আত্মজীবনী কেন পড়ি? একজন মানুষ যা যাপন করলেন নিজের দেশ-কাল-সন্ততির মাঝে, রূপকে নয়, সরাসরি নিজের নিত্যবস্তু আর প্রাণে, সেই অভিজ্ঞতা নিতে। দ্বিজেন শর্মার 'জীবনস্মৃতি : মধুময় পৃথিবীর ধুলি' পাঠান্তে কেমন এক শান্ত সমাহিত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ভিতর থেকে। এই মানুষটি নানান কারণে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গাছপালা নিয়ে এরকম মগ্ন জীবন আমাদের মাঝে আর কে কাটিয়েছেন? পৃথিবীর যে প্রান্তে গেছেন, থাকতে চেয়েছেন বৃক্ষের সঙ্গে। এজন্যই হয়ত তিনি বৃক্ষের মতো নির্বিকার, সাতচল্লিশের দিনগুলোতে, ৭১ সনে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এক খৃষ্টান পল্লীতে লুকিয়ে থাকার সময়েও মজে আছেন প্রকৃতির স্নিগ্ধতায়--অথচ প্রাণ ওষ্ঠাগত, স্ত্রী-সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন, জীবন হাতে নিয়ে দেশত্যাগ করছেন তবু পৃথিবীকে দেখছেন অবাক চোখে! আর যা মেলে, সোভিয়েত রাশিয়ায় কাটানো তার অনুবাদক জীবনের আনন্দ-হতাশা, স্মৃতি ও পরবর্তিকালের নষ্টালজিয়া। তিনটি দেশ ভেঙে পড়ার সাক্ষী এই মানুষটি, এবং মনে হয় যে তার বেদনার অধিক জায়গা দখল করে নিয়েছিল শেষোক্ত ভাঙন--সোভিয়েত রাশিয়ার পতন। কমিউনিজমের প্রতি অন্ধ আনুগত্য তার ছিল না, সমালোচনা ও শ্রদ্ধার মিশ্রণেই এই সমাজ কাঠামোকে তিনি ভালোবেসেছেন। দেশে প্রত্যাবর্তনের পরেও বারবার তাই মস্কোতে ফিরেছেন সে দেশকে দেখতে। এছাড়া বাংলাদেশ, এর শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে তার কিছু মন্তব্য বিশ্লেষণ গুরুত্ববহ মনে হয়েছে। এসব ছাড়া বইটি কেমন? এত মোহনীয় গদ্য, নরম করে যেন জড়িয়ে ধরে, শোনা কথায় যেমন শুনেছি মানুষ হিসেবে যেমন মোলায়েম ও ধ্যানী ছিলেন, তার গল্প করবার ধরণটিও সেরকম, অবিকল। এ বই কি অবশ্যপাঠ্য? জীবন আর প্রকৃতি নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে, এ বই তারা আদতে গিলবেন।