প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ভুমুখিতার আকর্ষণে আমি ভারতকে বলেছি ‘মহাভারত’ – যাকে আগলে রেখেছে হিমালয় ও কারাকোরামের বিশাল বাহু আর একটি উপসাগর, দু’টি সাগর এবং একটি মহাসাগরের বিপুল-বিশাল জলরাশি। যদিও আজকে সে ভূখন্ড বহু-বিভক্ত ও সংকীর্ণ ভ্রাত্রিঘাতী-সংঘর্ষে রক্তাক্ত; তবু আমার বিশ্বাস – মানুষ এই রাজনৈতিক বিভাজনকে অতিসত্বর গৌণ করে তুলবে।
ভারত ভ্রমণ শুরু করেছিলাম ছাত্রজীবনেই। কাজে, চিকিৎসায়, পর্যটনে, শিক্ষা ও চিকিৎসার মধ্যে দিয়ে দেখেছি বিশাল এই দেশ, চিনতে চেয়েছি তার মানুষ, মেলাতে চেয়েছি আমাদের ইতিহাস এবং যোগসূত্র টেনেছি বিরোধের সুত্রসমূহে। কালের ধারাবাহিকতা সর্বত্র রক্ষা করা যায়নি তবু প্রেমকে বড় করার চেষ্টাই ছিল মূল লক্ষ্য।
নতুন ভ্রমণ-সিরিজের পঞ্চ সিঁড়ির দ্বিতীয় ধাপ এটি। অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ভেলোর, ব্যাঙ্গালোর, শ্রীরঙ্গপাটনা, মহীশূর, উটি, কোচিন, ত্রিবান্দ্রাম, কন্যাকুমারী, হায়দ্রাবাদ, মাদ্রাজ ও দিল্লী।
লেখক ও কবি বুলবুল সরওয়ার পেশাগত জীবনে একজন চিকিৎসক ও শিক্ষক। অসাধারণ কিছু ভ্রমণকাহিনী রচনার জন্য অধিক খ্যাত হলেও গল্প, কবিতা, উপন্যাসেও তাঁর অবাধ বিচরণ। এছাড়া অনুবাদ সাহিত্যে তাঁর শক্তিশালী অবদান রয়েছে।
#ভ্রমণকাহিনী_সপ্তাহ ৪র্থ দিন মহাভারতের পথে ২-বুলবুল সরওয়ার
ঢাকা মেডিকেল থেকে উদ্ভুত যত লেখকের বই পড়েছি বুলবুল সরওয়ার লেখক হিসেবে নিসন্দেহে তাদের মধ্যে সেরা।অনুবাদ দিয়ে শুরু হলেও খ্যাতি পেয়েছেন ভ্রমণসাহিত্যে।ভারতকে তিনি বলেন মহাভারত,তার ব্যপ্তির কারণে।এই ২য় খন্ডে স্থান পেয়েছে ভেলোর,ব্যাঙ্গালোর,শ্রীরঙ্গপাটনা,মহীশূর, উটি,কোচিন,ত্রিবান্দ্রাম,কন্যাকুমারী,হায়দ্রাবাদ,মাদ্রাজ ও দিল্লী।এই স্থানগুলোর বেশিরভাগ টিপু সুলতানের স্মৃতি সংবলিত,তাই মহীশুরের এই বীর সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায় এই বই থেকে। সত্যি বলতে ভ্রমণকাহিনী পড়ে এত মজা কখনো পাইনি,কারণ আমার কাছে ভ্রমণকাহিনী মানেই "কাজ"।হাতে কলম-পেন্সিল ও ফোনের ম্যাপ ও গুগল খুলে বসা।তাই মসৃণভাবে পড়ার বিলাসিতাটা হয়না।কিন্তু লেখক এখানে কাল্পনিক অনেক কথোপকথন ও চরিত্রের মাধ্যমে যে যে স্থানে গিয়েছেন সেই স্থানের একদম পুঙখানুপুঙখ ইতিহাস,লোকেশন তো দিয়েছেনই,তেমনি সমানভাবে আছে ধর্ম,প্রেম,মানবিকতা,রাজনীতির স্বরূপ উন্মোচনে দর্শন বিনিময়ী আলোচনা।তাই শুধু একটি পেন্সিল নিয়েই বাকি তিন হাত-পা ঝেড়ে পড়ার আনন্দটা পূর্ণ উপভোগ করতে পেরেছি।এতটুক ছিলো বই সম্পর্কে আপনাদের জন্য আমার মতামত।বাকি অংশ আমার নিজের জন্য,স্থানগুলোর নাম লিস্টি করা,বলা তো যায়না কখন যাওয়ার সুযোগ হয়।তখন আবার কে বই ঘাটতে যাবে?
★ভেলোর-ভেলোর দূর্গ (টিপু সুলতানের সন্তানদের ব্রিটিশরা আটকে রাখে এখানে)।এর উত্তর দিকে জালাকান্ডেশ্বরার মন্দির।CMC বা christian medical college বাংগালী রোগীদের তীর্থ,ভারতের প্রথম নার্সিং কলেজ এখানে শুরু হয়।
★ব্যাঙ্গালোর-কেম্পাগৌড়া রাজার গড়ে তোলা শহর।এখানে আছে টিপু সুলতানের বাবার তৈরি "লালবাগ" বা রাজকীয় বাগান ও টিপুর সামার প্যালেস।
★শ্রীরঙ্গপাটনা-কাভেরী নদী ঘেরা টিপু সুলতানের দূর্গ যা ইংরেজদের ঠেকিয়ে রেখেছিল বহু বছর অমাত্যদের বিশ্বাসঘাতকার আগে,আছে টিপু ও তার বাবা-মার কবর।কাঠের দোতলা প্রাসাদ-দরিয়া দৌলতবাগ।নানজানগুদে আছে টিপুর নির্মিত শ্রীকান্তেশ্বরা মন্দির।
★মহীশূর-দশেরা উৎসবের জন্য বিখ্যাত মহীশূর বা সিল্ক সিটি।আছে প্রতি রোববারে ঝলমলে আলোকসজ্জায় সেজে ওঠা ওয়াদিয়ার রাজাদের জাগমোহন প্যালেস।বৃন্দাবন গার্ডেন যেখানে কাভেরী নদীকে বাগে আনার জন্য টিপু সুলতাম কৃষ্ণরাজা ড্যাম তৈরি করেন।আছে ফিলোমিনা চার্চ-ইতালিয় ফিলোমিনার দেহাবশেষ আছে এখানে,যাকে সম্রাট ডায়াক্লোটিয়ান খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার অপরাধে হত্যা করেন।
★উটি-উটিকে বলা হয় দক্ষিণের দার্জিলিং,শুধু পাহাড়ের জন্য নয়-টয় ট্রেন ও আছে এখানে।চামুন্ডী পাহাড়ের উপরে আছে চামুন্ডী মন্দির,বিশ্বের ৩য় বড় নন্দী মূর্তি এখানে (বাকি দুটো বাহাদিশ্বরা,তামিলনাড়ু ও লেপাক্সি টেম্পল,অন্ধ্রপ্রদেশে).আর কফি,ইউক্যালিপটাস তেল,গান পাওয়ার,র্যাবিস ভ্যাক্সিন উৎপাদনের জন্য উটি বিখ্যাত।দক্ষিণের সবচেয়ে উচু শৃঙ্গ ডোড্ডাবেট্টা এখান থেকে দেখা যায়।আছে টেলিস্কোপিক হাউস।
★কোচিন-ভাস্কো দা গামা ভারতে নেমে কোচিনকে রাজধানী করেছিলেন।আর সী-ফুডের জন্য কোচিন বিখ্যাত।আছে ফোর্ট কোচিন,সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চ যেখানে প্রথমে ভাস্কো দা গামাকে কবরস্থ করা হয় (পরে তার মৃতদেহ লিসবনে ফিরিয়ে নেয়া হয়),সেন্ট জর্জ অর্থোডক্স কুনাল সিরিয়ান চার্চ,পরদেশী-সিনাগগ।আরো আছে বোলাগাট্টি দ্বীপ
★কেরালা/ত্রিবান্দারাম-কেরালার সবচেয়ে বড় ঐতিহ্য বোট-হাউস এবং ভাইপিন লাইটহাউস। আছে ত্রিকাক্কাকারা টেম্পল,সান্তা ক্রুজ গির্জা,চেরাই বিচ,কেরালা হিস্ট্রি মিউজিয়াম,চেরামান পেরুমার জুম্মা মসজিদ।কথিত আছে ওফির বা পুভার দ্বীপে হজরত সোলেমান নোঙর ফেলেছিল।কেরালার রাজধানী ত্রিবান্দারামে আছে নেপিয়ার মিউজিয়াম,কনকাকুন্নু প্যালেস,পদ্মনাভাস্বামী টেম্পল।
★কন্যাকুমারী-স্বামী বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়ালে স্বামীজি দিব্যদর্শন লাভ করেছিলেন বলে শোনা যায়।এই দ্বীপে আছে আশ্রম যা বেলুড় মঠের আদলে করা আর ধ্যান-কেন্দ্র।তবে কন্যাকুমারীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তিন সাগরের মিলন-আরব সাগর,বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর।রাতে আলোকিত থাকে ভগবতী সাম্মান টেম্পল।মহান কবি থিরুভাল্লুর ভাস্কর্যের কাছে আছে সানরাইজ পয়েন্ট।
★হায়দ্রাবাদ-পৃথিবীর বৃহত্তম হৃদয় আকৃতির লেক-হুসেইন সাগর আছে এখানে।আর জিব্রাল্টার দ্বীপ নামক স্থানে আছে বিশ্বের বৃহত্তম বৌদ্ধ মূর্তি।সাইদানি মায়ের মাজার,মক্কা মসজিদ ছাড়াও আছে চৌমহলা প্যালেস যার ছবি প্রচ্ছদে আছে,এখানে আছে বিশাল এক প্রাচীন ঘড়ি,এমনই আরেকটি ঘড়ি সালারজাঙ জাদুঘরে (এই জাদুঘরের প্রধান আকর্ষণ জিওভানি মারিয়া বেঞ্জোনির "ভেইলড রেবেকা" ভাস্কর্য যা পৃথিবীতে ৪ টা আছে,বাকি ৩ টি আমেরিকায়)।ফালাকনুমা প্যালেস ছিলো নিজামদের খেলাঘর,এখানের বিলিয়ার্ড টেবিলকে পৃথিবীতে দুটি আছে-আরেকটি বাকিংহাম প্যালেসে।কিং-কোঠি,গোলকুন্ডা ফোর্ট (যার ভেতরে আছে রাহবান কামান,তারামতি মসজিদ),কুতুবশাহী টম্ব।
★মাদ্রাজ-এই শহরের প্রথম স্থাপত্য সেন্ট জর্জ গীর্জা।তবে সবচেয়ে বড় উপাসনালয় কাপালিশ্বরা টেম্পল।৪৫ মিটার উচু লাইটহাউজের পাশে বিখ্যাত স্যানথম চার্চ (যিশুর ১২ শিষ্যের মধ্যে ৩ জনের সমাধি আছে-ভ্যাটিকানের সেন্ট ব্যাসিলিকায় সেন্ট পিটারস,স্পেনের গ্যালিসিয়ায় সেন্ট জেমস আর সেন্ট ফ্রান্সিস হলো এই স্যানথমে)।এখানে চোলামন্ডল পল্লী হলো ভারতের একমাত্র "শিল্পীদের গ্রাম"।আরো আছে সেন্ট মেরি চার্চ (ভারতে খ্রিস্টানদের প্রথম বিজয় ঘটে এখানে,এবং লর্ড ক্লাইভ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এলিহু ইয়েলের বিয়ে হয় এখানে)।বিনোদনের জন্য আছে গোল্ডেন বীচ,ভারতের একমাত্র কুমির ফার্ম ও মাদ্রাজে,আরো আছে গিন্ডি স্নেক পার্ক,আরিগনার-আন্না চিড়িয়াখান,কার্ল স্মিথ মেমোরিয়াল,ওয়ার সিমেটারি,আমির মহল,ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।