হঠাৎ করেই টের পেলাম বহুদিন বাংলায় কোন থ্রিলার পড়া হয়নি৷ অগত্যা 'যকের ধন' এর পিডিএফ খুলে পড়তে বসে গেলাম। সত্যি বলতে গল্পটা আমার এত ভালো লেগে যাবে সে আশা একেবারেই করি নি৷ একে তো বয়সটা হয়তো একটুখানি বেশিই এই গল্প উপভোগের জন্য, উপরন্তু গুডরিডসে বেশিরভাগ রিভিউতেই দেখলাম 'ভুল বয়সে পড়াজনিত' বড় ধরনের না হলেও মাঝারি ধরনের অসন্তোষ জানানো হয়েছে। বইটা পড়ার পর এ অসন্তোষগুলোর কারণ বোধহয় কিছুটা আঁচ করতে পারি।
একটা এ.আই.(AI) কে যদি এ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় লেখা যাবতীয় মৌলিক থ্রিলার গেলানো হয়, এবং এরপর তাকে নির্দেশ দেয়া হয় তার এই জ্ঞানের আলোকে জেনেরিক একটা উপন্যাস দাঁড় করাতে, বেচারা এ.আই. হয়তো প্লটওয়াইজ 'যকের ধন' এর চেয়ে খুব বেশি আলাদা কিছু দাঁড় করাতে পারবে না। গুপ্তধনের হাতছানি, গোপন সাংকেতিক লিপি, দুর্ধর্ষ এক শত্রু, দুর্গম অরণ্যে ভ্রমণ, অতিপ্রাকৃতের ভয়, এমনকি প্রবল অনুগত এক ভৃত্য চরিত্র পর্যন্ত - বাংলা থ্রিলার সাহিত্যের কোন কমন এলিমেন্ট এতে নেই? কিন্তু অবশ্যই এখানে মূল বিষয়টা হচ্ছে রচনার সময়কাল। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের বিমল-কুমার জুটি নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস এটি, প্রথম প্রকাশ খু�� সম্ভবত ১৯৩০ এর দশকে(সঠিক তারিখটি বেশ খোঁজাখুঁজি করেও জানতে পারলাম না)। সেই সময়ে এই প্লটলাইন নিশ্চয়ই জেনেরিক ছিল না। বরং পরবর্তী প্রায় ৯০ বছরে এইখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বহু গল্প লেখা হয়েছে, তাই এখন জেনেরিক লাগছে। ক্লাসিক হবার বিড়ম্বনা!
কাহিনি হলো এমন - আসামের গভীর অরণ্যের মাঝে প্রকাণ্ড খাসিয়া পাহাড়, তার বিখ্যাত রূপনাথের গুহার মধ্য দিয়ে সুদূর চীনদেশে চলে যাওয়া যায় বলে জনশ্রুতি আছে। প্রাচীন যুগে চীনের এক রাজা এই পথে এসেই ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিলেন বলে পর্যন্ত শোনা যায়। এই রূপনাথের গুহার অদূরেই এক পরিত্যক্ত বৌদ্ধ মঠে কোন এক রাজা তার সমুদয় ধন-সম্পদ এক যক তথা প্রেতযোনির পাহারায় লুকিয়ে রেখে যুদ্ধে যান। যুদ্ধে রাজার মৃত্য হবার পর এই ধন-সম্পদের আর কোন দাবিদার রইল না।
মূল গল্পের শুরু যখন এক মড়ার মাথার খুলিতে লিখে যাওয়া গুপ্ত সংকেত অনুসারে এই গুপ্তধন উদ্ধারে ব্রতী হলো নিতান্তই গোবেচারা প্রকৃতির কুমার, অসম সাহসী বীর ও বুদ্ধির ঢেঁকি বিমল, বিমলদের বিশ্বস্ত পারিবারিক ভৃত্য রামহরি এবং কুমারের পোষা কুকুর বাঘা। কিন্তু গুপ্তধনের লোভে তাদের পিছু নিলো বিকট-দর্শন করালী ও তার গুণ্ডা দল, যারা গুপ্তধনের জন্য খুন পর্যন্ত করতে রাজি।
প্লট নিয়ে বহুত কথা বললাম। এইটা বলে শেষ করি যে অন্যদের যে কারণে(জেনেরিক প্লট) এই বই অত ভালো লাগেনি আমার আবার ঠিক একই কারণে এত ভালো লেগে গেছে। ঠিক যা যা চাইছিলাম একটা বইয়ে তার সবই পেয়ে গেলাম - চাহিদা আর প্রাপ্তির এমন অপূর্ব সম্মিলন আমার জীবনে শেষ কবে ঘটেছিলো স্মরণে আনতে পারছি না।
হেমেন্দ্রকুমারের লেখন-শৈলী ছিমছাম কিন্তু ভারি সুন্দর। তাঁর লেখায় উপমার ব্যবহারের কিছু উদাহরণ দেই। "সেদিন অমাবস্যা! চারদিকে অন্ধকার যেন জমাট বেঁধে আছে। কেবল জোনাকিগুলো মাঝে মাঝে পিটপিট করে জ্বলছে - ঠিক যেন আধার-রাক্ষসের রাশি রাশি আগুন চোখের মতো" কিংবা "কচি কচি ফুলগুলোকে দেখে মনে হলো, এরা যেন বনদেবীর খোকা-খুকি।"
লেখার শুরুটা পড়ে আমার ছোটবেলায় কোথাও বেড়াতে যাবার আগের দিন রাতে যেমন অনুভূতি হয় ওমন হচ্ছিলো। উপন্যাসের চরিত্রগুলোর সাথে আমিও আসাম ঘুরে এলাম এরকমই লাগলো। এমনকি প্রথমদিন রাতে জঙ্গলে ক্যাম্প ফেলার পর বিমল কুমারকে যে ভূতের গল্প শুনিয়েছিলো তাও দেখি আলাদা এক চ্যাপ্টার করে উল্লেখ করে মূল কাহিনির সাথেই সুন্দর করে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা একসাথে অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়ার পুরো ফিল-টাকে আরো জোরালো করেছে।
বিমল-কুমারের কেমিস্ট্রি অসাধারণ। কুমারকে মনে হলো বাঙালি মায়ের আদরের ছেলের আদর্শ প্রতিনিধি। আমাকেও বইয়ের পাতা ছেড়ে উঠে এসে বাস্তবে অ্যাডভেঞ্চারে যেতে বাধ্য করা হলে কুমারের মতই অবস্থা হত কিনা, তাই তার সাথে বেশ সিমপ্যাথাইজ করতে পারলাম।
কাহিনির সমাপ্তিটুকু যেভাবে হলো তাও বেশ মনে ধরলো। সবমিলিয়ে যতক্ষণ বইটা পড়েছি খুব অসাধারণ একটা সময় গেছে আমার। 'চাঁদের পাহাড়' যেই বয়সে পড়েছি সেই বয়সে পড়ার সুযোগ হলে নিঃসন্দেহে অল টাইম ফেভারিট শেলফে জায়গা করে নিত!