প্রকৃত অর্থেই অজেয় রায় বাংলার একজন ভার্সেটাইল লেখক । আট এবং নয়ের দশকে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল প্রশ্নাতীত । তিনি অ্যাডভেঞ্চার বা রহস্য লেখাতেই থেমে থাকেননি । তার বাইরেও লিখেছেন অনেক ভৌতিক-অলৌকিক-রোমাঞ্চকর গল্প । হাসির গল্প ও সামাজিক গল্পও তাঁর লেখার তালিকার বাইরে নেই । তাঁর ভৌতিক গল্প মানে শুধু হাড় হিম করা ভয় জাগানো গল্প নয় । তার মধ্যে রয়েছে নিরলস মজার মিশেল । সেই সমস্ত অলৌকিক ও রোমাঞ্চকর গল্পের ভাণ্ডার এই সংকলন ।
আটের দশকে আনন্দমেলা, শুকতারা, সন্দেশ, কিশোর ভারতী— এমন সব পত্রিকা পড়ে শৈশব কাটানো প্রতিটি বাঙালির মনে অজেয় রায়ের নাম প্রায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। ভূত, ভয়, রোমাঞ্চ এবং হাসি— এই সবিক'টি ধারাতেই বহু স্মরণীয় লেখা উপহার দিয়েছিলেন এই লেখক। তারপর যা হয়! ধীরে-ধীরে তাঁর লেখাগুলো হারিয়ে যায়। চোখের আড়াল হয়ে মনের আড়ালে চলে যান লেখকও। সেই পটভূমিতেই দে'জ পাবলিশিং শুরু করেছিলেন অজেয় রায়ের লেখাদের পুনরুদ্ধার প্রকল্প। এই সুমুদ্রিত খণ্ডটিতে সেভাবেই আমরা পেয়েছি মোট তেতাল্লিশটি ছোটো গল্প। সমুদ্র বসু ও অরিন্দম দীঘালের সংকলনে, প্রথম প্রকাশকালীন তথ্য এবং রঞ্জন দত্তের অলংকরণের সঙ্গে গল্পগুলো পড়তে মন্দ লাগে না। ইনফোটেইনমেন্ট এবং হাজারও বিনোদনে অভ্যস্ত আজকের ছোটোরা এদের আপন করবেন বলে মনে হয় না। তবে নস্ট্যালজিয়ার স্বাদ পাওয়ার জন্য আমার প্রজন্মের পাঠক পেছন ফিরে তাকাতে চাইলে এই বইটি তার জন্য আদর্শ উপকরণ হতে পারে। সুযোগ পেলে বইটিকে পড়তেই পারেন। সময়টা মন্দ কাটবে না।
শীতের সময়ে আমার কেন যেন ভারী কোন বই পড়তে ইচ্ছে করে না। কিংবা খুব বর্ষণে। এই দুই আবহাওয়াতেই আয়েশ করে লেপকাঁথা মুড়ি দিয়ে আমার ইচ্ছে করে রহস্য-রোমাঞ্চ-অলৌকিক এসব জনরার গল্প-উপন্যাস পড়তে। এই শীতে কী পড়ব এমন ভাবছিলাম। হঠাৎ সন্ধান পেলাম অজেয় রায়ের গল্পের। একটা গ্রুপে দেখলাম রিপোর্টার দীপকের নাকি পোড়োবাড়ি খোঁজা আর ভূতের সন্ধান করার বাতিক আছে, আর এই রিপোর্টার চরিত্রটি নাকি অজেয় রায়েরই সৃষ্টি।
আলাদা করে দীপকসমগ্র না পেলেও দেজ থেকে প্রকাশিত ৪৩টা গল্পের একটা সংকলন পেয়ে গেলাম। গল্পগুলো নানা স্বাদের। রহস্য আর অলৌকিকের মিশেল রয়েছে, আবার রয়েছে সাইন্স ফিকশন ও। ভয়ঙ্কর ভূত যেমন আছে তেমনি আছে মজার ভূতও। আবার ভৌতিক কাণ্ডের পেছনে মানুষের হাত আছে এমন গল্পও কম নেই।
১৯৭৩ সালে লেখা একটা গল্পে নোলানের প্রেস্টিজের গল্পের আশ্চর্য মিল দেখে অবাক হলাম, যদিও সম্পর্ক নেই দুটোর কোনমতেই। কিছু কিছু মিল রয়েছে কেবল, যা নেহাতই কাকতাল। অপরদিকে, ২০০৬ সালে তিনি জয়ন্ত-মানিক, বিমল-কুমার, ব্যোমকেশ, কিরীটি, জটায়ু সবাইকে এক গল্পে নিয়ে এসে মজার একটা প্যাস্টিশ ও লিখেছেন।
রিপোর্টার দীপকের গল্পগুলোও সব যে খুব দারুণ তা নয়, একঘেয়েও আছে। তবে কিছু কিছু সত্যিই রোমাঞ্চকর । আস্ত অভিজ্ঞতাটা নেহাত মন্দ নয়, বরং শীতের সাথে মানানসই একটা ফ্লেভার পেলাম। লেখার হাতও চমৎকার। ঘাটশিলা, বোলপুর এইসব জায়গায় ঘটনা প্রবাহিত হওয়ায় প্রকৃতিরও রমণীয় মেলবন্ধন ঘটেছে গল্পগুলোর সাথে। সব মিলিয়ে সময়টা কেটেছে বেড়ে!