‘আমি গুপ্তচর, তুমি গুপ্তচর’-এ ধরণের লুকোচুরি খেলা বহুদিন যাবত পৃথিবী জুড়ে চলছে। পাতলা বা অকিঞ্চিৎকর’ আবরণে সত্য পরিচয় ঢেকে রেখে গুপ্তচরবৃত্তি চালানো ইন্টেলিজেন্স জগতে বহুল আলোচিত একটি পদ্ধতি, যদিও এ ‘ঢেকে রাখা স্বীকৃত নৈতিকতার মানদণ্ডে বড় ধরণের প্রশ্নসাপেক্ষ কোনো ব্যাপার নয়। অন্যদেশের গুপ্তচর নিজদেশে প্রায় থোলাখুলিভাবে শুধু যৎকিঞ্চিৎ পাতলা আবরণের’ (Cover, কূটনৈতিক পরিচয়) আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তিতে নিয়োজিত থাকে। কিন্তু যখনই ঐ ‘পাতলা আবরণটি খসে যায় তখন নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, সে গ্রেপ্তার হতে চলেছে। সকলের মনেই একটি মৌলিক প্রশ্ন জাগতে পারে “গুপ্তচর কেন?” এ ক্ষেত্রে সহজ স্বাভাবিক উত্তর হচ্ছে “টিকে থাকার জন্য”। ক। প্রাচীন যুগে গুপ্তচরবৃত্তি (Spies in Ancient Times) টিকে থাকার সগ্রাম, পৃথিবীতে প্রাণ বা জীবন উদ্ভবের দিনের মতোই পুরানো। প্রাচীন প্রস্তর, লৌহ ও তাম্র যুগে আমরা পাথর ও ধাতব অস্ত্রের সন্ধান পাই। এ সব অস্ত্র-শস্ত্র শুধু খাদ্য সংগ্রহের জন্য নয় বরং হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ ও পরবর্তীতে সহযোগী মানুষের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে। টিকে থাকার সংগ্রাম শুধু অস্ত্রের গুণগত মান ও তার ব্যবহারের প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল ছিল না বরং শত্রুর চরিত্র সম্পর্কে জ্ঞানের ওপর অর্থাৎ কখন, কোথায় এবং কিভাবে শত্রু আক্রমণ চালাবে এ সমস্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হয়েছে। এ ধরণের তথ্য সগ্রহের উপর টিকে থাকা ও বিজয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং তথ্যের অভাব ও দুস্প্রাপ্যতা পরাজয় ও মৃত্যু ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট। সুতরাং টিকে থাকার এ সংগ্রামে কিছু লোক নিজেদের তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করলাম যারা ‘জাসুস’ (Spy) অর্থাৎ ‘গুপ্তচর’ হিসেবে পরিচিত। এ পদ্ধতি ধীরে ধীরে উন্নতি লাভ করে এবং বর্তমানে যাকে আমরা এসপায়োনেজ’ বলে জানি সে অভিধায় ভূষিত হয়। প্রাচীন ভারতীয় পুঁথিপত্রেও গুপ্তচরবৃত্তির বিভিন্ন কাহিনীর উপস্থিতি লক্ষণীয়। মনুর’ চরিতাবিধানে এ ব্যাপারে স্পষ্ট উল্লেখ্য যে, “রাজা বা শাসনকর্তা অবশ্যই নিজদেশে ও তার শত্রুদেশে গুপ্তচরের মাধ্যমে খবরাখবর সংগ্রহ করবেন।” বেদ, মহাভারত, রামায়ণেও এরূপ বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়; রামায়ণে বিদেশি দেশগুলোয় গুপ্তচর মারফত লক্ষ্য রাখার জন্য বলা হয়েছে। দ্রুপ মহাভারতে দুর্যোধনের গুপ্তচরবৃত্তির উদাহরণ
ভারতীয় সাংবাদিক ‘অশোক রায়না’র অতি তথ্যবহুল বই ‘ইনসাড র’। এটি অনুবাদ করেছেন বাংলাদেশের আরেক সাংবাদিক ‘আবু রূশদ’। যিনি ‘বাংলাদেশে র’ বইটিরও লেখক। আমি সেই বইয়েরও রিভিউ করেছি। ইচ্ছে হলে গ্রুপে সার্চ করে পড়তে পারেন।
পৃথিবীতে বিখ্যাত যতসব গোয়েন্দা সংস্থা আছে তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে RAW অর্থাৎ রিসার্চ এ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং। এই সংস্থাটি মূলত এশিয়ার বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও চীনে প্রচুর ভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছে। কিন্তু এই সংস্থার কাজটা আসলে? প্রথম এবং প্রধান কাজ হচ্ছে অন্য দেশের ভিতর থেকে তথ্য সংগ্রহ করা। দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে বহিঃআক্রমন ঠেকানো। অথবা নিজেরাই নানা ভাবে উদ্যোগ নেয়া। এই সংস্থার মাধ্যমে ভারত আরেকটি কাজ অতি চমৎকার ভাবে করে, সেটা হলো নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
লেখক অশোক রায়না অতি চমৎকার ভাবে এবং বিস্তারিত ভাবে এই RAW এর উত্থাপন সহ তার কর্মী গঠন হতে শুরু করে তাদের কর্মপদ্ধতির সুনিপুণ বর্ণনা করেছেন। তার বর্ণনার মাধ্যমে জানতে পারি এই RAW আমাদের দেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হবার পর থেকে, দেশ মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থায় আসা পর্যন্ত তারা কি পরিমান সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। (এবং সেটা বর্তমানেও সচল আছে)
সেই সময় RAW এর এজেন্টের ভূমিকা পালন করেন আমাদের দেশের ততকালীন গন্যমান্য গাধাশ্রেণীর রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে নানা পদের সেলিব্রিটিরা। গাধা বলার কারণ হলো ২৫শে মার্চ কাল রাত। ঐ রাতেই ৯০ভাগ বুদ্ধিজীবিকে শেষ করে দেশকে পঙ্গু বানিয়ে রাখা হয়। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের যোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন এটা অতি সত্য কথা, কিন্তু সেটা তাদের নিজেদের প্রয়োজনে। তা না হলে তারা একই পদক্ষেপ নিয়ে সিকিম রাজ্যকে নিজেদের অঙ্গরাজ্যে পরিনত করতো না। আমাদের র*ক্তের যে ঝাঁঝ, সেটার জন্য আমরা এখনো স্বাধীন।
এই RAW কোনো প্রতিষ্ঠানের বা কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য না, কেবলমাত্র স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ছাড়া। আর এই গোয়েন্দা সংস্থাটি পুরোদমে চলতে থাকে ভারতের সাবেক এবং প্রয়াত প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সময় থেকে। মূলত ১৯৬২ তে ইন্দো-চীন যুদ্ধের পর এই সংস্থার সূচনা হলেও তখন এটি তেমন ভাবে সক্রিয় ছিলো না। বা সেই ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। ১৯৬৫ তে ভারত - পাকিস্তান যুদ্ধের পর থেকেই ইন্দিরা গান্ধীর অধীনে সংস্থাটি পূনরায় সক্রিয় হতে থাকে।
‘র’এর প্রধান রামেশ্বর নাথ কাও আমেরিকার সিআইএ, এবং অন্যান্য দেশের গোয়েন্দা সংস্থা যেমন মোসাদ, কেজিবি, এমআই সিক্স নিয়ে বিশদভাবে গবেষণা করে এই ‘র’ এর কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এজন্য তিনি তার কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য আমেরিকার সহ ব্রিটেনে পাঠাতেন। মোট কথা হলো এই ‘র’ বর্তমানে চমৎকার প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থা।
আপনি বইটি যত পড়তে থাকবেন ততই বিস্মিত হতে থাকবেন। তাদের কর্ম পরিচালনা দেখে আপনি অবাক না হয়ে পারবেন না। সেই সাথে আপনার চমৎকার ধারণা হয়ে যাবে আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাপারে। কি জন্য ভারত এতো চাপ দিচ্ছে আমাদের দেশের উপর।