আনারকলি উপন্যাসের পটভূমি বাংলার ভূখণ্ড নয়, সুদূর অমৃতসর ও লাহোরের মাটি—১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাঞ্জাবের অন্তর্ভুক্ত যে দুটি ভূখণ্ডের একটি পাকিস্তান, অন্যটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ভয়াবহ রক্তাক্ত দাঙ্গার ভেতর দিয়ে বাংলার মতো তখন পাঞ্জাবও হয় দ্বিখণ্ডিত। সেই দাঙ্গাই এই উপন্যাসের নায়ক নিসার আলীকে সর্বস্বান্ত করে, বাস্তুচ্যুত করে ।
গল্পটা সরল। কিন্তু ভাষা প্রয়োগ এবং বর্ণনা যে মাত্র ২৮ বছরের একজন লেখকের সেটাও ভুললে চলবে না। দাঙ্গা নিয়ে রোমান্টিক-ট্র্যাজেডি এই উপন্যাসটাকে হয়তো সৈয়দ শামসুল হকের সেরা উপন্যাসের কাতারে রাখা যাবে না। কিন্ত পড়াও যাবে না তা না। বাছাই করা কয়েকটি অংশ তো পাঁচ তারা।
বইয়ের নাম : আনারকলি। লেখকের নাম : সৈয়দ শামসুল হক। মুদ্রিত মূল্য : ১৬০৳ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৮৭টি। প্রকাশনীর নাম : প্রথমা প্রকাশন।
‘পাঞ্জাব’ অখণ্ড ভারতবর্ষের একটি প্রদেশ ছিলো। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় দ্বিখণ্ডিত হয়ে পাঞ্জাবের একটি অঞ্চল পড়ে ভারতে আর অন্যটি পাকিস্তানে। ভারতে পড়ে অমৃতসর আর পাকিস্তানে লাহোর। ঠিক আমাদের বাংলা প্রদেশের মতো।
রাজনৈতিক অবস্থা এবং দেশভাগকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয় তাতে জ্বলেপুড়ে মনে অনেক নিরীহ মানুষ। এইসব মানুষের একজন ‘আনারকলি’ উপন্যাসের নায়ক ‘নিসার আলি’। যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিজের পরিবার এবং সম্পদ হারিয়ে কোনোভাবে জীবন নিয়ে অমৃতসর থেকে পালিয়ে লাহোরে এসে পৌঁছায়।
লাহোরে পালানোর সময় যে বাসে নিসার উঠে তার চালক ছিলো ‘দোস্ত মোহাম্মদ’ নামে একলোক। যাকে লাহোরে আসার সময় নিসার তাঁর সব ঘটনা খুলে বলে। লাহোরে আসার ঠিক একমাস পর দোস্ত মোহাম্মদের সাথে নিসারের আবারও দেখা হয়। তখন নিসারের জীর্ন শীর্ণকায় অবস্থা।
নিসারের এই অবস্থা দেখে দোস্ত মোহাম্মদ তাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেয়। নিসার ছিলো শিক্ষিত যুবক। তা-ই কিছুদিনের মধ্যে সে লাহোরের আনারকলি শহরে একটি ভালো জুতার দোকানে কাজ জুটিয়ে নেয় এবং ধীরে ধীরে উন্নতি করতে থাকে।
দোস্ত মোহাম্মদের এক মেয়ে এক ছেলে। মেয়ে আমিনা এবং ছেলে হাসিব। নিসার যখন প্রথম দোস্ত মোহাম্মদের বাড়িতে আসে তখন আমিনার বয়স মাত্র ৬-৭। নিসারের তেমন খেয়াল ছিলো না আমিনার প্রতি। একি বাড়িতে থেকেও তাদের দেখা হতো না।
নিসার দোস্ত মোহাম্মদের বাড়িতে প্রায় নয় বছর থেকেছে এরি মাঝে। হঠাৎ একদিন দোস্ত মোহাম্মদ নিসারকে ডেকে বলে যে, তার মেয়ে আমিনা এবং ছেলে হাসিবকে বাদশাহ জাহাঙ্গীর এবং তার স্ত্রী নূর জাহানের সমাদী ঘুরিয়ে আনতে। তখন আমিনার বয়স ১৬।
ষোড়শী আমিনাকে প্রথম দেখাতেই নিসারের ধরে যায়। ধীরে ধীরে একসময় আমিনাও অনুরক্ত হয়ে পড়ে নিসারের প্রতি। নিসার দোস্ত মোহাম্মদকে তার এবং আমিনার বিয়ের ব্যপারে বলবে বলবে করেও বলা হয়ে উঠে না। কিন্তু হঠাৎ একদিন দোস্ত মোহাম্মদ নিজেই নিসারকে প্রস্তাব দেয় নিজের মেয়ে আমিনাকে বিয়ে করার জন্য।
নিসার এবং আমিনার বিয়ের সবকিছু ঠিক। দুমাস পর বিয়ে। কারণ দোস্ত মোহাম্মদের বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনরা আসবে আরও নানান আয়োজন। ঠিক এরি মাঝে নিসারের জীবনে ঘটে যায় এক অভাবনীয় ঘটনা। একদিন এক খরিদদারের পাশে জুতা পরি যেই না নিসার ঐ লোকের মুখের দিকে তাকায় তখনি তার অন্তরে জ্বলে উঠে পুরোনো চাপা দেয়া আগুন। এরপর কি হয়েছিল জানতে হলে পড়তে হবে ‘সৈয়দ শামসুল হক’ রচিত ‘আনারকলি’ উপন্যাসটি।
পাঠ প্রতিক্রিয়া : সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা একটি অতি ঘৃণিত ঘটনা। যার মাধ্যমে মানুষ নিমিষেই বন্ধু থেকে শত্রুতে পরিনত হয়। বিশ্বাস নামক বস্তু বলতে তখন আর কিছুই থাকে না। নিজেকেই তখন আর বিশ্বাস করতে মন সায় দেয় না।
আর এই দাঙ্গার অনলে পুড়ে চাঁই হয় কতিপয় নিরীহ সাধারণ মানুষেরা। যার প্রমাণ এই উপন্যাসের নায়ক নিসার। আর এই দাঙ্গার আগুন সাময়িকভাবে চাপা দেয়া গেলেও সময় মতো তা আবারও অগ্নিগিরির মতো অগ্নুৎপাত করে বসে। যেমন এই উপন্যাসের নিসার। যে একজন আদর্শ প্রেমিক থেকে মূহুর্তেই হয়ে যায় ঘুনী।
তা-ই আসুন সাম্প্রদায়িকতাকে না বলি। নিজের মতের পাশাপাশি অন্যের মতকেও সম্মান করি। ক্ষুদ্র জাতীয়তাবাদ ভুলে সব মানুষকে মানুষ হিসেবে নিজের আত্মীয় ভাবি। তবেই পৃথিবী হবে মানুষের।
এই উপন্যাসটি সৈয়দ শামসুল হকের জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত ছিল। তাঁর মৃত্যুর পরে বইটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
উপন্যাসের পটভূমি পাঞ্জাব, ভারতবর্ষের বিভক্তির সময় বাংলা প্রদেশের মতো যে জনপদ দু টুকরো হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুনে জ্বলে উঠেছিল এর দুই পাশ- অমৃতসর আর লাহোর। অমৃতসরের দাঙ্গায় বাড়িঘর আর স্বজনদের হারিয়ে নিসার চলে আসে লাহোরে। জুতার দোকানে চাকরি করে আর ভালোবাসে তার আশ্রয়দাতা দোস্ত মোহাম্মদের মেয়ে আমিনাকে। একদিন লাহোরের রাস্তায় সে দেখল তার ভাইয়ের খুনিকে। নয় বছর আগে জ্বলন্ত বাড়ির আগুনের আলোয় দেখা সেই মুখ। লোকটি ছুরি চালাচ্ছিল তার ভাইয়ের বুকে। প্রেমের জায়গায় জ্বলে উঠল প্রতিহিংসার আগুন।
উপন্যাসের কাহিনী সুন্দর। তবে এর শেষটা হয়েছে একদম হঠাৎ করে। এতটাই আচমকা যে প্রথমে বুঝতে পারিনি এখানেই শেষ। এই একটি বিষয় ছাড়া সব মিলিয়ে বলা যায় উপন্যাসটি ভালোই।
লাহোরের আনারকলি বাজারে এক জুতার দোকানের সেলসম্যান নিসার আলী। দেশ ভাগের সময় অমৃতসরে দাঙ্গায় খুন হয় তার পরিবার। পালিয়ে চলে আসে লাহোরে। আশ্রয় নেয় পথিমধ্যে পরিচয় হওয়া বাসচালক দোস্ত মোহাম্মদের কাছে।চলতে থাকে জীবন,প্রেমে পরে যায় বাস ড্রাইভার দোস্ত মোহাম্মদের কন্যা আমিনার। হঠাৎ করেই অতীত নাড়া দেয় তাকে, জ্বলে উঠে প্রতিশোধের আগুন। এই নিয়েই চিত্রালী পত্রিকার বার্ষিক ১৯৬৩ সংখ্যায় প্রকাশিত সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস আনারকলি।মূলত প্লটটার খুবই জন্যই মাত্র দু দিন আগে বইটার খোঁজ পেয়ে পড়ে ফেললাম। ল��খকের লেখনী বরাবরের মতই অসাধারণ লেগেছে। প্লটটা ভালো হলেও কাহিনীটা সেই তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে। প্লটটা নিয়ে লেখক বড় পরিসরে আরো ভালো কিছু লিখতে পারতেন বলেই আমার বিশ্বাস। একটা আফসোস থেকেই গেলো। তবে যা হয়েছে তাতেই খুশি। সর্বোপরি বইটা ভালোই লেগেছে। সময়টা ভালো কেটেছে।
'আনারকলি' উপন্যাসটি সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম জীবনে লেখা। প্রথম জীবন বলতে বয়স তার আটাশ। কম বয়সের প্রেম, ভাই হত্যার প্রতিশোধ নিয়েই এই গল্পের ব্যপ্তি। কথা দিচ্ছি, 'আনারকলি' পড়লে কম বয়সের সেই প্রথম প্রেমে পড়ার স্মৃতি মনে পড়বে। কত নিষ্পাপ চাওয়া ছিল পছন্দের মানুষের প্রতি। 'আনারকলি' একটি নিষ্পাপ প্রেমের গল্প, পড়তে বসলেই সেই অমর লাইন মনে উঁকি দেয়,“প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য” এই প্রাণ হলো হৃদয়।গল্পের নায়ক নিসার তার হৃদয় দেয় আমিনাকে। আবার একইসাথে ভাই হত্যার প্রতিশোধপরায়ণা মনে করায়, “ আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসে অবিশ্র্রান্ত; একে একে হয় জড়ো, এ বয়স কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরোথরো।”
এই বই পড়া না পড়া ব্যক্তিগত ব্যাপার। ভালো পাঠকগণের এড়িয়ে চলতে পরামর্শ থাকবে।
আমি যেহেতু এখনো পাকা সাহিত্যবোদ্ধা হয়ে উঠিনি, তাই বিশদ বিশ্লেষণ করে বইটির মান নির্ধারন করতে পারছি না। তবে, আপাতদৃষ্টিতে আমার কাছে মন্দ মনে হয় নি বইটি। একঘেয়ে যাপিত জীবনে কিছুটা ভাবনার খোরাকি মিলবে বইটি থেকে।
এত ভালো বইয়ের শেষটা এত বাজে:) পড়ার সময় ভাবছিলাম ৫ স্টার দিবোই দিবো এই বই। তবে পুরো বইটা পড়ার সময় মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। শেষটা সুন্দর হতে পারতো৷
হক সাহেবের কাছে এমন দূর্বল লেখা পেয়ে আমি রীতিমতো হতাশ। একটা চমৎকার প্লট কেমন জানি খেলো হয়ে গেছে গল্পের দূর্বল বর্ননার কারনে। গল্পের চরিত্র গুলো কেমন জানি নিজেদের খুব ভালো ভাবে প্রকাশ করতে পারেনি।