঙ্গে কখনও-বা আলাদা তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর দোহাই পারিতে লাগিলাম। কিন্তু বিষ দোহাই মানিল না, রোগীর অবস্থা ক্রমেই মন্দ হইতে লাগিল। যখন দেখা গেল, ভালো কথায় কাজ হইবে না, তখন তিন-চারজন ওঝা মিলিয়া বিষকে এমনি করিয়া অকথ্য অশ্রাব্য গালিগালাজ করিতে লাগিল যে, বিষের কান থাকিলে সে মৃত্যুঞ্জয় তো মৃত্যুঞ্জয়, সেদিন দেশ ছাড়িয়া পলাইত।"
এবার মূল তত্ত্বে আসা যাক। শরৎচন্দ্র একজন সমাজ বাস্তবতার শিল্পী, নিখুঁত কারিগর। তাঁর মতো করে সমাজের জীবনসংগ্রাম ও অসঙ্গতি বাংলা ভাষার জাদুতে আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। এজন্যই তিনি আমাদের অপরাজেয় কথাশিল্পী। বিলাসী গল্পের দ্বারা একজন জাতপ্রথা দ্বারা পীড়িত মেয়ে বিলাসীর কি করুন পরিণতি চিত্রিত হয়েছে। নিচুতলার বেদের মেয়ে বলে মৃত্যুঞ্জয়ের সাথে তার বিয়ে কেউ মেনে নিতে পারেনি। তার প্রতি করা হয়েছে অকথ্য নির্যাতন। এমনকি মৃত্যুঞ্জয়কে সে মরণব্যাধি থেকে বাঁচিয়ে তুললেও এর ক্রেডিট তাকে তো দেওয়া হয়ই নাই, উল্টো সে মৃত্যুঞ্জয়ের জাত মেরেছে বলে রটানো হয়। মৃত্যুঞ্জয়কে সাপে কাটলে যখন সে মারা যায় তখন বিলাসীকেও আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়।
ধিক্কার সেই সমাজের প্রতি, যেই সমাজ মানুষকে মানুষ বলে মূল্যায়ন করতে জানে না। ধিক্কার সেই প্রথা ও সংস্কারের প্রতি যা জাতভেদের কারাগারে মানুষকে বন্দী করে। তার বেচে থাকার অধিকারকেও হরণ করে।