ভূমিকা -
যেকোনো রহস্যময় চরিত্র বরাবর ই আকৃষ্ট করে আমাকে। ঠিক সেইরকমই এও যেনো এক এক অদ্ভুত আকর্ষণীয় জীবনের আখ্যান। পড়তে শুরু করলে বুঁদ হয়ে যেতে হয় চরিত্রগুলোতে। আধ্যাত্মিকতার সাথে সংসারী মানসিকতার এক আশ্চর্য মিশেল রয়েছে এই উপন্যাসটিতে। তন্ত্র-মন্ত্র-সাধন-সাধনার ধোঁয়াশার আড়ালে ঈশ্বরকে খোঁজার,ঈশ্বরকে জানার ব্যাকুলতাই এই বইয়ের নাড়ী। সুখপাঠ্য,সাবলীল। লেখক খুব সাবলীল ভাবেই এর ব্যাখা করেছেন,
"অনেকে চোখ বুজে বিশ্বাস করে ঈশ্বর আছে। অনেকে চোখ বুজে অবিশ্বাস করে, ঈশ্বর নেই। ঈশ্বর আছে কি নেই - এই সন্ধান কত জন করে?"
সারসংক্ষেপ -
তাহলে শুরু করি অন্যরকম এক তান্ত্রিকের গল্প। যে তান্ত্রিক রীতিমতো সংসারী,ভোগী.... যে কোনো অলৌকিক কোনো গল্প বা কার্যকলাপ ও ঘটায় না। বরং একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই থাকে সারা জীবন ধরে, "কে করে? কে ঘটায়?"
একদম শুরুতে দেখা যায় আমাদের মতোই লেখক ওই অর্ধেক নাস্তিক, ঈশ্বর এ তার যেনো বিশ্বাস নেই, স্ত্রী-কন্যা কে নিয়ে কলকাতার দম বন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি চেয়ে হরিদ্বারে ঘুরতে যাওয়া ঠিক করলেন এবং সেখানে অগ্রিম কোনো থাকার ব্যবস্থা না করেই যাত্রা নিশ্চিত হয়ে গেলো শুধুমাত্র রামকৃষ্ণ মিশনের বড়ো মহারাজের দৌলতে, নইলে কোনো হোটেলে ঠাঁই নেবেন। ট্রেনের এই যাত্রাপথেই লেখকের পরিচয় হয় এই তান্ত্রিকের সাথে, নাম - কালীকিঙ্কর অবধূত। বলাবাহুল্য, এই অপরিচিত তান্ত্রিক কে যাত্রাসঙ্গী হিসেবে পেয়ে লেখক ও তার পরিবার কেউই খুশি হননি প্রথমেই।
যেনো নাটকীয় ভাবেই তাদের জীবনে আবির্ভুত হলেন অবধূত, লেখক তাঁর যে বর্ণনা বর্ণনা দিয়েছেন তাতে সাধারন তান্ত্রিকের সাথে তেমন পার্থক্য নেই, তবে তিনি সকলকে সম্মান করতে জানেন, ট্রেনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভিতরে লেখকের স্ত্রী-কন্যাকে দেখেই তাদের সম্মানে তিনি কোনো ভক্ত কে সিগারেট ফেলে দিতে বলেন। কিন্তু অবধূতের পরোপকারী, অমায়িক এবং বিলাসী মনোভাবের পরিচয় লেখক ক্রমশ পেতেই থাকেন। লেখক স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি যে অবধূতের হাস্য-কৌতুক এবং বিবেচনা বোধ প্রবল। এরপর ট্রেন ছাড়ার আগের মুহূর্ত অব্দি অবধুতের ভক্ত আর প্রনামি দেখে লেখক ও পরিবার হতচকিতই হয়েছেন।
ট্রেন ছাড়ার পর লেখকের সাথে কথাবার্তা চলতে থাকে অবধূতের, সেখানে বোঝা যায় তার মধ্যে কোনো সবজান্তা ভাব নেই। অবধূত সরস বচন-পটু তো অবশ্যই, কিন্তু তিনি যখন কিছু উপলব্ধি করেন মনে হয় তাঁর চোখ যেন কথা বলছে, লেখকের মতে এতেই তার ভক্তরা তাকে দেখে অভিভূত হয়, আর কেনোই বা হবে না তার উপলব্ধি তো ভুল প্রমাণিত হয়নি। এরপর লেখক, তার পরিবার ও অবধূতের পরিচয় বাড়তে থাকে... এই নিয়েই প্রথম খন্ড।
দ্বিতীয় খণ্ডে লেখক জানতে পারেন অবধূতের অতীত, পরিচিত হন তার স্ত্রী এর সাথে কালক্রমে তার অতীতের সাথে...(এগুলি বিশেষ বলবো না, শব্দ সংখ্যা কম আর পড়লে বেশি মজা পাবেন) লেখক যেনো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন কি না হয় গুরুভক্তি আর গভীর বিশ্বাসে। এরপর হঠাৎই একদিন হারিয়ে যান অবধূত ও তার স্ত্রী, কেউই জানতে পারেন না তাদের কথা।
উপসংহার -
তান্ত্রিক সে না কি আবার গৃহবাসী! তার আবার একজন রীতিমতো বিবাহিতা স্ত্রী ও আছেন অথচ তান্ত্রিকদের বলে সাধনার জন্য ভৈরবী থাকে, কিন্তু এ যে দস্তুর মত সংসারী কবিরাজী করা সাধক যে মায়ার টান কাটাতে বারবারই গৃহ ছেড়ে শ্মশানবাসী হয়েছেন, অজস্র মানুষ তাকে ঈশ্বরের দরজা দিলেও নিজেই সবসময়ই খুঁজেছেন সেই অসীম শক্তির উৎস কে, যার মুখে একটা প্রশ্নই ঘুরেফিরে এসেছে কে এই ঘটনা সাজায় ঘটায়, কার সবকিছুতেই এমন নিপুণ কারিগরি, কে বারবার কালীকিঙ্কর অবধূতকে টেনে নিয়ে যায় ঘটনার অকুলস্থলে? আর কার উপরেই ভরসা করে তার দিব্যাঙ্গনা স্ত্রী কল্যানী স্মিতমুখে সারাজীবন এক দিব্যশক্তির আধার হয়ে আলো ছড়িয়েছেন?!
আর এভাবেই মানুষের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছে (নাকি মানুষই তৈরি করেছে?) 'গডম্যান' নামক চরিত্রদের। অনেকে আছে সুযোগসন্ধানী, মানুষের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে লুটেপুটে খায় আবার কেউ কেউ আছেন সত্যিকারের সাহায্যকারী, মানুষের কল্যাণকামী। আর যারা সত্যিকার অর্থেই মানুষের কল্যাণপ্রত্যাশী, তারা অতি অবশ্যই বিনয়ী। আর সেজন্যই কালীকিঙ্কর অবধূত নি:সংকোচে বলতে পারেন, এই যে পৃথিবী জুড়ে এতো ঘটনা... কে সাজায়? কে ঘটায়? কেনো ঘটায়? কিভাবে ঘটায়? বিনা কারণে তো কিছুই ঘটে না। সেসব দেখে দেখে উপলব্ধি করি, কিন্তু কোন জবাব পাই না। আমি খুঁজি। আমি খুঁজে বেড়াই। ঈশ্বর আছে কি নেই, আমি জানি না।
কালীকিংকর অবধূত ঈশ্বরের খোজে ব্যস্ত থাকলেও সাধারণ মানুষ তা মানবে কেন? অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, মানুষকে বোঝা ও পড়তে পারার ক্ষমতা, ঔষধি বিদ্যায় পারদর্শী, কিছুটা ভোগী, কিছুটা সংসারী, ব্যতিক্রম চরিত্রের এই গৃহী সাধুবাবাটির সাথে লেখকের পরিচয় কিছুট আকস্মিকভাবেই। কিছু ব্যক্তিগত দু:খের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন লেখক ও তার পরিবার। প্রথম পরিচয়ে লেখকের মাঝে সাধুর প্রতি কিছুটা নিরাসক্ত ভাব থাকলেও ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হোন তার প্রতি। না, সাধুবাবার কেরামতির জন্য নয় বরং মানব চরিত্র বুঝার সুবিধার্থে। লেখকের বর্ণনায় মূর্ত হয়ে উঠেছেন অবধূত। প্রাঞ্জল ব্যবহার, তীক্ষ্ণধী আর ব্যক্তিত্বের গুণে ক্রমেই হয়ে উঠেছেন লেখকের প্রিয়পাত্র। 'সেই অজানার খোঁজে' বইটির পরতে পরতে উঠে এসেছে নানান ঘটনা, সাধুর অতীত ইতিহাস আর ঈশ্বরকে খোঁজার ব্যাকুলতা।
আমার কথা -
গৃহবাসী তান্ত্রিকের মধ্যে তারানাথ আমাদের সবারই মনের মনিকোঠায় এমনভাবেই ভাস্বর বোধহয় তার জায়গা কেউ নিতে পারবে না আমার এই বিশ্বাস ছিল লকডাউন এর আগেই, মধু সুন্দরী দেবীর কৃপায় অসাধ্য সাধন করা তারানাথকে আমার কাছে সবসময়ই দিব্য পুরুষ লেগেছে,তার জায়গা অন্য কেউ নিতে পারে এ আমার কল্পনাতীত ছিল!
নিতান্তই কৌতুহল বশে বইটা হাতে নিয়ে আমার এই কয়দিনের এত জঘন্য সময়সূচির ভেতর থেকে ও একটা নির্মল আনন্দের খোরাক হয়েছে,হয়ত অনেকের কাছে তারানাথের মত অবধূতকে খাসা লাগবে না কিন্তু আমার কাছে কালীকিংকর আর কল্যানীর এই গল্পগাথা তোফাই লেগেছে।
কালীকিংকর অবধূত নামের এই তান্ত্রিকের সাথেসাথে সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে কখন যে লোকটাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, সেটা আজ অব্দি বুঝতে পারিনি। এই ভালোবাসার টানেই, একটানা দুই খণ্ড পড়ে শেষ করেছি।
সবশেষে এটুকুই বলবো কালীকিংকর অবধূতের সাথে অন্যরকম, একটু বেশিই অন্যরকম একটা ভ্রমণ হলো। সাথে যোগ হয়েছিল, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহজ, সাবলীল লেখনী। সব মিলিয়ে,সময়টা বেশ ভালোই কেটেছে।