হঠাৎ করেই পরিচিত পৃথিবীটা পালটে যেতে থাকে কাজলের চোখের সামনে। নানাবাড়িতে কাজল আর তার মাকে রেখে বাবা চলে গেছেন যুদ্ধে। অসহনীয় এক জীবনে সে আটকা পড়ে। স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে যেন নিজের ভেতরেই নিজেকে খুঁজতে থাকে কাজল। অবশেষে নানাভাইয়ের কাছে আশ্রয় চায় সে। তারপর?
তার হাতে উঠে আসে আশ্চর্য এক প্রদীপ। নানাভাইয়ের ভাষায় ঘিয়ের পিদিম।
সুগভীর কাহিনি, চিরপরিচিত চরিত্রদের উপস্থিতি আর চিত্ররূপময় বর্ণনা মিলিয়ে ঘিয়ের পিদিম হয়ে উঠেছে অনবদ্য এক কিশোর উপন্যাস। আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোরসাহিত্যে এই উপন্যাস আরো একটি উজ্জ্বল সংযোজন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভীষণ মায়াকাড়া একটা ছোট্ট পরিসরের কিশোর উপন্যাস। হলদে রঙের প্রচ্ছদের সাথে মিলিয়ে ভেতরে হলুদ-কালোর মিশেলে খুব সুন্দর কিছু ছবি সংযোজন করা হয়েছে। গল্পটা পড়তে গিয়ে নিজের অজান্তেই কখন যেন বারো বছরের কাজলের চোখ দিয়ে গ্রামটাকে দেখেছি, ঘুরে বেড়িয়েছি একাত্তরের সেই ভয়াল সময়টায়। নানাভাইয়ের মুখে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প শুনতে শুনতে ইচ্ছেপূরণ প্রদীপ হাতে আশায় বুক বেধেছি। কল্পনার জগতটাকে খুব বাস্তব বলে মনে হচ্ছিল পুরোটা সময় জুড়ে।
ফ্ল্যাপের কথাটার সাথে আমি পুরোপুরি একমত। সুগভীর কাহিনি, চিরপরিচিত চরিত্রদের উপস্থিতি আর চিত্ররূপময় বর্ণনা মিলিয়ে ঘিয়ের পিদিম হয়ে উঠেছে অনবদ্য এক কিশোর উপন্যাস। আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোরসাহিত্যে এই উপন্যাস আরো একটি উজ্জ্বল সংযোজন।
বইয়ের ছোট্ট একটা অংশ উল্লেখ না করে পারলাম না :
"ছেলের শোকে রতনের মা এক একদিন পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসে। তবে বেশিক্ষণ কাঁদতে পারে না। কান্নাকাটির সম্ভাবনা দেখলেই মেজ মামি হাড়ি ধরে চালের কাঁকর বাছতে দিয়ে যায়, নয়তো অন্য কোন কাজ। কাজ হাতে পেলে রতনের মায়ের মাথা অনেকটা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। কাজল ভাবে, সারাদেশে এমন কতজন মা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে চালের কাঁকর বাছছে। দেশটা স্বাধীন হবে কবে?"
সময়টা ১৯৭১ ঢাকায় পাকিস্তানি আর্মির ধ্বংসলীলা শুরু হয়ে যাওয়ায় কাজল তার মা-বাবার সাথে নানাবাড়িতে চলে এসেছে। তাদেরকে রেখে তার বাবা আবার ঢাকায় ফিরে গেছেন বলে সবাইকে বললেও আসলে তিনি গেছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে।
মামা-মামী মামাতো ভাই-বোন নিয়ে জমাটি সংসার সেখানে। রাত্রে চোর এসে চুরি না করে পুরনো আত্মীয়র মতন ঘুরাঘুরি করে বাড়িতে, গায়ের পুকুরে চলে মাছ ধরার ধুম.....নানান সব বর্ণনায় উঠে আসে যেন শান্তিময় গ্রামখানি। কিন্তু সেখানেও হাজির হয় পাকবাহিনী। ছুটে চলে শরনার্থীদের মিছিল।
কাজল ঘিয়ের পিদিম হাতে মনে মনে চাইতে থাকে তার বাবা ফিরে আসুক, দেশ স্বাধীন হোক, শান্তি হোক। নানাভাই যেমন বলেছিল ঘিয়ের পিদিম কি তেমন করে ইচ্ছে পূরণ করতে পারে?
খুব খুব মিষ্টি একটা বই। ছোট ছোট সহজ বাক্যে কি সুন্দর বর্ণনা। একটানে পড়ে শেষ করলাম।
৩.৫/৫ "ভর বিকেল।মাথার ওপরে নীল আকাশ।পশ্চিমের মেঘে কমলারঙা রোদ।হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যায় ছাদের ওপর দিয়ে।ইটের রেলিঙের ওপর প্রদীপটা রাখে কাজল।'পিদিম,আর কিছু চাই না-একটা দেশ চাই।একদম আমাদের নিজেদের একটা দেশ।' শেষ বিকেলের রোদ এসে পিদিমের কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে থাকে।"
Well, the book is well written and it is very much enjoyable. The cover is very cute, loved it. Should there be more of the story? Probably, yes. Some extra pages would make it more palatable. Well done. Good book as a কিশোর উপন্যাস।
বহুদিন যাবত কিশোর উপন্যাস পড়া হয়না... আজকাল হরর, থ্রিলার এসবের নিচে কৈশোরের ইনোসেন্স চাপা পড়েছে। খুন-খারাবি, গালিগালাজের ভরা উপন্যাস পড়ে লাভের লাভ কিছু হচ্ছে না, বরং দুনিয়াটাকে দেখার ভঙ্গিমা আরেকটু কর্কশ হচ্ছে। মেজাজ চড়ে যায় মাঝে মাঝে কেন এসব না পড়ে একটু ধিরস্থির ধরনের শান্ত উপন্যাস পড়িনা কেন। সেই ভাবনা থেকেই যখন দেখলাম, অনলাইন এক বুকশপে এই বইটার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে- কিনে ফেললাম। বিশেষ করে হলুদ রঙ্গা প্রচ্ছদে যে ছেলেটার মায়ামায়া ছবি দেখা যাচ্ছে- প্রথম্বার দেখেই কেন যেন মন টানছিল।
বই হাতে পেয়ে দেখি সেবা প্রকাশনীর বইয়ের পেপারব্যাক সাইজের বইটা, ছোট্ট! পড়া শুরু করতেই ডুবে গেলাম। সত্যি বলতে আমি কিন্তু এই লেখকের লেখা আগে পড়িনি। এটাই সম্ভবত প্রথম এবং প্রথমবারেই ছক্কা- লেখনী আমাকে মুগ্ধ করেছে, অসম্ভব মুগ্ধ করেছে। এক বসায় পড়েছি বইটা।
গল্পের কাহিনী নিয়ে কিছু বলতে চাই না। কারণ ছোট্ট বই- রিভিউ একটু এদিক ওদিক হলেই মজা নষ্ট হয়ে যাবে।
প্রথম কথা, বইটা খুব মিষ্টি, গল্পটায় আমার প্রিয় লেখক বিভূতিভূষণের ছোঁয়া এসেছে। নির্ভেজাল সুন্দর একটা গ্রাম-- সেই গ্রামে কিশোর বয়সী একটা ছেলে এদিক ওদিক ঘুরছে- অনেকটা অপুর কথা মনে পড়ে... আবার অপূর্বের ছেলে কাজলের কথাও মনে পড়ে... সেই কাজল, আর এই কাজল, তফাৎ বেশি নয়। এর বেশি বলা যাবে না। গল্প পড়তে পড়তে রিভিল হবে, মিল আছে নাকি নেই।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বর্ণনা যতোটুকু এসেছে প্রয়োজনের বেশি একতুও নয়। কারণ এটা কিশোর উপন্যাস, এবং কিশোরের দৃষ্টিভঙ্গিতে এটুকুই যথেষ্ট। লেখকের পরিমিতিজ্ঞান অনেকটাই নিখুঁত কারণ এরচেয়ে বেশি চলে আসলে গল্পটা বাস্তবতা-ঘেঁষা নয়, ফ্যান্টাসি হয়ে যেত।
ভাষা খুব সরল এবং সুন্দর। আমি নিজে লিখতে গেলে হাজারটা প্যাঁচ চলে আসে। কেন জানিনা। এইজন্যই হয়তো আমাকে সরল লেখনী খুব বেশি মুগ্ধ করে।
গুড রিডসে রেটিং দিয়েছিলাম- ৪/৫ এবার পাঁচে পাঁচ দিচ্ছি কারণ এই বই আমাদের বাসার সব বাচ্চার হাতে হাতে ঘুরছে এবং আস্ত ফিরে পাই কিনা সন্দেহ। বহুদিন পর আমার বাসার হতচ্ছাড়া পাজিগুলোর হাতে বই উঠতে দেখে আমি যারপরনাই খুশি।
দাদাকে এই কথা বলতে তিনি প্রতিবাদ জানালেন- এটা তো শিশুদের বই না, কিশোরদের বই!
আরে আজিব, শিশু হোক বা কিশোর, বই পড়লেই আমি খুশি, খালি পাকনা বইগুলি না পড়লেই হয়! -_-
“স্বাধীনতা ছাড়া একটি জীবন মানে আত্মা ছাড়া শরীর।” – কাহলিল জিব্রান
আমাদের জীবন কতটা বৈচিত্রময়। ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ বদলায়। বলা যায় আমরা বেচে থাকি আশায়। মানুষের জীবনে আশা না থাকলে বেচে থাকাটাই দায় হয়ে যেত। তাই মানুষের জীবন আবর্তিত হয় তার আশায়। মানুষ আশা নিয়েই এগিয়ে চলে। জীবনের প্রতি তার ভাল লাগা খারাপ লাগা সব কিছুই আবর্তিত হয় তার আশাকে ঘিরেই। ছোট বড় সকল কিছুর আকাঙ্ক্ষা বা পাওয়ার ইচ্ছেটাই মানুষকে বাচিয়ে রাখে।
সময়টা এক দুঃস্বপ্নের, এক যুদ্ধের, এক জাতির বেচে থাকার লড়াই। গল্পটা এক কিশোর বয়সী ছেলের যে পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতা দেখে ফেলেছে। যে তার কৈশরের দিন গুলোতে বেচে আছে আশা নিয়ে। ছেলেটি দেখেছে কিভাবে মানুষের জীবন হুট করেই পরিবর্তন হয়।
সাল ১৯৭১, বাংলাদেশ নামে একটি দেশের মাথা উচু করে বাচার লড়াই শুরু হয়। সেই লড়াইয়ে অনেক মানুষ তাদের ঘর বাড়ি ছেড়ে জীবন বাচানোর জন্য ছুটে চলে দেশ থেকে দেশান্তরে। ঠিক এমন এক পরিবারের সদস্য কাজল। যে বড় হয়েছে শহরে। যার কাছে গ্রাম ছিল শহর থেকে বেড়াতে আসার মত। কিন্তু এবার জীবনের জন্য তাকে গ্রামে আসতে হয়েছে। আর তার বাবা চলে গিয়েছে দেশ স্বাধীন করতে। কিন্তু কাজল জানে না আসলে স্বাধীনতা কি।
কাজল ও তার মা উঠেছে নানা বাড়ির একান্নবর্তী পরিবারে। যুদ্ধের ঘোষণা অনেক আগেই হয়েছে। সেই সাথে গ্রামে মিলিটারি আসতে পারে এমন সম্ভাবণাও রয়েছে। এমন সময় দুজন মানুষ হুট করেই চলে আসলে তাকে আপদ মনে করা হয়। এ কারণে কাজলের মানে ঘরের সব কাজই করতে হয়। মাঝে মাঝে কাজল কে বাইরের কাজও করতে হয়। কাজল মনে মনে ভাবে বাবা একদিন ফিরে আসবে।
একদিন কাজল দেখে তার নানা ভাই বই পড়েছেন। তার বিশাল বইয়ের সংগ্রহে অনেক বই রয়েছে। একদিন কাজল দেখে নানাভাই অবনীন্দ্রনাথের লেখা উনিশ'শ ষোলো সালে বের হওয়া বই নালক পড়ছেন। কাজলকে দেখেই ডেকে পড়ে শুনান, নানাভাই বইটা তুলে জানালার দিকে একটু কাত হয়ে পড়তে থাকে- 'কাঠুরেরা কোনো-কোনো দিন কাঠ কেটে বন থেকে ফিরে আসতে দেখে, গাছের তলা আলো করে সোনার কাপড়-পরা দেবতার মতো এক পুরুষ! সবাই বলত, নিশ্চয় ওখানে দেবতা থাকেন!
কিন্তু দেবতাকে স্পষ্ট করে কেউ কোনোদিন দেখেনি- পুন্না ছাড়া। মোড়লের মেয়ে সুজাতা বিয়ের পরে একদিন ওই বটগাছের তলায় পুজো দিতে গিয়ে পুন্নাকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। সেই থেকে সে মোড়লের ঘরে আর-একটি মেয়ের সমান মানুষ হয়েছে। এখন তার বয়স দশ বছর। মানত করেছেন যদি ছেলে হয় তবে এক-বছর বটতলায় রোজ ঘিয়ের পিদিম নিয়ে নতুন বছরের পূর্ণিমায় ভালো করে বটেশ্বরকে পুজো দেবেন। সুজাতার ঠাকুর সুজাতাকে একটি সোনারচাঁদ ছেলে দিয়েছিলেন, তাই পুন্না রোজ সন্ধ্যাবেলা একটি ঘিয়ের পিদিম দিতে এই বটতলায় আসে।'
নানা ভাই কাছে ডাকেন কাজলকে, পুরোনো সুটকেস থেকে বের করে দেন একটা ঘিয়ের পিদিম। একশ চল্লিশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মানিক নামের ছেলেটা যখন পুঁটলি কাঁধে আবার ফিরে এসেছিলো, এই পিদিম উপহার দিয়েছিলো এ বাড়ির কর্তাকে। নানাভাই বলে উঠেন এ পিদিম কোনো সাধারণ পিদিম নয়, এ হচ্ছে ইচ্ছেপূরণের প্রদীপ।
কাজল পিদিম হাতে নিয়ে ফিসফিস কন্ঠে বলে উঠে, 'আমি আমার বাবাকে চাই, পিদিম। যেখানেই থাকুক ফিরে আসুক। আর কিছু চাই না, একটা দেশ চাই। একদম আমাদের নিজেদের একটা দেশ।
লেখক নিলয় নন্দীর লেখা প্রথমবারের মত পড়লাম। লেখা বেশ সাবলীল ও প্রঞ্জল। পড়া শুরুর আগে সেভাবে ভাবিনি বইটি কেমন হবে। এমনটি কোন লেখা বা রিভিউ কিছু না। তাই বইটি বেশ ভাল লেগেছে। মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা বরাবর আমার কাছে একটু বেদনাদায়ক। আমি সাধারণ কষ্টের বই কম পড়ি। তবুও বই আমার কাছে ভাল লেগেছে।
যদিও বইটি কিশোরদের জন্য লেখা হয়েছে। তাই বড়দের ক্ষেত্রে সেই আবেগ বা অনুভূতি সেভাবে কাজ নাও করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বইটি আপনাকে ধরে রাখবে। লেখক তার লেখায় এই মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন বলেই বইটি অনন্য হয়ে উঠেছে।
আবার অপরদিকে লেখাক একজন কিশোরের মনস্তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরতে গিয়ে কিছু জায়গা খেই হারিয়েছেন। কিশোর বয়সে হলেও তাকে আরও ছোট বলে মনে হয়েছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সাথে পরিবারের ঘটনার সমান্তরাল ভাবে চলার চেয়ে কাজলের গল্পটি বেশি এসেছে। বলা যায় মুক্তিযুদ্ধের অংশটুকু না থাকলেও গল্পে সেভাবে প্রভাব পরত বলে আমার মনে হয় না।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় সত্য ইতিহাস। যার সাথে জড়িয়েছে আমাদের সুখ দুঃখ হাসি কান্না আনন্দ বেদনা। প্রতিটি মানুষের একটি করে গল্প রয়েছে। যা হয়ত আজও জানা যায়নি। কোন দিন হয়ত আমরা জানব।
১৯৭১ সাল! আমাদের মুক্তিযুদ্ধ! আর কিছু মানুষের গল্প!
মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় যারা জীবিত ছিলেন, সেই সময়কাল চাক্ষুষ দেখেছেন— কেমন গিয়েছিল তাদের সময়? কী পরিস্থিতিতে দিন কাটিয়েছেন তারা? মাঝেমাঝে প্রশ্ন জাগে না? প্রতিনিয়ত মৃ ত্যু ভয় জাঁকিয়ে বসে। এই বুঝি তারা এলো। মেশিনগানের শব্দে বু লে ট এসে বিঁধবে, জীবনের শেষ হয়তো এভাবেই হবে। এত শঙ্কা নিয়ে কি বেঁচে থাকা যায়?
আমাদের এই গল্পটা কাজল নামের একটি ছেলের। বয়স ধরা যাক— বারো বা তার কিছু বেশি। ঢাকা শহরে মানুষ সে। কিন্তু এই গ্রামীণ পরিবেশে এসে নতুন করে জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছে। সেদিন মধ্যরাতে ঢাকার বুকে যেন ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়ে গিয়েছিল। রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছিল একদল বর্বরদের আক্রমণে। নির্মমতার সাক্ষ্য রেখে যাওয়া ঢাকা ছেড়ে অনেকেই পালিয়ে এসেছে। জীবন যে বাঁচাতে হবে। তাদের মধ্যে ছিল কাজলরাও।
সেদিনের পর থেকে নানাবাড়ীতে ঠাঁই মেলে। বাবা তাকে আর মাকে রেখে সেই যে চলে গেল, আর এলো না। জানা যায়, দেশকে স্বাধীন করার জন্য তার যুদ্ধে যাওয়া। প্রতিনিয়ত যু দ্ধের দামামা বাজছে। আর আতঙ্কে কাটছে গ্রামবাসীর এই বুঝি মিলিটারি এলো। সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিবে।
কাজলের দিন কাটে নিজের মতো করে। দুয়েকজন বন্ধু জুটে গিয়েছে। তাদের সাথে খেলাধুলা করে সময় কাটে। গ্রামীণ এই পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে সে। সেদিন বৈদ্যনাথতলায় গিয়ে দেখে এসেছে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া। তারপরও শহুরে পরিবেশে বড়ো হওয়া একজন কিশোরের গ্রামে মন টিকবে কেন?
প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে প্রিয়জনের কথা মনে পড়ে। কাজলের মনে পড়ে তার বাবাকে। বাবার কথা চিন্তা করে মা-ও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আশ্রিত হয়ে থাকার যন্ত্রণা অনেক। মানুষের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়, কথা শুনতে হয়। কাজের চাপ পড়ে। যে যা বলে, তা-ই করতে হয়! নিজস্ব বলে কিছু থাকে না।
কাজলের মন খারাপ হয়। বাবাকে পেতে ইচ্ছে করে। কোথায় আছে তার বাবা? কী অবস্থায় আছে? অন্তু নামের ছেলেটার খোঁচাখুঁচি স্বভাব। বলে, যু দ্ধে না-কি তার বাবাকে মে রে ফেলেছে মিলিটারি। নানাকে গিয়ে আক্ষেপের গল্প বলে সে। অনেকগুলো সময় দেখা নানার কথাতেই শান্ত হয় কাজল। পেয়ে যায় নতুন করে বেঁচে থাকার উপাদান।
লেখক নিলয় নন্দীর বই প্রথমবার পড়লাম। এটাই যেন লেখকের লেখার প্রতি মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। দারুণ লেখনশৈলী তার। জীবন্ত গল্পের রাশ ভালোই টানতে পারেন। বর্ণনাতে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিতে পড়েছেন। বইটির সবচেয়ে যে দিক ভালো লেগেছে, তা হলো একান্নবর্তী পরিবারের কথা। সব একসাথে আছে। রেষারেষি চলছে, খোচাখুচিও চলে। কিন্তু সব শেষে সবাই আবার এক হয়ে যায়। বিপদে সবাই এক থাকে, পাশে থাকে। হইচই করেও একসাথে। একসাথে থাকতে গেলে যেসব অনুভূতির সাথে পরিচয় হওয়া দরকার প্রতিটি ছিল বইটিতে।
“ঘিয়ের পিদিম” বইটি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গল্প। মুক্তিযুদ্ধের সময়টা প্রতিটি মানুষের খুব কঠিন কেটেছে। যারা সেই সময়ে দিনাতিপাত করেছে, কেবল তারা-ই বুঝবে এই কাঠিন্য। যেখানে জীবনের নিশ্চয়তা নেই, আছে প্রিয়জন হারানোর শঙ্কা— সেখানে একটু একটু করে মানুষ বদলে যায়। চেনা জগৎ অচেনা হয়ে যায়। পুরনো পৃথিবীর কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না।
সেই সময়টায় জীবন বাঁচানোর জন্য দলে দলে দেশের সীমানা পার হচ্ছিল মানুষ। তাদের জীবনের গল্প এখানে ভালোমতো ফুটে উঠেছে। নিজের প্রিয় জিনিসপত্র ছেড়ে, নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য দেশে স্থান নেওয়া খুব একটা সহজ না বোধহয়। প্রিয় বন্ধুগুলোও একদিন চলে যায়। জানানোর প্রয়োজনও মনে করে না। হয়তো সে ইচ্ছেই করে না।
জীবনে এমন সময় আসে, মানুষ তখন ভরসা হারিয়ে ফেলে। কিছুতেই আর নিজের প্রতি বিশ্বাস আসে না। তখন এমন কিছুর দরকার পড়ে, যা তার ভরসা ফিরিয়ে আনতে পারে। ম্যাজিকাল কিছু, যায় ছোঁয়ায় ভেতরে ভেতরে গুঁড়িয়ে যাওয়া নিজেকে নতুন করে ফিরে পাওয়া যায়। হয়তো ম্যাজিক বলে কিছু থাকে না। কিন্তু যে বিশ্বাস নিজের ভেতরে থাকে, সেই বিশ্বাস প্রস্ফুটিত হয়। নিজের ভেতরের বাস্তব জাদুতেই সব পূরণ হয়।
মুক্তিযুদ্ধের গল্পে সবসময় আমরা যু দ্ধ, গো লাগু লি পড়ে অভ্যস্ত। এখানে তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। মূলত মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একটি পরিবার কীভাবে দিন যাপন করেছে, তার চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক। সেই সাথে সেই সময়ের জীবনধারার সামান্য কিছু অংশ দেখাতে পেরেছেন। সেই সাথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় ছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের সময়কাল। লেখক তার লেখনীতে তা-ও দেখিয়েছেন।
এই গল্পের মূল চরিত্র কাজল। যার পথ ধরেই মূলত গল্পগুলো জানতে পারি। কিশোর বয়সী এক ছেলে হয়তো পুরোটা মেলে দিতে পারেনি নিজেকে, তারপরও যে গল্পগুলো উঠে এসেছিল সব প্রানবন্ত ছিল। প্রতিটি চরিত্রকে মনে রাখার মতো। নানার মতো ভালো মানুষ যেমন ছিল, অন্তুর মতো ইঁচড়ে পাকা ছেলেও ছিল। যার কাজ হচ্ছে খোঁচা দিয়ে কথা বলা।
পরিশেষে, কিছু বইয়ের শেষে তৃপ্তিদায়ক অনুভূতি হয়। স্বাদ লেগে থাকে অনেকক্ষণ। “ঘিয়ের পিদিম” বইটার শেষটা অমনই। আরো একটি বই পছন্দের তালিকায় প্রবেশ করল। ছোট্ট এই উপন্যাসিকা পড়তে বেশিক্ষণ লাগে না। কিন্তু মস্তিকের মধ্যে এর রেশ থেকে যায়। কতদিন?
অস্থিতিশীল একটা সময়। শহরে ধীরে ধীরে মিলিটারি ঢোকা শুরু করেছে সেজন্য শহর থেকে গ্রামের দিকে ছুটছে মানুষ। আবার যখন শহর পেরিয়ে মিলিটারি গ্রামে ঢোকা শুরু করে তখন আবার গ্রামের লোকজন পাড়ি জমানো শুরু করে বর্ডার পার হয়ে ভারতে। শহরে মিলিটারি আসায় কাজল তার মায়ের সাথে গ্রামে তার নানাবাড়ীতে এসেছে। কাজলের বাবা আর গ্রামে আসেনি তার বাবা গিয়েছে মিলিটারির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে। নানাবাড়ীতে এসে গ্রাম থেকে পরিচিত মুখগুলোর ভারতে চলে যাওয়া আর ঠিক ৭১ এর সেই সময়ের একটা সাময়িক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে বছর বারোর ছেলে কাজলের মাধ্যমে। আর এই সময়টাকে নিজের মত করে নিলয় নন্দী তার 'ঘিয়ের পিদিম' বইতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
শুরুতেই বলি এটা একটা কিশোর উপন্যাস কিন্তু সব শ্রেণির পাঠকরাই পড়তে পারবেন। লেখকের কোনো বই পূর্বে পড়া হয়নি তাই পাঠচক্রের মাধ্যমে বইটা হাতে আসায় প্রথমেই এটা পড়তে শুরু করি। সত্যি বলতে বইটা শুরুর দিকে একটু এলোমেলো লেগেছে আমার। কাহিনী মনে হয়েছে কেমন যেন পর্যায়ক্রমিক না। হুট করেই এটা সেটা ঘটে যাচ্ছে কিন্তু পরবর্তীতে যখন চিন্তা করলাম আসলে এমনই ত হয়। একটা দেশে যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন তো হুট করেই সব সিদ্ধান্ত নিতে হয় হুট করেই পালটে ফেলতে হয় সবকিছু। এখানেও তাই। কাজলের মাধ্যমে লেখক সেসময়ে দেশের গ্রামীণ জীবনগুলোর সামান্য একটা চিত্র তুলে ধরস্র চেষ্টা করেছেন। তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন কোনো পরিবারের ভেতরকার ঠান্ডা কলহ। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে লেখক বেশ ছোট ছোট জিনিসও তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন যেটা সাধারণত বইটা পড়তে অন্য একটা মাত্রা যোগ করেছে। একদম শেষদিকে এসে লেখক খুব সুন্দরভাবে সমাপ্তি টেনেছেন বিশেষ করে শান্ত একটা চরিত্রের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে যে শক্তি সঞ্চার করিয়েছেন সেটা আসলেই মনে রাখার মত। সব মিলিয়ে বইটা বেশ ভালো লেগেছে।
তবে সাধারণত বইয়ের কভার কেমন হলো সেটা তেমন খেয়াল করা হয় কম কিন্তু এই বইটার ক্ষেত্রে মনে হলো বইটার আরো ভালো প্রচ্ছদ প্রাপ্য। একদম সাদামাটা প্রচ্ছদ হয়েছে এমনকি ভেতরের গ্রাফিক্স এর কাজগুলোও আরো চালো করলে বইটা পড়ার সময় আরো ভালো মনে হতো।
‘ভাবো, তুমি এমন একটা সুন্দর জীবনে পৌছাতে চাচ্ছ যে জীবন তোমার আগে কখনো ছিল না। তাহলে? তোমাকে তো সেই কাজগুলোই সাহস নিয়ে করতে হবে যা তুমি আগে কখনো করোনি।'
যেন ফিঙের পালক দিয়ে লেখা- অবন ঠাকুরের লেখার বর্ণনা যেভাবে দিয়েছেন নিলয়, ওনার লেখার বর্ণনাও ওভাবেই দিতে ইচ্ছে হলো। মুক্তিযুদ্ধের এই জঁরার গল্পগুলো আমার কাছে সবসময় বেশি ভালো লাগে। সম্মুখযুদ্ধের বর্ণনা, গালি, উর্দুর মিশেলে বাঙলা, নিপীড়নের বর্ণনা- এগুলোর চেয়ে বড় যুদ্ধটা বোধহয় এটাই ছিল, পরিবারগুলোর যুদ্ধ। সন্তানের বাবা থেকে, স্ত্রীর স্বামী থেকে দূরে থাকার যুদ্ধ। নিলয় নন্দী অনাড়ম্বর আয়োজনে পরিমিতভাবে সেই যুদ্ধের বর্ণনাটা দেন৷ ছাপার কালির সাথে মিশিয়ে দেন কেমন যেন বিষাদ।
বইটা পড়তে পড়তে শেষে এসে আমার সুনীলের উত্তরাধিকার এর কথা মনে পড়ছিল।
‘নবীন কিশোর, তোমায় দিলাম ভূবনডাঙার মেঘলা আকাশ তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট আর ফুসফুস-ভরা হাসি তোমাকে দিলাম, নবীন কিশোর, ইচ্ছে হয় তো অঙ্গে জড়াও অথবা ঘৃণায় দূরে ফেলে দাও, যা খুশি তোমার তোমাকে আমার তোমার বয়সী সব কিছু দিতে বড় সাধ হয়।’
কাজল যেন সেই নবীন কিশোর, যাকে আমার তার বয়সী সবকিছু দিতে বড় সাধ হয়।
কিশোরদের উপোযোগী বলতে আমরা অতিরঞ্জিত লেখা বুঝি। আর মুক্তিযুদ্ধের লেখা মানে অ্যাডভেঞ্চার, গোলাগুলি ইত্যাদি। এই প্রথা ভেঙে "মুক্তিযুদ্ধ গভীরভাবে উপলব্ধি করার বিষয়" এই ব্যাপারটা বইটার মূল উপজীব্য। অথচ একইসাথে বইটা কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস
দাদার লেখার সবচে বড় দিক হচ্ছে উনার পরিমিতিবোধ। একটা কোন বাড়তি শব্দ নাই, আলাদাভাবে বিশেষণ প্রয়োগ না করেই পার্ফেক্ট বর্ণনা দিসেন। মেদহীন, ফেনাহীন ঝরঝরে লেখা পড়তেই মজা।
আর কিশোর উপন্যাস এবং মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস দুইটা জিনিস একসাথে সুন্দর ব্লেন্ড করসেন দাদা। এই কম্বিনেশনে কোনটার অনুপাতে গরমিল নাই, বাড়াবাড়ি নাই।
আবেগ, নাটকীয়তা এইসব ফুটানি নাই। মন ভালো করা একটা বই।
"ভর বিকেল। মাথার ওপরে নীল আকাশ। পশ্চিমের মেঘে কমলারঙা রোদ। হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যায় ছাদের ওপর দিয়ে। ইটের রেলিঙের ওপর প্রদীপটা রাখে কাজল।' পিদিম, আর কিছু চাই না-একটা দেশ চাই। একদম আমাদের নিজেদের একটা দেশ।' শেষ বিকেলের রোদ এসে পিদিমের কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে থাকে।"
ছোট আকারের ছিমছাম গল্প, সুন্দর। ভেতরে কিছু ইলাস্ট্রেশন আছে হলুদ-সাদা-কালোয় মেশানো, ঠিক প্রচ্ছদটার মতোই। তবে একটা অভিযোগ আছে—লেখাজোখা লেফট এলাইনড হবার কারণে পড়তে একটু কেমন যেন লাগল। চোখে লেগেছে বিষয়টা।
"সব কটা জানালা, খুলে দাও না আমি গাইবো, গাইবো বিজয়েরই গান ওরা আসবে, চুপি চুপি যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ।"
যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ, তাঁদের জন্য শ্রদ্ধা। সেই অশান্ত সময়টাতে আমি ছিলাম না, দেখিনি মুক্তিযুদ্ধকে কাছ থেকে। তবুও পড়েছি অসংখ্য বই, শুনেছি অসংখ্য ঘটনা। একটা স্বাধীন দেশের পতাকার জন্য র ক্তের লাল স্রোতধারা ভাসিয়েছে যে বীরের জাতি, লড়াই করেছে বুক ফুলিয়ে হানাদারদের সাথে, তাঁদের বিজয় ছিলো প্রাপ্য পুরস্কার।
আচ্ছা তখন আমি ছোট্ট কিশোরী যদি থাকতাম কাজলের মতো করে আমিও তো ভাবতাম আশেপাশের বদলে যাওয়া সময়ের কথা। সবাই কেমন আতঙ্ক নিয়ে জীবন যুদ্ধে এগিয়ে চলেছিল সেই সময়গুলোতে। নিজেদের জীবন বিপন্ন, আবার অর্থনৈতিক সংকটেরও রেশ আছে। সবদিকে বিপদ ছিলো সেই সময়ের মানুষগুলোর।
কাজলের কথা বলছিলাম না আমি, ওঁর বাবা গিয়েছেন ওঁর মা আর ওকে ফেলে যুদ্ধে। কাজল এসেছে গ্ৰামে তাঁর নানাবাড়িতে। ঢাকায় ওদের জীবনটা ভালোই কাটছিল। বাবা কেমন গল্প বলে স্কুলে নিয়ে যেতেন, স্কুল কামাই না করলে সপ্তাহে একদিন পেত সারপ্রাইজ। মিলতো অনেক ছোট ছোট উপহার। কাজল ভেবে রেখেছিল কত কিছু। হঠাৎ করেই মধ্যরাতে ঢাকার রাস্তায় শুরু হলো গোলাগুলির, পাকিস্তানীদের হ ত্যা য জ্ঞ।
নানাবাড়িতে একান্নবর্তী পরিবারের কাজলের খারাপ লাগে না। কিন্তু মামীরা মাকে পেয়ে খুব খাটায়। সব কাজ করিয়ে নেয় তাঁকে দিয়ে। কাজলের ভালো লাগে না এসব। বাড়িতে রতনের মা আছে কাজ করতে, সে অবশ্য কাজলের মাকে বেশি কিছু করতে দেয় না। লুকিয়ে করে ফেলে ভাগের কাজ। তবে পরের বাড়ীতে থাকতে হলে বোধহয় এসব করতে হয়। কাজল অনেক কিছু ভাবে, ভাবে আজ বাবা এভাবে না চলে গেলে হুট করে মাকে এত কাজ করতে হতো না। বাবার চিন্তায় মা কেমন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। বাবাটা যে কী!
কাজলের মামাতো ভাই অন্তুটা একটু দুষ্টু প্রকৃতির, সবসময় কাজলের পেছনে লেগে থাকে। অথচ আরেক মামাতো ভাই আসগর খুব শান্তশিষ্ট, ভালো ছেলে। আছে মামাতো বোন আসমা এবং বুলি খালা মাঝে মাঝে পড়াশোনা নেই বলে ধমক লাগান মিষ্টি করে। এছাড়া গ্ৰামের মদনা বলে ছেলেটি কাজলের খুব ভালো বন্ধু, ওঁর ভাই সুবল কাজলদার ভক্ত। দিনগুলো গ্ৰামের প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাজলের কেটে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে যুদ্ধের আঁচ টের পায় সে।
গ্ৰামের বাদল মামা, মদনার সাথে কাজল গিয়েছিল ঐতিহাসিক এক ঘটনার সাক্ষী হতে বৈদ্যনাথতলায়। সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ নিয়েছিল। কাজল দেখেছিল সেখানে জাতীয় চার নেতাকে। বহু লোকের জমায়েতে সেদিন কাজল দেখেছিল এক নতুন যাত্রার সূচনা, স্বাধীন বাংলাদেশের লক্ষ্যে যাত্রা। ওদিকে দলে দলে মানুষ চলে যাচ্ছে বর্ডার পার হয়ে। কাজলের সাথে দেখা হয় তাঁদের। সবার মাঝে বাঁচার তাগিদ। চলে যায় গ্ৰামের অনেক হিন্দু পরিবার। বন্ধু মদনারাও।
সময় এগিয়ে চলে, কাজল ভাবে এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে! একমাত্র নানাভাইয়ের কথায় সে মাঝে মাঝে একটু ভরসা পায়। নানাভাই যখন রেডিওতে যুদ্ধের খবর শোনেন কাজলও বসে পড়ে সেখানে। নানাভাই কাজলকে সাহস দেন। বাবার কথা ভেবে মন খারাপ করলে স্বান্তনা দেন প্রচুর বই পড়তে ভালোবাসেন নানাভাই। কাজলও মাঝে মাঝে নিয়ে পড়ে। কাজলের অস্থিরতা কাটাতে নানাভাই তাঁকে একদিন দিলেন এক অদ্ভুত জিনিস। কী সেটা?
এতক্ষণ বলছিলাম লেখক নিলয় নন্দীর লেখা বই "ঘিয়ের পিদিম" নিয়ে কথা। মানে কাজলের কথা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এক কিশোরের চোখে উঠে এসেছে সেইসময়কার ঘটনাগুলো। যা তাঁর মনে গেঁথে দিয়েছে নানান প্রশ্নের। কতটুকুই বা বয়স তাঁর, এই সব ভয়াবহতা তাঁর কাছে আসলেই তো নতুন। মেনে নিতে কষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক।
লেখক নিলয় নন্দীর বই প্রথমবার পড়া হলো। লেখকের লেখনী কিন্তু আমার কাছে চমৎকার লেগেছে। বিশেষ করে গ্ৰামীন পটভূমির বর্ণনা। গ্ৰামের প্রকৃতি, মানুষজনকে খুব সুন্দর ফুটিয়ে তুলেছেন। পড়তে খুব স্বস্তিদায়ক লেগেছে। এবং মনে হচ্ছিল আমি ওখানে আছি। কাজলের সাথে হেঁটে বেড়াচ্ছি। প্রতিটি বর্ণনা খুব ভালো লাগলো।
এটা মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কিশোর উপন্যাস তো যুদ্ধের সময় থাকবে না সেটা কী হয়! এখানেও লেখক বেশ ভালো ছিলেন। যুদ্ধের সময়কার কঠিন কঠিন বিষয় নয়। আমার কাছে মনে হয়েছে তিনি যুদ্ধকে দেখেছেন কাজলের চোখ দিয়ে। এই বিষয়টা ভালো লেগেছে বেশ। আসলে কিছু কিছু বই পড়লে পড়া শেষ একটা তৃপ্তি পাওয়া যায়। এটা তেমন এক বই।
বইটা আমার কাছে চমৎকার লেগেছে এবং শেষটা আরও সুন্দর একটা মেসেজ দিয়েছেন লেখক। ক্রাউন সাইজ হওয়ায় শুয়ে বসে আরামসে পড়ে শেষ করলাম। বেশ ভালো অভিজ্ঞতা।
বইয়ের নামঃ "ঘিয়ের পিদিম" লেখকঃ নিলয় নন্দী প্রকাশনীঃ পাঞ্জেরি প্রকাশন পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১০৩ ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৫/৫
"পিদিম" মানে কী জানেন? "প্রদীপ"। মানুষের জীবন কিন্তু একটা প্রদীপের মতো। প্রদীপ যেমন শত ঝড়-ঝাঁপটাতেও নিভু নিভু ভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করে তেল ফুরিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত, ঠিক তেমনি মানুষও কিন্তু প্রচণ্ড দুঃখ-কষ্ট, অনিশ্চয়তা, আশঙ্কার মাঝে এক বুক ভরা আশা নিয়ে বেঁচে থাকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এমন আশার প্রদীপ জ্বালিয়েই রাত্রিযাপন করেছিলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার হাজারো পরিবার। ১৯৭১ সাল বাংলার ইতিহাসে এক এলোমেলো অধ্যায়। মিলিটারি এসে যত্রতত্র হামলা করতে পারে যখন তখন। বুকে ভীষণ ভয়, বাঁচার আশঙ্কা, কিন্তু চোখে স্বপ্ন। তারা স্বপ্ন দেখে একদিন দেশ স্বাধীন হবে। ফিরে আসবে প্রিয়জনেরা। ছেলে আবার বাবার কাছে বায়না ধরবে নতুন জামা কিনে দেয়ার, মায়ের কোলে আবার ফিরবে আদরের ছেলে, দেশছাড়া পরিবারগুলো আবার ফিরে পাবে নিজেদের ভিটেমাটি, স্ত্রী আবার গল্পের ঝাঁপি খুলে বসবে রাতের গভীরে স্বামীর শিয়রে, প্রেমিকা আবার জড়িয়ে ধরবে প্রিয়তমকে, ছোটো বাচ্চারা আবার স্কুলে যাবে দলবেঁধে খেলবে। সব অপেক্ষার একদিন অবসান হবে, সব ইচ্ছে একদিন পূরণ হবে। সত্যিই হবে কি?
গল্পটা কাজলের। যুদ্ধে শুরু হওয়ার পর তার বাবা তাকে আর তার মাকে রেখে যায় নানার বাড়িতে। তারপর বাবা যায় যুদ্ধে। নানার বাড়িতে কাজলের দিন ভালোই কাটছিলো। শুধু অন্যের বাড়িতে থাকলে যা হয় আরকি.... শুনতে হয় বড়মামির টিটকারী, খেতে হয় মেজমামির মুখ ঝামটা, সহ্য করতে হয় মামাতো ভাইয়ের হিংসামি। বাড়ি থেকে কিছু হারালেই সন্দেহের চোখে তাকানো হয় কাজলের দিকে। কাজলের মারও শান্তি নেই। বাপের বাড়ি আসার পর থেকেই খাটতে হচ্ছে ভাই-ভাবিদের ফায়ফরমাশ। তবু কাজল অপেক্ষা করে তার বাবার ফিরে আসার। বৈদ্যনাথতলার পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠানে গিয়ে তার চোখজোড়া খোঁজে বাবাকেই। কাজলের মা স্বামীর চিন্তা করতে করতে শয্যা গ্রহণ করেন। কিন্তু বাবা আর অসেন না। এমন সময় কাজলের নানাভাই কাজলের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে উপহার দেন এক আশ্চর্য ঘিয়ের পিদিম। ইচ্ছেপূরণ পিদিম। এই পিদিমের কাছে মন থেকে কিছু চাইলে নাকি তা সত্যি সত্যি পাওয়া যায়। যদিও কাজল এসব রূপকথায় বিশ্বাস করে না তবু একদিন মনপ্রাণ এক করে পিদিমের কাছে চায় তার বাবা যেন ফিরে আসে। পিদিমের কাছে আবেদন জানিয়ে কাজল যেন একটু জোর পায় মনে। এই ঘিয়ের পিদিম কী পারবে তার ইচ্ছে পূরণ করতে? ফিরে আসবে কী কাজলের বাবা?
পাঠপ্রতিক্রিয়া : মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা গল্প/ উপন্যাস পড়তে আমার ভীষণ ভালো লাগে। কারণ এসব গল্পে বীর যোদ্ধাদের সাহসিকতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষদের জীবনচিত্রও ফুটে ওঠে। এই গল্পটা তাই দারুন লেগেছে। আমার ভালো লাগে বলে নয়। গল্পটা আসলেই দারুণ। কিশোর ছেলে কাজলকে ঘিরে আবর্তিত এই কাহিনী যে কারো মন ছুঁয়ে যাবে। আপনার মনে হবে। আপনি কাজল। মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার জন্ম হলে আপনি ঠিক কাজলের মতো করেই থাকতেন। নিলয় নন্দীর লেখা আগে কখনো পড়া হয়নি। কিন্তু এই বইটা পড়ার পর তো ওনার ভক্ত হয়ে গেলাম। এতো সুন্দর লেখনী.... প্রতিটা দৃশ্য এতো দারুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেন আমি সব কিছু চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম, শুনতে পাচ্ছিলাম পাতার মরমর শব্দও! আমি যেন কাজলের সাথে একদম মিশে গিয়েছিলাম, খুব করে চাইছিলাম কাজলের বাবা ফিরে আসুক, আর একবার ফিরে আসুক।
প্রচ্ছদ ও প্রোডাকশন : পান্জেরী বলতে আমি আগে শুধু গাইড বইকেই চিনতাম। তারা যে আউটবইও ছাপে জানতামই না। পান্জেরীর প্রোডাকশন সত্যি বলতে বেশ দারুন লেগেছে। ক্রাউন সাইজের বইটার প্রচ্ছদ অনেক বেশি সুন্দর লেগেছে। দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। এছাড়াও বইয়ের ভেতরে ছিল হলুদ কাগজের কিছু ইলাস্ট্রেশন যা ভালো লাগার মাত্রাকে আরো একটু বাড়িয়ে দেয়। ছোট্ট এই বইটার গল্পের সাথে সাথে প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন সব কিছুই ভালো লেগেছে। বইটার পেছনে ১২+ বয়সসীমা দেয়া আছে। কিন্তু আসলে যেকোনো বয়সের মানুষেরই এই বইটা ভালো লাগবে।
সবশেষে বলবো, নিলয় নন্দীর লেখা ঘিয়ের পিদিম বইটা ভীষণ ভীষণ ভীষন ভালো লেগেছে। এখন থেকে আমার প্রিয় বইয়ের শীর্ষে থাকবে বইটা। কেউ বইয়ের সাজেশন চাইলেই আমি এখন থেকে এই বইটার কথা বলবো।
সময়টা বড়ই অস্থির, ঢাকায় যেদিন গন্ডগোল হলো তার পরদিনই কাজলের বাবা কাজল আর তার মা'কে রেখে গেলেন নানার বাড়িতে। নানার বাড়ি এসেও কাজলের মন ভালো হয় না, অথচ স্কুল ছুটিতে নানার বাড়িতে বেড়াতে আসা, চারদিকে দৌড়ঝাঁপ করে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দটুকু কত না বিশুদ্ধ ছিলো। আর এখন বাবা রেখে যাওয়ার পর থেকেই কাজলের দিন কাটে বিষন্নতায়। কখনও মদনার সাথে ছুটে বেড়িয়ে, কখনও বা অন্তুর খোঁচা খেয়ে দিনগুলো কেটে যাচ্ছে তার দিন। যদিও মাঝেমধ্যে বড়ো মামি আর মেজ মামির ফিসফিস করে বলা কথা গুলোও মাঝে মাঝে বিষন্নতাগুলো উস্কে দেয়। এরমাঝে একদিন বৈদ্যনাথতলায় গিয়ে বাদলদার সাথে ঘুরেও আসে কাজল, কী এক স্বাধীন দেশ নিয়ে অনুষ্ঠান হয় সেখানে।
নানা ভাইয়ের বিশাল বইয়ের সংগ্রহ আছে, একদিন কাজল দেখে নানাভাই অবনীন্দ্রনাথের লেখা উনিশ'শ ষোলো সালে বের হওয়া বই নালক পড়ছেন। কাজলকে দেখেই ডেকে পড়ে শুনান, নানাভাই বইটা তুলে জানালার দিকে একটু কাত হয়ে পড়তে থাকে- 'কাঠুরেরা কোনো-কোনো দিন কাঠ কেটে বন থেকে ফিরে আসতে দেখে, গাছের তলা আলো করে সোনার কাপড়-পরা দেবতার মতো এক পুরুষ! সবাই বলত, নিশ্চয় ওখানে দেবতা থাকেন! কিন্তু দেবতাকে স্পষ্ট করে কেউ কোনোদিন দেখেনি- পুন্না ছাড়া। মোড়লের মেয়ে সুজাতা বিয়ের পরে একদিন ওই বটগাছের তলায় পুজো দিতে গিয়ে পুন্নাকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। সেই থেকে সে মোড়লের ঘরে আর-একটি মেয়ের সমান মানুষ হয়েছে। এখন তার বয়স দশ বছর। মানত করেছেন যদি ছেলে হয় তবে এক-বছর বটতলায় রোজ ঘিয়ের পিদিম নিয়ে নতুন বছরের পূর্ণিমায় ভালো করে বটেশ্বরকে পুজো দেবেন। সুজাতার ঠাকুর সুজাতাকে একটি সোনারচাঁদ ছেলে দিয়েছিলেন, তাই পুন্না রোজ সন্ধ্যাবেলা একটি ঘিয়ের পিদিম দিতে এই বটতলায় আসে।'
কাজল কিছুই বুঝতে পারে না। শুনতেও ইচ্ছে করে না, তার মাথার ভিতরে ঘুরে মায়ের জ্বরের কথা। গ্রামের পাশ দিয়ে লাইন ধরে চলতে থাকা ময়লা মাখা কাপড় পড়া মানুষগুলোর কথা, যারা একটু নিরাপত্তা, একটু আশ্রয়ের জন্য ভিটামাটি ছেড়ে ছুটছে বর্ডারের ওপারে। গ্রামের কবিরাজ কাকাও চলে গেছেন, চলে গেছেন কাজলের খেলার সাথী মদনা আর তার পরিবারও।
নানা ভাই কাছে ডাকেন কাজলকে, পুরোনো সুটকেস থেকে বের করে দেন একটা ঘিয়ের পিদিম। একশ চল্লিশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মানিক নামের ছেলেটা যখন পুঁটলি কাঁধে আবার ফিরে এসেছিলো, এই পিদিম উপহার দিয়েছিলো এ বাড়ির কর্তাকে। নানাভাই বলে উঠেন এ পিদিম কোনো সাধারণ পিদিম নয়, এ হচ্ছে ইচ্ছেপূরণের প্রদীপ।
কাজল পিদিম হাতে নিয়ে ফিসফিস কন্ঠে বলে উঠে, 'আমি আমার বাবাকে চাই, পিদিম। যেখানেই থাকুক ফিরে আসুক। আর কিছু চাই না, একটা দেশ চাই। একদম আমাদের নিজেদের একটা দেশ।
'ঘিয়ের পিদিম' বাংলাদেশের এক অস্তির সময়ের এক শান্তশিষ্ট গ্রামে ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা কিশোর বালক কাজলের গল্প, গ্রামের নানার বাড়িতে, গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর গল্প। যে গল্প পড়ে মুগ্ধ হয়েছি, কাজলের একাকিত্ব কষ্ট দেখে মনখারাপ করেছি। লেখক মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কিশোর মনের প্রভাবটুকু হালকা ধাঁচে তুলে এনেছেন দারুণ এক গল্পে। না, সেখানে কোনো মুক্তিযুদ্ধের কোনো খন্ড চিত্র পাবেন না, পাবেন না যুদ্ধের কিংবা রাজনৈতিক পাঠও। বরং মুক্তিযুদ্ধের সময়টুকু এক কিশোর মনে কী প্রভাব ফেলেছে তার চিত্র দারুণ ভাবে ফুটে উঠেছে। উঠে এসেছে গ্রামীন জনপদের গল্প, গ্রামের মানুষগুলোর চিন্তাধারা, প্রকৃতি, পুরোনো বাড়ি, পড়ন্ত বিকালের পুকুর পাড়ের সূর্যাস্তের গল্প, তাও আবার কাজল নামক এক কিশোরের চোখে যার চিন্তা বাবাকে ফেরত পাওয়া নিয়ে, একটা নিজের মতো দেশ নিয়ে।
ক্রাউন সাইজের বইটির উপরে কাজল নামক ছেলেটার প্রতিচ্ছবির পাশাপাশি ভিতরেও বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক স্কেচ আছে, যে দেখতে দারুণ লাগে। এছাড়াও বইটার প্রোডাকশন কোয়ালিটি দারুণ, ১৭৫টাকা মূদ্রিত মূল্যর মাত্র ১০৩ পৃষ্টার কিশোর উপন্যাসটা পড়তেও বেশিক্ষণ লাগবে না।
বড়ো হয়ে যাওয়ার পর আমরা আর ম্যাজিকে বিশ্বাস করি না। তাই ছোটোবেলায় মুগ্ধ হওয়া আলাদিনের চেরাগও আর খোঁজা হয় না। তবে অবচেতন মনের বিস্ময়কর ক্ষমতার পরিচয় আমরা প্রতিনিয়ত পেয়ে থাকি। মন থেকে যা চাইবে তা পাবে এমন কথা খুব অল্প বয়সেই মনে গেঁথে দেওয়া হয়।
রবিঠাকুরের ‘ইচ্ছাপূরণ' ছোটোগল্পটি পড়েননি এমন পাঠক পাওয়া ভার। অবশ্য সেখানে ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন ইচ্ছাদেবী। রাশাকেও তার নানি একটা মাদুলি দিয়ে বলেছিলেন এটার কাছে যা চাইবে তা পাবে। আমাদের সংস্কৃতিতে ইচ্ছাপূরণের ক্ষেত্রে মাদুলি-তাবিজের ব্যবহার অহরহ।
ঘিয়ের পিদিম কাজল নামে এক বারো বছর বয়সী কিশোরের সাধারণ একটা গ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধকে কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখছে তার গল্প। পাকিস্তানি মিলিটারিদের নৃশংসতা, লুণ্ঠন, নির্যাতন তার অপরিণত চেতনায় কী প্রভাব ফেলছে তা ফুটে উঠেছে। তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে।নিরাপত্তার খাতিরে অন্যের বাড়িতে গলগ্রহ হয়ে থাকা মানুষগুলোকে কী পরিমাণ মানসিক যাতনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তা-ও আলোকপাত করা হয়েছে। তবে কাজল রাশেদ, বুধা, রাশা কারো মতোই না। সে নিতান্ত সাধারণ। যে তার বাবার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে। যে একটু একটু বুঝতে শিখছে স্বাধীনতার মূল্য এবং তা অর্জনের জন্য নিদারুণ ত্যাগকে। মায়ের যন্ত্রণাকে কতটুকু বুঝতে পারল কে জানে।
খুব বিপদে আমরা কারও ওপর ভরসা করে স্বস্তি পাই। কে জানি বলেছেন মানুষের অন্তত এজন্য স্রষ্টা তৈরি করে নেওয়া উচিত। তত্ত্বটি বিতর্কিত হতে পারে, পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়। কাজলেরও এমন কিছু ছিল। সাত কোটি মানুষেরও এমন কিছু ছিল বলে হয়তো পঁচিশ থেকে ষোলো পর্যন্ত নরকের দিনগুলো গুজরান করতে পেরেছিলেন।
প্রায় এক কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। পথ চলতে চলতে তাদের সাথে দেখা হওয়া বিচিত্র নয়। চব্বিশে বাড়ির বড়োরা বলতেন ফেসবুক আমাদের ম্যানিপুলেটেড মানে মাথা বিগড়ে দিয়েছে। একাত্তরেও সেই বয়সীরা বলতেন রেডিও তরুণদের বিগড়ে দিয়েছে। যুদ্ধে দলভারী করে বিজয় নিশ্চিত করার জন্য কাউকে না কাউকে আগটা বাড়াতেই হয়। আর অবনঠাকুর! নানাভাই চরিত্রটিই কাহিনির প্রাণ।
এই দেশের ত্রিশ লক্ষ শহীদের মা, বাবা, ভাই, বোন, পুত্র, কন্যারা আজও অপেক্ষা করে আছেন তাদের হারিয়ে ফেলা মানুষটির জন্য। এসব মানুষের কাছে একটা ঘিয়ের পিদিম থাকলে হয়তো ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না... ওরা আসবে চুপি চুপি' -এর কথাগুলো একটুও অবাস্তব মনে হতো না। এতটা বিষাদে ভরা লাগত না। তাহলে বোধ হয় সবার জীবনেই ষোলোই ডিসেম্বর আনন্দ বয়ে নিয়ে আসত। বোনকে হারিয়ে ফেলার মতো অনারোগ্য দগদগে ঘা হয়ে থাকত না।
নির্দিষ্ট ধরনের বই ভালোলাগার জন্য আমি মানসিকভাবে ঐ বয়সে পৌঁছে যেতে পারি। লেখকের কর্মজীবন এই মুহূর্তে শিশু-কিশোরদের ঘিরে। সেই ঘরানায়ই কাজ করছেন প্রধানত। ঘিয়ের পিদিম খুবই সাদামাটা কিন্তু স্নিগ্ধ একটি কাহিনি। পারিবারিক টানাপোড়েনের গল্প হিসেবেও চালিয়ে দেওয়া যায়।
লেখকের ভাষাটা চড়াই পাখির মতো। যেন যত্ন করে কোনো শিশুকে স্কুলে যেতে ভোলাচ্ছেন। আয়তন আর সমাপ্তিতে একে বড়োগল্প কিংবা উপন্যাসিকাই বলা উচিত। বাড়ির ছোটোদের হাতে নির্দ্বিধায় তুলে দেওয়া যায় অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই বই।
এইবেলা বলে রাখি, যুদ্ধে বাবাকে হারিয়ে ফেলা কোনো কিশোরের মনের আকুলতাকে গভীরভাবে অনুভব করা যায় হুমায়ুন আজাদের ‘আব্বুকে মনে পড়ে' বইটি পড়লে। (কাজল তার বাবাকে হারিয়ে ফেলে এমন কিছু বলিনি কিন্তু।)
মুক্তিযুদ্ধে ভুক্তভোগী ছিল আমাদেরই পূর্বপুরুষরা। তার উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের কর্তব্য অনেক। এমনিতেও বড়ো একটা স্বাধীনতার সাথে বড়ো দায়িত্বও আসে। ঘিয়ের পিদিম পেলে কতই না সহজ হতো তা পূরণ করা।
‘পিদিম, আর কিছু চাই না— একটা দেশ চাই। একদম আমাদের নিজেদের একটা দেশ।’
❛পারবি যেতে ভেদ ক’রে এই বক্র-পথের চক্রব্যুহ? উঠবি কি তুই পাষাণ ফুঁড়ে বনস্পতি মহীরুহ?❜
৭১ এ কতো কিছু বদলে গেছে। ভরা পরিবার বিরান হয়ে গেছে। একসময় যে বাড়ি হৈ-হুল্লোড়, চ্যাঁচামেচিতে পূর্ণ ছিল সেখানে বিরাজ করেছে কবরের স্তব্ধতা। এসবই হয়েছিল পাক বাহিনীর বদৌলতে। কঠিন সে সময়টা যারা পার করেছে একমাত্র তারাই জানে এর ভয়াবহতা।
ছোট্ট কাজল আর তার মাকে মামাবাড়ি দিয়ে তার বাবা গেছে দেশটা স্বাধীন করতে। ঢাকায় যেদিন পাক বাহিনী আক্র মণ করলো তার কিছুদিন বাদেই মামাবাড়ি এসে পড়ে কাজল। শহরে বেড়ে ওঠা কাজলের কাছে গ্রামের বাড়ির পরিবেশ একদম নতুন। পুকুরে থেকে মাছ তোলা, গ্রামের নিশি পরিবেশ সবই নতুন।
গায়েও তখন কানাঘুষা চলছে পাক বাহিনীর আগমনের খবর। সবাই ভয়ে তটস্থ। যে যার মতো পারছে ব্যবস্থা করছে। রেডিওতে স্বাধীন বাংলার খবর, বৈদ্যনাথতলার সরকার গঠন চলছে। কাজলও সেখানে যায়। দুষ্টু লোকেদের থেকে দমন করতে বড়ো মানুষদের কাজ দেখে সে। এতো ভীরের মধ্যে ছোট্ট কাজলের চোখ খুঁজে বেড়ায় পিতাকে। সেই যে নানাবাড়ি রেখে গেলো আর আসার নাম নেই।
মামাবাড়ির পরিবেশ নতুন। সেখানের একান্নবর্তী পরিবারের দশাও অন্যরকম। এই গলায় গলায় মিল, তো এই কথা কাটাকাটি। তবে অন্যের আশ্রয়ের জীবনও খুব একটা সুবিধার না। গায়ের মেঠো পথে ঘুরে এক দুটো বন্ধু জোগাড় হলেও মামাবাড়ির অনেকের আচরণ-ই কেমন জানি। এই যেমন অন্তুর কথাই ধরা যাক না। কেমন ইঁচড়ে পাকা স্বভাব।
দিন এভাবেই কাটতে থাকে ভয় আর শঙ্কায়। একা কাজল আশ্রয় খুঁজে নানাভাইয়ের কাছে। নানাভাই এক রাতে তাকে উপহার দেয় ❝ঘিয়ের পিদিম❞। জাদুকরী ক্ষমতা আছে না-কি তার। ইচ্ছেপূরণ করে দেয় এই পিদিম। কাজল ঘিয়ের পিদিমের কাছে দেশের স্বাধীনতা আর বাবার ফিরে আসা কামনা করে।
আসবে কি তার বাবা? একটা ঘিয়ের পিদিমের কি মানুষের ইচ্ছেপূরণের ক্ষমতা আছে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে লেখা বইগুলো পড়তে অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে। যু দ্ধের বিভিন্ন দিক, কৌশল আর সে সময়ের মানুষদের যাপিত জীবনের অল্প কিছু হলেও ধারণা পাই, নিজেকে সে সময়ের একজন কল্পনা করি।
❝ঘিয়ের পিদিম❞ শিশু-কিশোর ভিত্তিক মুক্তিযু দ্ধের উপন্যাসিকা। ৭১ নিয়ে উপন্যাস, গল্প মানেই রাই ফেল, বো মা, বেয়োনেট নয়। কোন কিশোরের সাহসীভাবে রণে যোগ দেয়াও নয়। দেশকে স্বাধীন করা মানুষের গল্পের পাশাপাশি এই উপন্যাসে লেখক তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের তথা গেরস্থ জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন। একটা ছোট্ট ছেলের জীবন কীভাবে আমূল বদলে যায় সেটা এই উপন্যাসে আলোকপাত করেছেন লেখক নিলয় নন্দী। লেখকের লেখা এই প্রথমবার পড়লাম এবং নিঃসন্দেহে মুগ্ধ হয়েছি। মা র মা র কাট কাট ব্যতিরেকে কোমলভাবে সেই অস্থির সময়ের ভিন্ন একটা রূপ দেখিয়েছেন লেখক।
সে সময় আর দশজন মানুষ কেমন করে দিনাতিপাত করত, কেমন ছিল তাদের শঙ্কা, জীবন বাঁচাতে তাদের নেয়া পদক্ষেপ সবকিছু দারুণ সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন। কাজল চরিত্রটা অবশ্যই আদুরে ছিল। ছোট্ট এই ছেলেটার চিন্তাভাবনা লেখক প্রকাশ করেছেন নিদারুণভাবে।
শিশু-কিশোর উপন্যাস মানে একেবারেই বাচ্চামো নয় আবার পাকামোও নয় এই সুন্দর বিষয়টা ❝ঘিয়ের পিদিম❞ উপন্যাসে প্রকাশ পেয়েছে। নানাভাই চরিত্রটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। জীবনে উৎসাহ যোগানোর জন্য এমন কিছু মানুষ খুব-ই দরকার। যু দ্ধের সময় অসহায় মানুষের ছুটে চলা, দেশ ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়া বিষয়গুলো খুব অল্প করে হলেও এই উপন্যাসে প্রতিফলন হয়েছে।
ছোট্ট কিউট ক্রাউন সাইজের বইটার ভেতর হলুদ পাতার ইলাস্ট্রেশনগুলো ছিল নজরকাড়া। পাঞ্জেরী প্রকাশনীর প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ খুব সুন্দর।
❝ একশ চল্লিশ বছর আগে এই বাড়ির এক ছেলে হারিয়ে গিয়েছিল- মানিক। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। একদিন সে ফিরে আসে, তার ছেঁড়া পুঁটুলিতে করে নিয়ে আসে কতজনের জন্য কত রকমের উপহার। বাড়ির প্রধান যিনি তিনি পেলেন একটা ময়লা লাগানো ঘিয়ের পিদিম। কেউ কিছু জানে না,সেই ছেলে আবার কোথায় চলে গেল! শুধু বাড়ির প্রধান মানুষটি জানলেন এটা মোটেই সাধারণ কোনো প্রদীপ নয়,এ হলো ইচ্ছেপূরণের প্রদীপ।❞
"ঘিয়ের পিদিম" আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গল্প। কিশোর কাজলের বাবা যুদ্ধ শুরু হতেই কাজল এবং তার মা'কে নানাবাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে নিজে যুদ্ধে যোগদান করেন। এরপর কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও তার কোনো খবর আসে না বাড়িতে। তিনি আদোও বেঁচে আছেন কিনা তাও কেউ জানে না। পরের বাড়িতে আশ্রিত থাকার যন্ত্রণা কাজল এবং তার মা এই সময়ে হাড়ে হাড়ে টের পায়। একদিন কাজলের নানা তাকে একটি প্রদীপ দেন ; ইচ্ছেপূরণের প্রদীপ। কাজল সেই প্রদীপের কাছে তার বাবাকে ফিরে আসতে চাওয়ার কথা বলে। এরপর? সত্যিই কি প্রদীপের ইচ্ছেপূরণের ক্ষমতা রয়েছে?
কিছু কিছু বই আছে যা নিয়ে বেশি কিছু বলার দরকার হয় না। ❝ঘিয়ের পিদিম ❞ তেমন ই একটি বই। কিশোর বয়সীদের জন্য লিখা এই গল্পটা আমাদের সবার খুব পরিচিত। তবুও পড়ার সময় একটুও বিরক্তিকর বোধ হয় না লেখকের সাবলীল লেখনীর জাদুতে। এই গল্পে আপনি ❝কাকতাড়ুয়া❞ উপন্যাসের কিশোর বুধার মত নায়কোচিত কোনো কাজ পাবেন না, কিংবা ❝আমার বন্ধু রাশেদ❞ বইয়ের রাশেদের মত কাউকে পাবেন না। এ বইয়ের কাজল খুব সাধারণ। ঘিয়ের পিদিম কি পারবে তাকে অসাধারণ করে তুলতে?
বাংলাদেশের বেশিরভাগ কিশোর উপন্যাসের সমস্যা হলো সেগুলোর ভাষা অত্যন্ত শিশুসুলভ, বড্ড বেশি সরলীকৃত। কন্টেন্ট ওয়াইজ অনেক ভালো কাজ আছে কিন্তু ভাষার দৈন্যতা চোখে পরার মত।
ওপারের শঙ্খ ঘোষ, সত্যজিৎ রায়, সুকুমার রায়, হেমেন্দ্রনাথ রায়, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা বাইরের রয়াল্ড ডাল, জেকে রোলিং, টলকিন ভাষা দিয়ে যে ধরনের নুয়ান্স তৈরি করেছেন কিশোরদের জন্য লেখা গল্প উপন্যাসে সেরকম বাংলাদেশে প্রায় নেই। তারা কিশোরদের শিশু ভাবলো কেন কে জানে!
এমন না যে বাংলাদেশি লেখকদের সে ক্ষমতা ছিল না, উদাহরণ হিসেবে মুহম্মদ জাফর ইকবালের কথা বলা যাইতে পারে। এই লোক লেখক হিসেবে কতটা শক্তিশালী সেটা তার সবুজ ভেলভেট, বিবর্ণ তুষার, ছেলেমানুষী ধরনের লেখাগুলো পড়লেই বোঝা যায়। তিনি চাইলেই অনেক কিছু করতে পারতেন, তা না করে সারা জীবনভর একই জিনিস বার বার লিখে গেলেন।
এই বইটা সেই দিক দিয়ে অনেক ব্যতিক্রম লাগলো। ভাষা মোটেই শিশুসুলভ না, আবার বড়দের মত গুরুগম্ভীর ও না। যাকে বলে একদম পারফেক্ট কিশোর বান্ধব টোনে লেখা। বইয়ের বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ, এই ব্যাপারটাও ভালো লাগলো;আমি এর আগে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত কিশোর উপন্যাস পড়ছি সব গুলোর বিষয় ছিল " কিশোর মুক্তিযোদ্ধা " সার্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ না।
১০৩ পৃষ্ঠার ছোট্ট পরিসরেই লেখক মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গ্রামের পরিবেশ, মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া মানুষের জন্য প্রতীক্ষা, হুট করে আত্মীয়ের গলগ্রহ হিসেবে জুটে যাওয়া অনেক কিছুই তুলে ধরেছেন, এবং কাজটা করেছেন সাধাসিধে ভাবে, কোনকিছুই চাপিয়ে দেওয়া মনে হয়নি। কাজলের প্রতি মায়া পরে গেলো! তবে সব ছাপিয়ে গেছে লেখকের ভাষা, এত মোলায়েম, সুন্দর! এই ধরণের লেখা শেষ পড়েছিলাম শঙ্খ ঘোষের সকালবেলার আলো, সুপুরিবনের সারি বইতে। বইয়ের প্রচ্ছদ আর ভেতরের হলুদ কালিতে আঁকা ছবিগুলো ও অনেক মনকাড়া। সবমিলিয়ে কিশোর তো বটেই যেকোন বয়সী পাঠকের জন্যই সুপাঠ্য এক বই।