"পরকপালে রাজারানী" কথাকার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম পরিশ্রমী সাহিত্যকর্ম। "কলেজ স্ট্রিট" পত্রিকায় ধারাবাহিক বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় আলোড়ন পড়ে যায় নির্মাণটি ঘিরে। এটি তাঁর আয়তনে ও চিন্তায় শেষ বৃহৎ সাহিত্যকর্ম।
সে ছিল এক কলকাতা, যেখানে বারমহল, নয়তো বাগানবাড়িতে বাইজি নাচানো, মোসাহেব আর রক্ষিতা পোষা বাবুরা বেড়ালের বিয়ে, ঘুড়ি ওড়ানো, কবুতরবাজিতে ব্যয় করতেন লক্ষ লক্ষ টাকা, সেখানে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের এক জমিদার পরিবার আর তার রানীমা-টিকে নিয়েই এই আখ্যান।
Ashutosh Mukhopadhyay (Bengali: আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, anglicised spelling of surname: Mukherjee ) was one of the most prominent writers of modern Bengali literature.
He was born on September 7, 1920 in Bajrajogini, Dacca (now Dhaka) as the fifth of ten children of a Bengali Brahmin couple, Paresh Chandra Mukhopadhyay and Tarubala Devi. Mukhopadyay graduated in commerce from Hooghly Mohsin College, then affiliated with the University of Calcutta. His first story was Nurse Mitra, published in the newspaper Basumati, which was later made into major movies (Deep Jwele Jai in Bengali and Khamoshi in Hindi). Bollywood films like Safar (1970) and Bemisal were also made from his novels.
বিশশায়ায়ায়ায়াল! এবং পুরোটা সময়ে একটুও বিরক্ত হইনি! বইয়ের শেষে হ্যাপি এন্ডিং হবে লেখক বলেই নিয়েছেন। কেবল কেমন করে হ্যাপি এন্ডিং হয় সেইটা দেখার অপেক্ষা।
ঘটনার মূল একটা জমিদার বংশ। জমিদার বাড়ি, জমিদার বললেই কেমন একটা নেগেটিভ ভাইব চলে আসে। তাদের বিলাস ব্যসনের কথাই সবার প্রথমে ঘুরপাক খায় মাথায়। এটাও জমিদার নিয়েই কাহিনি, তবে ভালো জমিদার। উনিশ শতকের ইতিহাস নিয়ে লেখেছেন ভেবে শুরু করেছিলাম বইটা (মানে বিখ্যাত চরিত্রদের নিয়ে ঐতিহাসিক উপন্যাস টাইপ কিছু ভেবেছিলাম) এখন দেখি অইরকম কিছু না। তারপরেও খুব ভাল্লাগসে! ইচ্ছে হলে পড়তে পারেন।
কয়েকদিন ধরে পড়তে পড়তে এখন বই শেষ হওয়ায় হুট করে খুব আজাইরা হয়ে গেলাম 😏
আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নাম আগে অনেক শুনলেও কোনো লেখা পড়া হয়নি। গতবছর পরকপালে রাজারানী বইটি আমার সংগ্রহে আসে। 'পরকপালে' অর্থ অন্যের ভাগ্যের উপর নির্ভর করে নিজের দুর্ভাগ্য কাটানো। উপন্যাসটিতে এমন এক জমিদার পরিবারের অন্দরমহলের কাহিনি বর্নিত হয়েছে যারা তৎকালীন বাইজি নাচানো, রক্ষিতা রাখা, অহেতুক টাকা খরচ করা জমিদার ছিল না। সেই রক্ষণশীল জমিদার বংশের একজন রানীকে নিয়েই গল্প।
কলকাতা থেকে কয়েক ঘন্টার পথের দূরত্বে মোহনপুর গ্রাম। সেই গ্রামেরই বৈকুণ্ঠ বোসের ছেলে কমলাপতি বোস। কাজকর্ম কিছু করে না। তবে গ্রামের কারো কোনো সমস্যা হলেই সেখানে কমলাপতি হাজির। সংসারের প্রতি ছেলের মতিগতি ফেরাতে বাবা-মা ছেলের বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। নয়নপুরের খাতক মহাজন গোলক ঘোষের কাছে ঋণ আছে বৈকুন্ঠ বোসের। তাই বলতে গেলে অনেকটা বাঁধা হয়ে আছেন তার কাছে। গোলক ঘোষ এমন সোনার টুকরা ছেলেকে নিজের মেয়ের জামাই হিসেবে বরণ করতে চান এবং এটা শুনে ত বৈকুণ্ঠ ঘোষ বেজায় খুশি। কিন্তু বেঁকে বসে কমলাপতি। তার আত্মসম্মানে বাঁধা পড়ে মেয়ের জামাই হওয়ার বাহানায় বাবার ঋণ শোধ করতে। তাই একেবারে বিয়ে করতেই অস্বীকার করে এবং বাবার সাথে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। সম্বল মোটে বংশের সোনার সিকিটা। তাই নিয়েই কলকাতায় এসে পৌঁছায় এবং পূর্বপরিচিত ব্রিটিশ সৈন্যদের সহায়তায় কাজ জুটিয়ে নেয়। এদিকে ঘোষচৌধুরীদের মেয়েকে অগ্রাহ্য করে বাবার ঋণকে আরো বাড়িয়ে তোলে কমলাপতি। কমলাপতির বংশের সাথে কি ঘোষেদের এই বিবাদ মিটবে?
মোহনপুরের জমিদার রাজর্ষির মৃত্যুর পর জমিদারির হাল কে ধরবে তাই নিয়ে দোটানা সৃষ্টি হয়। তিন বড় মেয়েরই বিয়ে গিয়েছে এবং একমাত্র পুত্রের বয়স মাত্র চার। স্ত্রী জগন্ময়ী দেবী তখন বড় মেয়ের স্বামী ভবানীচরণের উপর সব দায়ভার প্রদান করেন। তবে ভবানীচরণ শর্ত হিসেবে সংসার ধর্ম ত্যাগ এবং শ্যালক রাজেন্দ্রনারায়ণ সাবালক হলে সন্ন্যাসীর পথে চলে যাবেন ঠিক করে নেন শাশুড়ির সাথে। অগত্যা রাজি হতে হয়। ভবানীচরণের বৈষায়িক বুদ্ধির জোরে খুব দ্রুতই জমিদারির উন্নতি হয় এবং নতুন নতুন এলাকা ক্রয় করে জমিদারির চৌহদ্দি বৃদ্ধি পায়। মা আর তিন বোনের আদরে বেড়ে উঠতে থাকে রাজেন্দ্রনারায়ণ। ভগ্নিপতি ভবানীচরণ শ্যালকের বিয়ে ঠিক করেন পার্শ্ববর্তী শিবচকের ক্ষয়িষ্ণু জমিদার ত্রিলোচন রায়ের নাতনীর সাথে। কিন্তু মেয়েটি বেশিদিন আয়ু নিয়ে আসেনি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর রাজেন্দ্রনারায়ণ জমিদারির দেখভালে মনোনিবেশ করেন। এদিকে তার দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার জন্য চারদিকে মেয়ে দেখার ধুম পড়ে যায়। দ্বিতীয় বিয়ে হলেও এমন পরিবারে মেয়ে দিতে পারলে মেয়ের পিতারাও বর্তে যান। তাই অনেক দূর থেকেও সম্বন্ধ আসতে থাকে। মা ও তিনবোন মিলে শ'খানেক মেয়ে দেখলেও রাজেন্দ্রনারায়ণ তা নাকচ করে দেন এবং নিজের পছন্দে বিয়ে করেন সাবিত্রীকে।
ত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবন রাজেন্দ্রনারায়ণ ও সাবিত্রীর। এই লম্বা সময়ে মোট তেরোটি সন্তান জন্ম হয়েছে তাদের। প্রথম সন্তান ছিল জন্মান্ধ এবং কয়েক বছর পরেই মারা যায়। এভাবে মোট দশটি সন্তান মারা যায় তাদের। বড় মেয়ে গায়ত্রীর বিয়ে হয়েছে, সন্তানও আছে। আরেক ছেলে রাজীবকুমার, সেও জন্মান্ধ। সবার ছোট রাজা, বয়স মাত্র দশ। এই সন্তানের ভাগ্যেও কি তার অগ্রজদের ন্যায় পরিণাম লেখা আছে? সাত লক্ষ টাকা বার্ষিক আয়ের জমিদারি রক্ষা হবে কীভাবে? রাজেন্দ্রনারায়ণ ছিলেন বালানন্দ ব্রহ্মচারীর ভক্ত। তার কাছে সমাধানের জন্য গেলে তিনি রাজাকে চেয়ে নেন আশ্রমের জন্য । কিন্তু এতে ত বংশরক্ষার জন্য কেউ থাকেনা। অন্য উপায় চাইলে রা্জাকে পরকলাকপালে করে দিতে বলেন। অর্থাৎ রাজার বিয়ে দিলে তার ফাঁড়া কাটবে বউয়ের ভাগ্যের কল্যাণে। এই কথা শুনে সাবিত্রী চৌধুরাণীর মনে হিংসার আগুন জ্বলে উঠে। কারণ তার ছেলে অথচ বেঁচে থাকবে কিনা অন্য এক মেয়ের ভাগ্যের ফেরে। মেয়ে দেখার ধুম পড়ে যায় আবার। অনেক বাছবিছারের পর ঐ সময়ে তিন লক্ষ টাকা খরচ করে মহা ধুমধামের মাধ্যমে রাজার বউ হয়ে আসে সাড়ে সাত বছরের সুধারানী। সুধারানীকে প্রথম থেকেই শাশুড়ির চোখের বালি হতে হয়। অথচ তার ভাগ্যের ফেরেই কিনা রাজার ফাঁড়া কাটবে! সুধারানী কি পারবে শাশুড়ির চোখের মণি হয়ে উঠতে? মোহনপুরের জমিদার বংশ কি টিকে থাকবে সুধারানীর ভাগ্যের ফেরে?
বিশাল এক উপন্যাস। চার-পাঁচ পুরুষের গল্প। তবে মধ্যমণি হিসেবে রয়েছেন রাজেন্দ্রনারায়ণ, সাবিত্রী চৌধুরাণী এবং সুধারাণী। পুরোটাই অন্দরমহলের গল্প। অন্যান্য জমিদাররা যেখানে টাকা উড়িয়ে নিজেদের সর্বস্বান্ত করে দিতেন সেখানে এই জমিদারবংশ নিজেদের জমিদারি টিকিয়ে রাখতে অনেককিছুই ত্যাগ করেছেন। আবার বিয়ে বা পূজার মধ্যে এমন জাঁকজমকের ব্যবস্থা করেছেন তা দেখে কলকাতার মানুষ তাজ্জব বনে গিয়েছেন।
বইটির কাহিনী বিশাল হওয়াতে পুরো বইতে পাঠককে মনোযোগী করে রাখাটাই একটা চ্যালেঞ্জ লেখকের জন্য। তবে কিছু জায়গা বাদে প্রায় পুরো উপন্যাসেই মনোযোগ ধরে রাখতে পেরেছিলাম। অন্দরমহলের অনেক ঘটনাই ভারতীয় সিরিয়ালের মতো ছিল নাটকীয়। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে যে প্রেক্ষিতে ঘটনাগুলোর উপস্থাপন হয়েছে সেক্ষেত্রে এর চাইতে ভালো উপায় ছিল না। সাবিত্রী বসুচৌধুরাণীর পতিভক্তি এবং প্রবল ব্যক্তিত্ব পাঠককে রাগান্বিত করবে আবার মুগ্ধ করবে। রানীর উপর হওয়া অত্যাচারকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায়না। তবে সাবিত্রী বসুচৌধুরানীর দিক হতেও এর ব্যাখ্যা ছিল। এদিকে মায়ের কাছছাড়া না হওয়া রাজা ছিল একেবারে ম্রিয়মাণ। মায়ের কথার বাইরে যেতে পারেনি কখনো। বিস্তর চরিত্রের সমাবেশ হয়েছে উপন্যাসটিতে। সকলকেই যার যার জায়গায় লেখক সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। তৎকালীন সমাজে মেয়েদের শিক্ষার প্রচলন ছিল একেবারে কম। তবুও জমিদার বংশটিতে শিক্ষার রেওয়াজ ছিল এবং সুধারানী সেই সুবিধা পেয়েছিল।
বিশালাকার বইটির শ'খানেক পৃষ্ঠা কিংবা অর্ধেক বই পড়ার পরেও মনে হয়েছে বেশি ভালো লাগছে না। কিন্তু ধৈর্য ধরে পড়ে যখন শেষ করলাম তখন মনে হলো বইটা শেষ না হলেই বোধহয় ভ���লো হতো। এক কথায় বললে সুন্দর একটি উপন্যাস। অন্দরমহলের নাটকীয়তাও যে অপূর্ব ঢঙে উপস্থাপন করা যায় তা এই উপন্যাস না পড়লে বোঝা মুশকিল। হ্যাপি রিডিং।
আশুতোষ মুখোপাধ্যায় র "পরকপালে রাজারানী" একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস. সত্য ঘটনা অবলম্বনে একটি জমিদার পরিবারের কয়েক প্রজন্মের ইতিহাস লেখক তুলে ধরেছেন এই উপন্যাসে ।
সত্যের সাথে কল্পনার মিশ্রণে অভূতপূর্ব আখ্যান জন্ম দেওয়াই একজন জাত লেখকের পরিচয় . আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁর পরকপালে রাজারানী উপন্যাসে তাই করেছেন অত্যন্ত সুচারুরূপে। মোহনপুরের এক সাধারণ ব্যক্তি কমলাপতি বসুর কমলার ( লক্ষ্মী) কৃপা লাভ এবং এক অসাধারণ জমিদার বসুচৌধুরী হয়ে উঠার কাহিনী নিয়ে উপন্যাসের প্রথম ভাগ. দ্বিতীয় ভাগে কমলাপতির চতুর্থ প্রজন্ম রাজনারায়ণ বসুচৌধুরীর জীবন দিয়ে শুরু । মা আর তিন বোনের অতি আদরে লালিত রাজনারায়ণ তাঁর ভগ্নিপতি ভবানীচরণের সার্ন্নিধ্যে ও পরিচালনায় ধীরে ধীরে বিক্রমশালী জমিদার হয়ে উঠেন। তাঁর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর অতি রূপসী সাবিত্রীকে বিবাহ করেন কিন্তু তাঁদের সুখের সংসারে নেমে আসে কালের অমোঘ অভিশাপ. একে একে দশটি সন্তানের মৃত্যু রাজনারায়ণকে মুহ্যমান ও সাবিত্রীদেবী কে পাথর করে ফেলে . জীবিত তিন সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তান জন্মান্ধ , দ্বিতীয়টি মেয়ে ও তৃতীয়টি রাজেন্দ্র সুস্থ একমাত্র. কিন্তু তাঁর ও ভাগ্য গণনায় মৃত্যুযোগ দেখা দেয়াই রাজনারায়ণ ও সাবিত্রী স্বামীজী বালানন্দ মহারাজের কাছে উপায় উদ্ধারে গেলে তিনি রাজেন্দ্রকে পরকপালে করে দেবার আদেশ দেন। দশ বছরের রাজার জন্যে ভাগ্য, জোটক গণনায় সর্বকৃষ্ট আট বছরের সুধারানী কে স্ত্রী করে আনা হয় . কিন্তু সাবিত্রী দেবী এই বিয়ে মেনে নিতে পারেন না মন থেকে । রানীর উপর নেমে আসে বিষম অত্যাচার ও শাস্তি ।
রানী কি পারবে তাঁর রাজাবাবুকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে? শাশুড়ির মন জয় করতে? তাঁর ভালোবাসা পেতে? তাঁর উপর এই শাস্তির পরিণাম কি হবে ? এই অসম বিয়ের পরিণতি কি হবে ?রানীর জীবন আর কি কি মোড় নিবে ? এই সকল প্রশ্নের উত্তর পেতে পড়তে হবে উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ড।
সেই সময় জমিদার বলতে আমরা বুঝতাম বাবু কালচার , ঘোড়াদৌড় , পায়রা উড়ানো , পুতুলের বিয়ে সহ নানান প্রতিযোগিতা ও বাঈজী বাড়ির বিলাস ব্যসনে দিন কাটানো অত্যাচারী জমিদারদের. কিন্তু এই উপন্যাস তাঁর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র আমাদের দেখায় এবং এক মহান ব্যক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় ।
‘পরকপালে’ শব্দটির মানে—অন্যের ভাগ্যে নিজের দুর্ভাগ্যকে ঠেকানো। এই উপন্যাসে উঠে এসেছে এক রক্ষণশীল জমিদার পরিবারের অন্দরমহলের জটিল, করুণ, আবার রঙিন গল্প—যারা সাধারণত প্রচলিত জমিদারদের মতো বিলাসী বা কুখ্যাত নয়, বরং দায়িত্ববান ও প্রজানুরাগী।
উপন্যাসের পটভূমি মোহনপুর গ্রাম। গ্রামের সাধারণ ছেলে কমলাপতি বোস—কাজ না করলেও, মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার বাবা বৈকুন্ঠ বোস, ঋণে জর্জরিত। ঋণদাতা গোলক ঘোষ নিজের মেয়ের সঙ্গে কমলাপতির বিয়ে দিতে চান, কিন্তু আত্মসম্মানে আঘাত পেয়ে কমলাপতি বিয়েতে রাজি না হয়ে কলকাতার পথে রওনা হয়। সামান্য কিছু সোনার মুদ্রা সম্বল করে শহরে এসে ব্রিটিশ সেনার মাধ্যমে চাকরি পায়, এবং ধীরে ধীরে নিজের ভাগ্য গড়ে তোলে। এর মধ্যে ঘোষদের সঙ্গে বোস পরিবারের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।
পরবর্তী প্রজন্মে আসে রাজর্ষি বসু চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুতে জমিদারি চালিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্ব পড়ে স্ত্রী জগন্ময়ী দেবীর কাঁধে। তিনি মেয়ের স্বামী ভবানীচরণকে দায়িত্ব দিতে চান। ভবানীচরণ শর্ত দেন—রাজেন্দ্রনারায়ণ সাবালক হলে তিনি জমিদারি ছেড়ে সন্ন্যাসে যাবেন। ভবানীচরণের নেতৃত্বে জমিদারির বিস্তার ঘটে এবং রাজেন্দ্রনারায়ণ বড় হতে থাকেন মা ও বোনদের ভালোবাসায়।
প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু পর রাজেন্দ্রনারায়ণ নিজের পছন্দে বিয়ে করেন সাবিত্রীকে। তাঁদের ত্রিশ বছরের দাম্পত্যে জন্ম হয় ১৩টি সন্তানের, যার মধ্যে ১০ জনই অল্প বয়সে মারা যায়, একটি সন্তান জন্মান্ধ, আর ছোট ছেলে রাজা—সে-ও কি টিকে থাকবে?
রাজা বেঁচে থাকবে কি না তা জানতে গিয়ে রাজেন্দ্রনারায়ণ গুরুদেব বালানন্দ ব্রহ্মচারীর শরণাপন্ন হন। গুরু বলেন—ছেলেটিকে বিয়ে দিতে হবে, স্ত্রীর ভাগ্যে বাঁচবে সে। এই কথা শুনে মা সাবিত্রী কষ্ট পান—নিজের ছেলেকে অন্য এক বালিকার ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে! অবশেষে সাত বছরের সুধারানীর সঙ্গে রাজা’র বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই শাশুড়ির বিরাগভাজন হয় সে।
এই বিশাল উপন্যাসটি মূলত কয়েক প্রজন্মের কাহিনি হলেও কেন্দ্রীয় চরিত্র তিনটি—রাজেন্দ্রনারায়ণ, সাবিত্রী ও সুধারানী। জমিদারি রক্ষায় এই পরিবার ভোগ-বিলাস না করে অনেক কিছু ত্যাগ করেছে। তবে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোয় তারা যথেষ্ট আড়ম্বর দেখিয়েছে, যা আশেপাশের এলাকাজুড়ে বিস্ময়ের সৃষ্টি করত।
বইটি বিশাল হলেও লেখক পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছেন, যদিও কিছু অংশ একটু ধীরগতির। অন্দরমহলের যে নাটকীয়তা উপস্থাপন করা হয়েছে, তা প্রথমে মনে হতে পারে অতিনাটকীয়, কিন্তু সেই সময় ও প্রেক্ষাপটে তা যথাযথ মনে হয়েছে। বিশেষভাবে নজরকাড়া চরিত্র হলো সাবিত্রী—যাঁর কঠোরতা ও মাতৃত্বের দ্বন্দ্ব পাঠকের মনে একসাথে মুগ্ধতা ও বিরক্তি আনে। রানীর প্রতি তাঁর ব্যবহার সহজে মেনে নেওয়া যায় না, তবে তাঁর অবস্থান থেকেও সেটা ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
রাজার দুর্বলতা ও মায়ের প্রতি তার নির্ভরশীলতা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। উপন্যাসে বহু চরিত্র থাকলেও লেখক প্রত্যেককে নিজের জায়গায় বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করেছেন। নারীশিক্ষা নিয়ে উপন্যাসে ইতিবাচক বার্তা রয়েছে—সুধারানী তার শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে, যা সেই সময়ের গ্রামীণ সমাজে বিরল ছিল।
বইটির প্রথম অংশ কিছুটা মন্থর মনে হলেও শেষ দিকে এসে তা গভীর আবেগে মোড়া এক অসাধারণ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। জানা যায়, লেখক এই উপন্যাস রচনার জন্য নানা জায়গায় ঘুরে ও লাইব্রেরিতে খোঁজ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, যা এক পাঁজি ভরসার মতো। মাত্র সাড়ে সাত বছর বয়সী ‘রানী-মা’র মুখে শোনা কিছু গল্পই এই বিশাল উপন্যাসের বীজ রোপণ করেছিল।
লেখকের নিজের একমাত্র পুত্রের মৃত্যুর দুঃখও যেন উপন্যাসের ঈশ্বরবিশ্বাসী দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও মর্মস্পর্শী করে তোলে। ফলে পাঠকের মনে ভাগ্য, ঈশ্বর, এবং বাস্তবতার মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।
সত্য ও কল্পনার মেলবন্ধনে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় যে সাহিত্যসৃষ্টি করেছেন, তা নিঃসন্দেহে এক অনন্য, কালজয়ী রচনা।