সুপ্রতিম সরকারের লেখা গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার নিছক একটি বই নয় — এ যেন বাংলা ট্রু‑ক্রাইম সাহিত্যের ভূচিত্রে এক উল্লেখযোগ্য বাঁক, এক সাহসী ‘turnkey’ মুহূর্ত।
এই বই রহস্য গল্পের চেনা ছকে ক্লাইম্যাক্স বা অপরাধী ধরার নাটকীয় আখ্যান নয়, বরং সেই সমস্ত জটিল, ধৈর্য-নির্ভর ও প্রায়শই অবিশ্বাস্য বাস্তবতা, যা সাধারণত পর্দার আড়ালেই রয়ে যায়। তদন্তের দৃঢ়তা, প্রমাণের কারিগরি সংগ্রহ, সাক্ষীর ভঙ্গুর মনস্তত্ত্ব সামলানো, আদালতের দরজায় চার্জশিট পৌঁছানো—এইসব অনবরত ব্যুরোক্রাটিক, অথচ আবেগমথিত কসরতের মাঝেই গড়ে ওঠে এক অনন্য পাঠ-অভিজ্ঞতা।
এই বইয়ের প্রতিটি পাতা তুলে ধরে আধুনিক ফরেনসিক, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, এবং তদন্তকারী দলের পারস্পরিক নির্ভরতাকে — যেখানে দারোগার হাতের লাঠি নয়, বরং মস্তিষ্কের কৌশল, চোখের সতর্কতা, আর হৃদয়ের গভীর মানবিক সহমর্মিতাহয়ে ওঠে মূল প্রতিপাদ্য। সুপ্রতিম সরকার একাধারে তদন্তকারী, প্রত্যক্ষদর্শী, এবং বর্ণনাকারী—আর তাঁর লেখা সেইজন্যই কেবল তথ্যনিষ্ঠ নয়, বরং নিঃশব্দ সাহসিকতার দলিল।
বইটি একত্রিত করেছে ১৯৩৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে কলকাতায় ঘটে যাওয়া ১২টি চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা। প্রতিটি ঘটনা অতি যত্নে তুলে আনা হয়েছে। পাঠক জানেন কে খুন করেছে, কিন্তু জানেন না কীভাবে পুলিশ প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, কোন খাতে তদন্ত এগিয়েছে। পাঠক আরও বোঝেন যে অভিযুক্তকে ফাঁসানো নয়, বরং আইনত সাজা দেওয়ার উপযুক্ত করে তোলা কতখানি কঠিন। গোয়েন্দার এই ‘পরের কাজ’ নিয়েই লেখকের মূল আগ্রহ।
সুপ্রতিম সরকারের পেশাগত অভিজ্ঞতা বইটির সবচেয়ে বড় সম্পদ। তিনি শুধু পুলিশের উচ্চপদে থেকেছেন বলেই নয়, সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা, মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং মানবিক দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে গেছেন, সেগুলিকে তিনি নির্মোহ অথচ সংবেদনশীল ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন।
তাঁর ভাষা ঝরঝরে, বিন্যাসে শৃঙ্খলা আছে, আবার তা ক্লান্তিকর তথ্যচর্চা হয়ে ওঠেনি। তাঁর কথনে রয়েছে investigative non-fiction এর মতোই একটা cinematic টান। প্রত্যেকটি narrative শুরু হয়েছে সামাজিক প্রেক্ষাপট দিয়ে, তারপর এসেছে ঘটনার ঘনঘটা, তদন্তের বাঁক, পুলিশের দলগত রণনীতি, এবং সবশেষে আদালতের মুখোমুখি দাঁড়ানো।
তুলনামূলকভাবে, যদি প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের দারোগার দপ্তর এর সঙ্গে compare করা যায়, স্পষ্ট ফারাক বোঝা যাবে। প্রিয়নাথের কাহিনিগুলি ঐতিহাসিকভাবে অমূল্য, তবে তাঁর বয়ানে আধুনিক মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণ বা আজকের প্রক্রিয়ার ফাইন টিউনিং অনুপস্থিত। প্রিয়নাথ ছিলেন উনিশ শতকের লালবাজারের মানুষ — তিনি ঘটনার সারসংক্ষেপ দিতেন, আবেগ বা কৌশল বা মনস্তত্ত্ব নিয়ে বেশি চিন্তা করতেন না। গোয়েন্দা চরিত্রকে প্রধান করে তোলার ধারাও তাঁর লেখায় অনুপস্থিত। ঠিক উল��টোদিকে গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার আধুনিক ট্রু‑ক্রাইম সাহিত্যের স্পেসে দাঁড়িয়ে। এখানে খুন যেমন রোমহর্ষক, তদন্ত তেমনি বুদ্ধিদীপ্ত এবং মানবিকভাবে জটিল।
এই বই তুলনায় অন্যান্য বাংলা ট্রু‑ক্রাইম বা পুলিশি ধারার বইগুলোর থেকে আলাদা। সেকালের গোয়েন্দা কাহিনী ফিকশনধর্মী—নস্টালজিক এবং অ্যাডাপ্টেড গোয়েন্দা আখ্যানের সমাহার, যার মধ্যে সত্য ঘটনা নয় বরং গল্প বলার রোমাঞ্চটাই মুখ্য। মিয়াজান দারোগার একরারনামা বা বাঁকাউল্লার দপ্তর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ঝলক দেয়, তবে সেগুলো বিশ্লেষণাত্মক বা প্রসিডিওরাল নয়। অন্যদিকে, সাদা আমি কালো আমি বা অপরাধ বিজ্ঞান গভীর রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক পাঠ উপস্থাপন করে, যা তথ্যপূর্ণ কিন্তু সাহিত্যের গদ্য রসে তেমন রসদ জোগায় না।
তুলনামূলক টেবিলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার সময়ের নিরিখে আধুনিক, লেখনীর দিক দিয়ে টানটান ও বর্তমান প্রজন্মের পাঠকদের উপযোগী, এবং লেখক নিজে যে পেশার অন্তর্গত —সেই firsthand অভিজ্ঞতা তাঁকে এক আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। ,সে দিক দিয়ে প্রিয়নাথের কাজ আর্কাইভাল ও প্রামাণ্য হলেও, সুপ্রতিমের কাজ বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জিং বাস্তবতায় নিখুঁত টেক্সট।
তমোঘ্ন নস্কর, উপেন বিশ্বাস, দীপ্তজিৎ মিশ্র প্রমুখের যেসব ট্রু‑ক্রাইম লেখা আমরা পড়েছি, সেগুলো সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট বিষয়—যেমন চিকিৎসা-সংক্রান্ত অপরাধ, রাজনৈতিক দুর্নীতি বা সমাজতাত্ত্বিক পটভূমিতে লেখা — এই গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেইসব বইয়ে ঘটনার তীব্রতা থাকলেও তদন্তের জটিল স্তরগুলি, প্রসিডিওরাল বুনোট, বা পুলিশের দলগত চিন্তাভাবনার কাঠামো প্রায়শই একপাক্ষিক বা সংক্ষিপ্ত থাকে। অনেক সময় লেখক নিজে তদন্তের অংশ না হয়ে, পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকেন—ফলে টেক্সচারে আসে একধরনের দূরত্ব।
গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার এই জায়গাটাই পুরো বদলে দিয়েছে। লেখক নিজে পুলিশের শীর্ষপদে থেকে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তার স্পষ্ট ছাপ পড়েতাঁর বর্ণনায়। তাই এখানে তদন্ত প্রক্রিয়া কেবল চিত্রায়ন নয়, একপ্রকার অনুশীলন। এই বই পড়তে পড়তে পাঠক আপনার মনে হতে বাধ্য যে আপনি নিজেই পুলিশের ব্রিফিংরুমে বসে আছেন, নিজের চোখে ফাইল ঘাঁটছেন, আর অনুভব করছেন অপরাধীদের মানসিক প্রক্রিয়া, জেরা কৌশল, ফরেনসিক সমীক্ষা, এবং বিচার-প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত দ্বন্দ্ব।
এমনকি যদি Mindhunter‑এর জন ডগলাস বা Helter Skelter‑এর ভিনসেন্ট বুগলিয়োসির মতো বইগুলোর কথা ভাবি—যেগুলো পশ্চিমের ট্রু‑ক্রাইম ক্ল্যাসিক, তাদের সঙ্গেও গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার একটি আত্মবিশ্বাসী তুলনার দাবি রাখে। কারণ এখানেও রয়েছে firsthand অভিজ্ঞতার নির্যাস, তদন্তের স্তরভিত্তিক বিবরণ, আর অপরাধের গভীরে পৌঁছানোর সেই ধৈর্য-ভিত্তিক এক্সপ্লোরেশন। শুধু ভাষার পার্থক্য নয়, সংস্কৃতিগত পার্থক্যের মধ্যেও লালবাজার তৈরি করে এক ঘরোয়া অথচ বিশ্বজনীন আবেদন।
সবশেষে, গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার নিছক একটা বই নয়—এ এক নীরব শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, সেই সব পুলিশ অফিসারদের প্রতি যাঁরা মিডিয়ার প্রচারের বাইরে থেকেও প্রতিদিন অপরাধ মোকাবিলা করেন, বিচারের পথে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যান।
যারা ট্রু‑ক্রাইমকে শুধু থ্রিলের উৎস হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র, আইন ও মানবিক মননের আন্তঃসম্পর্কের জটিল ম্যাপ হিসেবে পড়তে চান—তাদের জন্য এই বই নিঃসন্দেহে এক অনন্য ক্লাসরুম।
অলমতি বিস্তরেণ।