যার আসার কোনো তিথিই নেই, সেই "অতিথি"। অতিথি গল্পের প্রধান চরিত্র হচ্ছে তারাপদ। মানুষের সাথে কথা বলায় সে যেমন সিদ্ধহস্ত, তেমনি মানুষকে আপন করে নেয়ায়ও। তারাপদের কোনো নির্দিষ্ট বাসস্থান নেই, তরঙ্গের মত সামনে ভেসে চলাই যেন তার জীবনের উদ্দেশ্য। 'জীবনস্মৃতি'তে যে রবীন্দ্রনাথকে আমরা দেখেছি, জানালার সামনে বসে থাকা বালক, সমগ্র সময় প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করে আনন্দ উপভোগ করে, ঠিক সেরকম একটি ভঙ্গিমা তারাপদ চরিত্রটির মধ্য দেখতে পাই। রবীন্দ্রনাথ যেমন সুদূরের পিপাসা দেখতে দেখতে পেয়েছিলেন, বিপুলের বাঁশরী শুনতে পেয়েছিলেন,ঠিক যেন তেমনি এক কিশোর তারাপদ। ঘরছাড়া কিশোর, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে, বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি তার অমোঘ আকর্ষণ, বিভিন্ন বিষয় সে জানতে ভালোবাসে। সে সঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্রে যেমন আকৃষ্ট হতো, তেমনি প্রকৃতির পাখির ডাক, নদীর শব্দ, বৃষ্টির শব্দ, দুপুর বেলার চিলের ডাক, শ্রাবণ ধারার ব্যঙের ডাক, সমস্ত কিছু তার ভালোলাগতো। সে সমস্ত কিছুর সাথে মিশে যেতে চাইতো, সে প্রকৃতির সন্তান, গৃহী নয়।
আবার চারুশশী হচ্ছে বালিকা নায়িকা, তার সেভাব বোঝা দুর্ভেদ্য প্রহেলিকার মতো। সে যেমন জেদ করতে জানে, তেমনি ভালোবাসতেও জানে৷ আবার তার ভালোবাসার সামগ্রীকে ভাগ করে নিতে জানে না। তাই বাবা মায়ের আদরের ভাগ যখন তারাপদ পাচ্ছিলো, তখন সে তারাপদকে সহ্য করতে পারছিলো না, আবার বান্ধবী সোনামণি যখন তারাপদের সাথে মিশতে আসতো তখনও সে আপত্তি জানাতো। তারাপদের পড়াশুনা করার সময় সোনামণি এলে সে বিরক্তি জানাতো যে কেন সে তারাপদের শিক্ষায় ব্যঘাত ঘটাচ্ছে, অথচ তারাপদকে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করতো সে নিজেই।
জমিদার মতিলালবাবু আর স্ত্রী অন্নপূর্ণার মাঝে স্নেহপরায়ণ মাতা-পিতার সব গুণাগুণ দেখা যায়। তারা তারাপদকে স্নেহ করতো নিজের সন্তানের মতই, তার গুণে, গান শুনে মুগ্ধ হতো।
বিয়ের প্রায় ঠিক হয়ে যাবার প্রাক্কালে সবাইকে ছেড়ে তারাপদের নতুন অভিযাত্রা এই গল্পটির সবচেয়ে ট্রাজিক অংশ, মনে নাড়া দিয়ে যায়।