বাংলার নারীজাগরণের ছিন্নসূত্রটির পুনরুদ্ধারের কাজে যিনি ইতিমধ্যেই যশস্বিনী ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’ রচনা করে, সেই চিত্রা দেব এবার আরও ব্যাপক অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছেন বাংলার নারী-জীবনেরই অন্দরমহলে প্রবেশ করে । ১৮০৯ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে যাঁদের জন্ম-বাংলার প্রথম মহিলা আত্মজীবনীকার রাসসুন্দরী দেবী থেকে নির্যাতিতা বধূ অমিয়বালা দেবী পর্যন্ত —এমন প্রায় ষাট জন বঙ্গনারীর লেখা বিভিন্ন আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা কিংবা দিনলিপিতে ছড়ানো-ছিটনো নারীজীবনের খণ্ডচিত্রগুলিকে একত্র করে তার মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন বঙ্গললনাকুলের মানসিক বিবর্তনের প্রামাণ্য, বিস্তৃত ও অন্তরঙ্গ এক বিবরণ। বাংলার নারী-জাগরণের ইতিহাসে এ-বিবরণের মূল্য যে কী অপরিসীম, তা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। আপন উপলব্ধির আলোয় এইসব বঙ্গরমণীরা তাঁদের নিজস্ব জীবনবৃত্তের মধ্যে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বাস করেও খুঁটিয়ে দেখেছিলেন সমকাল আর সমসময়ের সমাজকে, সেইসঙ্গে হয়তো-বা নিজেদেরও। ‘অন্তঃপুরের আত্মকথা’ তাই একদিকে যেমন বাংলার নারীজাগরণের ধারাবাহিক বৃত্তান্ত, অন্যদিকে তেমনি দ্বিধা-সংশয় পার হয়ে বঙ্গনারীদের এক নিশ্চিত প্রত্যয়ে পৌঁছে যাবার স্বীকারোক্তি।
বাংলাভাষা ও সাহিত্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর উপাধি লাভ করে চিত্রা দেব মধ্যযুগের এক অনাবিষ্কৃত মহাভারতের ওপরে গবেষণা করে ডক্টরেট পেয়েছেন। কবিচন্দ্রের মহাভারত, বিষ্ণুপুরী রামায়ণ, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গল ও ময়ূরভট্টের ধর্মমঙ্গল সম্পাদনা করেছেন একক ও যৌথভাবে। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর নিরন্তর গবেষণার উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি রয়েছে বিদগ্ধ মহলে। মধ্যযুগীয় সাধারণ মানুষ ও পুঁথিপত্র সম্পর্কে লিখেছেন একটি প্রবন্ধ সংকলন ‘পুঁথিপত্রের আঙিনায় সমাজের আলপনা। বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ঠাকুরবাড়ির মহিলাদের ভূমিকা নিয়ে লেখা তাঁর অপর উল্লেখযোগ্য গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’। অনুবাদ করেছেন প্রেমচন্দের হিন্দী উপন্যাস ‘গোদান’ ও ‘নির্মলা’। বাংলার নারী জাগরণের বিভিন্ন তথ্য সংকলনে ও বৃহত্তর গবেষণা করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার গ্রন্থাগার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রয়াণ : ১ অক্টোবর, ২০১৭।
ফরিদপুরের এক গৃহবধূ। এক গলা ঘোমটা দিয়ে রান্না করেন রান্নাঘরে। রান্না করতে করতে ভাবেন গতরাতে দেখা স্বপ্নের কথা। স্বপ্নে দেখেছেন যে তিনি চৈতন্য ভাগবতের পুঁথি পড়ছেন। অথচ তিনি তো অক্ষরজ্ঞানহীন। কালো কালো অক্ষরের আড়ালে কী রয়েছে জানেন ও না। সেই দিনেই অত্যন্ত গোপনে এক সাহসী বিপ্লব সংঘটিত হয়ে গেল৷ অতি নিভৃতে, বিপ্লবী এক অসামান্যা নারী, একেবারেই একাকী। এক গলা ঘোমটা পড়া নিরক্ষর নারী, যিনি একটি ঘোড়াকে দেখলেও ঘোমটা বাড়িয়ে দেন সেই তিনিই সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় শিখে ফেললেন অক্ষর, পড়লেন কাঙ্ক্ষিত পুঁথিটি, শোনালেন অন্যান্য আত্মীয়া নারীদের আর পরবর্তীতে রচনা করলেন আত্মকথা 'আমার জীবন।' বাঙালি নারীর প্রথম আত্মকথা, লেখিকা রাসসুন্দরী দেবী। তখন বিয়ে হত ১০ না পেরুতেই, বড়জোর ১৩-১৪ বয়:ক্রম থাকত পাত্রীর। কুলীনের মেয়ে হলে তো আরো বিপদ। কপালে জুটত অসংখ্য সতীন আর ঘাটের মড়া স্বামী, বিয়ে করে বেড়ানোই যাদের পেশা ছিল। বিয়েতে নারীর মত? ওমা! অমন কথা সাধারণ মানুষ দূরে থাক, বিদগ্ধ পণ্ডিতদেরও মাথায় আসেনি। খুব ধীরে ধীরে অতি সংগোপনে একেকটি করে প্রদীপ জ্বলে উঠছিল। ধীরে ধীরে কোন কোন নারী বুঝতে শিখছিলেন তাঁরাও যে ভিন্ন কোন অস্তিত্বের অধিকারী, পুরুষের হুকুমের গোলাম নন৷ পুরুষতান্ত্রিকতা আর ধর্মীয় নিয়মের আড়ালে আত্মমর্যাদার দেখা পেতেন এমন নারী ছিলেন বিরল। তাই আঁতুড়েই মেয়ে সন্তান মেরে ফেলার প্রবণতা ছিল। মায়েরাও এমনকি মেয়ে হলে খুশি হতেন না। ভাবতেন, আপদ। কারণ যে জীবন তারা কাটিয়ে এসেছেন এর চেয়েও যে ভিন্ন কিছু হতে পারে তা দূরতম কল্পনায়ও ছিল না তাদের। পরবর্তীতে যখন ধীরে ধীরে নারীশিক্ষা চালু হল, তখনও মেয়েরা বাইরে বেরিয়ে কাজ করবেন, এমন ভাবনা আসেনি৷ সমাজপতিরা বা সমাজের বিচক্ষণ চালকেরা চাইতেন তাঁদের সহধর্মিণী যেন তাঁদের যোগ্য হয়, যেন ভালো করে ছেলেপুলে মানুষ করতে পারে, যেন সুনিপুণভাবে রান্নার কাজটা সারতে পারে। ব্যস! কিন্তু তাদের কর্মক্ষেত্রে সক্ষমতা এবং পদচারণ নিয়ে নানা কুসংস্কার থেকে বের হতে পারেননি অনেক গুণীজনও। অনেক পরে প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী যখন পরীক্ষা দিতে যান তাঁকে ইচ্ছেকৃত ফেল করিয়ে পুরুষ চিকিৎসকদের মাঠটা বজায় রাখতে চেয়েছিলেন পরীক্ষক। কিন্তু আগুনকে দমিয়ে রাখা যায় না কোনকালে। সংসার থেকে কার্যক্ষেত্র, সকল ক্ষেত্রেই নিজের মেধা এবং বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে গেছেন তিনি। বাঙালি নারীদের ধাপে ধাপে এই আরোহণটাই অন্ত:পুরের আত্মকথা নামে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় চিত্রায়িত করেছেন লেখিকা চিত্রা দেব। অনেক অজানা সংগ্রামী নারীদের কথা এবং তাঁদের কলমে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার একটা স্পষ্ট রূপ তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর ভাষায়৷ এমন নয় যে আজকের দিনে পড়তে বসলে গল্পগুলো রূপকথা লাগে। কারণ মেয়েদের অবস্থার অনেক অনেক পরিবর্তন হলেও সকল মেয়েরাই সেই সুবিধা পান বা সকলেই আত্মমর্যাদার অধিকারী তা কিন্তু নয়। এখনো অনেক পরিবার রয়েছে যারা মেয়েদের জন্মে খুশি হয় না। একজন চিকিৎসক হিসেবে যখন স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগে ইন্টার্নশিপ করি, তখন বাস্তব কদর্য অনেক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। শিউরে উঠেছি। অনেক পরিবারকে তো অহরহই দেখা যায় একের পর এক সন্তান নিতে একটি ছেলের আশায়। আল্ট্রাতে লিঙ্গ জানতে আগ্রহী এমন পরিবারের অভাব নেই। অন্ত:পুরের আত্মকথা পড়তে পড়তে কেবল আশ্চর্য হচ্ছিলাম সেইসব মহিয়সী নারীদের কথা ভেবে যাঁরা অসম্ভব প্রতিকূল সমাজব্যবস্থায় অবস্থান করেও অন্য রকম কিছু ভেবেছেন, করেছেন। তাঁদের আত্মসম্মানবোধ এবং নিষ্ঠা এই যুগেও বড্ড বেশিই দরকার এখনো।