"...অবশেষে এপ্রিলের ১৩ তারিখ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে খুন হয় শেফালি। তার ট্যাটু দেখে ধারণা করা হচ্ছিল সে মূলত হিটলারের সমর্থক। কারণ সেখানে ‘স্বস্তিকা’ আঁকা ছিল। এরপর বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তার লাশ পাঠিয়ে দেয়া হলো বার্লিনের জীর্ণ এক মর্গে। ঢাকা থেকে বার্লিনে লাশ নেওয়াটা সহজ ছিল না।অনেক কষ্ট করে রাষ্ট্রীয় বাহিনী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শেফালির লাশ বার্লিন পাঠাল। অথচ নেত্রকোণা শহরে কবর খুঁড়ে অপেক্ষা করছিল তার বাবা। এরপর কবর খালি রাখা ভালো না এই অজুহাতে আদরুনকে সেই কবরে শুইয়ে দেওয়া হয়। শেফালির লাশ যখন ট্রায়ালে বিচারের জন্য তোলা হয়, কোথাও তখন বাজছিল, ‘দিল মেরে হে দারদে ডিস্কো’। এই গান শুনতে শুনতে শেফালির বাবা কবরের মধ্যে প্রাণ ত্যাগ করে।বিজাতীয় সংস্কৃতির গান বাজানোর অজুহাতে দোকনদার ইলতুতমিশকে ১শ বেত্রাগাত করা হয়।খালি গায়ে ইলতুতমিশ যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছিল, তখন তার পিঠে এগারটি ‘স্বস্তিকা’র চিহ্ন তৈরি হয়..."
~ লেখক বলেছেন বইটাকে কবিতা, বড়গল্প, ছোটগল্প, অণুগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ যা ইচ্ছে মনে করতে পারি। আমি বইটাকে কাব্যগল্প হিসেবে মনে করলাম, কারণ এটা কবিতার মতোই বিষণ্ন এবং সুন্দর।
লেখকের ভাষায় সুন্দর, মজার এবং তীব্র বিষাদময়। এক ধরনের এক্সপেরিমেন্টাল লেখাও বলা যায়, এধরনের লেখা আপনার কাছে অনেক নতুন মনে হবে তবে পড়তে খুবই ভালো লাগবে। গুডরিডসে দেখলাম অনেকেরই ভালো লাগেনি, কেন লাগেনি সেটা আমি বুঝতে পেরেছি, সবার কাছে আসলে এধরণের লেখা ভালো লাগার কথা না। এই বইটার কথা ২০১৮ সালে জেনেছিলাম, তবে কিনার আগেই স্টক আউট হয়ে গিয়েছিল, পরে এবার লেখকের কাছ থেকেই বুকস অফ বেঙ্গল সংগ্রহ করে দিয়েছে, লেখকের আরো দুইটা বই সহ। আমি একদমই হতাশ হইনি পড়ে, কারণ আমার এ ধরণের বই পড়তে ভালো লাগে। লেখকের জন্য শুভকামনা।
"ঘোড়া মূলত কী? ঘোড়া মূলত কিছুটা ঘোড়া এবং অনেকটাই গাধা। ঠিক আমার মতো। আবার গাধা যতটা গাধা, ততটা গাধা না। তোমার মতো। এর মানে কি আমরা সমানে সমান? সমতা মূলত একধরনের খচ্চর ভাবনা। যা ঘোড়াও না, গাধাও না।
তাইলে ঘোড়ার ডিম?
সেইটা একটা ইতিহাস বটে। যেমন ট্রেন একটা ঘোড়ার ডিম। আকাশ একটা ঘোড়ার ডিম। মানুষ একটা ঘোড়ার ডিম। এই যে শেফালি, যাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানে বোমা ফালানোর দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, সে-ও কি ঘোড়ার ডিম নয়? এভাবে আমরা পৃথিবীর ঘোড়ার ডিমদের চিহ্নিত করতে পারি অথবা পুরো পৃথিবী ভরিয়ে দিতে পারি অভিন্ন সব ঘোড়াদের দিয়ে, যাদের রং হবে দুধের মতো সাদা। যারা প্রসব করবে নান্দনিক সব ডিম। আর তখনো পৃথিবীর বুকে বাজবে,
৩.৫/৫ "এদিকে আমি ডুবে যাচ্ছি ক্রমে।অথচ আমার ঘুম আসছে।ঘুমের মধ্যে পানিতে ডুবে যেতে যেতে আমার ঘুম পাচ্ছে। আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারি না,আমি ডুবে যাব নাকি ঘুমিয়ে পড়ব।এই সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যেই আমার ঘুম ভেঙে যায়।একটু পর আমি বুঝতে পারি,আমার ঘুম এখনো ভাঙেনি।আমি ঘুমের মধ্যেই ঘুম ভাঙার স্বপ্ন দেখছিলাম। তার মানে,আমি এখনো ঘুমিয়ে আছি।কিন্তু আমার মনে হচ্ছে,আমার ঘুম ভেঙে গেছে।"
"শেফালি কি জানে" বইটিকে কোন জনরায় ফেলা যায়-ছোটগল্প?পদ্য?মুক্তগদ্য?উপন্যাস?প্রবন্ধ?যে বিশেষণেই অভিহিত করা হোক না কেন,বইটি যে সাহিত্যকর্ম হিসেবে অভিনব এবং বহু পাঠকের মনোযোগ দাবি করে,সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।
ইহা কবিতা + বড়গল্প + ছোটগল্প + অনুগল্প + উপন্যাস + প্রবন্ধ এবং আরও যা যা আপনার মনে হইতে পারে, তার সবকিছুই। অথবা কিছুই না। খোদার কসম। - লেখক
বইটি পড়তে গিয়ে কখনো কখনো মনে হয় একগুচ্ছ অনুগল্প পড়ছি, যে গল্পগুলো কোনো এক বড়গল্পের শাখা। আবার কখনো মনে হয় করুণ সুন্দর কোনো কবিতা পড়ছি, যার ভাষা কী চিত্তাকর্ষক! চৌষট্টি পৃষ্ঠার এই বইয়ের পরতে পরতে দেখা যায় নিরীক্ষার ছাপ। গল্পের নামগুলোর মতো ভেতরের লেখাগুলোও ব্যতিক্রমধর্মী যা নিয়ে যায় কোনো এক নিগূঢ় ঘোরের মধ্যে, করে রাখে মোহাবিষ্ট।
গুঁড়ো দুধ, হাওয়াই চপ্পল ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার পর বিস্কিট রঙের দুপুরে সালমান শাহর মৃত্যু হয়ে যায়, কিংবা তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড পড়তে পড়তে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার পায়তারা করে; আমার মুগ্ধতার রেশ তবু কাটে না।
'শেফালির ভীষণ জ্বর। তাকে দুইটা টোস্ট বিস্কুট দাও।'
সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে শেফালি কোমরে ট্যাটু কইরা আপনারে আবগারি শুল্ক কি জিনিশ তা বুঝায় দিতে পারে, আবার আপনারে জীবনের প্রথম প্রাকৃতিক একুরিয়াম কেমন সেইটা দেখায় দিতে পারে। চাইলে তেহরানে বৃষ্টির সময় সেক্স ক্যান নিষিদ্ধ তা বইলা আপনারে উষ্কায় দিতে পারে, আবার মনে ধরলে তার আব্বা আদরুন রে 'দিল মেরে হে দারদে ডিস্কো' শুনায় কবরে শোয়ায় দিতে পারে। এমনকি বিস্কুট রঙের দুপুরে আপনার মনে আত্মহত্যার মতো সুস্বাদু বিস্কুটের লোভ ঢুকায়ও দিতে পারে। এইরকম এনার্কি সৃষ্টি কইরা ফেলানো শেফালিরে, সে কি জানে প্রশ্ন কইরা দুইটা টোস্ট বিস্কুট দিয়া বসায় রাখেন লেখক।
এই রকমের বইয়ের সাথে আগে পরিচয় হয়ে গেসে দেখে জনরা কি এই নিয়া মাথা বেশি খাটাইতে ইচ্ছা করলোনা। কেউ জিগাইলে 'স্যুরিয়েলিস্টিক মেটাফোরিক্যাল ম্যাজিক রিয়েলিজম ঘরাণার বই' বইলা সারপ্রাইজ কইরা দিবো। সে শুইনা ভাববে, আমি আসলে সব বুঝসি। আসলে আমিতো সব বুঝিনাই! শুধু রক্তের রঙেই যে আমাগো সব সমতা, সেইটা কিন্তু না; আমরা আসলে কেউই কিছু বুঝিনা, কাউরে বুঝিনা। ধরি ভাব বুঝি সব। সবার মধ্যে ঘোড়া-গাধার মতো অত পার্থক্য নাই। খচ্চরীয় সমতা আসলে সব খানে বিরাজমান।
যাইহোক বইটা আসলে পড়তে হইলে 'ধুউর কি লেখসে' বইলা দাম দিলাম না এই এরোগেন্স দেখাইলেও হবেনা, আবার একই কথা বইলা আপনি আসলে কিছুই বুঝবেননা এইটা ভাবলেও হবেনা। আপনার আসলে সাহস কইরা একবার পইড়া ফেলা লাগবে। পড়ার পরে চিন্তাভাবনা করা লাগবে কেমন কি হইলো ব্যাপারটা। আমার যেমন পড়ার পর সুস্বাদু বিস্কুট খাওয়ার প্রতি মাঝরাতে ইন্টারেস্ট জাগতেসে! আবার আম্মারে জিজ্ঞাস করতে মন চাইতেসে, চরম আপন সন্তানের প্রতি একইসময়ে একইসাথে ভালোবাসা, ঘৃণা, হতাশা ফিল করার ফিলিংসটা কেমন হয় আসলে? এইরকম এবসার্ড?!
বইটা নিয়ে আসলে কথা কইতে গেলে সবাই কথাবার্তায় এমনেই বিগড়ায় যাইতেসে দেখলাম। হোক লেখক আর পাঠক। এইটারে প্রভাব বলে! প্রচুর রেফারেন্স, পপ কালচারের ছড়াছড়ি। যত ধরা যাইবে ফল তত সুমিষ্ট হইবে। যাইহোক, বইটারে আমি ব্যক্তিগতভাবে, কোনো নাম না জানা জনরার সর্বোচ্চ পছন্দের বই (যেটার অর্ধেক আমি আমার মতো বুইঝা নিসি) হিসেবে স্বীকৃতি দিলাম। লেখকরে ধন্যব���দ।
'শেফালি কি জানে' পড়ে আমি আমার হৃদয় পড়ে নিলাম। আমার হৃদয় শেফালিকে কিছু বলতে চায়। শেফালি কি জানে আমি তারে ভালোবাসি। আসলে শেফালি সবই জানে কিংবা পাখি হয়ে জানার চেষ্টায় আছে। যারা বলবে শেফালি কিছু জানে না; তাদের সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না। হয়তো তারা শেফালিকে ভালোভাবে উপলদ্ধি করতে পারেনি। কিংবা হয়তো আমি শেফালিকে ভালোভাবে বুঝতে পারিনি। তবে শেফালিকে আমার ভাল্লাগছে।
'মরিবার হলো তার সাধ' এ বলা, 'গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজের মধ্যে ভুলেই গিয়েছিলাম মরতে থাকাটাও জরুরি একটা কাজ।' আমিও তাই মনে করি। দশ হাজার বই পড়ে তারপর একটি বই লিখে পান্ডুলিপি পুড়িয়ে মরে যাওয়ার খুব ইচ্ছা।
'আকাশি গাছের নিচে আমি' নিয়ে যদি আমি কিছু বলি তবে বলতে চাই আসলেই আকাশি গাছের নিচে আমি। আমি দাঁড়িয়ে আছি আকাশি গাছের নিচে, আকাশি গাছের পাতায় পাতায় আমি, আকাশি গাছের পরমাণু আমি। আকাশি গাছের চর্তুদিকে আমি। যা দেখি সবই আমি। কল্পনায় আমি, বাস্তবে আমি, প্যারালাল ইউনিভার্সে আমি।
যখন প্রথম আমি জানতে পারলাম আত্মা পরমাণু ব্যতীত আর কিছুই না। তখন থেকে আমি অসহ্য যন্ত্রণায় আছি। তখন থেকেই আত্মহত্যা করার সাধ হচ্ছে আমার। ঘড়ির কাঁটার ঘন্টা এবং মিনিটের কাঁটা বন্ধ করে দিয়েছি সেই কবে; যেদিন সে পাগল হয়েছিল। শুধু বাকি সেকেন্ডের কাঁটা।
শেফালি সম্পর্কে যদি কিছু লিখি তবে আরেকটা শেফালি হয়ে যাবে। যে শেফালি নিঃসঙ্গ শেফালিকে সঙ্গ দিবে। তবে শুধু বলতে চাই, শেফালি সম্পর্কে জানতে চাইলে বইটা পড়ে ফেলুন। শেফালিকে জেনে ভালো লাগবে পাঠকদের।
'Wear your heart on your skin in this life.' — Sylvia প্লাথ
অদ্ভুত প্রিয় একটা বই। 'শেফালি কি জানে' বইটিকে আমরা একইসাথে ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গদ্য, পদ্য অর্থাৎ সাহিত্যের সকল শাখার সমন্বয় বলতে পারি।
সাহিত্যে অভিনবত্ব আসে 'শেফালি কি জানে'র মতো বইগুলো মাধ্যমে। সাহিত্যের ব্যতিক্রমী এই সৃষ্টিগুলো যারা পড়ে তারা আবার সৃষ্টি করতে পারে নতুন চিন্তা। যার দ্বারা সমৃদ্ধ হয় শেফালিরা।
বইটা বহু পাঠকের মনোযোগ দাবি রাখে। নতুন চিন্তা পড়তে সবার ভালোলাগার কথা। বইটার বহুল প্রসার হওয়া উচিত।
‘শেফালি কি জানে’ অদ্ভুত সুন্দর একটা বই। যেটি আমায় এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে দেখি বই শেষ। এটা কিছু হলো! মাত্র ৬৪ পৃষ্টার বই। তা-ও বইটা আকারে স্বাভাবিক বইয়ের তুলনায় বেশ ছোট। শুধু এই একটা ব্যাপারে বইয়ের প্রতি রুষ্ট হয়েছি। বাদবাকি সবকিছু আমাকে তুষ্ট করেছে। এত ব্যতিক্রমধর্মী বই সচরাচর পাই না। এটি পেয়ে যারপরনাই গোগ্রাসে গিলেছি। বইয়ের গল্পগুলোর (আমি গল্পই বললাম, বইটিকে লেখক কবিতা, গল্প, উপন্যাস; যার যা ইচ্ছা তা ভাবার স্বাধীনতা দিয়েছেন) মতো এর নামগুলোও ছিল অদ্ভুত। গল্প শুরুর আগে (শুরুর আগে তো পড়তেই হয়), পড়ার মাঝখানে, এবং পড়ার শেষেও নামগুলোর দিকে বারবার চোখ বোলাচ্ছিলাম। নামের কিছু নমুনা: ‘গুঁড়ো দুধ, হাওয়াই চপ্পল ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান’, ‘বিস্কিট রঙের দুপুরে সালমান শাহর মৃত্যু’, ‘ঘাস হইল গিয়া পৃথিবীর কেশ’, ‘আরও কিছু গাছ এবং অপ্রকাশিত টোস্ট বিস্কুট সমগ্র’, ‘সিল মাছের কাঁটাবিষয়ক জ্ঞানতত্ত্ব’।
প্রিয় লেখক ইমতিয়ার শামীমের প্রতি কৃতজ্ঞতা। কারণ, তাঁর এক ফেসবুক পোস্ট মারফত পেয়েছিলাম এ বইয়ের সন্ধান।
‘শেফালি কি জানে’ লেখক হাসনাত শোয়েবের অন্যান্য বইয়ের প্রতিও আগ্রহী করে তুলল আমাকে।
শেফালি হইল শেফালি বিনতে আদরুন। শেফালিদের বাড়িতে ভিসিআরে শাহরুখ খানের মুভি চলত – “ডর”, “রাজু বান গ্যায়া জেন্টেলম্যান” ইত্যাদি। এসব সিনেমায় যারে দুই হাত উপরে কইরা কাউরে ডাকতে দেখা যাইত ওইটাই শাহরুখ খান। পরবর্তীতে দূর থেকে ভিজা কিন্তু কাছ থেকে ঠিকঠাক শার্টের ইমরানের লগে শেফালির প্রেম হয়। এই শেফালি নাৎসি সন্দেহে এপ্রিলের ১৩ তারিখ খুন হয় (গায়ে স্বস্তিকার ট্যাটু ছিল)। শেফালিরে পরে আবার দেখা গেল ইসাবেল মিরনের সাথে “কুমারী শেফালি স্টুডিও"তে। কারন ঘামের সাথে নুনের সম্পর্কেই মতই মিরনের সাথে মিশা আছে শেফালি। শেফালি কি জানে? বেমক্কা আইছে আব্বাস কিয়ারোস্তামি (আইস্যা আবার গাছ হইয়া যায়), ফেদারার, পাবলো এসকোবার। আইছে স্লাভো জিজেক, সিলভিয়া প্লাথ। এছাড়াও নওশাদ, ইমরান, মীনদের দ্যাখবেন। এখানে কোন কিছুর কিছু ঠিক নাই, "মিথ্যে" হইয়া যায় আংগুলের কাটা দাগের নাম, "বসো" ক্রিয়াপদ মানুষ বা জিনিশপত্রের মত হারাইয়্যা যায়। রুনুদি এট্টু পর রুনু ফুপি হইয়া যাবে। বিস্কিট রঙের দুপুর থিকা, শেফালির জ্বর হইলে টোস্ট বিস্কুট খাইতে চাওয়া আর আত্মহত্যাকে ক্রিম বিস্কুটের সাথে তুলনা - এতো বিস্কুট এক বইতে এতো ভাবে আগে পাইনাই। মানে expect everything, or nothing at all.
ক্যান জানি “গল্পে এখন যারা কাহিনী খুঁজবে তাদের গুলি করা হবে” কয়দিন আগে চোখে পড়া এই বইটার নামটা মনে পড়তেসে (যদিও বইটা আমি পড়িনাই)। যাইহোক, শেফালির কাহিনীতে আসলে কাহিনী এমনকি যুক্তিও খুঁজতে যাওয়ার মানে নাই। পড়তে পড়তে যেসব কথা আমার অন্তত মনে হইছিল– - এ তো বিরাট স্ক্যাম! পুরা ভাওতাবাজির উপর একটা বই লিখা ফ্যালসে! - কী পড়তাসি এগুলা? লাইক - “ঘাস হইল গিয়া পৃথিবীর কেশ” “Mama said – we all are bus conductor - Ticket please” - আসলে খুব খারাপও লাগতেসেনা - হুম... কোন জিনিসের সরাসরি বর্ণনা না দিয়া ব্যাপারটার ইম্প্রেশন লেখার ট্রাই করসে মনে হয় - কবিতা কবিতা লাইন আছে, লোকজন খাইব
শেফালি আসলে অনেক ভালো বই ওমুক তমুক সবার জন্য না ইত্যাদি ইত্যাদি টাইপের কথা বলতে চাইতেসিনা। হজম করতে না পারলেও এসব বই পইড়্যা রাখা ভালো। একদিন এগুলা আলাদা জনরা-ফনরা ক্রিয়েট কইর্যা ফেললে কওন যাবে, "এতোদিনে পড়তাসস? তুই জন্মাসও নাই তখন পড়ছি এডি।" এজন্যই এই বইয়ের সামনের রিভিউগুলায় এক চোখ খুইল্যা রাখব সবসময় ;)
এই লেখারে হয়ত যেকোন ক্যাটাগরি তে ফালানো যাবে। কোন ক্যাটাগরিতে ফেলতে চাই সেটা না ভেবে আমি আসলে গল্পের মূল কেচ্ছার মধ্যে ডুব দিতে চাইছিলাম। কেচ্ছার পর কেচ্ছা, অদ্ভুত সব কেচ্ছা। একে ভেক্টর রাশির কোন সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে ফেলতে পারবেন না। কারণ, কোন ডিরেকশনে কেচ্ছা আগাবে সেটাও নির্ণয় করা মুশকিল। এরকম উড়াধুড়া ট্রাঞ্জিশন টা অনেক এঞ্জয় করছি। ৫৬ পাতার একটা অদ্ভুত কেচ্ছাকাঁথার রোলার কোস্টার রাইড। রেকমেন্ডেড।
শেফালি কি জানে? কি জানে শেফালি? বিস্কিট রঙয়ের দুপুরে সালমান শাহর মৃত্যু�� খবর? ঘরের দরজা বন্ধ করে ক্রিস জেরিকোর রেসলিং মুভ চর্চা করা ছেলেটার গল্প? অথবা ধ্বংস হওয়ার সময় নাকি পৃথিবী দুপুরবেলা বসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর পড়বে? ইসাবেল মিরনের সাথে সংসার পাতা শেফালিকে কি খুঁজে পায় তার বাবা অথবা হাসনাত শোয়েব?
বইটাকে গল্প, কবিতা, অনুগল্প, কৌতুক কোনো ক্যাটাগরিতে ফেলা যায় না। যেটাই হোক না কেন, পড়া শুরু করলে চলে যেতে হয় একটা ঘোরে। কিছুটা জাদুবাস্তবতা, কিছুটা পরাবাস্তবতা ও কিছুটা বাস্তবতার মিশেলে লেখা কথাগুলো। সবথেকে যেটা ভালো লেগেছে সেটা হল দেশি ও পাশ্চাত্য পপ কালচারের বিষয়বস্তু ব্যবহার করে লেখক দারুণ কিছু মেটাফোর এনেছেন। আব্বাস কিয়েরোমাস্তানি, রজার ফেদেরার, ভিখু মাহত্রে, পাবলো এসকবার, বব উলমার থেকে শুরু করে এসে হাজির হয়েছে সালমান শাহ, শাহরুখ খান, নবাব সিরাজউদ্দৌলা পর্যন্ত।
শেফালি কি জানে নাকি জানিনা,তবে আমি জানিনা এই বইয়ের অর্থ কি,উদ্দেশ্য কি,বিষয় কি। কেন জানি যেসব বই অনেক অপেক্ষার পর হাতে পাই,সেই বইগুলা পড়তে যেয়ে মনে হয় নিজের চুলগুলা টান দিয়ে দিয়ে ছিঁড়ি।এতই হতাশ লাগে। যাই হোক,আমি এই বইয়ের সঠিক পাঠক না।আপনারা যারা শেফালি পড়েছেন,বুঝেছেন,পছন্দ করেছেন,সেলাম 🙏। যে বই বুঝলাম ই না,তার রেটিং দেয়ার ও প্রশ্ন আসে না। চেরি ফুলের গাছ থেকে সিল মাছ বের হওয়া,শেফালির আকাশে উড়া ইত্যাদি ইত্যাদি absurdity এর(তাও কোনো নির্দিষ্ট কাহিনি ছাড়া)ভক্ত নই আমি। তবুও যদি পড়ার অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে রেটিং দিতে হয় তবে এক তারকা।
শেফালি কী আদৌ জানে? তাকে নিয়ে উদ্ভট, বিশৃঙ্খল এবং একই সাথে অসাধারণ সব গল্প, অণুগল্প, উপন্যাস, বড়গল্প কিংবা কবিতা ফাঁদা হয়েছে।
"আমরা আসছি। আমরা আসছি মূলত আপনাকে আরেকটি মৌলিক গল্প শুনাব বলে। এইসমস্ত গল্পের শরীরে কেবল কাঁটা আর কাঁটা। তুমি গল্পের শরীর থেকে কাঁটা তোলো, আমরা আসছি। তোমার মৃত্যুর পর থেকেই এই গল্প প্রলম্বিত হতে শুরু করেছে। গল্পের গায়ে এখন তুমুল জ্বর। তুমি পানি ঢালো। যাই হোক, একটা ফাঁসির দড়ির প্রমাণ সাইজ কেমন হতে পারে? আমি ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি।"
প্রতিটি পৃষ্ঠা শেষ করার পর মনে হচ্ছিলো, কী পড়েছি আমি! মাথায় বাড়ি মারে। কখনো বিদ্রুপাত্মক কখনো বা অদ্ভুত কিন্তু অসাধারণ এক ইন্দ্রজাল প্রস্তুত করে লেখক যেন ছেড়ে দিয়েছেন পাঠকের উদ্দেশ্য। সেখানে ভেসে যেতে যেতে মাঝে মাঝে দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে যেতে হয় আবার খুঁজে নিতে হয় কিনারা। শেফালিকে ধরতে হয় কষে। আত্মহত্যা যেখানে বিস্কুট। Solitude ঝড়ে পড়ে এখানে পৃথিবী ধ্বংস হয়। পরাবস্তবতার সাথে লেখক যেন একটুকরো জাদুকে গুলিয়ে দিয়েছেন তার লেখায়। এইরকম লেখা সবসময় পড়া হয় না, কারণ সবসময় এইরকম লেখা রচিত হয় না। এটা অনেকটা বিরাট এক ভৃঙ্গরাজ গাছে ছেয়ে যাওয়া আঙিনায় ফুটে থাকা একটিমাত্র ভৃঙ্গরাজের মতোই। এখানে সুবোধ দোকানে কাজ করে, সে পালিয়ে যায় না। লেখক তার কল্পনার সুতো টেনে নিয়ে আসে তানসেনকে, শেষ নবাবকে। মীরাবাঈকেও নিয়ে আসেন তার গল্পের আসরে।
"Mama said, we all are bus conductor — Ticket Please"
লেখকের এই যাত্রায় সামিল হতে হলে seatbelt বেঁধে বসতে হবে আপনাকে। ডুব দিতে হবে তার অনিন্দ্য সুন্দর লেখেনির তলানিতে। তবুও খেই হারিয়ে ফেলতে হয় মাঝে মাঝে কিন্তু আবার ধরে নিয়ে ছুটতে হয় লেখকের সাথে তার সৃষ্টি করা উদ্ভট সেই দুনিয়াতে।
বইয়ের মধ্যে একটু পরে পরেই দেখলাম সব সুইসাইড করে মরে যাইতেছে। কেবলই এই দৃশ্যেরই জন্ম হইতেছে। এরপরে আসলে ঘোড়াগুলিই যে ঘাস খাইতেছে নাকি অন্য কেউ তা বোঝা বড় দায়! আহারে কিছুই ভালো লাগলো না😞 কিন্তু দুইটা বাক্য ভাল্লাগছে। ঘাস হইল গিয়া পৃথিবীর কেশ টাইটেলের আন্ডারে থাকা ভাল লাগা বাক্য দুইটা হইল- সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে হু হু করে বাড়ছে গাঁজার দাম। সেই সাথে বাড়ছে গাঁজাখোরদের সংখ্যাও।
এই বইয়ের প্রচ্ছদ দেইখাই আসলে বুইঝা যাওয়ার কথা ছিল ভিতরে কী থাকবার পারে। একটু কানা হওয়ার কারণে ভাল কইরা দেখছিলাম না। তয় প্রচ্ছদ আসলেই নাইস লাগে দেখতে। বইয়ের প্রোডাকশন ভাল হইছে, সাইজটা কিউট।
তয় কথা হইতেছে শেফালি আসলে কিছু জানে না। জানলে অই আর টিকতে পারতো না।
3.5/5 বেশ দ্বিধা নিয়ে বইটা শুরু করেছিলাম। বইয়ের কতটুকু বুঝতে পারব তা নিয়ে ভাবনা ছিল। দেখা গেল অল্পকিছু অংশ বাদে অনেকটাই ধরতে পেরেছি। গুঁড়োদুধের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞান এর সম্পর্কের সাধারণ গল্প যেমন আছে ঠিক তেমনি তেহরানে বৃষ্টির সময়ে সেক্স নিষিদ্ধ এর রূপকার্থক গল্পও আছে। শেফালিকে চিনতে গিয়ে হয়তো খুজে পেতে পারেন নিজেকেই। একটা সুইসাইড নোট পড়ে মনে ধরেছে। তুলে দিলাম সেটা।
"স্কুলের বার্ষিক স্মরণিকা প্রকাশের দিন প্রথম আমরা রেললাইন দেখতে যাই। যেহেতু আমাদের কখনো ট্রেনে চড়ার প্রয়োজন পড়েনি, তাই আমাদের রেললাইন দেখার অভিজ্ঞতাও ছিল না। সেদিন প্রথম দেখেছিলাম কীভাবে দুটি সরলরেখা সমান দূরত্বে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে? উত্তর মেলে না। আমাদের সমুদ্র দেখার অভিজ্ঞতা ছিল, কিন্তু সমুদ্রের অন্য পাড় কখনো দেখা হয়নি। তাই রেললাইনের নাম দিলাম সমুদ্র, কারণ তারও ওপাড় বলতে কিছু ছিল না"
এমন সব কথাবার্তা রয়েছে এই বইয়ে।। এমন সব কথাবার্তা বা গল্পের খবর শেফালী জানতো নাকি জানতো না সেটা ঠিক বলতে পারছি না, কিন্তু আমি জেনেছি যে এই নীরিক্ষাধর্মী কাজটি আমার মধ্যে ভাবনার ঝড় তুলেছে, আমাকে নিয়ে ফেলেছে অন্য এক জগতে, অন্য এক পরিবেশে
এই বইয়ে গল্প বলতে বলতে কবিতা এবং কবিতা বলতে বলতে গল্প বলা হয়েছে 🌻 এখানে লেখক বেশ সূক্ষ্মভাবে আমাদের বিশৃঙ্খল সমাজ, রাজনীতিক ব্যবস্থা এসবকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন।। সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বুননে লেখক যেন বুনেছেন, লেখা পড়ে এমনটাই মনে হলো..... কিন্তু অনেক লেখাতে ছিল নস্টালজিক আবহ, আবার অনেক লেখাতে উনি পরাবাস্তব একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন এবং পাঠককে চিন্তার জায়গা দিয়েছেন(যেটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি) তবে শেষ কথা হলো, এই বইটা সবার cup of tea না...
শোনা যায়, প্রস্তর যুগের পূর্বে গুটিকতক প্রাক-মানবের মগজে বীজ থেকে চারা অবধি বেড়েছিল শেফালি, তবে গাছে পরিণত হওয়ার আগেই কুঁকড়ে মরে যায় শেফালি-চারা।
বিংশ শতাব্দীর পেট চিঁড়ে যখন আরেকটি শতাব্দীর জন্ম হয়, এই শিশু শতাব্দীর গোড়ায় লেখক হাসনাত শোয়েবের কলম থেকে আদিম ঝর্ণা রূপে প্রথমবার যুবতী হলো সে—শেফালি।
‘শেফাল কি জানে’ কোনো প্রশ্ন নয়, এটা একটা স্বগোতক্তি। গিলোটিনের ফলা ঘাড় থেকে তিন ইঞ্চি উপরে ভাসমান থাকা অবস্থায় মুখ ফ��কে বের হয়ে যাওয়া একটি অর্ধেক প্রজাপতি।
গল্প, কবিতা, উপন্যাস, হিজিবিজি—কিছুই না। সে শুধুই শেফালি। ঊরুতে স্বস্তিকা চিহ্ন অঙ্কিত ন্যুড মডেলের অস্পষ্ট হাসির রেখা সে।
যেবার তেহরানে ২৭টি টিউলিপ অভিমানে আত্মহূতী দিল, সেবার তাদের রক্ত থেকে শেফালির পুনর্জীবিত হওয়ার কানাঘুষা শোনা গেল।
ক্রুশবিদ্ধ রাষ্ট্রযন্ত্রের শরীর থেকে টুকটুক করে ঝরে পড়া অশ্রু শিখায় বিস্কুট রঙের দুপ���রে শেফালির ভীষণ জ্বর হয়।
প্লেটো একবার তার শিষ্যদের সামনে আনমনে বলে ফেলেছিল, “Love is a blind monkey with high fever.” প্রথমে সে নিজেই কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, পরে দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টায়।
হাসনাত শোয়েব আমাদের সাথে একটা খেলা খেলেন—শব্দ-ফাঁদের খেলা। প্রতিটি অনুচ্ছেদ শেষে অদৃশ্য প্রশ্ন ছুড়ে দেন পাঠকদের দিকে,
“বিশৃঙ্খলার কি কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ আছে, নাকি শুধুই অর্থহীনতা?”
সচেতন পাঠকেরাই প্রশ্ন হাতড়াতে গিয়ে আবিষ্কার করে যে তার প্রতিটি বাক্য অ্যাবসার্ডিটি আর নিহিলিজমের সঙ্গমের ফসল। ফর্মেশনের দেয়াল টপকে কেয়োটিক ডিফর্মেশনের পন্থা অবলম্বন করেছেন তিনি।
“শেফালির ভীষণ জ্বর। তাকে দুইটা টোস্ট বিস্কুট দাও।”
“.....মাশরুর স্যার প্রায়ই বলতেন, পৃথিবীর মৃত্যুর আগে তেহরানে বৃষ্টি পড়া বন্ধ হয়ে যাবে। তার আগে অবশ্য আব্বাস কিয়েরোস্তামির মৃত্যু হবে। মানুষ ভুলে যাবে টিউলিপ নামে কোনো ফুল ছিল কিংবা টেস্ট অব চেরি নামে সিনেমা ছিল। এরপরও অবশ্য আরো একশ বছর পৃথিবী বেঁচে থাকবে। এর মাঝে মানুষ জানবে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে এবং কী কী সে আর কখনো ফিরে পাবে না! তারপর কোনো এক দুপুরে তুমুল বৃষ্টির মাঝে ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড পড়তে পড়তে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।”
বইটা ভাললাগে নাই; :) "গুঁড়োদুধ, হাওয়াই চপ্পল ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান"- যে পরিমাণ স্যাটায়ারের জন্ম দিয়া শুরু হইছিল সেটা লেখক পরে আপ টু দ্য মার্কে নিতে পারেন নাই; নিতে হবে এমনটা কইতেছি না কিন্তু! লেখকই আসলে কিছু যায়গায় স্যাটায়ার বানানি মশকো করছিলেন আরকি। অই অর্থে হইয়া উঠে নাই। এইরকম কথা কইতেছি নমুনা তো হাজির করতে হইবে! 'বৃষ্টি হচ্ছে, আমি 'বসো'কে খুঁজে পাচ্ছি না' অইরকম একটা টেক্সট; বসোরে বাথরুমে যতক্ষণ না খোঁজা শুরু হইল ততক্ষণ পর্যন্ত স্যাটায়ারিক্যাল ইনভায়রনমেন্টটাই মিসিং আছিল। পাঠিকা , আপনারা ইয়াদ রাখার কোশেশ না করলেও বলি, এগুলা সুররিয়ালিজম হইতে পারে কিন্তু ফেবুলিজম নহে। ফেবুলিজম হইলে স্যাটায়ারের মাত্রা লইয়া নানাবিধ আলাপ পারা যাইত কমবেশি। এইটা মেবি লেখকের এসথেটিক চয়েস। উনার পছন্দিরে ইজ্জত দিতে হবে মাশাল্লাহ। লেখার হিউমারাস বা ফানি সাইড যে আছিল না এমন না... মেবি মেবি ওইটার বল পরে মনোলগের দিকে গড়াইতে শুরু করছিল। মাঝে মাঝে বাসুদেবন নায়ারের কথা ইয়াদ আসতেছিল; মনোলগের প্যাঁচানিতে; কিন্তু লেখক এই যায়গায় তার পরিমিতি বোধ দেখাইছেন। 'মুম্বাই কা কিং কন' কিংবা 'উই অল আর বাস কন্ডাক্টর' দুর্দান্ত লেখা। আসলে পয়লা টেক্সটগুলার যে রাইটিং মান মাঝের টেক্সটগুলা অইভাবে আপহোল্ড করতে পারে নাই। বেশিরভাগ সময় মনে হইছে খেই হারায়ে ফেলছে; এইটারে ফ্যাসিবাদী যুগের পোস্টমর্ডানিজমের গুন কমু নাকি আছর বুঝবার পারতেছি না! :D
নাহ এ যাত্রায় ব্যাপারটা জমলো না। অনেক দিন সময় নিয়া বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কনটেক্সটে বসে, বইটা পড়লাম। ভাবলাম কোনো একটা সময়ে তো ভালো লাগা শুরু করবে। মুক্তগদ্য হোক বা কবিতা হোক বা এবসার্ড কিছুই হোক, এরা তো দূরের কেউ না। কিন্তু বিধি বাম। তার চেয়ে আশরাফ জুয়েল এবং সুহান রিজওয়ানের আলোচনাটুকু ভালো, কিছু পাওয়া যায়। হয়ত অন্য কোনো একদিন এই বই ভালো লাগবে। সেদিন রেটিং চেঞ্জ করতে বাধবে না মনে।
"আত্মহত্যা মূলত সুস্বাদু বিস্কুট। তার ভেতরের ক্রিমটাই বেশি মজার, যেটা চেটে খেতে হয়। আমরা ওপরের দুই আস্তরণকে কখনোই বিশ্বাস করি না। আমাদের সব বিশ্বাস ক্রিমের ওপর। সেই ক্রিমের লোভে মানুষ আত্মহত্যা করে। যা বেঁচে থাকা মানুষের বোধগম্যতার উর্ধ্বে এবং বেশিরভাগ মানুষ মূলত ভোরবেলা আত্মহত্যা করে। কারণ প্রত্যেকটা ভোরের রয়েছে আত্মহত্যার আলাদা আলাদা নিয়ম।"
আমি স্বভাবতই একটু বিষন্নতায় আচ্ছন্ন মানুশ। যার যেকোন মূহুর্তে আত্মহত্যা করার সম্ভাবনা আছে। আবার মাঝে মাঝে কীভাবে আত্মহত্যা করবো তার চিন্তাও করি। এসব চিন্তারা দিনে-রাত্রে যেকোন সময় না জেনে বুঝে আসে। এই চিন্তাগুলোকে বেশ অনেকটা প্রভাবিত করেছে এই বইটা। বইটা পড়তে পড়তে ঘুম আসে, আমি ঘুমিয়ে যাই। আবার ঘুম থেকে উঠে পড়ি। এভাবে পড়তে গিয়ে বেশ কয়েকবার পড়েছি বইটা। বেশ ছোট বই। তবে এই বইটা বুঝতে বেগ পেতে হবে ভালোই। উদ্ভট সব কথারা জোট বেঁধে সংসার করছে এই বইটার মধ্যে। ছোটবেলায় বাচ্চা আমিও এমন অনেক উদ্ভট কথা ভাবতাম। এখনও ভাবি। আমার মতো এমন পাগল আরো একজন আছে জেনে ভালোই লাগলো।
বইয়ের কথাগুলো কবিতার মতো। মেটাফিকশন আমরা যাকে বলি। অ্যাবসার্ড এবং বেশ ভালো রকমেরই অ্যাবসার্ড। সবার হয়তো এই বই ভালো লাগবে না। তবে আমার বরাবরই এমন টাইপ কথা, গল্প, কবিতারা যেখানে ভীড় করে থাকে তেমন বইই ভালো লাগে। এটাও স্বীকার করছি বুঝতে আমারও বেগ পেতে হয়েছে খানিকটা।
"ল্যাক অব কমিউনিকেশন" বলে ব্যাপারটা ক্লিয়ার হয়েছে এই বইটার মধ্যে দিয়ে। আমি পিছন থেকে পড়া শুরু করেছিলাম (নিছকই পাগল বলে)। পরে বুঝতে পারলাম আমার শেফালিকে চিনতে হবে। শেফালি কে যে চেনা হলো না। অদ্ভুত সুন্দর করে গল্প বলার ধরণ আমার বরাবরই প্রিয়। এই বইটাও বিশেষ প্রিয় বইগুলোর একটা।
আমার বিষন্ন চিন্তার গুড়ো দুধের রংটা আয়ুরেখা ধরে হেঁটে যেতে গিয়ে হঠাৎ রং পাল্টে মাটি-হওয়া রং হয়ে গেলো। বইটা পড়া উচিত না। আবার না পড়লে অনেককিছু হাতের কাছে পেয়েও না পাওয়া, না জানাই থেকে যাবে। অনেককিছু মিস হয়ে গেলো তো।
আমার ভীষণ পছন্দের দুইটা টপিক হলো- ঘ্রাণ আর রং। কেউ এগুলো নিয়ে একটু কথা বললেই আমি খুশি হয়ে যাই। এই বইটাতেও বেশ সুন্দর করে এই দুটা শব্দের অর্থ খুঁজে পেলাম নতুন করে।
বইটা আসলে মুক্তগদ্য নাকি ছোটগল্প নাকি কবিতা আমি জানি না। তবে পড়তে ভালো লেগেছে।
বইটা পড়তে গিয়া বুঝলাম, আমার বইয়ের টেস্টে ব্যাপক একটা চ্যাঞ্জ আসতেছে।
গতবছরের প্রথম দিকে পড়তে নিলে বইটা ছুঁইড়া মারতাম শিওর। কোনো নির্দিষ্ট কাহিনী নাই, কিস্সু নাই, কিসব অঙভঙচঙ লেইখা রাখছে। পদ্য নাকি গদ্য তাও বোঝা যায় না। লাইনের পরে লাইন, উইথ উল্টাপাল্টা বয়ান...
আজকে পড়তে গিয়া খেয়াল করলাম, বেশ ভালোই লাগতেছে। এবসার্ড বলেই বোধহয়। ভেতরের কিছুই ধরতে পারি না��। স্টিল পড়তে ভাল্লাগছে, আরাম কইরা শ্যাষ করতে পারসি। ক্যান ভাল্লাগছে এইটার প্রোপার উত্তর দিতে পারবো নাহ, কিন্তু ওইযে কইলাম, কাহিনীর ত্যানা প্যাচানো নাই তাও ভাল্লাগছে। কইতে গেলে, ওই আরকি, এমনিই ভাল্লাগছে :3
ব���ষ্টির দিনে পিঠ জুড়ে হাওয়াই চপ্পলের গ্রাফিতি।পলকেই সামনে চলে আসে একটি বর্ষণমুখর সকালের শেষে স্কুল থেকে ফেরার দৃশ্য, দুই হাত কাঁধে ঝোলানো ভারী ব্যাগটা সামলানোতে ব্যস্ত,আর গ্রাফিতি মাঝে মাঝে সীমানা পেরিয়ে ব্যাগেও চিহ্ন এঁকে যায়।পরিবেশ পরিচিতি সমাজ ক্লাসের পিঠভর্তি গ্রাফিতি পরিচিত অনুভূতি বহন করে অথবা মনে করিয়ে দেয় বাংলা ক্লাসে রচনা না পারার কারণে অর্ধ শিক্ষার্থীর ক্লাসের বাইরে মুরগী হয়ে থাকা।পেঁচার সাথে পৃথিবীতে মৃতদের একাদশতম ভাষায় আলাপ সারা তৈমুর লঙ মনে করিয়ে দেয় শত ব্যথায়ও মুখে সূর্যমুখীর হাসি চড়িয়ে নির্বিকার থাকা বান্ধবী হাসনাহেনাকে।ক্রেমলিনের একাকিত্বে বিষন্ন শিক্ষক আমার মাধ্যমিকের বিজ্ঞানের অনীল স্যারের কথা স্মরণে আনে।কোনো সাদৃশ্য নেই, তবু বিস্মৃতির অতল গহ্বর থেকে এরা একে একে উঠে আসে।
আমি গোল কমলালেবু রঙের বৃষ্টি কল্পনা করি।হঠাৎ আমার চোখের সামনে কমলালেবু রঙের তীব্র বিস্তৃতিতে ধাঁধা লেগে যায়।আমি তাড়াতাড়ি পৃষ্টা উল্টায়।তারপর সেখানে আসে রুনু ফুফুর মৃত্যুতে দাদীর হালকা মেরুন রঙের চোখের জল।আমার ভাবনায় আসে প্রতি বছর সালমান শাহের মৃত্যু দিবস আমার সামনে একটা বিস্কিট রঙের দুপুরকে দাড় করাবে।আমি বিস্কিট রঙের দুপুরের কথা ভাবতে ভাবতে হয়ত একসময় এই রঙের কিছু একটা কিনে চোখের সামনে ঝুলিয়ে রাখবো।মাশরুর স্যারের সুইসাইড নোটে লেখা “আগামীকাল সকালের সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই” ভীষণ গাঢ় বিষন্নতায় ডুবে থাকা ধ্রুব সত্যকে আরো স্পষ্টতর করে তোলে।আমি বারবার পড়ে দেখেও বুঝতে পারি না, আমি কি বিমুগ্ধ নাকি বিষন্নতা ভর করেছে।
আপেক্ষিক সব সাদৃশ্যকে চিহ্নিত করে রেললাইনকে সমুদ্র নাম দেওয়া দেখে আমি ভেবে কুল পাইনা এদের মাঝে ভালো খারাপের তুলনায় আসলে বিজেতা কে! সমুদ্র না রেললাইন।আমি হিসেব কষতে বসি কে বড় ঘাতক! সমুদ্র? যেখান থেকে আবির কখনো ফেরেনি। নাকি রেলপথ? যেখানে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে চোখের সামনে কাঁটা পড়েছিল সেখানেই বেড়ে ওঠা ছোট্ট পরী।
আমি ফিরে যাই শৈশবে।ঘুম ভাঙার পর বাড়ির আঙিনায় কৃষ্ণচূড়ার লাল স্রোতে সূর্যের আলোয় সুতীব্র এক মোহে সকালটা আরো রঙিন হয়ে ওঠত আর সন্ধ্যার আঁধার নামার কালে কি এক বিষন্নতা এসে ভর করতো।সকালের চোখ ধাঁধানো লাল বিকেল হতে হতে মিয়ে যেত।আমরা একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের লাল চোখে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম।
“আত্নহত্যা মুলত সুস্বাদু বিস্কুট। তার ভেতরের ক্রিমটাই বেশি মজার,যেটা চেটে খেতে হয়।আমরা ওপরের দুই আস্তরণকে কখনোই বিশ্বাস করিনা। আমাদের সব বিশ্বাস ক্রিমের ওপর।সেই ক্রিমের লোভে মানুষ আত্নহত্যা করে। যা বেঁচে থাকা মানুষের বোধগম্যতার উর্ধ্বে”
আমি টের পাই বাবার মন ভার হওয়া মুখ দেখে,মা এর তীব্র ভৎসনায়, প্রেমিককে ছেড়ে আসার মূহুর্তে, জীবনের পরীক্ষায় হেরে গিয়ে কেন আমি বারংবার সেই ক্রিমের স্বাদ নিতে চাইতাম।
“পেয়ারার ডালে পা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে ‘রোজাভেজে’র মতো একদিন আমিও ভেবেছিলাম বন্ধুগণ,’গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজের মধ্যে ভুলেই গিয়েছিলাম মরতে থাকাটাও জরুরি একটি কাজ।’ পড়তে পড়তে আরও গভীরভাবে ঝুলে পড়তে ইচ্ছে জাগে।কিন্তু মরার আগে মালবিকার বন, যেখানে সুগাঢ় মদের ভেতর জীবন লুকানো, তাকে খুঁজে বের করতে হবে।সেজন্য আমরা বেঁচে আছি বন্ধুগণ।….আমার বন্ধুরাই ঠিক করে দিয়েছে যে এবার আমার মরে যাওয়া উচিত।কারণ, বেঁচে থাকা নিছকই পাহাড় গুণে ক্লান্ত হওয়া ছাড়া কিছুই নয়।আমি ভাবি,মৃত্যু পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে।শিরীষের বুকে একটি আঁচড়ের দাগ ও মরা ছাতিমগাছের কোল থেকে মহাজাগতিক উড়োজাহাজের উড়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কিছু ঘটার সম্ভাবনা নিতান্তই শূন্য।সেই শূন্য সম্ভাবনার মাঝে যে দেয়ালঘড়ি এখনো বেজে চলেছে তার কাঁটা আঁকড়ে মানুষের বেঁচে থাকা।সম্ভাবনাটুকু শেষ হয়ে গেলেই মৃত্যু।”
বেঁচে থাকার মত ক্লান্তিকর কাজটা বয়ে বেড়াচ্ছি দুচোখ ভরে পৃথিবী দেখার স্বাদ আজও মিটেনি বলে।আকাশ ভরা তারা, পূণিমা চাঁদের নিচে হাওয়া খেতে খেতে রবীন্দ্র গান শুনে চোখ বোজা,শরতের আকাশে মেঘের ভেলা, বর্ষার আকাশ ভাঙা বর্ষণ……. কি করে এই সৌন্দর্য ছেড়ে দুম করে মরে যায়!
“একদিন তোর বাস আঁকা শেষ হবে।আমরা দুজন সেই বাসের কন্ডাক্টর হব।এটি দূরপাল্লার বাস।আমাদের বাস যাবে পাহাড়ের দিকে। সারি সারি পামগাছ এবং আনারস ক্ষেত পার করে বাস একদিন পাহাড়ে গিয়ে পৌঁছবে। তখন বাঘ কাঁপানো শীত। আমরা যাত্রী নামাতে নামাতে বলব—we all are bus conductor—Ticket please.”
ছোটবেলায় একবার বাস কন্ডাক্টর হওয়ার শখ চেপেছিল।বাসের সিড়ির পা-দানিতে দাড়িয়ে গ্রামের রাস্তার পাশের বিস্তৃত ধানক্ষেত, সরিষাক্ষেতে ফসলের বাতাসে দোল খাওয়া দেখতে পাওয়াটাও তখন সপ্নীল মনে হত। বাস কন্ডাকটর হওয়ার স্বপ্ন উন্নীত হই ট্রাভেলারে।একদিন দূরপাল্লার যানে চড়ে সারি সারি পামগাছ, সরিষাক্ষেত দেখতে দেখতে চলে যাব দূরের দেশে।
“বন্ধুহীন পাখিরা একা একা নিজের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে” আমি নিজেকে বন্ধুহীন পাখি ভাবতে শুরু করি।আমি জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা একা কথা বলি, মনের মাঝে চরিত্রের কাঠামো বানায়,ভালোবাসার জাল বুনে ঘর তৈরি করি।একটা বৃত্তের ভেতর বন্দী থেকে এরা কথোপকথন চালায়।
স্মৃতির জার্নালের মত বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছি আর বিস্মৃতিরা যেন পাইনবনের ছায়া হয়ে একে একে হাজিরা দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মনে অতীতের দুঃখ কষ্টের পাহাড় বুকশেলফের আবরণের মত ঠাঁই দাড়িয়ে থাকে।শেলফ থেকে একটা একটা করে বই বের করলে যেমন ভেতরকার কাহিনী বেরিয়ে আসে, মনের মাঝের স্তুপ থেকে দুঃখগুলোও সময়ে সময়ে এভাবে বেরিয়ে আসে।
“শেফালি কি জানে” আমার ক্লান্ত মনে প্রশান্তির ছায়া আনে।পৃথিবীতে নিজেকে ভীষণ একা মনে করা আমি নিশ্চয়তা ফিরে পাই।’শেফালি কি জানে’র প্রতি পাতায় পাতায় যেসব অদ্ভুত চিন্তার খেলা চলেছে, সেসব আমার কাছে অর্থ পেতে শুরু করে।বিস্কিট রঙের দুপুর, গোল কমলালেবু রঙের বৃষ্টি,তেহরানের বাগান,কিয়ারোস্তামির গাছ হয়ে যাওয়া,শেফালির জ্বর হলে কেন সে টোস্ট বিস্কুট খেতে চায়,এই মূহুর্তে পৃথিবীর রঙ ধূসর নাকি বাদামী ভাবতে আমার ভালো লাগে।বাস্তবতায় একটা ঘোরের বৃত্ত খুঁজে পাই আমি।আমার জানতে ইচ্ছে করে আরেকটি সুন্দর সকালের অপেক্ষায়, তপ্ত দুপুরের লুব্ধতায় আর রোদ মরে যাওয়া বিকেলের প্রশান্তিতে বেঁচে থেকে আমি যে বিষন্ন তবু আনন্দিত,শেফালি কি তা জানে!!!
"মানুষের উড়ে যাওয়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। যেমন শেফালির উড়ে যাওয়ার মধ্যে আছে ব্রক্ষ্মান্ডের গোপন সব রহস্য। মিরন সেই সব সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে থাকে। আর ভাবতে থাকে ঘাম এবং নুনের সম্পর্কের কথা। যেমনটা বলেছিলেন রনজিৎ দাশ, 'ঘামে যে রয়েছে নুন, তার অর্থ সমুদ্রে ছিলাম...'। পৃথিবীর এই সম্পর্কের কিছুই উদ্ধার করতে পারে না মিরন। ঘামের সাথে নুনের সম্পর্কের মতোই তার সঙ্গে মিশে আছে শেফালি। এ কথা কি শেফালি জানে"
- পৃষ্ঠা : ৫৬
বড় অদ্ভুত এক বই পড়ে শেষ করলাম। এ গ্রন্থ পাঠ শেষে কারো কাছে কবিতা, কারো কাছে উপন্যাস, কারো কাছে ছোটগল্প কিংবা অণুগল্প সংকলন মনে হতে পারে। জাদুবাস্তবতার ন্যারেটিভ সম্পর্কে ধারণাহীন পাঠকের কাছে পাগলের প্রলাপ মনে হতে পারে বইটির কন্টেন্ট।
আমার কাছে 'শেফালি কি জানে' একটি উপন্যাসই মনে হয়েছে। কারণ হাসনাত শোয়েব ত���র ক্যাওটিক লেখনীর মাঝে একধরণের ক্রম বা অর্ডার মেনে চলেছেন মনে হয়। যেখানে শেফালি বিনতে আদরুন, তার পিতা আদরুন, মাথা কামানো তৈমুর, উত্তম পুরুষে কেউ একজন ( লেখক নাকি? ) সুইসাইড করা রুনুদি, ইসাবেল মিরনের চরিত্রায়ন সংক্ষেপে সাধিত হয়েছে। লেখক একদিকে দর্শনশাস্ত্রের ছাত্র, অন্যদিকে কবি। কবিরা সাধারণত অল্প অক্ষরে বহু কথা বলার যে জটিল এবং দুর্বোধ্য প্রক্রিয়াটি সারেন তা তাদের মধ্যে অনেককেই বাচাল গদ্যকার হওয়া থেকে রক্ষা করে। একইসাথে অনেক কবির গদ্য দুর্দান্ত। হাসনাত শোয়েব এই কবিতা / ছোটগল্প / অণুগল্প সংকলন / উপন্যাসে ভাষার এক অদ্ভুত কেরদানি দেখাতে পেরেছেন। সহজ, ঝরঝরে, প্রাঞ্জল তবে এই ভাষা যেন ধরা দিয়েও অধরা।
বিদেশি বিভিন্ন পপ কালচার রেফারেন্স লেখক যেভাবে টেনে এনেছেন জাদুবাস্তবতার ন্যারেটিভে তা এখন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে কেউ করেছেন কিনা আমার জানা নেই। আবার বইয়ের পাতায় পাতায় ঘুরে বেরিয়েছেন শাহরুখ খান, সালমান শাহ, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী, অনুরাগ কাশ্যপ সহ আরো অনেকেই।
জাদুবাস্তবতার ন্যারেটিভের সাথে ভিষণ রকমের অ্যাবসার্ডিটিও স্থান পেয়েছে এই উপন্যাসে। এত অ্যাবসার্ডিটি এসেছে যে আত্মহত্যাপ্রবণতার দিকে বারবার যেন টানতে চাইছে বিভিন্ন চরিত্র, পাঠককে। মানব জীবনের অর্থহীনতাকে অর্থ দান করার ব্যর্থ প্রয়াসের আকাঙ্ক্ষা মনে হয় লেখকের ছিল না। তিনি বরঞ্চ ঠান্ডা মাথায় এক ধরণের ডার্কনেস ছড়িয়েছেন তার চারিদিকে। রহস্যময় শেফালি কিংবা লেখক হয়তো নিজেও জানেন না অবচেতন থেকে আগত কত ভয়ানক ভায়োলেন্স আছে এই বইয়ে। অবশ্য ভায়োলেন্স বলুন বা সুন্দর ভাষায় পাগলামির বহিঃপ্রকাশ বলুন, এই বই কেন, মানবজীবনের অদ্ভুতুড়ে যাপনে এসব তো আছেই। লেখক যা পাঠক জানেন কিন্তু প্রকাশ হয়তো করেন নি, এরকম অনেক সমসাময়িক বিষয় নিজের ভাষাতেই প্রকাশ করেছেন। উক্ত বইটি ভবিষ্যতের বাংলা সাহিত্যে ধ্রুপদী মর্যাদা পাওয়ার সক্ষমতা রাখে মনে হয়।
"তিনি বললেন, কবিদের মোরালিটি থাকতে হবে। আমি বললাম, মোরালিটি হলো আরেকটা ফাঁদ। যেখানে বাঘ থাকে। আর থাকে হিরন্ময় অন্ধকার। আমি তাই মোরালিটির সাথে নেই।"
-পৃষ্ঠা : ১১
পাঠ প্রতিক্রিয়া
বই : শেফালি কি জানে লেখক : হাসনাত শোয়েব প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০১৮ তৃতীয় সংস্করণ : এপ্রিল ২০২২ প্রচ্ছদ : রাজীব দত্ত প্রকাশনা : চন্দ্রবিন্দু জঁরা : উপন্যাস / কবিতা / ছোটগল্প / অণুগল্প সংকলন রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
"শেফালি কি জানে" হাসনাত শোয়েবের লেখা আকার ও আকৃতিতে ছোটখাটো একটা বই। বইটা দৈর্ঘ্যে সাত ইঞ্চির চাইতে একটু বড় প্রস্থে বরাবর পাঁচ ইঞ্চি।
বইটা আসলে কি? কবিতা, বড়গল্প, ছোটগল্প, অনুগল্প, উপন্যাস নাকি প্রবন্ধ! লেখক খোদার নামে কসম করে বলেছেন, বইটি আমি বা আাপনি যানে করি তা। অথবা কিছুই না। প্রচ্ছদ করেছেন রাজীব দত্ত। বইটা হাতে নিলেই মনটা ভালো হয়ে যায় রাজীব দত্তের কল্যানে।
বইটাতে যদি অনেকগুলো ছোটগল্পের সমষ্টি মনে তাহলে গল্পগুলোর নামকরনটা একটু অদ্ভুত লাগে। যেমন, কখনো কোনো গল্পের নাম শুনেছেন "গুঁড়োদুধ, হাওয়াই চপ্পল ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান" অথবা পাখিওয়ালা, পাইনবন ও ক্রিস জেরিকো/ ইটস হেভিলি রেইনিং/ বাবা, কর্নেল এবঙ উলমার বিষয়ক এলিজি/ বিস্কিট রঙের দুপুরে সালমান শাহ'র মৃত্যু/ সলিচিউড পড়তে পড়তে পৃথিবী ধ্বংস/ ইটস অর্গানিক/ শেফালির ভীষন জ্বর/ শেফালি সম্পর্কে আমরা আরও যা যা জানি/ ইসাবেল মিরনের ঘোড়ার রেইনকোট/ ঘাস হইল গিয়া পৃথিবীর কেশ/ আত্নহত্যাকামী মানুষের গন্ধম ফল/ বৃষ্টি হচ্ছে, আমি 'বসো' কে খুঁজে পাচ্ছি না/ আব্বাস কিয়ারোস্তমি এখন গাছ/ মরিবার হলো তার সাধ/ মুম্বাই কা কিং কন/ ফ্রি স্কুল স্টিটে পাবলো এসকোবার/ স্লাভো জিজেকের সুইসাইড ভাবনা/ উই আর অল বাস কন্ডাক্টর/ আরও কিছু গাছ এবং অপ্রকাশিত টোস্ট বিস্কুট সমগ্র/ তুমি লুটপাট হয়ে যাবে/ শহরে নতুন ট্রেন/ আকাশি গাছের নিচে আমি/ সিল মাছের কাঁটা-বিষয়ক জ্ঞানতত্ত্ব/ শেফালিকে তার বাবা খুঁজতেছে/ পাখিরা দাঁত মাজে না এবং অবশেষে শেফালি কি জানে।
আসল কথা হলো নামগুলো আমার চমৎকার লাগলো। হাসনাত শোয়েব ছিলেন দর্শনের শিক্ষার্থী। তার রচনায় ঘুরে ফিরে জীবন, স্বপ্ন, বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ে দর্শন দেখা যায়। লেখাগুলো কিছুটা এলোমেলো ঠেঁকে। কিন্তু না, যতটুকু এলোমেলো মনে হয় লেখাগুলো আসলে ততটাই গুছানো। লাইনগুলার অন্তমিল আর উপমা সুন্দর।
যেমন শেফালি কি জানে গল্পে ছিলো, "ঘামে যে রয়েছে নুন, তার অর্থ সমুদ্রে ছিলাম।"
অথবা উই আর অল বাস কন্ডাক্টরের শেষ কয়টা লাইন, "একদিন তোর বাস আঁকা শেষ হবে। আমরা দুজন সেই বাসের কন্ডাক্টর হব। এটি দূরপাল্লার বাস। আমাদের বাস যাবে পাহাড়ের দিকে। সারি সারি পাম গাছ এবং আনারস ক্ষেত পার হয়ে বাস একদিন পাহাড়ে গিয়ে পৌঁছবে। তখন বাঘ কাঁপানো শীত। আমরা যাত্রী নামাতে নামাতে বলবো- we are all bus conductor- Ticket please"
প্রতিটি মানুষের মৃত্যুতে পৃথিবীর ওজন একটু একটু করে কমে। জন্মে পৃথিবীর ওজন খুব বেশী বৃদ্ধি না পেলেও মৃত্যুতে অনেকটাই কমে যায়। পৃথিবী ভারমুক্ত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজের মধ্যে ভুলেই গিয়েছিলাম মরিতে থাকাটাও জরুরি একটা কাজ।
(মরিবার হলো তার সাধ)
এই বইটাতে আত্নহত্যাবিষয়ক লেখাটি সুন্দর। " "আত্নহত্যা মূলত সুস্বাদু বিস্কুট। মূলত তার ভেতরের ক্রিমটাই বেশী মজার, যেটা চেটে খেতে হয়। আমরা উপরের দুই আস্তরনকে কখনোই বিশ্বাস করি না। আমাদের সব বিশ্বাস ক্রিমের ওপর। সেই ক্রিমের লোভে মানুষ আত্নহত্যা করে। যা বেঁচে থাকা মানুষের বোধগম্যতার উর্ধ্বে এবং বেশীরভাগ মানুষ ভোরবেলা আত্নহত্যা করে। কারন, প্রত্যেকটা ভোরের রয়েছে আত্নহত্যার আলাদা আলাদা নিয়ম"
এর ব্যতিক্রম নাকি ছিলেন আদ্দিওম যে মধ্যরাতে বিস্কুটের উপরের দুটি আস্তরন সরিয়ে ক্রিম চেটে চেটে খেয়েছিলো।
শেফালির যেমন জ্বর হলে টোস্ট বিস্কুট খেতে ইচ্ছা করে, পাখিরাও দাঁত মাজে না। শেফালি পাখি হতে চেয়ে দাঁত মাজা বন্ধ করেছিলো। শেফালি সমাপ্তিতে পাখি হয়োছিলো কিন্তু পৃথিবীর প্রথম টুথব্রাশ আবিস্কার করেছিলো জেলবন্দি এক কয়েদি যার নাম "উইলিয়াম আদ্দিন"।
This entire review has been hidden because of spoilers.
আজকে শেষ করলাম হাসনাত শোয়েবের শেফালি কি জানে বইটা। প্রচ্ছদে যেমন দেখতে পাচ্ছেন মাথামুণ্ডহীন সব চিত্র, বইয়ের বিষয়বস্তুও ঠিক তেমনি। এটা ছোটগল্প নাকি উপন্যাস নাকি গদ্য কবিতা সেটা নির্ণয় করাও কষ্টকর ব্যাপার। বলতে গেলে পুরো বইটাই অ্যাবসার্ড জিনিসে ভরপুর। এখানে মানুষ ডিম পাড়ে, আব্বাস কিয়োরোস্তামি তার নামের গাছের সাথে কথা বলেন, এখানে আত্মহত্যাকে তুলনা করা হয় ক্রিম বিস্কুটের সাথে, পৃথিবী মার্কেজের বই পড়তে পড়তে ধ্বংস হয়, দুনিয়ার সবকিছুই হয়ে যায় একেকটা ঘোড়ার ডিম! কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো এই আজগুবি, আপাত অর্থহীন কথার মাধ্যমে লেখক অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বর্তমান পৃথিবীর মানুষের বিচ্ছিন্নতা, আত্মহত্যা প্রবণতা নিয়ে কথা বলেছেন। আর এগুলা বলতে গিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন বর্তমান পপ কালচার। তাই প্রতিটা পাতায় পাতায় পাই আব্বাস কিয়োরোস্তামি থেকে মনিকা বেলুচ্চি, এলভিস প্রিসলি থেকে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ থেকে টুথপেস্টের আবিষ্কারক উইলিয়াম আদ্দিস, দার্শনিক স্লোভো জাজিক থেকে চিত্রকর মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, গোপাল ভার্মার মুভি থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ফলে বইটা লেখক যেমন বলেছেন শেষ পর্যন্ত কি হিসেবে দাঁড়ায় বা আদৌ দাঁড়ায় কিনা সেটাই নির্ণয় করা দুঃসাধ্য হয়। তারপরও বইটা শেষে একটা রেশ থেকে যায় মনে, মানতেই হয় এমন কিছু তো কোনোদিন পড়িনি!
"এই প্রশ্ন আমার মনকে উদ্বেলিত করেছিলো যে, সাহিত্যে দুঃখকর কাহিনী কেন আনন্দ দেয়-মনে উত্তর এল, চারিদিকের রসহীনতায় আমাদের চৈতন্যে যখন সাড়া থাকে না, তখন আত্মোপলব্ধি ম্লান। আমি যে আমি এইটে খুব করে যাতে উপলব্ধি করায় তাতেই আনন্দ। যখন সামনে বা চারিদিকে এমন কিছু থাকে যা সম্বন্ধে উদাসীন নই, যার উপলব্ধি আমার চৈতন্যকে উদ্বোধিত করে রাখে, তার আস্বাদনে আপনকে নিবিড় করে পাই। এইটার অভাবে অবসাদ। বস্তুত মন নাস্তিত্বের দিকে যতই যায় ততই তার দুঃখ। দুঃখের তীব্র উপলব্ধিও আনন্দকর, কেননা সেটা নিবিড় আস্মিতাসূচক; কেবল অনিষ্টের আশংকা এসে বাধা দেয়। সেই আশংকা না থাকলে দুঃখকে বলতুম সুন্দর। দুঃখ আমাদের স্পষ্ট করে তোলে, আপনার কাছে আপনাকে ঝাপসা হতে দেয় না।" -- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সাড়ে তিন তারা দিতে পারলে ভাল্লাগতো। বইটা ভালো। বিক্ষিপ্ত মনের চিন্তাধারা, অথবা দরকারি কিন্তু নিষিদ্ধ বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এমন আলাপ ঢাকতে বিক্ষিপ্ততার ভাব ধরা। অথবা ভাব ধরা লেখার ভাব ধরা হয়েছে যাতে অভাবিত কিছু সামনে চলে আসে। বইয়ের অংশটুকু ভালো লাগলো, কিন্তু বইয়ের শেষে পাঠক প্রতিক্রিয়া দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়েছি।
বই: শেফালি কি জানে লেখক: হাসনাত শোয়েব #hasnatsoyeb প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৮ প্রকাশনা: চন্দ্রবিন্দু #চন্দ্রবিন্দুপ্রকাশন প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত দাম: ১৮০/- পৃষ্ঠা: ৫৬ (মূল বই) ধরন: অনু চিন্তা/ অনু গল্প
লেখক বইয়ের শুরুতে বলেছেন বইটি আসলে কি ছোট গল্প বা উপন্যাস নাকি অনুগল্প অথবা কবিতা বা আসলে কি উনি জানেন না। আমার কাছে মনে হয়েছে বইটি কিছু অনু চিন্তার সমষ্টি। বইটি পাঠককে একটি ঘোরে নিয়ে যাবে। ঘোরটি হবে হয়তো কোনো পাঠকের কাছে স্বপ্নের বা কারো কাছে হতাশার। পাঠক বইয়ের কোনো চিন্তার ভিতরে যাবার চেষ্টা করলে হয়তো আরো আসক্ত হবেন। লেখার ধরন অসাধারণ। আপনাকে প্রতিটি লাইন ভিতরে টানবে; অনেকটা ব্ল্যাকহোলের মতো। লেখকের চিন্তাগুলো আসলে কিছুটা বাস্তব; আবার কিছুতে অতি বাস্তবতার ছোঁয়া রয়েছে যা আমরা বলতে পারি না, শুধু বুকে চেপে হতাশায় ভুগতে পারে; কিছু চিন্তা সরাসরি বিকল্প বাস্তবতার অংশ, অনেকটা what if ধরনের আর কিছু চিন্তা স্বাপ্নিক।
শেফালি এই বইয়ের একটি চরিত্র যাকে বিভিন্ন চিন্তায় লেখক ফেরত এনেছেন। এই বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়াতে অনেকে বলেছে এটি হয়তো ক্লাসিক হবে। এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। তবে যদি এই চিন্তাগুলোর ডট গুলোকে সংযুক্ত করে চিন্তাগুলোর বিস্তৃতি করে একটি উপন্যাস লিখেন সেটি ক্লাসিক হবার সম্ভাবনা থাকবে বলে আমার মনে হয়। #ধূসরকল্পনা