অনিতা আর সাবিনা। দুই ভূগোলের দুই সময়ের মানুষ। শিলংয়ের আর বাংলাদেশের। দেশভাগের আর এই সময়ের। অনিতা সেনের স্মৃতিকথা পড়তে পড়তে সাবিনার সামনে ভেসে উঠল তার বাবার জীবন। বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, দাংগা, দেশভাগ। সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। বাংলা আর বাংলার সীমান্তের ওপারের দুই মানুষের জীবনে একই ইতিহাস এগিয়ে চলল ভিন্নতর দুই গল্পে।
Shaheen Akhtar is the author of six short story collections and four novels. She has also edited the three-volume Soti O Swotontora: Bangla Shahitye Nari, about the portrayal of women in Bengali literature, and Women in Concert: An Anthology of Bengali Muslim Women's Writings 1904-1938.
Akhtar's second novel Talaash won the Best Book of the Year Award for 2004 from Prothom Alo, the largest-circulation daily newspaper in Bangladesh. The English translation of the novel was published by Zubaan Books, Delhi, India in 2011.
Novels:
1. Palabar Path nei (No Escape Route), Mowla Brothers, 2000
2. Talaash (The Search), Mowla Brothers, 2004
3. Shokhi Rongomala, Prothoma, 2010
4. Moyur Shinghashon (The Peacock Throne), Prothoma, 2014
এই যে একেকটা সময় আসে, একেকটা প্রবল স্রোত আসে, আর তাতে যে আমরা ভেসে যাই- এই স্রোত চলে যাওয়ার পর কী ঘটে আসলে? দেশ রক্ষার জন্য নকশাল হলেন, দেশ রক্ষার জন্য আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দিলেন,বিদেশে যুদ্ধ করতে ছুটে গেলেন, জীবনের সেরা সময়টা চলে গেলো, উত্তেজনার অবসান ঘটলো। এরপর?এই যে আপনার বন্ধু ফেরত আসলো না, এই যে বন্ধুর পরিবার পথে বসলো, এই যে আপনার ক্যারিয়ার বলতে কিছু নাই, এই যে আপনার আদর্শ পুরুষকে এখন আর কেউ চেনেই না, এই যে "ত্যাগ আর তিতিক্ষা" এগুলোর সত্যি সত্যি কি প্রয়োজন ছিলো? নিজেকে প্রশ্ন করেন?নিজেকে ভুলিয়ে রাখেন? ভুলিয়ে রেখে আদৌ লাভ হয়? নিজেকে নিয়ে গর্ব করতে পারেন? অনিতা, নীরদ, মোয়াজ্জেম, সাবিনার গল্পগুলো ঘুরেফিরে কেন একই রকম হয়ে যায়? ব্যক্তির অংশগ্রহণ ছাড়া ইতিহাস রচিত হয় না, কিন্তু ইতিহাসে ব্যক্তিমানুষের মূল্য কতটুকু? এমন হাজারো প্রশ্ন ছড়িয়ে আছে "অসুখী দিন" এর পরতে পরতে। পড়তে একটু কষ্ট হয় কিন্তু পড়া শেষে অভিযোগ করার জায়গা থাকে না। শাহীন আখতার এর বিষয় নির্বাচন, নিরাবেগ দৃষ্টিভঙ্গি আর প্রাগ্রসর চিন্তাভাবনার পরিচয় পেয়ে আরেকবার মুগ্ধ হলাম।
শ্রমসাধ্য এ কাজটির জন্য শাহীন আখতারকে কুর্নিশ। আমার সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাসের ছোট্ট তালিকায় অনায়াসে ঠাঁই নিলো ‘অসুখী দিন’। এ-ও ভাবনায় আসছে, চব্বিশ সনে পড়া প্রথম বইটি কি বছর শেষে সেরা বইয়ের লিস্টেও প্রথমেই থাকবে! দেখা যাক।
যেইখানে সবচেয়ে বেশি রূপ- সবচেয়ে গাঢ় বিষণ্ণতা; যেখানে শুকায় পদ্ম- বহু দিন বিশালাক্ষী যেখানে নীরব; যেইখানে একদিন শঙ্খমালা চন্দ্রমালা মানিকমালার কাঁকন বাজিত, আহা, কোনোদিন বাজিবে কি আর!
~ জীবনানন্দ দাশ
বাদামি মলাটের সাদামাটা পুরনো এক বই; হলুদের ছোপ ছোপ দাগ লাগা সেকেন্ডহ্যান্ড ঐ বই সংযোগ ঘটায় দুই ভূগোলের দুই সময়ের দুই মানুষের মাঝে। অনিতা সেনের সেই স্মৃতিকথা পড়তে পড়তে পাঠিকা সাবিনা ঘুরে আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অল ইন্ডিয়া কমিউনিস্ট পার্টি, আগস্ট আন্দোলন, আজাদ হিন্দ ফৌজ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, দাঙ্গা থেকে দেশভাগের সময়টুকুতে। বাকশক্তিরহিত পিতা আর বৃদ্ধা মায়ের কাছ থেকে শোনা খন্ড খন্ড স্মৃতিগুলোকে একত্র করে একসময় সে সন্ধানে বের হয় স্মৃতিকথার অতলে হারিয়ে যেতে বসা এক মানুষের।
ইতিহাস-আশ্রিত এই উপন্যাসে সত্য আর কল্পনার অপূর্ব এক সংমিশ্রণ ঘটিয়ে শাহীন আখতার গল্প বলে যান তাঁর স্বভাবসিদ্ধ লেখনীর মাধ্যমে; আর প্রতি অধ্যায় শেষে থমকে যেতে হয় একগাদা বিস্ময় নিয়ে। একরাশ বিষণ্ণতা আর হাহাকার নিয়ে ঘটে উপন্যাসের সমাপ্তি।
অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক নীল দরজা, যা মেলবন্ধন ঘটায় দুই সময়ের- এই মূলভাব নিয়ে জাহিদুর রহিম অঞ্জনের চমৎকার প্রচ্ছদটিও জোগায় ভাবনার বিস্তর খোরাক।
গত বছর ঠিক এমন সময়েই পড়ার সুযোগ হয়েছিল দেশের সীমানা ডিঙিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পাওয়া উপন্যাস তালাশ এর। অসুখী দিন প্রিয় লেখিকা হিসেবে শাহীন আখতারের আসনটিকে আরো পাকাপোক্ত করে দিল।
বেশ লম্বা সময় লাগলো বইটা শেষ করতে। মূল ঘটনায় প্রবেশ করতে কিছুটা সময় লেগেছে। যেই মোটামুটি চরিত্রগুলোকে বুঝতে শুরু করলাম তখনই হঠাৎ বই পড়ায় ইস্তফা দিলাম। অন্যসব বই পড়ে বেড়াচ্ছি অথচ এটা ধরা হচ্ছেনা কিংবা একটু পড়ে রেখে দিচ্ছি। এভাবে দীর্ঘ বিরতির পর অনেকটা জোর করেই পুনরায় পড়া শুরু করলাম। পড়া শেষে অবশ্য ভালোই লাগলো। বিশেষ করে শেষের একশো পাতা উপভোগ করেছি বেশ।
শাহীন আখতারের লিখার সাথে প্রথম পরিচয়। তিনি পরিস্থিতি বর্ণনা ক্ষেত্রে দেখলাম একটু বিশদ বর্ণনা টানেন। অনুভূতি বর্ণনার ক্ষেত্রে মোটামুটি নিঃস্পৃহ। গদ্যভাষা কঠিন নয় তবে দ্রুত পড়া যায়না।
শাহীন আখতার বাংলা সাহিত্যের অতি উচ্চ স্তরে আসন ক'রে নিয়েছেন আগেই, 'অসুখী দিন' সেই স্থানটাকে যেন আরো পোক্ত ক'রলো। দুই নারীর, সাবিনা ও অনিতা সেন, দুই সময়ের জীবনকে এক স্থানে নিয়ে এসেছেন উপন্যাসের শেষ অংশে। উনি যেন তেন বিষয় নিয়ে লেখেন না, কোন বিশেষ ধ্যান-ধারণায় চেপে বসেও থাকেন না। ইতিহাসকে নাড়াচাড়া করা ওনার উপন্যাসগুলোর একটা বৈশিষ্ট্য, এই উপন্যাসও একটা 'হিস্টোরিকাল ফিকশন'। ওনার পাঁচটা উপন্যাসের চারটা প'ড়েছি ('ময়ূর সিংহাসন' সংগ্রহ ক'রেছি, অচিরেই প'ড়বো), সেই উপন্যাসগুলোয় আমাদের ভূখন্ডের তথা পৃথিবীর গোলমেলে ইতিহাসকে নেড়েচেড়ে দ্যাখার আকাঙ্ক্ষা প্রতীয়মান। 'অসুখী দিন'-এও তার ব্যতিক্রম নেই।
উপন্যাসের মাঝে সরাসরি ইতিহাস চ'লে এসেছে, সেটা যে অনেক গবেষণালব্ধ তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। সেই ইতিহাসের বর্ণনা থেকে অত্যন্ত সাবলীলভাবে ফিকশনে চ'লে গেছেন, কখনো ঐতিহাসিক ঘটনার মাঝে কাল্পনিক চরিত্র খুব চমৎকারভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। উপন্যাসের টাইমলাইন সরল রৈখিক নয়, তাই পাঠকের মনোযোগ খুব জরুরী, বেশি ছেড়ে ছেড়ে প'ড়লে বইটার গূঢ় অংশ থেকে পাঠক বিচ্ছিন্ন হ'য়ে যাবে। বেশ কিছু উর্দু/হিন্দি শব্দ ব্যবহার ক'রেছেন খুব সফলতার সাথে, তা কখনোই বেখাপ্পা লাগেনি।
অঞ্জন জাহিদুর রহিমের প্রচ্ছদ উপন্যাসের সাথে খুব যথোপযুক্ত ম'নে হ'য়েছে- অতীত আর বর্তমানের মাঝে একটা দরজা, তা নীল (কষ্টের?), তা খুললেই যেন দুই সময়কাল মিশে যেতে পারে।
কি এমন হতো যদি না জানা হতো মোয়াজ্জেম হোসেন ও নীরুর শেষ পরিণতি? হয়তোবা এ এক অলৌকিক প্রণোদনা যা আপনা আপনিই লিপিবদ্ধ হতে চায়। তাই পুরোণো বইয়ের দোকানে খুঁজে পাওয়া অনিতা সেনের স্মৃতিকথার সাথে সাবিনার পরিচয় ঘটে যাওয়া মোটেও কাকতাল মনে হয় না।
উপন্যাসিক শাহীন আখতার লিখছেন অনিতা সেন ও সাবিনার কথা, তারা লিখছেন মোয়াজ্জেম, নীরু কিংবা কমরেড “অ” এর কথা। আজকের এই ইতিহাসের বুনিয়াদের নিচে কতশত গল্পইতো চাপা পড়ে গেলো। যুদ্ধ মানেই কেবল প্রাণের অপচয়। জয় পরাজয়ে আসলেই কি ত্যাগের প্রকৃত স্বীকৃতি মেলে? মনে হয় মেলে না বরং এক প্রজন্মের নায়কেরা আরেক প্রজন্মের কাছে হয়ে পড়ে অপ্রাসঙ্গিক। তবুও মানুষ যুদ্ধে যায় বিবিধ অনাচারের বিপরীতে নিজেকে দাঁড় করিয়ে বেঁচে থাকার যথার্থতা যাচাই করে নিতে কিংবা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে জন্মভূমিকে মুক্ত করতে। অথচ যুদ্ধের আগুনে নিজেকে বাঁজিয়ে দেখে মানুষ হয়তো শেষমেশ ব্যক্তিগত নির্বাণেই সমর্পিত হয়।
উপন্যাসিক শাহী�� আখতার কে আমি আবিষ্কার করেছি সম্প্রতি তার “তালাশ” উপন্যাস দিয়ে। সেই অপূর্ব পাঠ অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলো আরেকটি উপন্যাসের নাম “অসুখী দিন”। অনিতা সেনের স্মৃতিকথা এবং সাবিনার পরিবারের স্বর্ণালী ইতিহাস লেখা এই দুইয়ের জাক্সটাপজিশানে প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে ইতিহাসের বিস্মৃতপ্রায় এক অধ্যায়। নেতাজি সুভাস বসু ও “আজাদ হিন্দ ফৌজ” নিয়ে আমার ব্যক্তিগত জানাশোনা ছিলো খুবই সামান্য। এই উপন্যাস পড়বার সুবাদে ইতিহাসের এই ধুলিধূসর অধ্যায়টা আবার খানিকটা নেড়েচেড়ে দেখা হলো। এই উপন্যাসের ক্যানভাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ , বিট্রিশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের স্বাধীকার আন্দোলন ও পরবর্তীতে দেশভাগ পেরিয়ে বিস্তৃত হয়েছে সামাজিক ও ব্যক্তিগত টানাপোড়নের গন্ডিতে। ইতিহাস মূলত আপনা আপনিই পুনরাবৃত হয় “তালাশ” উপন্যাসের মতো এখানেও সেই নির্মম সত্যের উচ্চারণ দেখতে পাই। সময়কাল ও নামের ভিন্নতা ছাড়া মরিয়ম কিংবা অনিতা সেন কে আমার একজনই মনে হয়।
ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ইতিহাসের বিষয়বস্তু পাঠকের মনেযোগ ফিকশান থেকে বেশী তার দিকে ঘুরিয়ে নেয়। তারউপর বিষয়বস্তু যদি হয় স্পর্শকাতর তাহলে তো কথায় নেই। শাহীন আখতার সেক্ষেত্রে অনবদ্য দক্ষতায় ইতিহাসকে অনুঘটকের সিমানায় আটকে রেখে ফিকশনের জগৎ কে করে তুলেছেন সাবলাইম। বিট্রিশের গারদ থেকে পালিয়ে যাও নেতাজির গতিবিধি এড়িয়ে পাঠকের চোখ এখানে আটকে থাকবে নীরু, মোয়াজ্জেমের দিকে। উপন্যাসিক শাহীন আখতার কে আরো পড়বার আগ্রহ তৈরি হয়েছে, আপাতত “অসুখী দিন” উপন্যাসের জন্য তাকে কুর্নিশ।
রিফিউজি পাড়ার মেয়েরা নাকি প্রতি বছরে স্কুলে দৌড় প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হতো। ওদিকে, ইতিহাস তার নিজস্ব রীতিতে তৈরি করেছে আরেক রিফিউজিদল, যারা কেবল এক সময়ের স্মৃতি নানা সময়ের নিজস্ব জীবনে বয়ে বেড়াতে থাকে। কিন্তু তাদের গন্তব্যস্থল কোথায়? স্মৃতি ধারণ করে শুধুই কি সেই বিষাদভারাক্রান্ত অতীতকে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া? নাকি নিজের জীবনেই কোন আকাঙ্ক্ষার সাথে অবশেষে মিলিত হওয়ার সুতীব্র বাসনা? ইতিহাসের টালমাটাল সময়গুলিতে প্রতি পরিবারেই যেন সৃষ্টি হয় ছিন্নতার সম্ভাবনা, যে ছিন্নতা এবং ইতিহাসে অংশ নেওয়ার একটা ঘোর আচ্ছন্নতা পরবর্তীতে জন্ম দেয় অপরাপর নিকটজনদের অনন্ত বিষাদের। সময়ের ব্যবধান এবং ভৌগলিক সামান্য ব্যবধান ডিঙিয়ে কখনো বা একই গল্প, বিভিন্ন রকমভাবে রূপায়িত হতে থাকে একাধিক পরিবারে। বিপ্লবী অনিতা সেন এবং তার স্মৃতিকথার একজন পাঠক সাবিনা, যে কিনা এই উপন্যাসের ভিত্তি তৈরি করে একে একে নিজের পরিবারের অতীতের সাথে অনিতা সেনের স্মৃতিকথার আশ্চর্য সাযুজ্য দেখে। একসময় খুঁজতে বের হয় স্মৃতিকথার হারানো এক মানুষের সন্ধানে, যে সন্ধান সাবিনা শুরু করে শয্যাশায়ী বাবা এবং বৃদ্ধা মায়ের কাছ থেকে শোনা টুকরো টুকরো স্মৃতি জোড়া লাগিয়ে।
মাঝে মাঝে বিছানায় শুয়ে চোখ বুজেভাবি আমি শুয়ে আছি ঢাকায় মিরপুরে কিংবা সেনপাড়ায় আমার অতীত নিবাসে মাটিতে ফেলা স্থায়ী তোষকে। খুব জোর দিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেক সময় সত্যি মনে হয় আমি বোধহয় এখন আর এখানে নেই। টের পাই ঘরের আসবাব বদলে গেছে। জানালাটা ডান দিকে।
আমার হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো ফিরে আসে যাদের কথা সাধারণত স্মরণে আনতে চাই না। স্মৃতি ঘাটলে অসংখ্য কিরে কসম আর প্রতিজ্ঞাভাঙ্গা আর অপরাধবোধ আর হতাশা। কিন্তু এই চোখ বুজে মিথ্যেমিথ্যি মিরপুরে ফিরে যাওয়ার সময় সেটাও সহনীয় লাগে। মনে হয় চোখ খুললেই ফিকশন থেকে সত্যে ফিরে আসবো। ভয় কি?
অসুখী দিন বইটা পড়ে এই কথাটুকু খুব লিখতে ইচ্ছা হলো
সময় নিয়ে ধীরে ধীরে পড়ে শেষ করলাম বইটা। দেশভাগের সময়টার উপর অল্প বিস্তর পড়াশোনা থাকলেও প্রায় বিস্মৃত এবং খুব কম আলোচিত একটা বিষয় নিয়ে এই পুরো বইটার গড়ে ওঠা- পড়ে বোঝা গেলো সুভাষ বসুকে নিয়ে বলতে গেলে তেমন জানতামই না আমি।
দুই প্রজন্মের দুই নারীর লেখা নিয়ে গল্প এগিয়েছে, তবে সময়রেখাটা মোটেও সমান্তরাল নয়। কখনো কখনো লেখা হয়ে উঠেছে নিরেট ইতিহাস। সেখান থেকে পিছলে চলে এসেছে ফিকশনে। পড়তে হলে পাঠককে তার পূর্ণ মনোযোগ দিতেই হবে। একটু কষ্ট করে মনোযোগ ধরে রাখতে পারলে খুবই কম্পিটিটিভ একটা ঐতিহাসিক ফিকশন এই বই।
শাহীন আখতারের গল্প বলার ভঙ্গিটি হয়ত খুব সরল নয়- বিষয়বস্তু তার পেছনে একটি বড় কারণ হতে পারে। তবে লেখার পেছনের তুমুল খাটাখাটুনি খুব ভালভাবেই স্পষ্ট। হিস্টোরিকাল ফিকশনে আগ্রহী যেকোন মানুষের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
শাহীন আখতার গল্প আঁকেন, ছবি লেখেন। এই কথাটাই বার বার মনে হচ্ছিল আখতারের “অসুখী দিন” বইটি পড়তে পড়তে। তাঁর গদ্য এতটাই সাবলীল অথচ মায়াময়, তাঁর এই উপন্যাসের চরিত্রগুলি এতটাই আটপৌরে অথচ বহুমাত্রিক – তারা যেন মণিমুক্তার মতন অঙ্গাঙ্গীভাবে গাঁথা এক বৃহত্তর উপমহাদেশীয় ইতিহাসের মালায়। “অসুখী দিন” প্রকাশ পেয়েছে ২০১৮ তে। চেনা পরিচিত অনেকেরই পড়া । তাই এই উপন্যাসের কাহিনী নিয়ে নতুন করে বলার নেই । শাহীন আখতারের গদ্যশৈলী আর সংযম এই উপন্যাসের দুই স্তম্ভ। তিনি কল্পবাস্তব গড়েন স্বকীয় ভাষায়, ভঙ্গীতে। সংযমের প্রমাণ পাতায় পাতায় - সমস্ত মর্মান্তিক উপাখ্যানে, সমস্ত স্নেহ-প্রেমের অন্তঃসলীলা ধারায়। গদ্যের বুনোটে দেখতে পাওয়া যায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কিংবা সইয়দ ওয়ালীউল্লাহের স্ফুলিঙ্গ। শাহীন আখতার তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরী। একটি মাত্র বই পরে এইটা বলার সাহস উপস্থিত আমার নেই। কিন্ত ইচ্ছে করে এই null hypothesis নিয়েই আখতারের অন্য লেখাগুলির কাছে যেতে। “অসুখী দিন”-এ শাহীন আখতার বেছে নিয়েছেন দুই দেশের, দুই সময়ের, দুই নারীকে – দুজন observer হিসেবে। তাদের চোখেই ধরা পরে দুটি ভিন্ন পরিবার, সমাজ, পৃথিবী, রাজনীতি – মিলে মিশে একাকার হয়ে। এই দুই নারী - অনিতা ও সাবিনা -র সাংস্কৃতিক, আর্থ-সামাজিক অবস্থান আলাদা। তার দেখছে, লিখছে ভিন্ন জিনিস। সেই ‘জিনিস’ যে আসলে একই সিক্কার এপিঠ - ওপিঠ – সে শুধু পাঠককে মনে করিয়ে দেন আখতার। ‘দেশ’, ‘আদর্শ’, ‘মূল্যবোধ’ এই শব্দগুলোর, এই বোধগুলোর একেবারে শিকড়ে টান দিয়ে একটা অসম্ভব visceral discomfort এর সম্মুখীন করেন পাঠককে, দাঁড় করিয়ে দেন উপন্যাসটির চরিত্রগুলির সঙ্গে। অনিতা ও সাবিনা । দুই সময়ের, দুই ইতিহাসের সাক্ষী। একজনের জীবন যেন তার সমসাময়িক বিপুল ঐতিহাসিক টানাপোড়েনের মাঝে ব্যক্তিগত জীবনের খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরার, তার অর্থ বোঝার গল্প। অন্যজনের গন্তব্য উপমহাদেশের বিরাট ইতিহাসের ঝড়ে চাপা -পরে - যাওয়া পারিবারিক বিচ্ছিন্ন সব অতীতের খড়কুটো জড়ো করার পথে। এই দুই আপাত ‘অন্তর্মুখী’ আর ‘বহির্মুখী’ পথ কোথায়, কীভাবে মেলে, নাকী আদৌ মেলেনা – সেসব শাহীন আখতারের মায়াকলমের কা��সাজি। পাঠক শুধু পারেন শিলং থেকে সিলেট বিস্তৃত বৃষ্টি, কুয়াশা আর মেঘের খোয়াবে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে।
গল্পটা দুই দেশের, দুই, সময়ের, দুই অঞ্চলের আর দুই মানুষের। একজন শিলংয়ের অনিতা সেন। আরেকজন বাংলাদেশের সাবিনা। তার বাবা মোয়াজ্জেম গিয়েছিলেন কলকাতা, ডাক্তারি পড়তে। এরপর এক বন্ধুর সঙ্গে চলে গেলেন সুভাষ বসুর আর্মিতে। মোয়াজ্জেম ফিরে এলেও তার বন্ধু ফিরে আসে না। কিন্তু নীরুকে নিয়ে তার বোন অনিতা সেন একটি স্মৃতিকথা লিখে যান (মূলত সেখানে অনিতার নিজের কথাও কম নেই)। সেই স্মৃতিকথা থেকেই সাবিনা খুঁজে পায় তার বাবার বন্ধু নীরুকে।
বাংলাদেশের সাহিত্যে ভারত ভাগের প্রসঙ্গ এলেও সুভাষ বসুর আইএনএ প্রসঙ্গ আসে না। অন্তত আমার পাঠে এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। সে কারণেই অবাক এবং খুশি হলাম। শাহীন আখতারের গদ্য আমার পছন্দ এবং তার গদ্য সম্পর্কে সচেতন পাঠক ওয়াকিবহাল তাই আলাদা করে বেশি কিছু বলব না। তবে এই উপন্যাসে আলাদাভাবে মুগ্ধ হই দুই নারীর (সাবিনা ও অনিতা সেন) মনস্তত্ত্ব, ভাবনা আর সময়ের ভিন্নতায় তাদের জীবন ও যাপনের ভিন্নতার চিত্রে। শাহীন আখতার এই কাজটা চমৎকার করেছেন। এর পাশাপাশি মোয়াজ্জেম, সায়মা খাতুন, নীহার বানু, কাশেম মিয়া, কমরেড অরুণ, আনিতার মা-বাবার চিত্রায়নও ভালো। যুদ্ধ এই বইয়ে নেই কিন্তু ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির দুর্দশা, সুভাষ প্রশ্নে বিতর্ক, তৎকালীন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়গুলোও উপন্যাসে এসেছে এবং পরিসর অল্প হলেও লেখিকা দারুণ ভারসাম্য রেখেছেন।
এ যেন পুরান ঢাকার অতি সুস্বাদু বিরিয়ানি, একবারে অনেক খানি খাওয়া দুষ্কর। অনেকের মত আমিও সময় নিয়েই বইটি পড়েছি। . শাহীন আখতার যে এই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গুণী লেখকের একজন সেটা আবারও প্রমাণিত। . প্রখ্যাত লেখক ডঃ সলিমুল্লাহ খান এর কথা ধরে বলতে হয়, মানুষের জীবনে একসাথে ২টি বড় ঘটনা ঘটে গেলে মানুষ লঘু ঘটনাটি ভুলে যায়। আমারা বাংলাদেশীরা যে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পেয়েছিলাম সেটা ১৯৭১ এর জন্য ভুলেই গেছি। . বইয়ের মোজাম্মেল হক, নীরু সেন, অনিতা সেন এসব চরিত্র বারবার স্মরণ করে দিয়েছে ৪৭ এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ঘটনা। কত মা আমৃত্যু দরজা খোলা রেখেছিল তার সন্তান ফিরে আসবে তার বুকে। পরিবারের সকল সদস্যদের স্যাক্রিফাইস। দেশভাগ, লুন্ঠন, দস্যুতা, দাঙ্গা প্রতিটি বর্ণনা চোখের সামনে ভেসে উঠেছে বারবার। . Happy Reading