ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠিত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো কিন্তু ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মত নয়। তার অন্যতম কারণ ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব এবং বিকাশের শর্ত এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব এবং বিকাশের শর্ত ভিন্ন। তাই, শুধু ইউরোপ এবং আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশের ইতিহাসের মধ্যদিয়ে যেমন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র বুঝা যাবে না, ঠিক তেমনি, সে ইতিহাস উপেক্ষা করেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট বুঝা যাবে না। তাই, এই বইয়ে ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সাথে বাংলাদেশ-ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। একই সাথে আলোচনা হয়েছে কিভাবে আমাদের দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক এবং জ্ঞানজাগতিক কাঠামো ঔপনিবেশিক। শুধু তা-ই নয়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত বিষয়াদিও ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত। এই শিক্ষা যেহেতু ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা এবং ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত, তাই এখানকার সমস্যা সমাধানে যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাকেই দৃষ্টিগোচর হতে দেয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস আমাদের সমস্যা চিহ্নায়ন করতে সহায়তা করলেও অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম নয় । তার জন্য প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দার্শনিক আলোচনার, প্রয়োজন জ্ঞানের বিকাশের চরিত্র বুঝার। বাংলায় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দার্শনিক গ্রন্থ নেই। ইংরেজীতেও খুবই কম। কিন্তু যে কয়েকটি রয়েছে সব গুলোই অত্যন্ত প্রতাপশালী। বড় দাগে তিন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব রয়েছে- ভিলহ্লেম হামবোল্ডট, জন হেরী নিউমেন এবং ক্লার্ক কের লেখায় এই তিন ধরনের প্রস্তাব উঠে এসেছে। এই বইটিতে দেখানো হয়েছে তাদের কারো প্রস্তাব আমাদের জ্ঞানজগতিক বন্ধ্যাত্ব প্রতিকারের জন্য উপযুক্ত নয়। আমাদের সমস্যা এবং প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে- যার নাম দেয়া হয়েছে -‘বিউপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয়’।
সৈয়দ নিজার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক। তার দর্শন পাঠ ও চর্চার হাতেখড়ি ঢাকায় থাকা অবস্থায় হলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানে তিনি যৌথভাবে স্নাতক। পরবর্তীতে, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে তিনি গাণিতিক যুক্তিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন নিউজিল্যান্ডের ক্যান্টারবেরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার গবেষণার বিষয় ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন যুক্তিতত্ত্ব ‘চতুষ্কোটি’। সৈয়দ নিজার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। ক্যান্টারবেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ৬ মাস ভিজিটিং স্কলার পদে ছিলেন। তার গবেষণা-কর্ম বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বহুমাত্রিক তার গবেষণার বিষয়। তিনি গবেষণা করেছেন যুক্তিবিদ্যা, ভাষাদর্শন, নন্দনতত্ত্ব এবং বিউপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ে। বিউপনিবেশিত জ্ঞানকাণ্ড নির্মাণ তার অন্যতম দার্শনিক প্রকল্প । তিনি ‘বিউপনিবেশিত জ্ঞানকাণ্ড নির্মাণ' প্রকল্পকে একটি আন্দোলনে পরিণত করার চেষ্টা করছেন। বিগত কয়েক বছরে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ-বিষয়ে তিনি বক্তৃতা করেছেন। ২০১৫-২০১৬ সালে তিনি বাংলাদেশের ভাষা-শিল্প-সাহিত্য-দর্শন-বিজ্ঞানের রূপরেখা নিয়ে ‘বাংলাদেশের বিউপনিবেশায়ন তত্ত্ব' শীর্ষক বক্তৃতামালার আয়োজন করেন। ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তার গবেষণাগ্রন্থ: 'ভারতশিল্পের বিউপনিবেশায়ন ও সুলতানের বিউপনিবেশায়ন ভাবনা' (২০১৭) ও 'বিশ্ববিদ্যালয়: উদ্ভব, বিকাশ ও বিউপনিবেশায়ন' (২০১৮)।
ক. ‘...যে প্রতিষ্ঠান মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাবে, তার প্রশিক্ষণকেন্দ্রিক হবে না।‘ মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানো—আরো সুসংজ্ঞায়িত করা যেত কি?
খ. "উনিশ শতকের গোড়ায় ইউরোপে গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবির্ভাব হয়। আজকাল এই সকল বিশ্ববিদ্যালয় কে অবশ্য আধুনিক বা ‘দ্বিতীয় প্রজন্ম‘-র বিশ্ববিদ্যালয় বলা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে মাতৃভাষায় পাঠদান এবং গবেষণা করা হয়ে থাকে। সে কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলো জাতির রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।" (পৃ. ২৯)
গ. সার্বিক জ্ঞান (Universal Knowledge) বিষয়টি আসলে কী?
ঘ. বহুশৃঙ্খল বা বহুবিভাগীয় (multidiscipline) গবেষণার সপক্ষে বলতে গিয়ে নিজার বলেছেন প্লাতোনের মতো জ্ঞানের বিভাগভিত্তিক বিভাজন না করে পদ্ধতিগত বিভাজন করতে। এই ‘পদ্ধতিগত‘ বিভাজন আসলে কী?
ঙ. ‘আমরা কি গাণিতিকভাবে প্রমাণ করতে পারব ‘অখণ্ডসংখ্যা অসীম‘? গণিতের ছাত্র তো দূরের কথা, গণিতের অনেক শিক্ষকের জন্যও তা কষ্টসাধ্য‘—এটা দিয়ে কী বোঝাতে চাইলেন তিনি?
এছাড়া মিশেল ফুকো সহ কয়েকজনের উক্তি ঠিক বুঝি নি।
এক নিজার-শিষ্য বললেন, নিজার একটা বৃহত্তর বই লিখছেন বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। পড়ার অপেক্ষায়।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলান প্রকৃতার্থে কতটুকু "বিশ্ববিদ্যালয়" হয়ে উঠতে পারছে? নাকি পারে নাই? শুধু চাকরির প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদানে কিছুটা সাহায্য করাই কি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ? নাকি সেটা আরো অন্য কিছু? দেশ-জাতি-সমাজের অগ্রযাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কিরূপ? এই ধরণের খুবই স্বাভাবিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই পড়তে হবে। লেখক আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান অনুৎপাদনশীলতার কারণ তুলে ধরছেন, সমাধানের পথ দেখানোর চেষ্টা করছেন এই অন্ধকার থেকে; এই বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তর আলাপ হওন জরুরী।
সৈয়দ নিজার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক তার বইটিতে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপত্তি এবং সেই সময়কার উদ্দেশ্যের সঙ্গে বর্তমান উদ্দেশ্যের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য তুলে ধরেছেন। আলোচনা করেছেন উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঠামো এবং সেগুলোর সাথে তুলনা করেছেন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে। ঠিক কোন কোন জায়গায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা এবং গবেষণা পিছিয়ে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন এই লেখক।
যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব ও বিকাশ নিয়েই পুরো বইটিতে আলোচনা করা হয়েছে; 'বিউপনিবেশায়ন' অংশের জন্য বরাদ্দকৃত অল্প ক'টা পাতা কেবল আফসোসই বাড়িয়েছে। অথচ ঐ অংশটুকুর ব্যাপারেই সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলাম। লেখক বিউপনিবেশায়নের কেবল একটা রূপরেখা দিয়েই বইটি হঠাৎ করে শেষ করে দিলেন। তবে বাকি অংশটুকুর অসাধারণত্বের জন্য বইটির চার তারকা প্রাপ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় কি ভবিষ্যৎ চাকুরি লাভের জন্য প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নাকি নতুন জ্ঞান অন্বেষণ করার উপযুক্ত স্থান? উত্তর দ্বিতীয়টা হওয়া উচিত হলেও প্রথমটাই সর্বত্র কার্যকর হয়ে আছে। এ কারণে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো শুধুমাত্র চাকুরীজীবী উৎপাদন করে আসছে।
চাকুরীজীবী উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে কীভাবে নতুন জ্ঞান সংযোজন করা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন বিউপনিবেশায়ন প্রয়োজন সে সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর বইটি পাঠ প্রয়োজন বলে মনে করছি।
বইয়ের শিরোনাম দেখে একটু বেশিই গুরুগম্ভীর ও ভারী মনে হলেও খুব প্রাঞ্জল ও আগ্রহজাগানীয়া ছিলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও এর উদ্দেশ্য কি কিংবা স্কুল, কলেজের সাথে এর পার্থক্য কোথায় এই বিষয়টা নিয়ে খুব সংক্ষেপেই খুব ইন্টারেস্টিং আলোচনা ছিলো। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে জ্ঞানবিকাশের চেয়ে সার্বিক জ্ঞান লাভের কেন্দ্র হিসেবেই কাজ করছে এই বিষয়টা নিয়ে আরো আলোচনা করা যেত। যেকোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিংবা পড়তে ইচ্ছুকদের জন্য বইটি সাজেস্টেড।
বইটা পড়া উচিত সবার | এই উপমহাদেশে উপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে কি হয় এবং কেন, তা জানতে পারবেন | আর বাংলাদেশে যেখানে কতৃপক্ষ হাজার রুলের মাঝে রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তির শিক্ষা দিতে চায় সেখানে একসাথে এতকিছু নিতে গিয়ে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী হয়ত হয় রোবট, আর হয় কেউ সিস্টেমের বলি | বাকি যারা বাচঁতে চায় তারা বিদেশ চলে যায় | যেখানে শিক্ষার আলো আসে রাজনীতি আর ব্যাবসা বানিজ্যর ফিল্টারে, সেখানে আর কি আশা করা যায় |