রীতিমতো রুদ্ধশ্বাসে পড়লাম এই ছোট্ট বইয়ে থাকা দুটো উপন্যাস। প্রথম কাহিনি 'রহস্যের দশ আঙুল'। সন্ত্রাসবাদীদের এক মারাত্মক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে অনিলিখা'র সম্মান, মায় জীবন বিপন্ন। কিন্তু কীভাবে জালবন্দি হল সে? কে রয়েছে তার পেছনে? এই ফাঁদ কেটে কি বেরিয়ে আসতে পারবে অনিলিখা? পূজাবার্ষিকীর লেখার স্বল্প-পরিসরে, কিশোরপাঠ্য হওয়ার বাধ্যবাধকতা নিয়েও এই লেখাটির মতো জম্পেশ থ্রিলার আমি অনেকদিন পড়িনি। শুধু আক্ষেপ হচ্ছিল, গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় লেখক কেন এই উপন্যাসটিকে আরও বিস্তৃত করলেন না? কেন কাহিনির শেষে অপরাধীকে সব সূত্র ধরিয়ে দিতে হল? লেখক যেভাবে চরিত্রদের নির্মাণ করেছিলেন তাতে আর হাজার চারেক শব্দ পেলেই ইঁদুর-বেড়াল খেলার মতো করে সবটা বেরিয়ে আসত আপনা থেকেই! বাস্তবের আলো-আঁধারির খেলা ভারি চমৎকার ফুটেছে এই বইয়ের ছোট্ট-ছোট্ট কথায়। সেজন্যই এই কাহিনি কাঙ্ক্ষিত পূর্ণতা পেল না বলে আক্ষেপ থেকে যায় শেষ অবধি। দ্বিতীয় কাহিনি 'রহস্য যখন সংকেতে'। কলকাতায় একের পর এক খুন হচ্ছে। সেও আবার যেমন-তেমন খুন নয়— জীবিত মানুষ মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কঙ্কালে পরিণত হচ্ছে! পুলিশ দিশেহারা। এরই মধ্যে বিখ্যাত গণিতবিদ নতুন গবেষণায় নিবিষ্ট হয়েও প্রায় রাতারাতি পালিয়ে এলেন এদেশে। তারপরেও তাঁর মৃত্যু হল রহস্যজনকভাবে। কেন? তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে কি এই সিরিয়াল কিলিঙের কোনো সম্পর্ক আছে? অনিলিখা কি পারবে খুনিকে থামাতে? নাম থেকেই পরিষ্কার, এই কাহিনির শিকড় লুকিয়ে আছে অনিলিখা'র প্রথম উপন্যাসে। কিন্তু এবারের গল্পে অ্যাডভেঞ্চার কম। বরং ভয় বেশি। বিজ্ঞানের ব্যবহারও বেশি। শুধু এখানেও সীমিত পরিসর কাহিনিকে অন্বেষিত পরিণাম পেতে দেয়নি। মিস্টার পাই-এর আবির্ভাবও রহস্যের জাল ছিন্ন করার বদলে কমিক রিলিফ হিসেবেই কাজে দিয়েছে। তাই এর শেষেও রইল অপ্রাপ্তির খেদ। তবে বিজ্ঞান ও রোমাঞ্চ দিয়ে গড়া এই বই যে অবশ্যপাঠ্য— এই নিয়ে কোনো সংশয় নেই। সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন।
অনিলিখা সিরিজ আমার মোস্ট ফেবারিট, এই সিরিজ পড়েই আমি লেখকের ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম। যারা যারা অনিলিখাকে চেনে, তাদের কাছে অনিলিখা মানেই নতুন কোনো রহস্য, নতুন অ্যাডভেঞ্চার। বইটিতে মোট ২টি রহস্য গল্প আছে, দুটোই অনিলিখাকে নিয়ে। ১)রহস্যের দশ আঙ্গুল : ৩স্টার🌠। এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয় অনিলিখা। কেলিক ম্যানর রিসোর্টে চারদিন পর খুন হবেন তিন দেশের প্রধান নেতা, আর সেই খুনের অভিযুক্ত করা হবে অনিলিখাকে। অনিলিখা কি পারবে নিজেকে সেই ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করতে ? আজকাল সবই অনলাইন হয়ে গিয়েছে, আর এই অনলাইন ডাটা হ্যাক করে দুষ্কৃতীরা কিভাবে বিপদে ফেলতে পারে তারই একটা নমুনা এই গল্পটা। অনিলিখার অন্যান্য গল্পগুলোর তুলনায় এটা একটু কমতি লেগেছে, ঠিক যেনো তৃপ্তি পেলাম না। ২) রহস্য যখন সংকেতে : ৪ স্টার🌠। একটা দুটো নয়, পরপর নটা খুন। আর যেমন তেমন খুন না, খুনের প্রমাণ হিসাবে পাওয়া যায় শুধুই কঙ্কাল। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ রাজর্ষি সরকার তদন্ত করতে গিয়ে কুলকিনারা খুঁজে পায় না, তখন অনিলিখা এগিয়ে আসে।তদন্ত করতে গিয়ে অনিলিখা খুঁজে পায় এক সংকেত। কি সেই সংকেত ? আর এর সাথে খুনের কি সম্পর্ক ?
😋 অল্প খানিকটা গোয়েন্দা গল্প, বেশ খানিরকটা কিশোর সাহিত্য আর অবারিত ধারায় ঢেলে দিন কল্পবিজ্ঞান। এই হল গিয়ে অনিলিখা সিরিজের ব্লু প্রিন্ট। ☺️ একান্ত কিশোর মন নিয়ে পড়লে দুটি গল্পই বেশ শিহরিত করবে। প্রথম গল্প রহস্যের দশ আঙুল বেশ ভয়ানক হলেও আসল থ্রিলের মজা দিয়েছে দ্বিতীয় গল্প রহস্য যখন সংকেতে ।
🌟 Extra terrestrial, genetic engineering, plastic surgery, advanced mathematics এরকম সব রকম মস্তিষ্ক উদ্দীপক বিষয় বেশ ভালো করে ঘাঁটা হয়েছে গল্প দুটিতে। ছোট বেলার সেই ডক্টর জেকল, বা ডক্টর কিংবিন বা আমাদের প্রফেসর ক্যালকুলাস; এদের কান্ড কারখানা যদি আপনাদের মজা দিয়ে থাকতো তাহলে তার সাথে গোয়েন্দা প্রেক্ষাপট দিলে কোথায় পৌঁছাবে একটু ভেবে নিন।
🌟 সব মিলিয়ে খুবই উপভোগ করেছি বইটা। তবে একটাই আফসোস। বড়ো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল বইটা। ওই জন্য একতারা কম। 😋 আরও কয়েকটা গল্প দিয়ে একটু বড় করলে ভালো লাগতো। বেশ ভালোই লাগছে অনিলিখাকে।
এবারের বইমেলায়(2018) পত্রভারতী থেকে প্রকাশিত হয়েছে অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর লেখা নতুন বই 'রহস্যের দশ আঙুল'। এই বইয়ের দুটি উপন্যাসই পাঠকদের অতি প্রিয় চরিত্র অনিলিখাকে কেন্দ্র করে। উপন্যাস দুটি হল - 'রহস্যের দশ আঙুল' এবং 'রহস্য যখন সংকেতে'।
*** রহস্যের দশ আঙুল ***
মাত্র কয়েকমাস আগের ঘটনা, সবকটা দৈনিক সংবাদপত্রে ফলাও করে ছাপানো হয়েছিল খবরটি। যা সেই (মোবাইল) সংস্থার সাথে যুক্ত সকল গ্রাহকদের রাতের ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছিল। খবরটি হল - সেই সংস্থার সাথে যুক্ত সকল গ্রাহকের ব্যক্তিগত সমস্ত ডাটাবেস নাকি রাতারাতি হ্যাক হয়ে গেছে, সাথে গেছে সরকারি আইডেন্টি প্রুফের সব তথ্যও। খবরটা পাঠকদের নিশ্চই এবার মনে পড়েছে।
বর্তমান যুগে আমরা দিনকে দিন আরো বেশি টেকনোলজি নির্ভর হয়ে পড়ছি। আমাদের সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য আজকাল সফটকপি রূপে জমা থাকছে বিভিন্ন অনলাইন সার্ভারে বা ই-ভার্সন মাধ্যমে। দেশও ডিজিটাল হচ্ছে, ফলে কাগজপত্রের ব্যবহার দিনকে দিন কমছে। বাড়ছে অনলাইনের মাধ্যমে কাজ করার প্রবণতা, আর তার সাথে সাথে বাড়ছে হ্যাকিংয়ের দৌরাত্ম্য। অনলাইনে আপনার সামান্য অসতর্কতা কি সংঘাতিক রকম বিপদ দেখে আনতে পারে তা আপনার কল্পনারও বাইরে।
আপনাদের মনে হতে পারে একটি উপন্যাসের পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে শুরুতেই হ্যাকিং কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে ব্যবহারের বিপদের কথার উল্লেখ করছি কেন? কারণ অভিজ্ঞান রায় চৌধুরীর এবারের উপন্যাসটি এই বিষয়কে কেন্দ্র করেই লেখা হয়েছে। কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত সমস্ত ডাটাবেস জোগাড় করার পিছনে কত বড় আন্তর্জাতিক চক্র কাজ করছে এবং তারা কিভাবে নিরীহ, নিরপরাধ মানুষদের টোপ হিসাবে ব্যবহার করছে তা এই কাহিনীতে খুব সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে। যা পড়তে গিয়ে পাঠকরা বুঝতে পারবেন এই কাজ কত পরিকল্পনামাফিক করা হয়, কিভাবে টার্গেট সিলেক্ট করা হয় এবং কিভাবে তাদের এই ট্র্যাপে ফাঁসানো হয়।
অভিজ্ঞান রায় চৌধুরীরর সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র অনিলিখা এবার এই চক্রের শিকার। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্রিটেন, যেখানে কেলটিক ম্যানর রিসর্টে চারদিন বাদে খুন হবেন তিন দেশের প্রধান নেতা, ঘটনায় মূল অভিযুক্ত হবে অনিলিখাই। কোন দোষ না করা সত্বেও তার নামের সাথে যুক্ত হবে মোস্ট ওয়ান্টেড ইন্টারন্যাশনাল টেররিস্টের কলঙ্কিত শিরোপা। আন্তর্জাতিক চক্রটি এবারে অনিলিখাকে যেভাবে ফাঁদে ফেলেছে তার থেকে বেরিয়ে আসা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়, সাথে রয়েছে তার প্রাণহানির আশংকাও।
অনিলিখা কি পারবে এই আন্তর্জাতিক চ���্রের চক্রব্যূহ কেটে বেরিয়ে আসতে? জানতে গেলে এক-নিঃস্বাসে পড়ে ফেলতে হবে এবারের অনিলিখা কেন্দ্রিক রহস্য উপন্যাস "রহস্যের দশ আঙুল"। আর হ্যাঁ, এনিলিখার দশ আঙুলকে কেন্দ্র করেই এই উপন্যাস। এই কাহিনী যত শেষের দিকে যাবে পাঠকদের দশ আঙুলের নখের অবস্থাও তত খারাপ হবে এই কথাটা আগেভাবে জানিয়ে রাখলাম। সাথে চুপিচুপি এটাও বলে রাখি "কাহানি অভি খতম নেহি হুয়ি ..... পিকচার অভি বাকি হ্যায়"! পড়ুন, তাহলে বুঝতে পারবেন কেন একথাটা বললাম :)
এই কাহিনীর ভাল লাগার দিকগুলি হল - ১) কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ডাটাবেস হ্যাকিং থেকে শুরু করে তাকে ফাঁসানোর পুরো পদ্ধতিটিকে পয়েন্ট অনুসারে এই কাহিনীতে লেখক খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ২) লেখার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাহিনীতে একটা টানটান ব্যাপার আছে যা পাঠকদের বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরাতে দেবে না। ৩) ঝরঝরে ভাষায় বর্তমান যুগের একটা ভয়াবহ সমস্যাকে খুব সুন্দর ভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরা এবং মূল কাহিনীর সাথে আরও কিছু ঘটনাবলীর কথা উল্লেখ করে পাঠকদের সামনে চিত্রটা আরো পরিষ্কার করা।
*** রহস্য যখন সংকেতে ***
বছর ছয়েক আগের কথা, তখন পশ্চিমবঙ্গের খবরের কাগজগুলির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল "কঙ্কাল-কান্ড"র মতন ঘটনা। যা সেই সময় জন-মানসে রীতিমতন শোরগোল ফেলে দিয়েছিলো। আবার সেই "কঙ্কাল-কান্ড" ফিরে এলো লেখক অভিজ্ঞান রায় চৌধুরীর হাত ধরে খোদ কলকাতার বুকে। একটা নয় , দুটো নয়, পর-পর ন-ন'টা খুন !!! আর খুনের সাক্ষী হিসাবে পরে থাকছে শুধু হতভাগ্যের কংকাল। হ্যাঁ , ঠিকই ধরেছেন বইয়ের দ্বিতীয় কাহিনীর মূল আকর্ষণ হলো "সিরিয়াল কিলিং" আর "কঙ্কাল-কান্ড"।
এই ন'টা খুনের তদন্তে নেমে যখন রীতিমতন হিমশিম খাচ্ছেন রাজর্ষি সরকারের মতন ফরেনসিক এক্সপার্ট, ঠিক তখনই তিনি পাশে পেলেন অনিলিখাকে। এরকম একটা কেসের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে অনিলিখাও এসে হাজির খোদ শহর কলকাতাতে। অনিলিখা রাজর্ষির সাথে কথা বলে বুঝতে পারে খুনি অত্যন্ত বেপরোয়া এবং খুন করতে এমন মারাত্মক বস্তু ব্যবহার করছে যার কথা আগে কখনও শোনা যায়নি। কি সেই বস্তু যা রক্ত-মাংসের জীবিত মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে কঙ্কালে পরিণত করছে ?
এর পিছনে রয়েছে মৌলিক সংখ্যার রহস্য, আছে জেনেটিক রিসার্চ, আছে এনক্রিপশন, আছে আরো অনেক কিছু ....অনিলিখা কি পারবে এই সমস্ত রহস্য ভেদ করতে ? জানতে গেলে পড়ে ফেলতেই হবে "রহস্য যখন সংকেতে" উপন্যাসটি। আর হ্যাঁ, এই উপন্যাসে অনিলিখার সাথে মিস্টার পাই-ও রয়েছেন।