অভিজ্ঞান রায় চৌধুরীর অনবদ্য কিছু কল্পবিজ্ঞান ও ভৌতিক, অলৌকিক গল্পের সঙ্গে ওনার সৃষ্ট অত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্র অনিলিখা কে নিয়ে ১৯৯৬ এ লেখা প্রথম গল্প ‘মিকুমুর গবেষণা’ ও ১৯৯৪-এ প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘ভয়’ এই সংকলনে স্থান পেয়েছে। এই সংকলনের ‘ডাহোমা’ উপন্যাসটি (শারদীয়া শুকতারা ‘১৪২৪’ – এ প্রকাশিত) প্রভূত পরিমাণে প্রশংসৃত ও সমাদৃত হয়েছে।
সূচিপত্র –
পিরামিডের লুকোনো ঘরে ভয় আর দশ বছর নিশ্চিন্তপুরের রূপকথা মিকুমুর গবেষণা দাবার বোর্ডের বোড়ে যে লোকটা স্বপ্ন তৈরি করতে পারে চোখের সামনে মৃত্যু শুধু বারবার ফিরে আসে ক্যাপ্টেন হ্যাডকের সঙ্গে কয়েকদিন স্বপ্নেরা যখন সত্যি পুতুল খেলার আড়ালে ডাহোমা
তেরোটি ভিন্ন স্বাদের গল্পের ঝুলিতে লেখক আবারও সাজিয়ে তুলেছেন এই বই, যার কিছু অলৌকিক এবং কল্পবিজ্ঞানের মিশেলে শিহরণ জাগানো আবার কিছু গল্প একান্তই মানবিক গোত্রের।
প্রথমেই শুরু করি এই বইয়ের আমার পড়া প্রথম গল্প এবং লেখকের কলমেও প্রথম কাহিনী 'ভয়' দিয়ে। ১৯৯৪ সালে রচিত হলেও এই গল্পটি বেশ বিভ্রান্ত করেছে পাঠককে তাদের ভাবনাকে অন্যদিকে চালিত করে ; নোটবুক এবং ক্রাচের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হলে শেষ লাইন অবধি আটকে থাকতেই হবে এবং অবাকও হতে হবে। কোনোরকম কপটতা না করেই বলছি, লেখকের নতুন লেখা পড়ার পরেও এই গল্পটা সত্যিই একইরকম ভালো লেগেছে, স্রেফ কিছু জায়গায় খানিক repetition এসেছে এই যা যেমন 'হর-কি-দুন' নামটির উল্লেখ একাধিকবার পাওয়া গেছে বেশ কিছু জায়গায়। কিন্তু শেষের মোচড় একইরকম চমকপ্রদ।
স্বাধীনতার পরেও আমরা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন নই, প্রতিমুহূর্তেই বলী হয়ে চলেছি রাজতন্ত্রের এবং এই সামাজিক রাজতন্ত্রকে জীবন্ত করে তুলেছে 'দাবার বোর্ডের বোড়ে'। ক্রিস বেনেটও প্রতিনিধিত্ব করেছে সেই শোষক সমাজের, কাজেই এটাও একপ্রকার আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে 'কল্প-বাস্তব' শ্রেণীর কাহিনী।
অনাবিল ফ্যান্টাসির ধারায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে 'স্বপ্নেরা যখন সত্যি' যেখানে সৃষ্ট হয়েছে বর্তমান ও ভবিষ্যতের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। গল্পের চরিত্র পার্থ সাথে Taare Zameen Par সিনেমার Ishan Awasthi কে মনে পড়িয়েছে বেশ কিছু জায়গায়, বিশেষ করে আঁকার দৃশ্যগুলো। কল্পবিজ্ঞানের আশ্রয়ে গড়া 'আরো দশ বছর'ও শেষে রেখে গেছে মানবিক ছাপ, প্রযুক্তি এগিয়ে গেলেও সবসময় তা ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারেনা মাতৃস্নেহ।
এক আলাদা জগতে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে 'নিশ্চিন্তপুরের রূপকথা'। এই গল্পটা হৃদয়ে অনন্তকাল বিরাজ করবে এবং এই কাহিনীর প্রতিটি পরতে লেখকের তীব্র কল্পনাশক্তির পরিচয় স্পষ্ট। কিন্তু স্রেফ কল্পনার হাতে ছেড়ে দিয়ে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হননি লেখক, কল্পনার প্রলেপে এঁকে গেছেন বাস্তব চিত্র, যেখানে প্রকৃত রাজার বর্ণনা সত্যিই ভাবায়, গল্পটি ভিন্ন বয়েসী পাঠকদের কাছে ভিন্নভাবে পৌঁছবে। গল্পের শেষে দুঃখের ছায়াটা মনকে ভার করে দিলেও একপ্রকার হয়তো ভালোই হয়েছে, বলাই পেয়েছে এক আসল দুনিয়া।
বিশেষভাবে ছুঁয়েছে 'যে লোকটা স্বপ্ন তৈরি করতে পারে', ইচ্ছেশক্তির দৌলতে ফেলে আসা স্বপ্নকে দেখে সত্যিই অনেক অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করা যায়। বাস্তবে কোনো শায়ন থাকলে বড়োই ভালো হতো।
'চোখের সামনে মৃত্যু' বেশ বুদ্ধিদীপ্ত একটা গল্প যা আবারো শেখায় কিছু আদর্শ। ইংল্যান্ডের ক্রীতদাস প্রথা ও তার বিরুদ্ধে বিপ্লব সংক্রান্ত তথ্যও প্রদান করে এই গল্পটি। গল্পের নামটা আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয় লেগেছে যেখানে পাথরের ওপর কারও মুখ ভেসে উঠলেই মৃত্যুর বার্তা বহন করে সেই সামঞ্জস্য বজায় থেকেছে নামকরণেও অথচ বেশ অভিনব উপায়ে। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে 'শুধু বারবার ফিরে আসে' খুব ভালো, গল্পটা পড়ে নিজে ঘরের দেওয়ালের আড়ালে নকশা খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম।
অনিলিখার মোট তিনটি গল্প এখানে স্থান পেয়েছে। অনিলিখার সর্বপ্রথম গল্প 'মিকুমুর গবেষণা' ভারী মিষ্টি, albino হওয়া সত্যিই কোনো পাপ নয়, এবং শেষে গবেষক নিজেও, যিনি albino সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন, আনন্দে কেঁদে ফেললেন একটি non-albino শিশুর জন্মে যা তাঁর মানবিক সত্তাকে প্রতিষ্ঠা করে। মিলন কুমার মুখার্জি ওরফে 'মিকুমু' নাম বেশ চমকপ্রদ। 'পতুল খেলার আড়ালে' রীতিমতো শিহরণ জাগায় এবং আবারও বলতে বাধ্য হচ্ছি, 'মুচকি হেসে বললো অনিলিখা' এই লাইনগুলো পেলে দয়া করে বুঝে যাবেন যে picture abhi bhi baki hai !! সীতার পুতুলখেলা দেখানোর সাথে সত্যজিৎ রায়ের 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' চলচ্চিত্রের ভূতের নাচের সুক্ষ মিল পেলাম কারণ দুটির আড়ালেই লুকিয়ে আছে কিছু সত্য। তুলনামূলক মাঝারি লাগলো 'পিরামিডের লুকোনো ঘরে' যেটা আরেকটু অন্যরকম ভাবে শেষ হলেও পারতো। কিন্তু পিরামিড তৈরির সাথে অন্য গ্রহের মানুষদের যোগসূত্রের দিকটা বেশ অন্যরকম লেগেছে। লেখকের কাছে জানতে চাইবো বইয়ের প্রচ্ছদে যার ছবি দেখি তিনি এই গল্পের চরিত্র 'জেন রিচার্ডসন' কিনা। তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বইতে অনিলিখা বিভাগ 'মিকুমুর গবেষণা' দিয়ে শুরু করলে ভালো হতো।
চোখের কোণে সত্যিই জল আনে 'ক্যাপ্টেন হ্যাডকের সঙ্গে কয়েকদিন'। কিন্তু এই কাহিনীর মধুর সমাপন একটু হলেও হাসি ফোটায় শেষে।
এবারে আসি এক উপন্যাসে, যে উপন্যাস মনকে ছুঁয়ে গেছে আলাদা করে, শেষ পাতাটা যখন এলো, খুব আক্ষেপ হতে শুরু করলো কেন রেখে রেখে পড়লাম না ? কেন আরেকটু সময় নিলামনা শেষ করতে ? ১৯৭০ সালের অতীত এবং ২০৮০ সালের ভবিষ্যৎ মিশে গেছে এক অত্যাশ্চর্য কল্পবিজ্ঞানের মাধ্যমে, এরকম ধরণের কল্পবিজ্ঞান কাহিনী আগে লেখা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। কাহিনীর শেষে বারবার ফিরে যেতো চেয়েছি বিলুর বাড়িতে, বারবার ফিরে পেতে চেয়েছি রবার্ট, ম্যাক্স, মধুকাকুদের, পড়তে চেয়েছি ম্যাক্সের ডায়েরী, শুনতে চেয়েছি 'অত সহজে কি তোকে হারিয়ে যেতে দেব ! থিঙ্ক পজিটিভ !' এবং সবশেষে বারবারই আশ্রয় নিতে চাই 'ডাহোমা'র কোটরে। উপন্যাসটা পড়ার পরে আমি ইচ্ছে করেই অন্য কিছু আর পড়িনি টানা একদিন, মনে প্রানে উপলব্ধি করতে চেয়েছিলাম এটা, ঠিক যেমনটা করেছিলাম ভয়নিচ পড়ার পরে। সম্পাদকীয়তে পড়েছি এই উপন্যাস বহুল প্রশংসিত, এখন তার যোগ্যতা আমার কাছে সত্যিই স্পষ্ট হলো।
আমি এই বইয়ের প্রতিটা গল্প নিয়েই বললাম যা সবসময় বলিনা। জানিনা কেন, বইয়ের নিজস্ব কোনো মায়াবী ক্ষমতা আমায় লিখতে বাধ্য করলো সবকটা গল্প নিয়েই।
যদি কোনো বই প্রকৃত অর্থে লেখকের শিশুমনকে ফুটিয়ে তুলেছে, তা হলো নিঃসন্দেহে 'চোখের সামনে মৃত্যু', লেখকের কল্পশক্তির এক প্রকৃত দর্পন এই বই।