আফ্রিকার বন্য পরিবেশ ও সাফারি/শিকার নিয়ে এপর্যন্ত অনেক শিকারীর লেখাই পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে যাঁদের মাঝে আছেন আত্তিলিও গত্তি, গাই মালদুন, জন টেইলর, আর এস ম্যাকলে, কারমাজো বেল ইত্যাদি। তবে জন হান্টারের 'হান্টার' কে এগিয়ে রাখবো সবার থেকেই। কারণ প্রায় অজানা বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি অনেক ডিটেলসে আফ্রিকান ওয়াইল্ডলাইফকে তুলে এনেছেন হান্টার। বিভিন্ন এঙ্গেলে লেখা এগিয়েছে। লেখার মাঝে সাহিত্যিক গুণও সুস্পষ্ট। সেবা প্রকাশিত খসরু চৌধুরীর অনুবাদও বেশ ভালোমানের, সহজবোধ্য।
মোট সতেরো অধ্যায়/পরিচ্ছেদে লেখা হয়েছে বইটি। আগেই বলেছি অনেক বিস্তৃত, ডিটেইলড বর্ণনা।
বইটি শুরু হয় এক খুনে হাতির তান্ডবলীলা দিয়ে। গাইডসহ পিছু নিয়ে অনেক কষ্টে হাতিটাকে মারেন হান্টার। এরপর সূচনা হয় তাঁর স্মৃতিচারণের। পুরো বইটাই এরকম স্মৃতিকথা দিয়ে সাজানো।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে হান্টার জানান তাঁর বাল্যকালের কথা। স্কটল্যান্ডের সিয়ারিংটন, লোচার মস, শিকারের ঝোঁক, বাবা-মার সাথে মন কষাকষি ও বাবার উপদেশে কেনিয়া আগমন। মোম্বাসা-নাইরোবি রুটে রেলের গার্ডের চাকরি নেন জন হান্টার ও এই রেলপথেই জীবনের প্রথম হাতি শিকার করেন তিনি। দুটো দাঁত বিক্রি করেই দুমাসে গার্ডের চাকরি করে যে মাইনে পেতেন তার চেয়েও বেশি আয় হয়ে গেলো তাঁর।
সিংহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও সিংহ শিকারের কথা আছে তৃতীয় পরিচ্ছেদে। এছাড়া আছে কুলু পাহাড়ে পথ হারিয়ে মরতে বসা ও মিস হিল্ডা ব্যানবেরিকে ভালোবেসে বিয়ে করার গল্প।
চতুর্থ অধ্যায়ে দেখা যায় দুই আমেরিকানকে নিয়ে জন হান্টার চলেছেন সাফারিতে, উদ্দেশ্য সেরেঙ্গাতি মালভূমির অভ্যন্তরে অঙ্গরোঙ্গরো আগ্নেয়গিরি। ক্যাপ্টেন হার্স্ট বলে এক সভ্যতা বর্জিত লোকের গল্প আছে। আছে খচ্চরের পিঠে বাঁধা টিনের শব্দে ভয় পেয়ে পালানো হিংস্র সিংহের পালের গল্পও।
অধ্যায় পাঁচে আছে বিভিন্ন জাতের শিকারীর কথা। হুইস্কি খোর ফরাসী কাউন্ট, শিশিরের ভয়ে ভীত রাজা, দশ ফুট লম্বা চিতাবাঘের রেকর্ডের দাবীদার জোচ্চোর, গাড়ি গিফট করা সুইস কোটিপতি, দয়ালু বঙ্গো শিকারী, ফে ও তার ভীতু বন্ধু, অহংকারী ইউরোপীয় প্রিন্সেস এবং শুয়োরের চামড়া দিয়ে সিট বানাতে চাওয়া নির্লজ্জ আর্ল অভ কর্নাভর্ন - ইত্যাদি নানা মানসিকতার শিকারীকে তুলে এনেছেন হান্টার। এবং সুযোগ বুঝে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিদ্রুপের খোঁচা মারতে ছাড়েননি।
মাসাই - কেনিয়ার বীর লড়াকু জাতি। কোনোরূপ আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়া কেবলমাত্র সাহসের ওপর ভর দিয়ে বল্লম সম্বল করে সিংহ শিকার করে সারা দুনিয়ায় বিখ্যাত তারা। মাসাই রিজার্ভে উৎপাতকারী অসংখ্য সিংহকে স্বর্গে পাঠাতে আবির্ভূত হন জন হান্টার - ষষ্ঠ অধ্যায়ে। আছে কুকুরের পাল দিয়ে সিংহ শিকার ও কিরাকাঙ্গানো নামে এক দক্ষ মাসাই গাইডকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার গল্প।
সপ্তম পরিচ্ছেদে আছে মাসাইদের সিংহ শিকারের বর্ণনা। অস্ত্র বল্লম ও সিমি (দুই ফুট লম্বা ভারী ছুরি)। আছে শ্রেষ্ঠ খেতাব মোলোমবুকির কথা - মাসাইদের মাঝে যে সিংহের লেজ টেনে ধরে শিকারের সময়!
শ্রদ্ধেয় ময়ূখ চৌধুরীর রচনাসমগ্রের দ্বিতীয় খন্ডে ইতোপূর্বেই ভয়াবহ এই শিকারের গল্প পড়া হয়ে গিয়েছিলো। জন হান্টারের উল্লেখ বারবারই এসেছে তাঁর বিভিন্ন লেখায়।
অধ্যায় আট শুরু হয় লেখকের পরিবারের বর্ণনা দিয়ে, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী হিল্ডা, বড় ছেলে গর্ডন ও তাদের নাইরোবির উপকন্ঠে কিনা সুন্দর বাড়িটার কথা। একজন গাইডের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন হান্টার। মারেঞ্জ বনে হাতি শিকার করতে গিয়ে নিজের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়া নিয়েও বলেছেন তিনি।
লেক ভিক্টোরিয়ার ছোট্ট দ্বীপ ফুমভে। জলে কুমীর ও জলহস্তী, ডাঙায় সিতাতুঙ্গা এন্টিলোপ। আরো আছে নানাজাতের প্রচুর পাখি। এই দ্বীপে হানিমুনের গল্প আছে নবম অধ্যায়ে। গন্ডার বনাম জলহস্তীর দুর্লভ লড়াইয়ের কথাও আছে এখানে।
দশম অধ্যায়ে লেখক পিছু নিয়েছেন আফ্রিকার সবচে ভয়ংকর জন্তু (অনেকের মতে) বুনো মহিষের। আছে মহিষ নিয়ে লোমহর্ষক কয়েকটি ঘটনার বিবরণ, যার মাঝে হতভাগ্য তুরকানা সর্দার আবেয়ার মৃত্যু বেশ মর্মান্তিক। এছাড়া বাফ নামের এক অবাধ্য কুকুরের ধীরে ধীরে লেখকের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠা ও শেষমেশ নিজের একগুঁয়েমিতে প্রাণ হারানোর কাহিনীও পাওয়া যায় এই অধ্যায়ে। অধ্যায় শেষ হয় হান্টারের একান্ত অনুগত কিরাকাঙ্গানোর করুণ মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে।
তৎকালীন বেলজিয়ান কঙ্গোর (আজকের ডিআরসি) নিবিড় রেইনফরেস্ট ইতুরি বনে অভিযানে যাওয়ার গল্প আছে ১১তম অধ্যায়ে। আছে রহস্যময় ডাচ বেজেদেনহাউটের কথা। অসমসাহসী এই লোক হাতির দাঁত চুরি করে পুলিশের চোখ এড়িয়ে কুমিরে ভর্তি সেমিলিকি নদী পার হয়ে গিয়েছিলো!
পূর্বোক্ত মাসাইদের মতই এ অধ্যায়ের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু গহীন অরণ্যের পিগমী জাতি৷ এছাড়াও আছে দুর্লভ ওকাপির পিছু নেয়া, বিষ ছিঁটানো স্পিটিং কোবরা ও ভুলক্রমে লেখকের নরমাংস ভক্ষণের গল্প!
গন্ডার ছাড়া আফ্রিকান সাফারি অসম্পূর্ণ। বারোতম অধ্যায় পুরোটাই লেখকের গন্ডার শিকার নিয়ে। ক্রমবর্ধমান ওয়াকাম্বা উপজাতির জন্য বসতবাড়ি নির্মাণ ও চাষের জমি তৈরী করতে গিয়ে নিয়মিত জঙ্গল ছাটাই হচ্ছিলো, একইসাথে মারতে হচ্ছিলো বিপদ সৃষ্টিকারী বিভিন্ন জন্তুকে। যার মাঝে অবশ্যই ছিলো গন্ডার। তিনমাসের অভিযান শেষে ১৬৩ টা গন্ডার হত্যা করেন লেখক। যদিও শেষদিকে এসে লেখক প্রশ্ন রাখেন, "ক্রমবর্ধমান সমাজের তাগিদে মাত্র কয়েক একর জমির জন্য এই চমৎকার জীবদের হত্যা করার কি কোনো যু্ক্তি আছে?"
তেরোতম অধ্যায়ে দেখা যায় জন হান্টার মাকিন্দু জেলার বনরক্ষকের দায়িত্ব পেয়েছেন। পাততাড়ি গুটিয়ে মাকিন্দু চলে আসেন তিনি। এবার তাঁর দায়িত্ব গন্ডার হত্যা নয়, রক্ষণ। অবুঝ ওয়াকাম্বা পোচার, শ্বেতাঙ্গ ধূর্ত পোচার ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের হাতির দাঁত/গন্ডারের শিং পাচার নিয়ে বলেছেন হান্টার। আফ্রিকার সবচেয়ে ক্ষতিকর জন্তুর খেতাব দিয়েছেন হায়না ও বেবুনকে। আর শেষদিকে জুড়েছেন আগুনের ভয় দেখিয়ে টাঙ্গানিকার ধূর্ত একপাল হাতি শিকারের গল্প।
পরবর্তী অধ্যায়ও হাতি শিকার নিয়েই। সবসময় হালকার চেয়ে ভারী রাইফেল দিয়ে শিকারের উপর জোর দিতেন হান্টার। উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন কিভাবে হালকা রাইফেল দিয়ে হাতি মারতে গিয়ে প্রাণ হারান লেডিবুর নামে এক ডাচ শিকারী। এক বৃদ্ধ অভিজ্ঞ ও তরুণ শক্তিশালী হাতির জোড় বাঁধার গল্পও আছে। অধ্যায়ের শেষে হান্টার স্মৃতিচারণ করেন কিভাবে নেটল কাঁটার বিষে আরেকটু হলে মরতে বসেছিলেন।
ক্রমশঃ শিকারের প্রাণী হ্রাস পাওয়া ও মানুষের মনে বিবেকবোধের জাগরণ রাইফেল ছেড়ে মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিলো ক্যামেরা। মানুষ বুঝতে পারছিলো শুধু আগ্নেয়াস্ত্র নয়, ক্যামেরার লেন্স দিয়েও শিকার করা সম্ভব। এরকমই বিভিন্ন ফটোগ্রাফারের সাথে লেখকের সাফারির বিবরণ আছে ১৫তম অধ্যায়ে।
আফ্রিকার সবচেয়ে ভয়ংকর/মারাত্নক জন্তু কী? মিলিয়ন ডলার কোশ্চেন। জন হান্টার কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ধোঁয়াশা রাখেননি। তাঁর মতে আফ্রিকার সবচেয়ে মারাত্নক জন্তু চিতাবাঘ। এরপর যথাক্রমে সিংহ, বুনো মহিষ, গন্ডার ও হাতি। নিজ মতের সপক্ষে চিতাবাঘ শিকারের কয়েকটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।
নিজের মাতৃভূমি স্কটল্যান্ডের সিয়ারিংটন ছেড়ে দীর্ঘকাল বাইরে, আফ্রিকার বন্যপ্রান্তরে কাটিয়েছেন জন হান্টার। তাই নিজের শৈশবকে আরেকটিবার ঝালিয়ে নিতে, মায়ার টানকে পোক্ত করতে স্ত্রীকে নিয়ে পাড়ি জমান মাতৃভূমিতে। যদিও মাতৃভূমি তাঁকে হতাশ করেছিলো। আফ্রিকার মত প্রাণের স্পন্দন, পাখির কাকলি, জান্তব রোমাঞ্চ সর্বোপরি প্রকৃতির টান তিনি পাননি। তাই আবার ফিরে আসেন মাকিন্দুতে। বারান্দায় বসে তারাভরা আকাশের দিকে তাকান, ঘ্রাণ নেন রজনীগন্ধার, শুনতে পান আদিবাসীদের ঢাক আর হায়নার হাসি। এই যেন তাঁর নিজের দেশ।
বুনো দুর্নিবার রহস্যময় আফ্রিকার প্রতি ভালোবাসা দিয়ে শেষ হয় জন হান্টারের 'হান্টার'।
আধুনিককালে শিকার পরিত্যজ্য, নিন্দনীয়। এবং এই নিন্দা যথার্থও। হান্টারের মত শিকারী রা হাজারে হাজারে হাতি, গন্ডার, সিংহ হত্যা করে তাদের নিয়ে গেছে বিলুপ্তির দোরগোড়ায়। তবে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন তিনিসহ প্রায় সব শিকারীই। যেকারণে শেষজীবনে অনেকেই প্রাণী সংরক্ষক হয়ে যান। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তখনকার বন্য আফ্রিকাকে জানতে তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া গতি নেই।
হান্টার৷ তাঁর পারিবারিক উপাধি, তাঁর পেশা, তাঁর নেশা, তাঁর ভালোবাসা। দুর্দান্ত বই। রেটিং ৫/৫।