'পালামৌ' একটা ছোটখাট স্মৃতিচারণমূলক ভ্রমণ কাহিনী !
কিছু কিছু জায়গার লেখকের প্রকৃতির বর্ণনা এবং সেটাকে জীবনের নানান কোণ থেকে মিলিয়ে দেখাতে পারা - রীতিমতো দূর্দান্ত লেগেছে! যেমন, এক জায়গায় রুক্ষ মৃত্তিকাশূন্য পাথরের ফাঁকে বেড়ে উঠা অশ্বত্থগাছ দেখে উনি লিখেছেন, "তখন মনে হইয়াছিল, অশ্বত্থবৃক্ষ বড় রসিক, এই নীরস পাষাণ হইতেও রস গ্রহণ করিতেছে। কিছু কাল পরে আর একদিন এই অশ্বত্থগাছ আমার মনে পড়িয়াছিল, তখন ভাবিয়াছিলাম বৃক্ষটি বড় শোষক, ইহার নিকট নীরস পাষাণেরও নিস্তার নাই। এখন বোধহয় অশ্বত্থগাছটি আপন অবস্থানুরূপ কার্য্য করিতেছে; সকল বৃক্ষই যে বাঙ্গালার রসপূর্ণ কোমল ভূমিতে জন্মগ্রহণ করিয়া বিনা কষ্টে কাল যাপন করিবে, এমত সম্ভব নহে। যাহার ভাগ্যে কঠিন পাষাণ, পাষাণই তাহার অবলম্বন।"
তবে উনার লেখা পড়ে, মোটা দাগে ,মানুষ হিসেবে তরুণ বয়েসের সঞ্জীব চন্দ্রকে আমার পছন্দ হয় নি। তরুণ সঞ্জীবকে দাম্ভিক, নাকউঁচু বর্ণবাদী মনে হয়েছে। যেমন একজায়গায় তিনি লিখেছেন, "যে সকল কোল কলিকাতা আইসে বা চা-বাগানে যায়, তাহাদের মধ্যে আমি কাহাকেও রূপবান্ দেখি নাই; বরং অতি কুৎসিত বলিয়া বোধ করিয়াছি।"... পরে অবশ্য এই বলে সান্তনা দিয়েছেন যে 'কোল' নৃ-গোষ্ঠী র মানুষেরা বনে তাদের নিজেদের এলাকাতেই সুন্দর দেখায়... বন্যেরা বনে সুন্দর!! আবার আরেক জায়গায় লিখেছেন, "যে সকল ব্যক্তিরা তথায় বাস করে, তাহারা জঙ্গলী, কুৎসিত, কদাকার জানওয়ার, তাহাদের পরিচয় লেখা বৃথা।" কী অদ্ভুত মানসিকতা !!!
সাথে উনি আবার ঔপনিবেশিকদের পক্ষ নিয়েও সাফাই গেয়েছেন, " মৌরিনামক আদিম জাতি বলিষ্ঠ, বুদ্ধিমান্, কর্ম্মঠ বলিয়া পরিচিত, ... মৌরি দুর্ব্বল নহে ... তথাপি এ জাতি লোপ পায় কেন? তুমি বলিবে সাহেবদের অত্যাচারে? তাহা কদাচ নহে, ক্যানেডার অধিবাসী সম্বন্ধে সাহেবরা কতই যত্ন করিয়াছিলেন, কিছুতেই তাহাদের কুলক্ষয় রক্ষা করিতে পারেন নাই।" বোঝা যায় বৃটিশ সরকারের তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর, বিহারের পালামৌ তে ডেপুটি মেজিস্ট্র্যাট হিসাবে যোগ্য উত্তরসূরিকেই পাঠিয়েছিলেন। যদিও জানা যায়, কর্মজীবনে শেষ পর্যন্ত খুব একটা বনিবনা হয়নি উনার !!
তবে সবচে হৃদয়বিদারক ছিলো, একদিন এই ভদ্রলোক তাবুর ভেতরে 'সাহেবী ঢঙ্গে কুক্কুরী লইয়া ক্রীড়া' করবার সময় বাইরে থেকে একজন উনাকে “খাঁ সাহেব" বলে ডাকায় উনি অপমানিত বোধ করে কিছু না দেখেই “হারামজাদ্” “বদ্জাত” বলে তাড়িয়ে দেন। কারণ, "আমাকে “খাঁ সাহেব” বলিয়াছে, বরং “খাঁ বাহাদুর” বলিলে কতক সহ্য করিতে পারিতাম, ভাবিতাম, হয়তো লোকটা আমাকে মুছলমান বিবেচনা করিয়াছে, কিন্তু পদের অগৌরব করে নাই।" !!! ঘটনা এইখানে শেষ হলেও হয়ে যেত হয়তো , কিন্তু কিছুক্ষণ পর উনার তাবুতে এক বিপদ্গ্রস্থ বৃদ্ধ ও অল্প বয়স্কা মেয়ে এলে ডেপুটি মেজিস্ট্র্যাট সাহেব বললেন, "আমি অনিমেষ লোচনে সুন্দরী দেখিতে লাগিলাম; কেন আসিয়াছে, কোথায় বাড়ী, এ কথা তখন মনে আসিল না। আমি কেবল তাহার রূপ দেখিতে লাগিলাম"। কিন্তু যেই মুহূর্তে জানলেন এই বৃদ্ধই তাকে “খাঁ সাহেব" বলে ডেকেছিলেন সাথে সাথে চিৎকার করে তাড়িয়ে দিলেন কিছু না শুনেই। পরে জানা গিয়েছিলো ওই দুই হতভাগ্য, জংগলে তাদের সব সঙ্গী সাথী মারা যাওয়ায় এবং সব টাকা পয়সা সব শেষ হয়ে যাওয়ায়, দুইদিন না খাওয়া অবস্থায় খানিকটা সাহায্যের জন্য এসছিলো, আর উনি কিছু না শুনেই তাদের তাড়িয়ে দিয়েছেন। দিনকয়েক পর সেই মেয়ের মারা যাবার খবর পাওয়া যায়।
তবে একটাই বলবার মত জায়গা, যে লেখক এখানে ভালো মানুষ সাজার চেস্টা করেননি। যা ঘটেছে তাই বর্ননা করেছেন এবং পরবর্তী জীবনে সে কৃত কর্মের জন্য অল্প বিস্তর অনুতাপের কথা জানিয়েছেন।
সাহিত্যরসিকদের মাঝে এই বইকে নিয়ে একধরনের মুগ্ধতার আঁচ টের পাওয়া যায় ,বলা হয়ে থাকে,এটা বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল ভ্রমণ কাহিনী। তবে প্রায় দেড়শো বছর আগের এই লেখা পড়তে গিয়ে অন্তত আমি সেই ঘোর লাগা মুগ্ধতা অনেক জায়গাতেই ধরে রাখতে পারি নি ।
লেখা শুরু করবার সময় তিন তারা দিয়ে শুরু করেছিলাম । লেখা শেষ করতে করতে বিরক্ত হয়ে এক তারায় ঠেকলাম !!