একজন প্রবল প্রতিপত্তির মালিক, নাম সিগসবি ম্যান্ডারসন। যার নামে বাঘে মহিষে এক ঘাটের জল খায়। ব্রিটেনের শেয়ার বাজারের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। ব্যবসায়ী এই মানুষ যে কত অসহায় মানুষের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে তার ইয়াত্তা নেই। তবুও তিনি এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। যখনই শেয়ার বাজারে কোনো ছন্দপতন হয়, তার হাত ধরেই ঘুরে দাঁড়ায় অর্থনীতি। কত মানুষের শেয়ারের অংশীদার হওয়া তাকে ঘিরে! এমন একজন মানুষের মৃ ত্যুর খবর যখন ছড়িয়ে পড়ল, তখন স্বাভাবিকভাবেই বড়ো ধরনের শিরোনাম হবে তাকে ঘিরে। তার উপর নির্ভর করে যারা ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে, তাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাবে। সবকিছু হারানোর শঙ্কায় কেউ কেউ হয়তো নিজেদের জীবনটাই হারিয়ে ফেলবে! কানাঘুষো চলবে, সত্য-মিথ্যার রহস্য উদঘাটনে চায়ের কাপে ঝড় উঠবে। কী হয়েছিল ম্যান্ডারসনের?
ম্যান্ডারসনের লা শ পাওয়া যায় নিজের বাসার সামনে। এত বড়ো ব্যবসায়ী, ব্যক্তিত্ববান, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষটার মৃ ত্যুর কারণ কেবল একটা বুলেট। যা চোখের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করে পিছন দিয়ে বেরিয়ে গেছে। মৃ ত্যু এসে যেন জানান দিয়ে গেল, জীবনের কাছে ক্ষমতা নস্যি। একবার নিঃশ্বাস নেওয়া বন্ধ হলে আর কোনো ক্ষমতাই জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে না।
এত বড়ো একটা খবর, এর রহস্য উদঘাটন তো করতেই হবে। এক ব্রিটিশ পত্রিকার আগ্রহে ডাক পড়ে সাংবাদিক, চিত্রশিল্পী ও শখের গোয়েন্দা ফিলিপ ট্রেন্টের। ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ শুরু করতে গিয়ে বেশকিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ে। পরিপাটি ম্যান্ডারসনের কিছু একটা ঠিক নেই। সূত্রগুলো একাট্টা করতে গিয়ে মূল অপরাধীকে ধরতে পারে। কিন্তু এদিকে ট্রেন্টের মনের মধ্যে উথাল পাথাল ঢেউ। যা তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
আর এই দুর্বলতা নিয়ে কি সে পারবে মূল অপরাধীকে খুঁজতে? এমন সব রহস্যে জড়িয়ে থাকে কাছের কেউ। হয় কোনো পরিচারক বা সহযোগী, কিংবা স্ত্রী! কে এর অপরাধী? একেকটা চমকে সত্য আসবে সামনে। ট্রেন্টের মতো মতো বিচক্ষণ কেউ এই চমক সামলে উঠতে পারবে তো?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
এই বইয়ের শুরুটা দুর্দান্ত। একটি খুনের প্রারম্ভিক বর্ণনা এত দারুণভাবে দেওয়া যায়, না পড়লে বোঝার উপায় নেই। আর এই বর্ণনার মধ্য দিয়ে যে ভিকটিম, তাকে খোলা বইয়ের মতো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। যেটা ভালো লেগেছে। বিশেষ করে শুরুর দিকে মূল চরিত্রকে এভাবে ব্যাখ্যা করে দিলে একটা স্পষ্ট ধারণা হয়। যা পরবর্তীতে বই এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগে।
তবে যাকে ভিকটিম বললাম, সে কি আসলেই ভিকটিম? একজন মানুষের অনেক রূপ থাকতে করে। ম্যান্ডারসনেরও এমন অনেক রূপ আছে। সবচেয়ে বড়ো রূপ তার ক্ষমতাবান হওয়া। তার বিরুদ্ধে কেউ টিকতে পারেনি। একজন সফল ব্যবসায়ী যখন তরতরিয়ে উপরে ওঠে, তাদের প্রাচুর্যে গরিবের ঘাম লেগে থাকে। আর সেই ঘামের যথাযথ পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। এমন একজন মানুষের শত্রুর অভাব নেই। তীক্ষ্ম ক্রিমিনাল বুদ্ধি সম্পন্ন কাউকে যে কেউ মে রে ফেলতে পারে।
এখানেই আসলে ফিলিপ ট্রেন্টের আগমন। তিনি একজন চিত্রশিল্পী। আর একজন শিল্পীর দেখার চোখ ভিন্ন হয়। তাই স্বাভাবিকভাবে কেউ যেখানে নজর দেয় না, সেখানে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সবকিছু আমলে নেয়। এভাবেই একটু একটু সূত্র জুড়ে দিয়ে রহস্যের মূল খুঁজে পাওয়া। তারপর একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। এই সিদ্ধান্ত বা হাইপোথিসিস সবসময় সত্যি হবে কি না সেটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ।
ট্রেন্টকে আমার মনে হয়েছে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী। নিজের কাজের উপর আস্থা আছে। তাই সে যেভাবে বিশ্লেষণ করবে, অপরাধ ও অপরাধীকে শনাক্ত করবে; এটাই ঠিক ধরে নিতে হবে। কিন্তু মানুষ মাত্রই ভুল করে। আর এই ভুল বারবার করেছে ট্রেন্ট। তাই ট্রেন্টকে আমার শক্তপোক্ত কোনো চরিত্র মনে হয়নি। একটি গোয়েন্দা গল্পের প্রধান চরিত্র যেমন হয়, তেমন লাগেনি। বরং মনে দিক দিয়ে কিঞ্চিৎ দুর্বল মনে হয়েছে। যে মানুষ রহস্য সমাধান করতে গিয়ে প্রেমে পড়বে, তাও আবার এমন একজনের যার স্বামী সদ্য মা রা গিয়েছে; বিষয়টা হজম করার মতো না। এখানে গোয়েন্দা সাহেবের নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন চলে আসে। প্রেমের এ উপাখ্যান এই বইয়ের সবচেয়ে দুর্বল ঘটনা।
যদিও এই গল্পের মূল ভিত্তি এই প্রেম, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সময়ে সময়ে এই ঘটনার গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথাগত গোয়েন্দা গল্পের মতো টানটান উত্তেজনা এখানে ছিল না। বরং একটু ধীরগতির কাহিনি। ধীরে ধীরে লেখক গল্প এগিয়ে নিয়েছেন। চরিত্রগুলোকে পোক্ত করার চেষ্টা করেছেন। তবে, মূল তিন চারটা চরিত্র ছাড়া, বাকি চরিত্রগুলো শুধু প্রয়োজনের তাগিদে এসেছিল। খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। এক পর্যায়ে বইটি পড়তে একঘেয়ে লাগছিল। বিশেষ করে সংলাপগুলো বেশ দীর্ঘ। যেগুলো পড়তে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। তারপরও শেষের দিকে বেশকিছু ঘটনা ও জবানবন্দির মাধ্যমে যে চমক ছিল, তা বইটিকে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। শেষের অংশ ছাড়া আমি এক গড়পড়তা এক কাহিনি বলেই ধরে নিতাম।
বইটির সময়কাল আজ থেকে প্রায় একশ বছরেরও বেশি সময় আগের। সেই সময়ের অর্থনীতি, রীতিনীতি, পোশাক, সামাজিক বিষয়-আশয় এখানে ফুটে উঠেছে। ইংরেজদের সাথে আমেরিকানদের যে জাতিগত বিদ্বেষ, তাও লেখক দেখিয়েছেন। শুধু আমেরিকান নয়, অন্য দেশ যেমন ফ্রান্সের সাথেও যে বিরূপ মনোভাব ইংরেজদের তা-ও এখানে দৃশ্যমান। আমি এ কারণে মনে করি একটি বই সমাজের আয়না। সমাজকে এভাবেই পাঠকের সামনে তুলে ধরে। সমাজ ও সময়কে ধরে রাখার জন্য বইয়ের বিকল্প কিছু নেই।
তারপরও কিছু বিষয় থাকে, যা আরেকটু বেটার করা যেত। একটি খুনের তদন্ত যেহেতু হচ্ছে সেহেতু পুলিশের ভূমিকা এখানে থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। একজন শখের গোয়েন্দা ও সাংবাদিক একা রহস্য সমাধান করে ফেলেছে, বিষয়টা ঠিকঠাক লাগেনি। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের একজন অফিসার থাকার পরও তাকে তেমন সুযোগ দেওয়া হয়নি। কিছু ঘটনা খুব দ্রুত ঘটেছে। একটা ঘটনা থেকে আরেকটি ঘটনায় জাম্প দিয়েছে বেশ। যা পছন্দ হয়নি। তাছাড়া একজন গোয়েন্দার মূল কাজ অপরাধীকে চিহ্নিত করে তাকে শাস্তির মুখোমুখি করা। কিন্তু সে যখন দুর্বল হয়ে অপরাধীকে বাঁচাতে চায়, জেনেও কিছু না করে তখন তার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এর জন্য কী মনস্তত্ত্ব কাজ করেছিল জানি না। এ কারণেই ট্রেন্টকে দুর্বল চরিত্রের বলে আমার মনে হয়েছে।
▪️অনুবাদ, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
বর্তমান সময়ের যে কয়েকজন অনুবাদক খুব ভালো কাজ করছেন, লুৎফুল কায়সার তাদের মধ্যে অন্যতম। অনুবাদকের অনুবাদ পড়তে আরাম লাগে। তিনি যে হরর অনুবাদের প্রথা ভেঙে গোয়েন্দা কাহিনির অনুবাদ করেছেন, এই জন্য ধন্যবাদ। বেশ ভালো অনুবাদ করেছেন। আড়ষ্ট ভাব ছিল না। কিছু ফুটনোট ছিল যার কারণে বইয়ের কিছু বিষয় বুঝতে সুবিধা হয়েছে।
তবে একটা পরামর্শ থাকবে। অনুবাদকের অনুবাদ ‘বেজায়’ শব্দটির অধিক ব্যবহার পড়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেছে। কিছু অনুচ্ছেদে তিন থেকে চারবার এই শব্দটি ছিল। এমন না যে শব্দের ব্যবহারও যৌক্তিক। অনেক জায়গায় মনে হয়েছে এই শব্দটি ঠিক মিলছে না। এরচেয়ে ‘ভীষণ, খুব, বেশ’ শব্দগুলোর ব্যবহার অধিক যুক্তিসঙ্গত হতো। তাছাড়া কিছু বাক্য অনুবাদক ‘তাই না?’ দিয়ে শেষ করেছেন। আমি জানি না ইংরেজিতে কেমন বাক্য ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে অনেক জায়গায় ‘তাই না?’ দিয়ে শেষ না করলে পড়তে আরামদায়ক হতো। কিছুটা বিরক্তি লেগেছে।
সম্পাদনা ঠিকঠাক। খুব একটা বানান ভুল পাইনি। এক জায়গায় ‘মিসেস ম্যান্ডারসন’ এর জায়গা ‘বিশেষ ম্যান্ডারসন’ লেখা ছিল। এছাড়া ভুল নিয়ে তেমন অভিযোগ নেই।
প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে। ক্লাসিক বইয়ের প্রচ্ছদ এমনই হওয়া উচিত। বাঁধাই, প্রোডাকশন কোয়ালিটি দারুণ। যেমনটা বেনজিন প্রকাশনীর হয়।
▪️পরিশেষে, অপরাধ করলেই কি তাকে অপরাধী বলা যায়? না-কি কিছু অপরাধ সমাজের জন্য আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়? তখন আসলে দ্বিধার জন্ম দেয়। অপরাধী বলা উচিত, কী না!
▪️বই : ট্রেন্ট’স লাস্ট কেস
▪️লেখক : ই. সি. বেন্টলে
▪️অনুবাদ : লুৎফুল কায়সার
▪️প্রকাশনী : বেনজিন প্রকাশন
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৭৫/৫