এই বইয়ের সাবটাইটেলেই বিষয়বস্তু বলা আছে: রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনী সংকলন। এখানে নতুন ও পুরোনো লেখক-লেখিকা মিলিয়ে মোট ১২টি কাহিনী রয়েছে যার মধ্যে পাঁচটি অনুবাদসাহিত্য। বর্তমানে অনুবাদসাহিত্যের ধারার বহমানতা সরস্বতী নদীর মতো। কাজেই সম্পাদকদের অনূদিত রহস্যকাহিনীকেও সংকলনে রাখার সুবিবেচনাকে সাধুবাদ জানাই। এবার আর কথা না বাড়িয়ে ঢুকে পড়ি বইয়ের কনটেন্টে।
বরফ পাহাড়ের আগুন: সৈকত মুখোপাধ্যায় যাঁরা সৈকতবাবুর লেখনীর সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা খুব ভালোই জানেন লেখকের থ্রিলার লেখার ক্ষমতা কেমন। যাঁরা জানেননা, তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি, শব্দ দিয়ে ছবি আঁকেন সৈকত মুখোপাধ্যায়। থ্রিলারের ক্ষেত্রে পাঠক হিসেবে একটা এক্সপেক্টেশন থাকে যে যেন গোটা ঘটনাটা বুঝতে পারি। সেই এক্সপেক্টেশন পূরণ করতে সৈকতবাবুকে দশে বারো দেওয়া যায়।
সীমানা: এইচ আর ওয়েকফিল্ড মূল কাহিনী: দ্য ফ্রন্টিয়ার গার্ডস ভাষান্তর: তমোঘ্ন নস্কর প্রেডিক্টেবল গল্প কিন্তু সযত্নে গল্পের পরিবেশটা রচনা হওয়ায় উৎরে গেছে। অনুবাদ সাবলীল।
খুঁত: পার্থ দে এই লেখাটা পড়তে পড়তে আর গল্পের মূল চরিত্রের বর্ননা ও তার পেশা এসব সম্পর্কে জানতে জানতে মনে হচ্ছিল যেন বাস্তব জীবনের একটা ঘটনাকে(সেটা আপনারাও সবাই জানেন, পড়লে বুঝবেন কোন ঘটনা) কেন্দ্রবিন্দু করে লেখক রহস্যজাল বুনেছেন। মোটের ওপর এনজয়েবল।
মীন: দীপিকা মজুমদার প্রপার রহস্য গল্প বুনতে গেলে একজন লেখককে প্রতিটা ছেড়ে যাওয়া সূত্রকে মিলিয়ে দিতে হয় গল্পের শেষে। লেখিকা একদম নিখুঁতভাবে এই নিয়ম অনুসরণ করেছেন। একবারের জন্যেও মনে হয়নি যে এই জায়গার প্রশ্নটা রয়ে গেল। খুব সুন্দর করে প্লটটা এগিয়ে নিয়ে গেছেন লেখিকা।
পড়শি: রিচার্ড ম্যাথেসন মূল কাহিনী: দ্য ডিস্ট্রিবিউটর ভাষান্তর: সৌভিক চক্রবর্তী এই কাহিনীর শেষটা আমি বুঝিনি। মানে মোটিফটা ঠিকঠাক পরিষ্কার লাগেনি আমার কাছে। অনুবাদও কিছু জায়গায় আড়ষ্ট। তবে গল্পটা খুব ভাল। রহস্যটা পাঠকদের কাছে উন্মোচন করে চরিত্রদের কাছে ধোঁয়াশা রেখে দেওয়াটা কঠিন বিষয়। সেটা এখানে খুব সাবলীলভাবে করা হয়েছে।
পূর্ণিমা: অদিতি সরকার প্রেডিক্টেবল প্লট। তবে ভাষার ব্যবহার ও গল্পকথনটা ভাল লেগেছে।
স্বপ্ন-বাড়ি: আগাথা ক্রিস্টি মূল কাহিনী: দ্য হাউজ অফ ড্রিমস ভাষান্তর: পিনাকী মুখোপাধ্যায় এই সংকলনের অনুবাদগুলির মধ্যে সেরা কাহিনী এই স্বপ্ন-বাড়ি। অনুবাদও উচ্চমানের। রহস্যরাণী যেভাবে খেলা করতেন মানুষের মনের গহীন নিয়ে, অনুবাদকও সেই খেলায় শামিল হতে সক্ষম হয়েছেন।
কাঠিবাবু: সায়ন্তনী পুততুন্ড এই সংকলনের মৌলিক কাহিনীর মধ্যে সেরা। রহস্যের সঙ্গে সঙ্গে পরতে পরতে সামাজিকতাও জড়িয়ে রয়েছে গল্পে।
কালযাত্রী: রবার্ট এ হাইনলাইন মূল কাহিনী: অল ইউ জম্বিস ভাষান্তর: অভীক মুখোপাধ্যায় টাইমট্র্যাভেল নিয়ে একটা অসাধারণ গল্প। গল্পটা বেশ আমায় বেশ কয়েক জায়গায় আবার পেছনে গিয়ে পড়তে হয়েছে সম্পূৰ্ণভাবে গল্পটা আস্বাদন করার জন্য। সংকলনের দ্বিতীয় সেরা অনুবাদ।
মামলার শেষে: সৌরভ মুখোপাধ্যায় 'কাঠিবাবু'র সঙ্গে যুগ্মভাবে 'সেরা' তকমা পাওয়ার যোগ্য এই কাহিনী। কাহিনীর শেষটা এরকম হবে কল্পনার বাইরে ছিল।
নেকড়ে: রন উইঘেল মূল কাহিনী: শ্যাডো অফ দ্য উলফ ভাষান্তর: ঋজু গাঙ্গুলী এটা মূলত শার্লক হোমসের একটা প্যাস্টিশ। কাহিনী হিসেবে খুবই দুর্বল। আরও একটু স্ট্রং মোটিভ থাকলে ভাল লাগত।
সপ্তম স্বর্গ: সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এই সংকলনের শেষ গল্প। একই সঙ্গে আপনাকে রহস্যের সমাধান খুঁজতে এবং আপনার মেরুদন্ড বেয়ে ঠান্ডা ভয়ের স্রোত নামাতে সক্ষম এই কাহিনী।
সব শেষে একটা কথা না বললেই নয়, তা হল অলংকরণের দায়িত্বে থাকা অর্ক পৈতণ্ডীর কথা। তাঁর প্রতিটা আঁকার মাধ্যমে গল্পের পুরো অ্যাম্বিয়েন্সটা ফুটে উঠেছে।
রহস্য রোমাঞ্চ জঁর-এ, আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখক কে জানেন?
জানেন না। চেষ্টা করেও আন্দাজ করতে পারবেন না।
জটায়ু, ওরফে লালমোহন গাঙ্গুলী।
অস্যার্থ, এ বাবদ আমি বিরাট পড়ুয়া নই, বিশাল অভিজ্ঞ পড়ুয়াও নই। সিম্পুল কারণ আমার স্বভাবের মূল রসটা হাস্যরস, সাসপেন্স জমিয়ে উপভোগ করলেও আমায় কৌতুকের সহজিয়া আনন্দ বেশী টানে। তবু, নয় নয় করেও যা পড়েছি, যত পড়েছি তা নেহাৎ কমও নয়। কাজেই এ ধরণের কাহিনি সংকলন পড়তে বসলে আমার বেশ কিছু প্রত্যাশা থাকে। অরণ্যমন থেকে প্রকাশিত নতুন ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখার সম্মিলিত সংকলন ‘বৃশ্চিক’ বেশ ভালভাবেই সে প্রত্যাশা মেটাতে সক্ষম হয়েছে।
লেখাগুলোর আলোচনায় যাবার আগে বইটার কথা বলে নিই। কারণ বইমেলায়, এ বইটা এসে হাজির হবার পর প্রথম আমার মন কেড়েছিল প্রচ্ছদ। রহস্য রোমাঞ্চ বলেই রগরগে ছবি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার হালফ্যাশনটা বৃশ্চিকের প্রকাশক-সম্পাদকরা করেননি দেখে ভাল লেগেছিল। একটিমাত্র লাল বিচ্ছুতে আতঙ্কের ঈষদাভাস, নামটা থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তে ভয়ের একটা ঝটিকা ছোঁয়া, এবং চোখ সরিয়ে নিতে নিতে খেয়াল হওয়া দুধসাদা কভারের দুই, ছবির ব্যাকরণ অনুযায়ী সবচেয়ে কম দৃষ্টি আকর্ষণকারী কোণ দুটিতে, দুই বিছের ছায়াশরীরের শিহরণ। প্রচ্ছদভাবনা, চিত্র দুই-ই দশে দশ। (প্রসঙ্গতঃ, এই রক্ত জিনিসটা ঠিক মাত্রাজ্ঞানের সঙ্গে ব্যবহার করতে না পারলে যে কি কুৎসিত জঘন্য প্রচ্ছদ হতে পারে তা ইদানীংকালের অন্য একটি বইতে দেখেছি, তার প্রকাশককে নিভৃতে জানিয়েও এসেছি।)
মলাটের মুগ্ধতা, মলাটের ভিতরের বিষয়েও মোটামুটি একই রকম ভাবে ছড়িয়ে থেকেছে। অনুবাদ গল্পগুলিতে পরে আসছি, আগে মৌলিক লেখাগুলির কথা বলি।
রহস্য রোমাঞ্চ দুনিয়ায় সৈকত মুখোপাধ্যায় পরিচিত নাম, পাঠকদের মন জয় করে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসনের অধিকারী। সংকলন শুরু হয়েছে তাঁর লেখা ‘বরফ পাহাড়ের আগুন’ গল্প দিয়ে। দুরন্ত লেখা। খুব নিরীহভাবে, রোমাঞ্চ দিয়ে শুরু হয়ে পরে রহস্যের খাসমহলে ঢুকে পড়াটা ঈর্ষনীয় রকমের চমকপ্রদ। নেহাত ওঁকে ঈর্ষা করি না, তাই!
পার্থ দে-র ‘খুঁত’, খুব মেপে, অল্পের মধ্যে গুছিয়ে লেখা এক ব্যর্থ পরিকল্পনার কথা - লেখার কৌশলে দুর্দান্ত। ফিরে দ্বিতীয়বার তারিয়ে তারিয়ে পড়া যায়, এতটাই ভাল লেগেছে লেখাটি। এর বেশি কিছু বললে স্পয়লার দেওয়া হবে, তাই থেমে গেলুম।
দীপিকা মজুমদারের ‘মীন’ আমার দুর্বল লেগেছে, অতিদীর্ঘ অনাকর্ষক লেখাটি সংকলনের বাকি লেখাগুলোর সঙ্গে খাপ খায়নি।
অদিতি সরকারের ‘পূর্ণিমা’ বহুব্যবহৃত প্লট ও কিছুটা পর থেকে প্রেডিক্টেবল। তা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র লেখার বাঁধুনির জন্যই একটানে পড়ে ফেলতে বাধ্য করে, এবং পড়ে ভাল লাগে। এই পড়ে ভাল লাগে টা খুব জরুরি কথা আমার মত পাঠকদের জন্য, অনেক গল্পই তো ভেবে দেখতে গেলে, কখনো না কখনো, কেউ না কেউ আগে লিখে গেছেন। তবু, গল্প বলা যখন সুন্দর হয়, তখন চেনা জানা গল্পও আবার শুনতে দিব্যি লাগে। পড়ার পর, ভাল লাগার রেশটুকু থেকে গেলে সেটা পাঠকের বিশাল পাওনা, লেখকের বিশাল তৃপ্তি।
সায়ন্তনী প��ততুন্ডর ‘কাঠিবাবু’ খুব ভাল একটি ছোটগল্প, কিন্তু এই সংকলনে আমার কিছুটা বেমানান লাগল। গল্পটি মানবচরিত্রের, রহস্য পার্ট তাতে নগন্য, প্রায় আরোপিত মনে হবার মত তুচ্ছ। যদি সাইকোলজিকাল রহস্য-রোমাঞ্চ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে তাহলে তাতে অনেক বেশি জটিলতা আশা করি – এই সংকলনেরই ‘পড়শি’ অনুবাদ-গল্পটি যার উদাহরণ। তবে, আবারও বলি, গল্প হিসেবে ‘কাঠিবাবু’ রীতিমত ভাল। হালকা চালের ভাষাতেও চরিত্রগুলোর ঝুলকালিমাখা অন্দরমহল ফুটে উঠেছে নিপুণভাবে।
জটিলতার প্রশ্নে অবশ্য সৌরভ চক্রবর্তীর ‘মামলার শেষে’ বেশ প্যাঁচ খাইয়ে তৈরী গল্প। লেখা বেশ ভাল, কিন্তু প্লটটা, কিছুটা অবাস্তব লাগল। বা, বলা ভাল, গল্পে উপস্থাপনে ফাঁক আছে মনে হল, আরো বিশ্বাসযোগ্য করে মুখ্য অভিযুক্ত চরিত্রের আচরণগুলো আনা হয়তো দরকার ছিল। রহস্য উন্মোচনের ব্যাখ্যায় বেশ কিছু খটকা থেকে যায়, অসন্তোষও।
সংকলনের অন্যতম সেরা গল্প সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘সপ্তম স্বর্গ’। ঘটনাচক্রে এটা পড়েওছি রাত্রে, ঠিক ঘুমোতে যাবার আগে – এটা কেন বললাম তা গল্পটা পড়লে বুঝবেন। তবে, দিনে পড়লেও এ গল্পটা মনে দাগ কাটত। একটু ডার্ক লেখা, রহস্য রোমাঞ্চের সঙ্গে তীব্র আতঙ্কও পাঞ্চ করা, তাড়াহুড়ো নেই, ধীর স্থির চালে এগোচ্ছে কিন্তু টানটান, পাঠককে উত্তেজনার চূড়ায় নিয়ে গিয়ে ঈপ্সিত ধাক্কার সঙ্গে সমাপ্তি। দুর্দান্ত।
এবার আসি অনুবাদ গল্পগুলোয়। আচ্ছা, সূচীপত্রে অনুবাদকের নাম নেই কেন? অনুবাদের কাজটা তো এত তুচ্ছও নয়! যাই হোক, সম্পাদকত্রয়ীকে স্যালুট সংকলনে অনুবাদ রাখার জন্য এবং তাতে এমন অনতিপরিচিত গল্প অনুবাদের জন্য বেছে নেওয়ার জন্য। বহু বহু কাল বাদে, সম্ভবত সেই ছোটবেলার আনন্দমেলার পর এরকম চমৎকার অনুবাদ গল্প পড়লুম।
এইচ আর ওয়েকফীল্ডের ‘দ্য ফ্রন্টিয়ার গার্ডস’ অনুবাদ করেছেন তমোঘ্ন নস্কর ‘সীমানা’ – কৃতিত্ব ভাগাভাগি করে দিতে হয় তো বটেই, এমন হৃৎস্পন্দন ক্ষণিকের জন্য থামিয়ে দেওয়া গল্পভাবনার জন্য কুর্ণিশ নিশ্চয় মূল লেখককে, কিন্তু অনুবাদক যে সেই সাসপেন্স, সেই আদ্যন্ত বিদেশী পরিবেশ ভাষান্তরেও ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন এ কৃতিত্ব তাঁরই। তবে, নামকরণটা মূলে অনেক বেশী অর্থবহ, ব্যঞ্জনাময়।
রিচার্ড ম্যাথেসনের ‘দ্য ডিস্ট্রিবিউটর’ অনুবাদ করেছেন সৌভিক চক্রবর্তী ‘পড়শি’ নামে, জটিল মনস্তাত্ত্বিক গল্প, পড়ে কেমন হতবাক হয়ে যেতে হয়। অনুবাদটি সামান্য কাঠ-কাঠ লাগল। তবে যেহেতু মূল গল্প পড়িনি তাই জানিনা, হয়তো মূলানুগ হওয়ার জন্যই এরকম বাক্যের গঠন।
আগাথা ক্রিস্টির ‘দ্য হাউজ অফ ড্রিমস’ অনুবাদ করেছেন পিনাকী মুখোপাধ্যায়, ‘স্বপ্নের বাড়ি’ নামে। এইটে বেশ সন্দিগ্ধচিত্তে পড়তে শুরু করেছিলুম, কারণ আগাথা ক্রিস্টি আমার প্রচণ্ড প্রিয় লেখক ( বললুম তো, নয় নয় করে নেহাৎ কমও পড়িনি রহস্য রোমাঞ্চ। চাকরি পাওয়ার পর প্রথম যে কাজটা করেছিলুম তা হল ধরে ধরে খুঁজে খুঁজে আগাথা ক্রিস্টির কলেকশনটা কমপ্লীট করা। ) ক্রিস্টির লেখার ম্যাজিক পুরোপুরি অনুবাদ করা অসম্ভব বলে আমার ধারণা। প্রতিটি তুচ্ছ চরিত্রও তাঁর কলমে রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষ হয়ে ফোটে, রহস্য মিস মার্পলের সোয়েটারের প্যাটার্ণের মতই নির্ভুল হিসেবে গড়ে ওঠে, কোন সাংঘাতিক অ্যাকশন বা গা-গরম করা ডায়লগের তোয়াক্কা না করেই স্নায়ু টান করে রাখা উত্তেজনায় এক সীটিং এ পুরো বই পড়ে ফেলতে বাধ্য হয় পাঠক। কাজেই, পড়তে শুরু করার আগে সংশয় ছিল। এ গল্পটি তাঁর স্বল্প-পরিচিত ছোটগল্পগুলোর একটা, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার গা ছমছমে গল্প। অনুবাদক গল্পটির যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে পেরেছেন, হতাশ হইনি পড়ে।
রবার্ট এ হাইনলাইন এর ‘অল ইউ জম্বিস’ অনুবাদ করেছেন অভীক মুখোপাধ্যায়, ‘কালযাত্রী’ নামে। প্রচণ্ড জটিল গল্পসূত্র নিখুঁতভাবে জড়িয়ে এবং ছাড়িয়ে, ঝরঝরে ভাষায় শেষ অবধি গেছে গল্পটি। আবারো, মূল গল্প পড়িনি, কিন্তু অনুমান করতে পারি এরকম জটিল গল্প ভাষান্তরে, সহজবোধ্য করে লেখা কতটা কঠিন। অনুবাদক কঠিন কাজটা অবলীলায় করে দেখিয়েছেন।
রন উইঘেলের ‘শ্যাডো অফ দ্য উলফ’ অনুবাদ করেছেন ঋজু গাঙ্গুলী। গতকালই জেনেছি এ ধরণের লেখাকে বলে প্যাস্টিশ - অন্য লেখকের সৃষ্ট স্বনামধন্য চরিত্র নিয়ে তাঁদের মৃত্যুর পর আরো গল্প লেখা। এটি তেমন, শার্লক হোমস ও ওয়াটসনকে নিয়ে লেখা রহস্য গল্প। এ ধরণের গল্প আমি আগে পড়িনি্। অনুবাদে কোন খামতি নেই, বাংলা ভাষাতেও চোখের সামনে দিব্যি ফুটে উঠেছে টারেট-মিনার শোভিত লণ্ডনের বাইরের শহরতলির এক ম্যানরের ছাত। গল্পটা যে আমার নিজের ঐ অমর চরিত্রের আদি গল্পগুলোর ধারে কাছেও যেতে পারে না বলে মনে হয়েছে, সে দায় মূল লেখকের। কিন্তু তবু ধন্যবাদ এরকম গল্প অনুবাদে তুলে আনার জন্য, এই ধারার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য।
এ সংকলনের সম্পাদনার আরেকটা বিশেষ দিক উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। গল্পগুলি সাজানোর ক্রম দুর্দান্ত। প্রতিটি লেখা আগেরটার থেকে যতটা সম্ভব আলাদা, অথচ এতক্ষণ ধরে গড়ে ওঠা মুড বিগড়োয় না। একটানাই পড়ুন, বা আলাদা আলাদা করে – পড়ার সুখ বহাল থাকে। এই সাজানোটার পিছনে যে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, তা পড়ে বোঝা যায়।
কিছু কিঞ্চিৎ বানান ভুল চোখে পড়ল। তা বাদে রীতিমত তৃপ্তিদায়ক একটা সংকলন। ভবিষ্যতে আরো এমন সংকলন ‘চ্চাঁই চ্চাঁই চ্চাঁই’, বলে রাখলুম।
#পাঠ_প্রতিক্রিয়া - বৃশ্চিক (একটি রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনী সংকলন) #সম্পাদনা - ঋজু গাঙ্গুলি, অভীক মুখার্জি এবং তমোঘ্ন নস্কর #প্রকাশক/পরিবেশক - অরণ্যমন প্রকাশনী #প্রচ্ছদ, অলংকরণ এবং বিন্যাস - অর্ক পৈতন্ডি #প্রথম প্রকাশ - জানুয়ারি (কলকাতা বইমেলা), ২০১৮ #দাম - ২৫০ টাকা #পৃষ্ঠা সংখ্যা - ৩২৮
কলকাতা বইমেলা শুরু হবার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ফেসবুকের বিভিন্ন সাহিত্য সংক্রান্ত গ্রূপে মাঝে মাঝেই দেখা মিলছিল একটি বৃশ্চিকের এবং তার নিচে লেখা ছিল 'আসিতেছে'। ব্যাপারখানা কি তা স্পষ্ট হল বইমেলা শুরু হবার সাথে সাথে। অরণ্যমন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে একটি রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনীর সংকলন যার নাম 'বৃশ্চিক'। কিন্তু বইমেলাতে অনেক কষ্টেও এককপি বই জোগাড় করা সম্ভবপর হল না, সে নাকি প্রকাশের সাথে সাথেই নিঃশেষিত। অতয়েব শেষ ভরসা চিরঞ্জিত এবং তার কল্যানে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে হাতে এল বৃশ্চিকের কপি।
বই হাতে নিতেই চোখ টেনে নিল ঝকঝকে দুধসাদা কভারের ওপর আঁকা রক্তমাখা বৃশ্চিকটি। 'বৃশ্চিক' শব্দটিকে টাইটেল ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে অসাধারন রূপদান করেছেন প্রচ্ছদশিল্পী অর্ক পৈতন্ডি। বইয়ের পাতা উল্টে দেখতে গিয়ে একটা অদ্ভুত 'ফিল-গুড ফ্যাক্টার' কাজ করল যা আগে অরণ্যমনের কোন বইতে পাইনি। ১) প্রতিটি গল্পের শুরুতে অর্ক পৈতন্ডির করা ইলাস্ট্রেশন ২) বড় ফন্ট এবং লাইন-স্পেসিং এর সঠিক ব্যবহার (এতে পাঠকদের পড়তে আরাম হবে) ৩) ভাল মানের পাতা এবং ছাপাই বইটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে নিঃসন্দেহে প্রোডাকশন কোয়ালিটির দিক দিয়ে এটি এখনও পর্যন্ত অরণ্যমন থেকে প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে সেরা কাজ। তবে বইয়ের ব্যাক-কভারে বিজ্ঞাপনের ব্যবহার একদম ভাল লাগেনি।
বইয়ের সূচিপত্রের দিকে চোখ রাখলে দেখা যাবে এতে রয়েছে মোট ১২টি গল্প। যার মধ্যে ৭টি মৌলিক গল্প ও বাকি ৫টি অনুবাদ কাহিনী এবং লেখক তালিকার দিকে তাকালে দেখা যাবে নামী সুপ্রতিষ্ঠিত লেখকদের তুলনায় প্রতিভাবান নবীন লেখকদের প্রবল উপস্থিতি। এর জন্য সম্পাদক-মন্ডলীর বাড়তি অভিনন্দন প্রাপ্য, কারণ তারা নামের পিছনে না ছুটে সম্ভাবনাময় নবীন লেখকদের স্থান দিয়েছেন তাদের প্রথম প্রকাশিত রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনী সংকলনে। সত্যিই তারিফযোগ্য পদক্ষেপ, এরকম সাহসী সিদ্ধান্ত নেবার জন্য।
*** ১২টি গল্পের মধ্যে যে কাহিনীগুলি সবথেকে মন টেনেছে সেগুলি হল ***
১) পূর্ণিমা - অদিতি সরকার
রাহুল এবং শর্মি মধুচন্দ্রিমা করতে হাজির হয় গভীর জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত এক কটেজে যেখানে সেই কটেজের কেয়ারটেকার ছাড়া আর কোন মানুষ বাস করে না। রাহুল শর্মির উপস্থিতি সে মোটেই পছন্দ করে না এবং জানায় জঙ্গলে ঘোরার জন্য এটা একদম আদর্শ সময় নয়। কেন? কি হয় এই সময়?
লেখক কাহিনীতে প্রাচীন একটি মিথকে দারুণভাবে ব্যবহার করেছেন এবং তার সাথে পরিবেশের এত সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন যে পড়তে গিয়ে মনে হবে গল্পের চরিত্রদের সাথে সাথে আপনিও যেন ঘুরে বেড়াচ্ছেন এই গভীর জঙ্গলের অজানা রাস্তায়। শুরু থেকে থেকে শেষ অবধি একনিঃশ্বাসে পড়বার মতন একটি কাহিনী এবং গল্পের ক্ল্যাইম্যাক্স রোমকূপ খাড়া করে দেবার মতন। রহস্য-রোমাঞ্চ সংকলনের সেরা গল্প লেগেছে এটি, অদিতি সরকারকে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম অনবদ্য কাহিনী পাঠকদের উপহার দেবার জন্য।
সিলমার স্ট্রিটের নতুন পড়শি থিয়োডোর গর্ডন তার নতুন বাড়িতে আসার সাথে সাথেই পাড়ার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় আসে এক অদ্ভুত পরিবর্তন, যার সম্মুখীন তারা এর আগে কখনও হয়নি। এরকম কিছু যে তাদের সাথে কোনদিন হতে পারে তা তারা কল্পনাও করতে পারেনি। ঠিক কি হয় থিয়োডোর গর্ডন পড়শি হিসাবে আসার সাথে সাথে?
গল্পটি পড়তে পড়তে ভয়ে শিয়রে উঠে আপনিও আনমনে বলে ফেলবেন থিয়োডোর গর্ডন যেন আপনার পাড়ার পড়শি হিসাবে না আসে। এরকম দুর্দান্ত একটি গল্প বাছাই এবং তার সাবলীল অনুবাদের জন্য লেখক সৌভিক চক্রবর্তীকে জানাই অকুন্ঠ ভালবাসা এবং অভিনন্দন! অনুবাদ গল্পের তালিকায় এটা সেরা গল্প লেগেছে।
৩) মামলার শেষে - সৌরভ চক্রবর্তী
কোর্টরুম ড্রামা নিয়ে হলিউড/বলিউডে অজস্র চলচ্চিত্র তৈরী হলেও হাল আমলে বাংলা সাহিত্যে তার উপস্থিতি প্রায় হাতে গোনা। সৌরভ চক্রবর্তীর 'মামলার শেষে' কাহিনীটি সেই শুন্যস্থানটিকে খানিকটা ভরাট করল। কাহিনী শুরু হয় কিরণ রাস্তোগি নামের এক মহিলার হত্যাকাণ্ডের মামলা দিয়ে, যার মূল অপরাধীকে পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও ধরতে পারেনি। ফলে আদালত মামলাটিকে যখন প্রায় হিমঘরে পাঠাবার স্বীদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে ঠিক সেই সময় কিরণ রাস্তোগির সরকারি উকিল হিসাবে উপস্থিত হয় ইলিয়াস মোহাম্মদ। পরিচিত মহলে তার দাবি এই সেই কেস যার জন্য সে এতবছর অপেক্ষা করে আছে। ইলিয়াস কি পারে প্রকৃত অপরাধীকে সনাক্ত করতে?
জানতে হলে এই গল্পের শেষ লাইন অব্ধি আপনাকে পড়তেই হবে। অসম্ভব উপভোগ্য কোর্টরুম ড্রামা কাহিনী লিখেছেন ছোট গল্পের প্রতিশ্রুতিমান লেখক সৌরভ চক্রবর্তী।
৪) বরফ পাহাড়ের আগুন - সৈকত মুখোপাধ্যায়
ইন্ডিয়ান আর্মি থেকে বিতাড়িত কম্যান্ডার রুদ্র ঘটনাচক্রে সন্ধান পান বাদশা জাহাঙ্গীরের আমলে তৈরী এক অ্যান্টিক (Antique) সুরার বোতলের, যার দাম বর্তমানে আকাশছোঁয়া। হিমাচল প্রদেশের এক পরিত্যক্ত গ্রামে নাকি রয়েছে সেই সুরার পরিত্যক্ত ভান্ডার, কিন্তু সেখানে পৌঁছানো সহজ কাজ নয়। কম্যান্ডার রুদ্র কি পাবে জাহাঙ্গীরের আমলে তৈরী অ্যান্টিক সুরার পরিত্যক্ত ভান্ডারের সন্ধান ? উত্তর জানতে হলে একনিঃশ্বাসে পড়ে ফেলতে হবে সৈকত মুখোপাধ্যায়ের টানটান অ্যাকশন-থ্রিলার 'বরফ পাহাড়ের আগুন'।
সৈকত মুখোপাধ্যায়ের লেখনী নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই, তবে ইদানিং পড়া কাহিনীগুলিতে Antique এর উপস্থিতি বার বার পাচ্ছি ; বা বলা ভাল অ্যান্টিককে কেন্দ্র করেই কাহিনীগুলি গড়ে উঠছে। ওনার Antique নিয়ে লেখা কাহিনীগুলির মধ্যে আমার সেরা লেগেছে "মৃত্যুর নিপুন শিল্প", এই কাহিনীর প্লটকে কিশোরদের উপযোগী করে কিছুটা এডভেঞ্চার মোডে লেখা উপন্যাস 'অ্যান্টিক আতঙ্ক'। এছাড়া বুধোদা সিরিজের অনেকগুলি কাহিনীও গড়ে উঠেছে কোন না কোন অ্যান্টিক সামগ্রীকে কেন্দ্র করে। (বিষয়টি চোখে পড়ল তাই উল্লেখ করলাম, এর মধ্যে কোন বিতর্ক সৃষ্টি করা আমার উদ্দেশ্য নয়)
পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদে একটি অসাধারণ সাইকোলজিকাল থ্রিলার 'স্বপ্ন-বাড়ি'। একটি স্বপ্ন-বাড়ির অস্তিত্ব নিয়েই গড়ে উঠেছে এই কাহিনীটি, যার শেষাংশটি পড়ে পাঠকরা বুঝতে পারবেন কেন আগাথা ক্রিস্টিকে 'কুইন অফ মিস্ট্রি' বা 'রহস্যের রানী' বলা হয়। পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের গল্প বাছাই এবং অনুবাদ তারিফযোগ্য।
৬) কালযাত্রী - রবার্ট এ হাইনলাইন (অনুবাদ - অভীক মুখার্জি)
সময় বা কালের আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া একটি মানুষের জীবনকাহিনির অসামান্য উপস্থাপনা রবার্ট এ হাইনলাইনের 'কালযাত্রী'। গল্পের কাহিনী এবং রূপায়ন পাঠকদের মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতন। এরকম অসাধারণ একটি সাই-ফাই কাহিনী নির্বাচন এবং অনুবাদের জন্য অভীক মুখার্জিকে অভিবাদন জানাই।
*** এছাড়াও ভাল লেগেছে ***
৭) নেকড়ে - রন উইঘেল ( অনুবাদ - ঋজু গাঙ্গুলি )
ইয়ার্কশায়ারের ক্রফোর্ড নামের একটি গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে নেকড়ে-মানুষ বা Warwolf এর আতঙ্ক। সত্যিই কি আছে ওয়্যার-উলফ নাকি সবটাই গুজব? উত্তর জানতে পাঠকদেরও শার্লক হোমসের সাথে চড়তে হবে ক্রফোর্ড যাবার ট্রেনে যেখানে আছে সব রহস্যের সমাধান।
ঋজু গাঙ্গুলির অনুবাদের দৌলতে আমরা শার্লক হোমসের একটি প্যাস্টিসে (pastiche) বাংলাতে পড়বার সুযোগ পেলাম। পাঠক হিসাবে ঋজু গাঙ্গুলির কাছে একান্ত অনুরোধ গল্প লেখার পাশাপাশি অনুবাদের কাজটা খুব সিরিয়াসলি করবার জন্য। আপনার পাঠঅভিজ্ঞতা এবং বিস্তৃতি অবাধ, তাই সাগরের তলদেশ থেকে কিছু মণি-মুক্তা তুলে এনে যদি পাঠকদের কাছে তুলে ধরেন তাহলে আমরা পাঠকরা আপনার কাছে চির-কৃতজ্ঞ থাকবে।
৮) মীন - দীপিকা মজুমদার
প্রাইভেট ডিটেকটিভ অরুনাভ ও অদিতির কাছে একটি মেয়ের অপহরণের কেস আসছে। তদন্তে নেমে তারা জানতে পারে এই মেয়েটির অপহরণের সাথে যোগ আছে একটি মৃত্যুর ঘটনার। রহস্য আরও গভীর হয় যখন মেয়েটির পাঠানো একটি SMS কাহিনীর মোড়কে ঘুরিয়ে দেয়। এই মৃত্যুর ঘটনার সাথে জ্যোতিষ শাস্ত্রের 'মীন' রাশির যোগ আছে। এই দুই ক্লু কে অবলম্বন করে অরুনাভ ও অদিতি কি ভাবে হত্যাকারীকে খুঁজে বার করে তা জানবার জন্য পড়তে হবে দীপিকা মজুমদারের কাহিনী 'মীন'. গল্পটি একবার পড়তে ভাল লাগবে।
৯) খুঁত - পার্থ দে
যশ, ঋষি এবং মোহিত ছোটবেলার তিনবন্ধুর মাঝে আসে রুহি। এই রুহিকে পাবার জন্য সাজানো হয় এক মার্ডার প্ল্যান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাতে থেকে যায় সামান্য ত্রুটি বা খুঁত। গল্পটি একবার পড়তে ভাল লাগবে।
*** সেভাবে মন টানেনি/ জমেনি ***
১০) কাঠিবাবু - সায়ন্তনী পূততুন্ড
রিচার্ড ম্যাথেসনের 'পড়শি' গল্পটি পড়বার পরে 'কাঠিবাবু' গল্পটি একদম জমেনি। গল্পটির মধ্যে সেরকম জমাটি ব্যাপার চোখে পড়ল না। সম্পাদকমন্ডলী বরং সায়ন্তনী পূততুন্ডর লেখা 'নাগমতীর উপখ্যান' কাহিনীটি সংকলনে রাখলে ভাল করতেন।
১১) সীমানা - এইচ আর ওয়েকফিল্ড ( অনুবাদ - তমোঘ্ন নস্কর ) সেভাবে মন টানেনি লেখাটা, গল্প বাছাই ও খুব একটা ভাল লাগেনি।
১২) সপ্তম স্বর্গ - সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
অসম্ভব ভাল প্লটের একটা গল্প শেষ তিন পাতায় এসে কেমন যেন খেয়ে হারিয়ে ফেলল। গল্পের যে এরকম অদ্ভুত একটা পরিসমাপ্তি হবে সেটা একদম আশা করিনি। অথচ তার আগে অবধি পুরো কাহিনীটি গোগ্রাসে গিলেছি। এই খারাপ লাগাটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত। গল্পের শেষের টুইস্টটা অন্য পাঠকদের ভালোও লাগতে পারে, আমার যেমন লেগেছে সেরকমই জানালাম।
প্রায় নির্ভুল ছাপা, চমৎকার বাঁধাই, পাঠযোগ্য ফন্টের ব্যবহার এবং সর্বোপরি পেপারব্যাক স্টাইলে করা এই বইটি হাতে তুলে নিলে পড়তে ইচ্ছে করবেই। তাই আর দেরি না করে আজই সংগ্রহ করে ফেলুন রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনীতে ঠাসা এই দুর্দান্ত সংকলনটিকে।
বৃশ্চিক - একটি রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনি সংকলন প্রকাশক - অরণ্যমন প্রকাশনী মুদ্রিত মূল্য - ২৫০ পৃষ্ঠা সংখ্যা - ৩২৮ পেপারবাইন্ড
এক শ্রেণীর পাঠক-লেখক-সমালোচকের কাছে থ্রিলার বা রোমাঞ্চ ঘরানার লেখনী মূল সাহিত্যরসের তুলনায় অপাংতেও হলেও এই ঘরানার লেখনী বহু-সময় ধরে আমার মতো অগণিত পাঠকের কাছে অত্যন্ত আদৃত। বাংলা সাহিত্যে বিগত কয়েক বছরে এই ঘরানা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে এবং এখনো হয়ে চলেছে। মৌলিক গল্পের পাশাপাশি বলিষ্ঠ কলমে বিশ্ব সাহিত্য থেকে বেছে নেওয়া রোমাঞ্চ ঘরানার অনুবাদ গল্প ও বিগত বছর কয়েক ধরে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন দুই বাংলার লেখক ও প্রকাশকরা। এই বাংলার অরণ্যমন প্রকাশনী এরকমই কিছু মৌলিক ও অনুবাদ গল্প নিয়ে তৈরি করেছে এই বৃশ্চিক গল্প সংকলন যা সম্পাদনার দায়িত্বে রয়েছেন ঋজু গাঙ্গুলি, তমোঘ্ন নস্কর, অভিক মুখার্জির মতো বিদগ্ধ লেখক- পাঠক মহাশয়রা। মূলত লেখক লেখিকা সূচি ই এই বইয়ের প্রতি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে তবে আমি যখন এই বইয়ের প্রথম পর্ব পড়া শুরু করছি ততদিনে এই বইয়ের আরও ৩ টি খণ্ড বেরিয়ে গেছে। better late than never। এবার চট জলদি বলে দি এই সংকলনে ঠাঁই পাওয়া গল্প গুলির সম্বন্ধে।
১) বরফ পাহাড়ে আগুন (সৈকত মুখোপাধ্যায়) - ইতিহাসের পটভূমি এনে রচিত বর্তমান সময়ের গল্প। লেখকের সুন্দর কলমে চারশো বছরের পুরনো ইতিহাসের সাথে বর্তমান ভারতবর্ষের কাহিনী জুড়ে অত্যন্ত উপভোগ্য একটি বড় গল্প তৈরি হয়েছে। থ্রিলার ঘরানার বৈশিষ্ট্য মেনে শেষ পর্বে চমকটিও বেশ লেগেছে আমার।
২)সীমানা (এইচ আর ওয়েকফিল্ড(দ্য ফ্রন্টিয়ার গার্ডস), তমোঘ্ন নস্কর) - অনুবাদ গল্প। একদম শুরু থেকে একটি ভয়ের রেশ বুনে লেখক এগিয়েছেন। তবে এই ধরণের গল্প প্রতিবার পড়ার পর আমার মনে হয় 'শেষ হয়েও হইলো না শেষ' । চূড়ান্ত রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি তে ড্রপ সিনের মতো গল্পটি শেষ হয়ে গেলেও রিনরিনে যে ভয়ের রেশটা রয়ে যায় সেটাই বোধহয় এই গল্পের সার্থকতা। তমোঘ্ন বাবুর অনবদ্য অনুবাদে গল্পটি অত্যন্ত উপভোগ্য।
৩) খুঁত ( পার্থ দে) - অন্তর্জাল পত্রিকায় পড়া গল্পে। প্রথম পার্থ বাবুর কলমের স্বাদ পাই। পাঠককে গল্পের পাতায় আটকে রাখা এই অনবদ্য কলমচির প্রধান বিশেষত্ব। এই গল্পটিও তার ব্যতিক্রম নয়। সম্পর্কের জেরে খুনের মতো সাধারণ বিষয় নিয়ে রচিত হলেও লেখকের গুণে গল্পটি একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে থাকা যায়না।
৪) মীন (দীপিকা মজুমদার) - লকড রুম মিস্ট্রী, অপহরণ নিয়ে পুরাদস্তুর রহস্য ধর্মী বড় গল্প। ভালোই লেগেছে আমার ।
৫) পড়শি (রিচার্ড ম্যাথেসেন ( দ্য ডিস্ট্রিবিউটর), সৌভিক চক্রবর্তী)- একটি শান্ত পাড়ার মধ্যে একদা আসে নতুন এক পড়শি। তারপরেই সম্পূর্ণ বদলে যায় পাড়াটির শান্তি পূর্ণ চেহারা। এ গল্প পড়তে পড়তে বার বার মনে পড়ে যায় প্যান্ডরার বাক্সের কথা। একটি মাত্র খলনায়ক যেন সহসা উন্মুক্ত করে দিলো পাড়ার সকল মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার অংশগুলি। অসাধারণ একটি অনুবাদ গল্প।
৬) পূর্ণিমা (অদিতি সরকার) - গল্পটি প্রথম পড়েছিলাম কল্পবিশ্ব অন্তর্জাল পত্রিকায়। ফ্যান্টাসি ঘরানার এই থ্রিলার গল্পটি প্রথমবার পরেই যে রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম তা বলার নয়। লেখিকার স্বাদু কলমে পূর্ণিমা রাত্রের মোহময়ী জঙ্গুলে পরিবেশ একেবারে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
৭) স্বপ্ন বাড়ি ( আগাথা খ্রিস্টি ( দ্য হাউজ অব ড্রিমস) পিনাকী মুখোপাধ্যায়) - এই গল্পটি অনুবাদ গল্প যদিও এর মূল গল্পটি আমি আগে কোথাও একটা পড়েছিলাম। মূল গল্পটির রসাস্বাদন যে আমি করতে পারিনি তা বোধহয় পাঠক হিসেবে আমারই ব্যর্থতা। অনুবাদ গল্পটির ও রসাস্বাদনে ব্যর্থ হলাম।
৮) কাঠিবাবু (সায়ন্তনী পূততুন্ড) - অতি সাধারণ এক ব্যক্তির ততোধিক সাধারণ এক বদ অভ্যাস। কাঠি করা। এই সাধারণ ব্যক্তির ই প্রসঙ্গ নিয়ে বেশ উপভোগ্য একটি গল্প। অসাধারণ না লাগলেও স্বীকার করতেই হচ্ছে বেশ উপভোগ্য।
৯) কাল যাত্রী ( রবার্ট এ হাইনলাইন ( অল ইউ জোম্বিস) অভিক মুখোপাধ্যায়) - এই সংকলনের একমাত্র কল্পবিজ্ঞান গল্প। টাইম ট্রাভেল এবং টাইম প্যারাডক্স নিয়ে বেশ ভালো লেগেছে এই ছোট গল্পটি।
১০) মামলার শেষে ( সৌরভ চক্রবর্তী)- কোর্ট রুম ড্রামা বলা যেতে পারে এই বড় গল্পটিকে। প্রথম থেকে দারুণ ভাবে রহস্য জমিয়ে শেষে একটি মোক্ষম মোচড় দিয়ে গল্প শেষ করেছেন লেখক। গল্পটি উপভোগ্য হলেও গল্পের ভিত্তি টি মানে রহস্য টি কিছুটা মামুলি লেগেছে আমার। সেটার একটা কারন হয়তো এই যে সদ্য নারায়ণ সান্যাল মহাশয়ের 'কাঁটায় কাঁটায়' পড়েছি তাই না চাইলেও তুলনা এসেই গেছে।
১১) নেকড়ে ( রণ উইঘেল (শ্যাডো অফ দ্য উলফ) ঋজু গাঙ্গুলি) - প্যাস্টিশ গোত্র ভুক্ত অনুবাদ গল্প। আদি অকৃত্রিম শার্লক হোমসের সম্পূর্ণ স্বাদ বজায় রাখে এই ছোট গল্পটি। মূল গল্পটি পড়ার ইচ্ছে জন্মাল এই লেখাটি পড়ে। অনুবাদের মান প্রশ্নাতীত কিন্তু অনুবাদ পড়ে যা মনে হলো তাতে আমার মতে মূল গল্পটিকে অসাধারণ কিছু তকমা দেওয়া যায় না। তবে মানতেই হচ্ছে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো।
১২)সপ্তম স্বর্গ (সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়)- একদিকে এক গোয়েন্দা অন্যদিকে এক ভুতুড়ে গল্পের লেখকের কথা নিয়ে শুরু থেকেই একটি ভয়ের রেশ ধরে রেখে এগোলেও গল্পের পরিণতি টি আমার পছন্দ হয়নি। প্রথম থেকে লেখনীর গুনে যে ভয়ের পরিবেশ টি তৈরি হচ্ছিল তাতে আরেকটু রোমাঞ্চকর অন্যরকম কিছু শেষ আসা করছিলাম।
সবশেষে বলতেই হচ্ছে প্রচ্ছদ শিল্পীর মানানসই অঙ্কন গুলির কথা। প্রতিটি গল্পের সাথে মানান সই ছবি গল্পটির প্রতি প্রথম আগ্রহ তৈরি করতে সম্পূর্ণ সফল। পরিশেষে বলি যে ভালো লাগা খারাপ লাগা সবটাই আমার একান্ত ব্যক্তিগত। থ্রিলার ঘরানার ১২ টি ভিন্ন গল্প দিয়ে এই সংকলনটি কিন্তু বেশ ভালোই। অন্যান্য ভাগ গুলি পড়ার তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বইয়ের নাম- বৃশ্চিক ( একটি রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনী সংকলন) প্রকাশনা - অরণ্যমন প্রকাশনী
আমি বরাবরই রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনীর একনিষ্ঠ পাঠক। তাই যখন লোকমুখে শুনলাম বৃশ্চিক বইটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তখন কিনতে দেরি করিনি । প্রথমেই বলা উচিত যেটা সেটা হচ্ছে পৃষ্ঠার গুণগত মান। সাদা ধবধবে সুন্দর পাতার উপর গোটা গোটা অক্ষরের ছাপা শব্দ পড়তে অত্যন্ত সুবিধা হয়েছে। এবার আসা যাক গল্পে।
বরফ পাহাড়ের আগুন:- সৈকত মুখোপাধ্যায় বর্তমান বাংলা সাহিত্য জগতের পরিচিত লেখক। তাঁর এই গল্পটি কোনো রহস্য কাহিনী নয় বরং রোমাঞ্চ কাহিনী বা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী বলা চলে । ইন্ডিয়ান আর্মির অপারেশন নিয়ে বেশ টানটান অ্যাকশন থ্রিলার।
সীমানা :- এইচ.আর.ওয়েকফিল্ড এর লেখা " দ্য ফ্রন্টিয়ার গার্ডস" গল্পের ভাষান্তর করেছেন তমোঘ্ন নস্কর । এটি একটি ছোট হরর গল্প হলেও ভয় খুব একটা পাবে না । তবে ছোটোর মধ্যে বেশ ভালো।
খুঁত :- পার্থ দে এর লেখা এই গল্পটি বেশ ভালো লাগলো রহস্য গল্প হিসাবে। তবু ছোটো খাটো খুঁত থেকে যায় যেমন কারুর মোবাইল থেকে call history ডিলিট করলেই কি পুলিশ আর সেই ফোনকলের কথা জানতে পারে না নাকি ? খুব বোকা বোকা এটা ।
মীন :- দীপিকা মজুমদার এর একটি মোটামুটি রহস্য গল্প এটি । আপাতদৃষ্টিতে যাকে অপরাধী লাগে , গল্পের শেষে সেই যখন অপরাধী হয় তখন পাঠকের গল্প পড়ার আগ্রহ মিইয়ে যায়। লেখিকা সত্যিই হতাশ করেছেন।
পড়শি :- রিচার্ড ম্যাথেসন এর লেখা " দ্য ডিস্ট্রিবিউটর " গল্পের ভাষান্তর করেছেন সৌভিক চক্রবর্তী। এই গল্পটি অসাধারণ লেগেছে । কিভাবে ছোট ছোট সন্দেহ আর ছোট ছোট মিথ্যে একটা শান্তিপূর্ণ জায়গাকে কয়েকদিন এ ছার/খার করতে পারে তারই গল্প এটি।
পূর্ণিমা :- অদিতি সরকারের এই গল্পটি বেশ রোমাঞ্চকর। তবে গল্পের মূল প্লটটি একেবারেই নতুন না । এইরকম গল্প অজস্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বাংলা এবং বিশ্বসাহিত্যে।
স্বপ্ন বাড়ি:- আগাথা ক্রিস্টির " দ্য হাউজ অফ ড্রিমস" এর ভাষান্তর করেছেন পিনাকী মুখোপাধ্যায়। গল্পটির original version আমার আগেই পড়া। এই ভাষান্তরটি মূল গল্পের তুলনায় অনেক বেশি রোমাঞ্চকর ও আকর্ষণীয় করে লেখা হয়েছে। পিনাকী মুখোপাধ্যায় নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন।
কাঠিবাবু:- সায়ন্তনী পূততুন্ড এর অধিরাজ সিরিজ সেরম ভালো লাগে না আমার কোনদিনই। কিন্তু এই গল্পটি মন ছুঁয়ে গেল।
কালযাত্রী :- রবার্ট এ হাইনলাইন এর লেখা " অল ইউ জম্বিস" এর ভাষান্তর করেছেন অভীক মুখোপাধ্যায়। অসাধারণ একটি রোমাঞ্চকর সায়েন্স ফিকশন গল্প।
মামলার শেষে :- সৌরভ চক্রবর্তী�� এই গল্পটি রহস্য গল্প হিসাবে একদম উপযুক্ত। গল্পের শেষ টুকু অসাধারণ।
নেকড়ে:- রন উইঘেল এর " শ্যাডো অফ দ্য উলফ" এর ভাষান্তর করেছেন ঋজু গাঙ্গুলী। মন্দ লাগেনি।
সপ্তম স্বর্গ:- সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের এই গল্পটি প্রবাদ বাক্যে ব্যাখ্যা করতে গেলে হবে " ওস্তাদের মার শেষ রাতে" । পুরো বইয়ের মধ্যে এই গল্পটিই সেরা লেগেছে। বেশ ভয়াল। বাকি গল্পগুলোর মান এরম হলে ভালো লাগতো।
বৃশ্চিক পড়ার ইচ্ছে অনেকদিনের। আদ্যন্ত রহস্য, অলৌকিক, অপরাধ ঘরানার সংকলন। সমসাময়িক অনুরূপ গল্প-সংকলনের মধ্যে বৃশ্চিক বেশ ভালো।
এই সংকলনের আরেকটি ভালো দিক কিছু ভালো বিদেশী গল্প রাখা হয়েছে। সব গল্পগুলোই ভালো। যদিও কিছু পর্যবেক্ষণ আছে।
রণ উইঘেল এর লেখা নেকড়ে গল্পটিতে আমাদের প্রিয় sherlock holmes রয়েছেন, এই গল্পটি ফ্যান-ফিক্শন বা pastiche জাতীয় কিছু হবে হয়তো।
কালযাত্রী পড়ে ১০-১২ বছর আগে দেখা predestination movie মনে পড়ে গেলো। টাইম ট্রাভেল নিয়ে অসাধারণ একটা মুভি। মুভিটা যে এই গল্পের উপর base করে জানতাম না। গুগল করে জানতে পারলাম All You Zombies গল্পটি লেখা হয়েছে ১৯৫৮ সালে। টাইম ট্রাভেল নিয়ে আজ থেকে প্রায় ৬৫ বছর আগে এমন লেখা, ভাবতে পারিনি।
পড়শি গল্পটি পড়ে কিরকম অস্বস্তিকর অনুভূতি হয়েছে বোঝানো যাবে না। disturbing, eerie এই শব্দগুলো প্রযোজ্য এইরকম এক অদ্ভুত psychological গল্পের জন্য। এর পরেই কাঠিবাবু গল্পটি পড়ে পড়শি গল্পের সাথে এর basic মিল পেলাম। যদিও চরিত্র, প্লট আলাদা।
বাকি গল্পগুলোও পড়ে ভালো লেগেছে। বৃশ্চিক প্রথম সংখ্যা পড়ে অনুভূতি আনন্দদায়ক। বাকি সংখ্যা গুলোতে এরকম unique সংকলন থাকবে আশা করি।
১২ টা বিভিন্ন লেখকের বিভিন্ন গল্প। প্রতিটা গল্পের বিষয়বস্তু রহস্য। এর মধ্যে আছে কয়েকটা অনুবাদ গল্প। অনুবাদ গল্পগুলো বেশ ভালো অনুবাদ। অনুবাদ আর বাকি গল্পগুলো এসব এ কালের খ্যাতনামা লেখকদের লেখা। গল্পগুলি চমৎকার। বিষয়বস্তু নির্বাচনের জন্যে সম্পাদককে তারিফ করতে হবে। এই সিরিজের প্রথমটা পড়ার পর, পরেরটা পড়ার জন্যে উন্মুখ হয়ে রইলাম।