২০০৮ সালে প্রকাশিত হবার পরপরই মনস্বী পাঠকের দৃষ্টি কেড়েছিল এই বই। তারপর ধীরে ধীরে সেটি বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি সেটি টের পাওয়া গেছে প্রকাশের দশ বছর পর - ২০১৮ সালের একুশের বইমেলায়। এটাই সুমন রহমানের বৈশিষ্ট্য, সময়ের সাথে সাথে ক্রমশই তিনি উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেন। বাংলা গল্পের চালচিত্র বুঝবার জন্য যে অল্প কয়েকটি গ্রন্থের কাছে ভবিষ্যতের পাঠককে ফিরে ফিরে যেতে হবে, সুমন রহমানের “গরিবি অমরতা” নিঃসন্দেহে এর একটি।
জন্ম ১৯৭০ সালে, ভৈরবে। পড়াশোনা করেছেন দর্শনশাস্ত্র, উন্নয়ন অধ্যয়ন ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নে। প্রবন্ধ বেরিয়েছে দেশ-বিদেশের সুপরিচিত জার্নাল ও সাময়িকপত্রে। তাঁর ‘নিরপরাধ ঘুম’ গল্পটি কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় উঠে এসেছে। কমনওয়েলথ পুরস্কারের ইতিহাসে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা তথা ইংরেজি-ভিন্ন যেকোনো ভাষা থেকে এটি প্রথম ঘটনা। সুমন রহমান ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের গণমাধ্যম অধ্যয়ন ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক।
সময়ের সাথে সাথে গল্পকারের বয়ান কি কঠিন হয়ে ওঠে নাকি হয়ে যায় সহজ?
সুমন রহমানের 'গরিবি অমরতা' পড়তে গিয়ে এই প্রশ্নটি মস্তিষ্কে ধাক্কা দেয়। গল্পগুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়, বইটির প্রতিটি পাতায় শব্দের পেছনে গল্পকার স্পষ্ট ও দৃশ্যমান। যেন তিনি চোখ বন্ধ করে পাঠকের কাছে এসে নিজে গল্প বলে যাচ্ছেন। গল্পগুলো পাঠকদের ভালো লাগা বা না লাগায় গল্পকারের কিছু যায় আসে না—একটি নির্লিপ্ততা যেন প্রায় সব গল্পে বিদ্যমান। এছাড়া, 'হন্যে হয়ে শায়লাকে খোঁজা', 'মৃত বাবার সাথে কবরস্থানে এসে গল্প করা' কিংবা 'নয়টা পঞ্চাশ গল্পের সমাপ্তি'—সবখানেই গল্পকারের চিরাচরিত ডার্ক স্যাটায়ারের উপস্থিতি বিদ্যমান।
সুমন রহমানের লেখার যে দিকটি ভালো লাগে, তা হলো তাঁর গল্পগুলো পড়লে মনে হয় নগর জীবনের পাশাপশি উনি আস্ত বাংলাদেশটাকেই শব্দের ক্যানভাসে আঁকতে চলেছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত, গল্পগুলো সামাজিক হলেও কোথাও যেন রূপান্তরিত হয়ে যায় রাজনৈতিক গল্পে।
কিন্তু, প্রায় এক যুগ আগে লেখা এই বইয়ের তুলনায় ২০১৯ সালে প্রকাশিত 'নিরপরাধ ঘুম'-এর সাথে এই বইয়ের তফাৎ দৃশ্যমান। 'নিরপরাধ ঘুম'—মেদহীন, আধুনিক ও প্রাঞ্জল। প্লটগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে বিষয়বস্তুর জন্য শুধু এ দেশেই নয়, বাইরের দেশের পাঠকদেরও নজর কাড়বে। পক্ষান্তরে, 'গরিবি অমরতা'-তে ক্রাফটের মুনশিয়ানা থাকলেও কোথায় যেন একটি অস্পষ্ট অসম্পূর্ণতা রয়েছে।
তবে, এই বইয়ের সেরা গল্প হলো 'ডুমরি'। ছোট্ট এই গল্পটিতে সুমন রহমান অকপটে জাদু দেখিয়েছেন। মহৎ শিল্প সৃষ্টি করতে গেলে সাহিত্যিকের যে কোনো ধর্ম, জাত বা লিঙ্গ থাকে না—এমনই সত্যতা যেন তিনি এখানে প্রমাণ করেছেন।
সমকালীন সময়ে তাঁর আরও গল্প পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম...
(২০২২ সালে এই বই নিয়ে গুডরিডসে রিভিউ লিখেছিলাম। আজ আবার শেয়ার করলাম। আমার মতে, 'গরিবি অমরতা' ও 'নিরপরাধ ঘুম'—এ সময়ের দুর্দান্ত দু'টি গল্প সংকলন।)
আজকে সাড়ে তিনের ভূতে পেয়েছে । এই বইয়ের গল্পগুলো নিঃসন্দেহে ভালো, তবে "নিরপরাধ ঘুম" এর গল্প গুলোর মত আবার অতটা পরিণতও নয়। প্রথম গল্প সংকলন বলেই বোধহয় এমন।
সুমন রহমানের এই গ্রন্থের গল্পগুলো প্রায় সবই নাগরিক। শহরের অলিগলির বিচিত্র সব মানুষজন গল্পগুলোর প্রধান চরিত্র। কিন্তু সব গল্পের চরিত্রগুলোই যেন এক সুতোয় বাঁধা। কেমন নিস্পৃহতা, কেমন নিষ্প্রভতা চালিত করে এদের। একটা বিষয় লক্ষনীয় যে সব গল্পের চরিত্রগুলো উত্তম পুরুষে নিজের কথ্যভাষায় নিজের গল্প বলে, প্রমিত বাংলায় নয়। যার কারণে তাদের চরিত্রগুলোর সাথে সাধারণ পাঠকের যোগাযোগ সহজতর হয়। এমনিতে সুমন রহমানের লেখা সহজে পড়া যায়। অত্যন্ত বেদনাদায়ক গল্পের ভেতরও থাকে হাস্যরস, কৌতুক। কিছু কিছু কথা সত্যিই হাসাতে হাসাতে কলিজা ফুটো করে দেয়। ছলছাতুরে চমৎকারভাবে জীবননান্দের কবিতা এসেছে। বিনয় মজুমদার এসেছে। ইংরেজি শব্দের অধিক ব্যবহার কোথাও কোথাও চোখে লাগে। প্রায় সবগুলো গল্পই ডালপালা ছড়ায় না যতটা ছড়ালে পরিতৃপ্তি পাওয়া যায়। কিছু কিছু গল্পে ধারণ করা হয় ছোট ছোট সময়। কোনো গল্পের দৃশ্যগুলো আসে সময়ের বাউন্ডারি ডিঙিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে। তাই অতৃপ্তি থাকে কিছু। তবে সব গল্পই ভালো। পড়ার মতো। সাতটা গল্পের মধ্যে আমার প্রিয় হয়ে থাকবে শেষ গল্প “বয়স আমার বাড়ে না”। সম্পূর্ণ বই হিসেবে পাঁচে নাম্বার দেব সাড়ে তিন কী পৌনে চার।
ডেঙ্গুচর্চার দিন। বইয়ের প্রথম গল্পপাঠ শেষে রচনার সময়কাল দেখে একটু চমক লাগে — " মার্চ ২০০৫ "। ধারণা ছিল গল্পটা (পাশাপাশি অন্যান্য গল্পগুলো) হয়ত সম্প্রতি বছর তিন/চারেক আগে "শোন ভাই কালিদাসের হেয়ালীর ছন্দ, দরজা আছে হাজারটা তবু কেন বন্ধ" (ধাঁধার) দিনকালে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের অবসরে হবে। নাহলে ডেঙ্গু নিয়ে এমন নির্লিপ্তভাবে চরিত্রদের ভেতর (স্বামী-স্ত্রী) একে অপরকে নি:শেষ করার ভয়ংকর প্ল্যান ফাঁসানো যায় নাকি! সবচে' মনে ধরেছে নামগল্প 'গরিবি অমরতা' ৷ কবিতার খাতা ছিঁড়ে ফেলার চাপা বিক্ষোভের লেলিহান শিখা কি পিতার কবরফলকে জীবনানন্দ দাশের কবিতা হয়ে প্রকাশ পায়? কবরস্থ পিতার সাথে চলতে থাকতে সংসারের নানা দুর্দশার বয়ান আর ধর্ম কাব্য নিয়ে নিত্য বাহাস। শেষের দিকে 'বয়স আমার বড়ে না' গল্পটাও চমৎকার৷ বাকিসব মোটামুটি, চলে যায়!
এই বইটা হয়তো আমি আরো এক-দেড় বা দুই-আড়াই বছর পর আবার পড়বো। তখন দেখবো—আজকে আমি যে গল্পগুলো পড়লাম, যে চমকগুলো পেলাম— দীর্ঘ একটা সময় পর সেগুলো কেমন লাগবে। আমার মনে হয়, আমি তখন দেখবো এই গল্পগুলোকে আমি নতুন করে আবার অন্য আঙ্গিকে জানছি।
প্রথম গল্প 'ডেঙ্গু চর্চার দিন' পড়তে গিয়ে শহীদুল জহিরের 'আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল নেই কেন' গল্পটার কথা মনে পড়ছিলো। সবগুলো গল্পের মধ্যে আমার মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে নাম গল্প 'গরিবি অমরতা', যেখানে মৃত বাবাকে দুর্দশাগ্রস্ত পৃথিবীর জঞ্জালে আটকে রাখে এক যুবক। দেয় এক গরিবি অমরতা। যেখানে কবরেও দু দণ্ড মুক্তি নেই। একেকবার আমার মনে হয়, সেই যে বাবা কবিতার খাতা ছিঁড়ে ফেলে তাকে পৃথিবীর জঞ্জালে আটকে দিতে চেয়েছিলো—তার প্রতিশোধ নয় তো? তারপর এক ভিখারিনীর মমতা, প্রেম আর ছলনার গল্প 'ডুমরি', যার গরিবি জীবন দর্শনে নাম কেবলই একটা খোলস।
এই বইয়ের সাতটা গল্পের প্রতিটা গল্পই কী এক সহজিয়া বিপন্নতার উপর দাঁড়িয়ে! ডার্ক একটা ব্যাপার আছে। আবার প্রায় সবগুলো গল্পেই যেন 'গরিবি অমরতা' নামের ছাপ। এই একটা নাম বিশ্লেষণ করতে হলেও বোধহয় আমার আরো সময় দরকার, আরো ভাবনা দরকার।
এই গল্পগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, বেশিরভাগ গল্পের ভাষাটা অপ্রমিত। তাই পড়তে আলাদা একটা আরাম আছে। কিন্তু সেই আরামে টুকটাক ব্যাঘাত ঘটেছে কিছু জায়গায় প্রমিত ঢুকে যাওয়াতে। ওভারঅল, ছোটগল্পের সাথে আমার এই জার্নিটা অন্যরকম ছিলো। নতুন পরিচয়ের মতোন।
আলোচ্য গল্পগ্রন্থের অধিকাংশ লেখাই ২০০৫-০৭ সালের মধ্যে লেখা, পেশায় শিক্ষক সুমন রহমান নাগরিক জীবনকে তুলে ধরেছেন নিজস্ব ঢঙ্গে।
শুরুতে গল্পলেখার সময়কাল উল্লেখ করেছি কি কারণে পাঠক তা পড়া শুরু করলেই হাড়ে হাড়ে টের পাবে। আহ কত্ত বাস্তব অনুভব হয়েছে গোটা সাতেক গল্প, অথচ কত্ত আগের। অস্কার ওয়াইল্ড যেমনটি বলছেন, Literature (art) always anticipates life. It does not copy it, but molds it to its purpose. অর্থাৎ সাহিত্য বস্তুগত বাস্তবতার নিরিখেই একটা নিজস্ব বায়বীয় বাস্তবতা সৃষ্টি করে। জীবন যেমন এখানে নির্মিতির অংশ হয়ে ওঠে, তেমন নির্মিতি হয়ে ওঠে জীবনের অংশ।
প্রথম গল্পের শিরোনাম 'ডেঙ্গু চর্চার দিন'। সাধারণ একটা 'সুখী' পরিবার। বউ-জামাই চাকরি করে, বিকেল বেলায় বাসার ফিরে, বারান্দায় একটা ফুলের টব আছে, যেখানে তারা হাজি মহসিনের মতো জলদান করে। অর্থাৎ একদম পাঠ্যবইয়ের মতো একটা পরিবার। কিন্তু এইদিকে শহর চলে যায় ডেঙ্গুদের দখলে আর এই পরিবারের মধ্যেই বোনা হতে থাকে ভয়ঙ্কর এক গল্প।
এরপরের গল্প 'শায়লার দিকে যাওয়ার', বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার এক কর্মী তার মনপাখি শায়লা খুঁজে বেড়াচ্ছে আর দেশের দারিদ্র বিমোচনে বিদেশী ত্রানের টাকায় নানা জরিপ করে বেড়াচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সজনীকে কি আমাদের মূল চরিত্র খুঁজে পাবে? লেখকের ভাষায়, "একবার যদি তুমি এই শহরে কাউরে হারায়া ফেল, বাকি জীবনভর খোঁজাখুঁজি কইরা তারে পাওয়ার সম্ভাবনা ১৪ শতাংশ মাত্র।" এই গল্পে লেখক এত মিষ্টি করে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর ধান্দাবাজিকে ধুয়েছেন। আহ কি বলব!
বাপ সারাজীবনভর খাটতে খাটতে একসময় মরে যায়, আর তার একমাত্র কাব্যপ্রেমিক ব্যর্থপোলা সেই কবরের ফলকেই ঝুলিয়ে দেয় জীবনানন্দ দাশের একখানা কবিতা। কিন্তু কবরের সামনে কোরান শরিফের সুরা বদলে জীবনান্দ দাশের কবিতা? কেমন কি? এইদিকে এলাকার মুসল্লিরাও তা মেনে নেয়। এই নিয়েই নামগল্প গরিবি অমরতা'।
মাঝখানের আরো তিনটা গল্প তেমন একটা ভালো লাগেনি। এই খারাপ লাগাটা পুষিয়ে দিয়েছে শেষ গল্প 'বয়স আমার বাড়ে না'। ঢাকার বস্তি নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও সুমন রহমান এখানে একটু ভিন্ন স্বাদ যুক্ত করেছেন। গত তত্ত্বাবধারক সরকারের আমল, সুবিধাবাদী রাজনীতিক আর ক্রসফায়ার প্রিয় র্যাব। এইসব কিছু ছাপিয়ে এক কিশোর আক্রান্ত হয় হানুফা নামক এক নারীর প্রেমে। আর এখানে জন্ম নেয় অসাধারণ এই গল্পটি।
সুমন রহমান যাদের কথা লিখেছেন, তাদের ভাষাই ব্যবহার করেছেন। যদিও বইজুড়ে টুকটাক কিছু অসংলগ্নতা ছিল। যেমন কথক কথা বলছে, যাইতেছি, খাইতেছি,শুইতেছি ইত্যাদি ব্যবহার করে। আর সেই একই গল্পকথক মনে মনে চিন্তা করছে শুদ্ধ অনেকটা বাংলা একাডেমির বাংলায়। কেমন জানি অদ্ভুত!
তবে সবকিছু ছাপিয়ে তার লেখার মধ্যে পাঠক যে 'ঠান্ডা হিউমার' খুঁজে পাবে, তাই সত্যিই মনে সুখ দেয়। বিশেষ করে 'শায়লার দিকে যাওয়া' গল্পটা হাসাতে হাসাতে অনেক ভাবিয়েছে।
সুমন রহমানের গল্পগ্রন্থ দুইটা যারা পড়েছেন তাদের সবাইকে ‘নিরপরাধ ঘুম’কে ‘গরিবি অমরতা’ থেকে এগিয়ে রাখতে দেখেছি। আমি দুইটাকে পাশাপাশি রাখলাম। ‘গরিবি অমরতা’র সবগুলো গল্পই ভালো লেগেছে। বেশি ভালো লেগেছে এ তিনটা—‘শায়লার দিকে যাওয়া’, ‘গরিবি অমরতা’ ও ‘নয়টা পঞ্চাশ’। প্রমিত আর অপ্রমিত মিলিয়ে যে গদ্যভাষায় সুমন রহমান গল্প বললেন, এ গল্পগ্রন্থ এত ভালো লাগার এটা বড় এক কারণ।
পেশায় শিক্ষক সুমন রহমানের গোটাসাতেক ছোট গল্প নিয়ে এই বই।সবগুলো গল্পই নাগরিক জীবনকে ঘিরে।
প্রথম গল্প "ডেঙ্গুচর্চার দিন" ঢাকায় সেই সোনালি সময়ে নিয়ে যখন পুরো ঢাকা ডেঙ্গু মশাদের দখলে গিয়েছিল। গল্পের কথল আরদশটা ভেতো গৃহী মানুষের মতোই। যার কাছে আপনার বউয়ের চে' প্রতিবেশীর বউ বরবরের মতোই ঢের রূপবতী। যে ঘরের বউয়ের থেকে নিস্তার পেতে সদাউন্মুখ। তাই প্রতিদিন বারান্দায় ফুলের টবে দাতা কর্ণ না হোক নিদেনপক্ষে হাজি মহসীনের মতো জল দান করে যায়। উদ্দেশ্য যদি ডেঙ্গুর কবলে পড়া যায় অন্য উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। গল্পটি ইদানীংকালের চিকুনগুনিয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। ডেঙ্গুর বদলে চিকুনগুনিয়া লিখে দিব্যি চালিয়ে দেয়া যাবে
"শায়লার দিকে যাওয়া" গল্পটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার এক দেশি চাকুরে যে নিজ দেশে দারিদ্র নিয়ে জরিপে সহায়তা করছে এবং নানা কাল্পনিক প্রক্ষাপটে খুঁজে বেড়াচ্ছে নিজ প্রাণসজনী শায়লাকে। এই গল্পটি সংকলনের সেরা গল্প মনে হয়েছে আমার কাছে।একদিকে যেমন বাংলাদেশের মতো একটি তথাকথিত উন্নয়নশীল দেশে কিছুদিন পরপরই ধনবান দেশের টাকাও এনজিওগুলো জরিপের নামে নিজস্ব ধান্দাবাজির কথা লিখেছেন। আরেকদিকে কাহিনী এগিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নানা সুখস্মৃতির নায়িকা শায়লাকে আবার জীবনপথে ভিন্ন কোনো খাতে ভিন্নভাবে খুঁজে পাওয়ার অতৃপ্ত ইচ্ছাকে নিয়ে। খুব কায়দামতো গল্পটা ফেঁদেছেন সুমন রহমান। খুব সাদামাটা প্লট, অথচ অনেক কাছের মনে হয়েছে।
বাবা খেটে মরছে। কিন্তু ছেলে কাব্য লিখে দুনিয়া উদ্ধার করছে বলে পিতার ধারণা। পুত্রের মতে, কাব্য তো সব জীবনানন্দ লিখেই গেছেন।সেই পিতা একদিন হঠাৎ হারিয়ে গেলেন।তারপর? এই নিয়েই নামগল্প "গরিবি অমরতা"।
"নয়টা পঞ্চাশ", "ডুমরি" কিংবা "মনোগ্যামির ভূত" ততটা মন ছাপ ফেলেনি, যতটা ভালো লেগেছে বইয়ের শেষ গল্প "বয়স আমার বাড়ে না"। ঢাকার বস্তি,বস্তিবাসী আর বস্তিদখল এসবই পুরাতন কনসেপ্ট। বিস্তর বাংলা সিনেমা হয়েছে এই নিয়ে, সাহিত্যও কম হয়নি। তাই সুমন রহমানের একই কনসেপ্টে লেখায় আলাদা কিছু ছিল না। তবে গত তত্ত্বাবধারক সরকারের সময়ে রাজনীতির পায়রার খোপে ঢুকে যাওয়া, স্থানীয় ক্ষমতাশালীদের ঝিম মেরে থাকা আর র্যাবের ক্রসফায়ারের গল্প ছাপিয়ে গেছে এক কিশোরের হানুফার ভালোবাসায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। কিন্তু কিশোর কেন বলছে "বয়স আমার বাড়ে না"। বয়স বাড়লে সে কী করবে?
সুমন রহমানের লেখালেখির সাথে পরিচয় দেশের কাটতিসমৃদ্ধ এক দৈনিকের মাধ্যমে। দুই, চারটি লেখা পড়ার সুযোগ হয়েছিল আগে। তাও গল্প নয়, কলামগন্ধী লেখা। জনাব সুমন রহমান কংক্রিটের নগরের নাগরিকদের গল্প বলেন। কলম হাতে নিলে সবাই চায় নিজস্ব প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে। গল্পকার সুমন রহমানও চেয়েছেন হয়তো। তবে সবিনয় নিবেদনে বলছি তাঁর লেখায় আলাদা কোনো ধরন আমার চোখে পড়েনি ; এমন কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য সারাবইতে আমি পাইনি যে কারণে তাঁর লেখার কথা বইশেষে আমার মাথায় থাকবে।গল্পের কথক কথা বলছে সাধারণ লোকের ভাষায় অর্থাৎ যাইতেছি, খাইতেছি,শুইতেছি ইত্যাদি। আর সেই একই গল্পকথক মনে মনে চিন্তা করছে শুদ্ধ অনেকটা বাংলা একাডেমির বাংলায়- এটা আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে। তবে গল্পের প্লটগুলো নিঃসন্দেহে ভালো। বিশেষ করে, "শায়লার দিকে যাওয়া" গল্পটির কথা অনেকদিন মাথায় থাকবে।