Kazi Nazrul Islam (Bengali: কাজী নজরুল ইসলাম) was a Bengali poet, musician and revolutionary who pioneered poetic works espousing intense spiritual rebellion against fascism and oppression. His poetry and nationalist activism earned him the popular title of Bidrohi Kobi (Rebel Poet). Accomplishing a large body of acclaimed works through his life, Nazrul is officially recognised as the national poet of Bangladesh and commemorated in India.
গাহি সাম্যের গান সাম্যবাদী-তে মোট ১১ টা কবিতা। দুঃখিত ১ টা কবিতা এবং সেই একটাকে আরও ১০ টা অংশে ভাগ করে মোট ১১ টা করা। সেই ১০ টা কবিতাও ওই ১ টারই অংশ আরকি।
স্কুল লাইফ ছাড়া নজরুলের কবিতা পড়া হয়নি। সেসময় যে খুব বুঝেছিলাম সেটা মনে হয়না। নইলে এতদিন নজরুলের কোনো কবিতা বাদ রাখতামনা হয়তো। আজকে বুঝলাম নজরুল কেন জাতীয় কবি। বইটা হাতে নিয়ে আর নামায়ে রাখতে পারলামনা। একের পর একটা পড়তে পড়তে কখন যে শেষ হলো বুঝলামই না। মনে হলো এই তো ৫ মিনিট আগে শুরু করলাম পড়া।
কত সুন্দর করে বিষয় গুলা বলা, কত রুপক ব্যবহার করা লাইন গুলোতে, কত চেনা জানা কথা, কত চেনা জানা অন্যায়, অবিচার, নিরাশা, দুঃখ, দুর্দশা। প্রতিটা লাইনের ওজন দুই চারটা পাহাড়ের ওজনের থেকেও অনেক বেশি। সাম্যের কবিতাতেও বিদ্রোহের ছাপ। তুমি বিদ্রোহী, তুমি সাম্যবাদী, তুমি চিরন্তন। তুমি কোটি কোটি বাঙ্গালীর বুকে কোটি কোটি বছর ধরে জেগে থাকবে। তুমি নজরুল একজনই। ❤️
"সাম্যবাদী"তে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সাম্যবাদের স্বরূপ। নজরুলের সাম্যবাদের গুরু কার্ল মার্কস নন বরং ভারতীয় সুফি,ঋষি বা উভয়েই। মূলত প্রচলিত অর্থে সাম্যবাদ বলতে যা বোঝায় নজরুলের সাম্যবাদ তার ব্যতীক্রম। ক্ষেত্রগুপ্ত বলেছেন, "নজরুলের সাম্যবাদ একান্তই মানববাদী আবেগজাত ভাবনা।" কবিতাগুলোর মধ্যে দিয়ে তিনি প্রমান করতে চেয়েছেন যে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হল যে সে একজন "মানুষ"। তাই জাতি,ধর্ম,বর্ণ,লিঙ্গ,শ্রেণী,পেশা ইত্যাদির ভিত্তিতে মানুষের মাঝে বৈষম্যের প্রাচীর গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি ঘোর বিরোধী।
কাব্যের প্রতিটি কবিতায় তিনি বারবার বলছেন যে তাঁর চোখে চোর-সাধু,পুরুষ-রমনী,ধনী-দরিদ্র,সৎ-অসৎ,পাপী-তাপী সবাই সমান। আসলে প্রজ্ঞার চেয়ে কবিতাগুলোতে আবেগের প্রাধান্যই বেশি। আর হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি কামনা এ কাব্যের এক বিশিষ্ট অংশ। মোল্লা-পুরুতদের ভন্ডামিকে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলো ধরেছেন। প্রচুর পৌরাণিক কাহিনী ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের স্বার্থক উপস্থাপন কাব্যটিকে ভিন্ন মাত্রা দান করেছে। এক কথায় একাব্যে কবির সাম্যবাদী চেতনার চরম স্ফূরণ ঘটেছে।
"ধর্মান্ধরা শোনো, অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো" আমাদের মধ্যে অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ আছেন যারা পুণ্য করতে করতে নিজের পাপ ভুলে যান এবং অন্যের পাপ নিয়ে সমালোচনা করতে থাকেন। এই ব্যাপারটা যুগ-যুগান্তর ধরে চলে আসছে। শুধু ধর্মান্ধরা না, আমরা প্রায় সবাই এমন। তাই তিনি বলেছেন, "হেথা সবে সম পাপী, আপন পাপের বাট্খারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি" উনি এই কবিতাতে "হারুত" আর "মারুত" এর গল্প বলেছেন কবিতার ছলে ছলে(কবিতার ছন্দে গল্প বলা, এটা হয়তো নজরুল দিয়েই সম্ভব)
"সাম্যের গান গাই – আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই! বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর" এটা ভেবে বেশ অবাক হতে হই যে, আমরা এখন নারীদের অধিকার নিয়ে কন্ঠ তুলি, তাদের সমঅধিকার পাওয়ার জন্য লড়াই করি। কিন্তু নারীদের অধিকার নিয়ে নজরুল সেই কবে বলে গিয়েছেন, বুঝিয়ে গিয়েছেন নারীদের অধিকার যেন আমরা প্রতিষ্ঠা করি। এখন নারীরা ধীরে ধীরে তাদের অধিকার পাচ্ছে, আমরা তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু নজরুল সেই সময়ে নারীদের অধিকার নিয়ে আমাদের সচেতন করে গিয়েছেন, যে সময়ে নারীরা পুরুষের কথায় চলতো, নিজদের মুখ রাখতো বন্ধ, নিজদের অধিকার নিয়ে তারা ছিল হতাশ। "স্বর্ণ-রৌপ্যভার নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হয়েছে অলঙ্কার। নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ, যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান"
"কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে? হয়ত তোমায় স-ন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে। না-ই হ’লে সতী, তবু তো তোমরা মাতা-ভগিনীরই জাতি; তোমাদের ছেলে আমাদেরই মতো, তারা আমাদের জ্ঞাতি" উনি এখানে বীরাঙ্গনাদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। বীরাঙ্গনারা নিজদের এতকিছু উৎসর্গ করার পরও মানুষের তাচ্ছিল্যের স্বীকার হয়েছেন। তা নিয়ে কবি আওয়াজ তুলেছেন। উনি ধিক্কার দিয়েছেন যারা বীরাঙ্গনাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে
"গাহি সাম্যের গান- মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান্ । নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি, সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি" "সাম্যের গান গাই যেখানে আসিয়া সম-বেদনায় সকলে হয়েছি ভাই। এ প্রশ্ন অতি সোজা, এক ধরণির সন্তান, কেন কেউ রাজা, কেউ প্রজা? অদ্ভুত দর্শন – এই সোজা কথা বলি যদি ভাই, হবে তাহা সিডিশন! প্রজা হয় শুধু রাজ-বিদ্রোহী, কিন্তু কাহারে কহি, অন্যায় করে কেন হয় নাকো রাজাও প্রজাদ্রোহী!" ধর্ম-কাল-পাত্রবেধে, ধনী-গরিব আমরা সবাই মানুষ।। এখানে কবি সবার একাত্মতা কামনা করেছেন। আমরা সব মানুষ যেন এক থাকি, তা নিয়ে গেয়েছেন সাম্যের গান। উনি হুঙ্কার তুলেছেন যারা ধর্মে ধর্মে ভেদাভেদ এনে মনুষ্যত্বের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে। উনি আরো বলেছেন আমরা মানুষ হয়ে অপর মানষের অধিকার যেন নষ্ট না করি।। হয়তো পরে গিয়ে ঐ মানুষটি এমন একটা মানুষ হয়ে উঠবে যাকে আপনি ছুঁতেও পারবেন না, তার নিকটে যেতে পারবেন না! তাই তিনি বলেছেন--- "কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি? হয়ত উহারই বুকে ভগবান্ জাগিছেন দিবা-রাতি"
"যাদের লইয়া রাজ্য, রাজ্যে নাই তাহাদেরই দাবি, রাজা-দেবতার অনন্ত ভোগ, আমরা খেতেছি খাবি! এ নিয়ে নালিশ কার কাছে করি, জয় রাজাজি কী জয়! আমাদের হয় সুবিচার, নাই রাজারই বিচারালয়!" আপনি যদি দেখেন, আমরা হলাম প্রজা, আর সরকার হলো রাজা। আমরা প্রজারা কষ্ট করে মরি, আর সরকার ভোগ করতে থাকে, আমাদের উপর চালাতে থাকে অনিয়ম।। তো কবি এখানে আমাদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন। আমরা সমাজে বাস করেও ঠিকমতো অধিকার, ন্যায় বিচার পাচ্ছি না। আর অপরদিকে আমাদের রাজারা দুর্নীতি করছে, জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করেই যাচ্ছে। এসব নিয়ে আমরা কিছু বলতে পারছি না, মুখ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।।
"সাম্যবাদী-স্থান নাইকো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গোরস্থান। নাইকো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গির্জা-ঘর" আমরা শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গ -এর মধ্যে যে পার্থক্য তৈরী করি তা নিয়ে বলেছেন কবি। কৃষ্ণাঙ্গ দের অধিকার নিয়ে আজকাল আমরা বেশ সচেতন। কিন্তু কবি অনেক পূর্বে তাদের অধিকার নিয়ে বলে গিয়েছেন ----------------------------------------------------- সর্বশেষে বলতে চাই যে, নজরুল মানুষের সাম্য নিয়ে, অধিকার নিয়ে বলে গিয়েছেন। সেই বুঝানোতে তার কন্ঠ কখনো ছিল সোচ্চার, কখনো বা তিনি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন। আপনি ভেবে অবাক হবেন যে, যেসব বিষয় নিয়ে আমরা আজকাল আন্দোলন করি, আওয়াজ ত���লি, তা নিয়ে সেই কবে নজরুল গেয়ে গিয়েছেন সাম্যের গান!!
এই নজরুল হলেন আমাদের কবি। আমাদের জনমানুষের কবি। যখন আমাদের পাশে কিছু ছিল না, তখন নজরুল আমাদের সাহস দিয়েছেন। এখনো আমরা নজরুলকে সাথে নিয়ে চলতে পারি যদি আমরা নজরুলের চেতনাকে ধারণ করি এবং নিজের অধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকি 🌻
জাতীয় কবি নজরুলের তেমন বিশেষ বই কখনো পড়া হয়নি আমার, সাথে কবিতার বইও পড়েছি জীবনে একদম কম। তাই ঠিক করেছিলাম নজরুল এবং কবিতা দুটাই একসাথে পড়বো, তারই প্রেক্ষিতে সাম্যবাদী বইখানা হাতে তুলে নেওয়া। বইটিতে রয়েছে মোট ১১টি কবিতা। নজরুলকে কেনো সাম্যবাদী কবি বলা হয় তার একদম নিখুঁত এবং স্পষ্ট ধারণা পেয়ে গেলাম বইটি পড়ে। বইটির কবিতাগুলো নিয়ে কিছু কথা তুলে ধরছি।
১-সাম্যবাদীঃ এটি প্রথম কবিতা। এইখানে কবি দেখিয়েছেন আমরা যে কোনো ধর্মের-ই হই না কেনো, হোক না আমরা যে কোনো জাতির নয়তো যে কোনো দর্শনে বিশ্বাসী, আমরা যেনো এক হয়ে থাকি।
২-ঈশ্বরঃ এই কবিতায় কবি বলেছেন আমাদের হৃদয়ে রয়েছে সবথেকে বড় ধর্মের বসবাস।
৩-মানুষঃ এই কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে মানুষের থেকে বড় কিছু হতে পারেনা এবং নেই। এছাড়াও ধর্মের নাম করে যারা ভণ্ডামি করে কবি তাদের নিয়েও কথা বলেছেন।
৪-পাপঃ পাপীদের নিয়ে আমাদের সমাজে যে ট্যাবু রয়েছে সেটাতে কবি এই কবিতার দ্বারা আঘাত করেছেন। তার মতে কোনো মানুষই পাপের উর্ধ্বে নয়। প্রসঙ্গক্রমে তিনি দেবতাদের পাপ নিয়েও উদাহরণ টেনেছেন।
৫-চোর-ডাকাতঃ এই কবিতায় তিনি খুবই সূক্ষ্মভাবে ছোট চোর ডাকাতদের নিজের বন্ধু দাবী করে আর যারা সমাজে লুকিয়ে থেকে বড় বড় চুরি ডাকাতি করেও সভ্য হয়ে বেঁচে থাকে তাদের করেছে তিরস্কার।
৬-বারাঙ্গনাঃ আমাদের সমাজে পতিতাদের সবাই ঘৃনা করে। কিন্তু তারাও তো মানুষ, সেটাই কবি বলতে চেয়েছেন কবিতার মাঝে। তিনি তাদের সম্বোধন করেছেন মা দিয়ে।
এছাড়াও মিথ্যাবাদী, নারী, রাজা-প্রজা, সাম্য, কুলিমজুর নামকও বিশেষ কিছু কবিতাও রয়েছে। যেখানে "নারী" কবিতাটি পড়ে আমি বেশ অবাক হয়ে ভাবছিলাম কবি ১৯২৫ সালে থেকেও কি করে এতো সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা করলো, এটা পড়েই বুঝেছি তিনি তার সময় থেকে কতোটা এগিয়ে ছিলেন। এছাড়াও "কুলিমজুর" নামক কবিতায় কবির কিছুটা মার্কসীয় সাম্যবাদী চেতনার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। জাতীয় কবির অন্যতম বিশেষ এই বইটি চাইলে পড়তে পারেন।
কাব্যগ্রন্থটি ১৯২৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। কবি নজরুলের বয়স তখন ২৬ এর মতো। তরুণ কবি মানুষের জীবনের সাদা কালো পাতাগুলো ইতিমধ্যে দেখে ফেলেছেন, বুঝেছেন কালো পাতার সংখ্যাই বেশি। আর এ জীবন দর্শনই তাকে গড়ে তুলেছিল বিদ্রোহী আর সাম্যবাদের কবি হিসেবে। ১৯২৫ এর সময়কার হলেও কবিতা পড়ে মনে হয় কবি এইমাত্র লিখলেন একবিংশ শতাব্দীর জন্য!!!!
বইটিতে মোট ১১ টি কবিতা রয়েছে - সাম্যবাদী ঈশ্বর মানুষ পাপ চোর-ডাকাত বারাঙ্গনা মিথ্যাবাদী নারী রাজা-প্রজা সাম্য কুলিমজুর
মসজিদে কাল শির্নী আছিল,-অঢেল গোস–র”টি বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটি কুটি, এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন্ বলে, ‘ বাবা, আমি ভূখা-ফাকা আমি আজ নিয়ে সাত দিন!’ তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা-‘ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা, ভূখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?’ ভূখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল-‘তা হলে শালা সোজা পথ দেখ!’ গোস–র”টি নিয়া মসজিদে দিল তালা! ভুখারী ফিরিয়া চলে, চলিতে চলিতে বলে- ‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু, আমার ক্ষুধার অন্ন তা ব’লে বন্ধ করনি প্রভু। তব মস্জিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী..(মানুষ)
এত সুন্দর কবিতা,একজন মানুষ লিখেছেন তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। তার কবিতার ভাবার্থ এত যা একবার পড়লে বুঝা যাবে না।বারেবারে পড়বেন আর তার অর্থ যখন বুজবেন কবির প্রতি আপনার শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে যাবে, ইনশা-আল্লাহ। এই সাম্যবাদী, কাব্যগ্রন্থে ৬ টি কবিতা রয়েছে প্রত্যেকটি খুব সুন্দর ও অর্থবহ।
সাম্যের গান গাই-
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।(নারী)
এই রকম লাইন যে কবি লিখেন তিনি দেশ,সাম্প্রদায়িক সব কিছুর উদ্ধে। কিন্ত কষ্টের বিষয় এই কবি নিয়ে যতটা আলোচনা করার দরকার ততটা করা হয় না। কিছু কিছু মানুষ তাকে সাম্প্রদায়িক, নাস্তিক বলেন,তাদের বলবো তিনি হয়তোবা নজরুলের লেখার মমার্থ বুজতে অপারগ।
#তার কাব্যগ্রন্থকে মূল্যায়ন করা আমার মত ছোট খাটো পাঠিকার জন্য দুঃসাহস ছাড়া আর কিছুই না। পাঁচ তারকা তার লেখার মূল্যায়ন নয়,তিনি এই সকলের উপরে।#
বিদ্রোহ ও তারুণ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ধূমকেতুর মতই আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। চিরাচরিত পঁচনধরা সমাজকে ভেঙে সুনির্মল এক নব্য সমাজ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। এজন্যই তিনি বিদ্রোহের দামামা বাজিয়েছেন সকল অন্যায়-অত্যাচার, অসত্য, শোষণ-বঞ্চনা আর দুঃখ-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। ভিনদেশীদের শোষণ ও পরাধীনতার গ্লানি থেকে জাতিকে মুক্ত করতে তিনি হাতে তুলে নেন কলম। শুধু কাব্যের ঝংকার দিয়েই তিনি আপামর জনসাধারণের হৃদয়কে উন্মাদিত করতে সক্ষম হন। এ কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। তবুও এই বিদ্রোহী কবিকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি কেউ। অন্ধকার কারাগারের অভ্যন্তরে বসেও তিনি গেয়েছেন সাম্যের গান। ঠিক এভাবে, অধ্যবসায়ী ও স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত এক যুগ প্রতিনিধি নজরুল, সাধারণ মানুষের হৃদয় কুঠরিতে এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে নিতে সক্ষম হন।
তাঁর লেখা "সাম্যবাদী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা থেকে আমরা তাঁর সাম্যবাদী চিন্তাধারার ধারণা লাভ করতে পারি। সাম্য অর্থ সমতা। সাম্যবাদী অর্থ হল সকলে সমান, এমন ধারণা। মোট ১১ টি কবিতা নিয়ে রচিত হয়েছে কবি নজরুলের সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি নারী, চোর-ডাকাত, রাজা-প্রজা সহ সবাই যে সমান, সবাই যে মানুষ, এই ধারণার প্রবর্তন করেছেন তাঁর এই কাব্যগ্রন্থে।
এই বইয়ের প্রথম কবিতা "সাম্যবাদী"-র প্রথম লাইনে রয়েছে,
গাহি সাম্যের গান- যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।
এখানে তিনি বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়, আদিবাসী, উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও বিভিন্ন দর্শনের অনুসারীদেরকে একত্রিত হওয়ার কথা বলেছেন। এগুলো বোঝাতে নির্দিষ্ট করে কবি যেসব নাম উল্লেখ করেছেন কবিতায়, তাহলো হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, ক্রীশ্চান, পার্সী, জৈন, ইহুদী, সাঁওতাল, ভীল, গারো, কনফুসিয়াস ও চার্বাক চেলা। এসব সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করার ���র কবিতায় কবি মোট ৮টি ধর্মীয় গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন। যেগুলো হল যথাক্রমে কোরান, পুরাণ, বেদ, বেদান্ত, বাইবেল, ত্রিপিটক, জেন্দাবেস্তা ও গ্রন্থসাহেব। এরপর এসেছে এসব ধর্মের কিছু পথপ্রদর্শকদের নামও।
ধর্ম ও ধর্মীয় গোষ্ঠীদের প্রতি সাম্যের গান গাওয়ার পর কবি তাঁর ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট করেছেন এই গ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতা "ঈশ্বর" কবিতায়। এই কবিতায় কবি ঈশ্বরের প্রকৃত তাৎপর��য ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। তিনি মনে করেন সব ধর্মের চেয়ে বরং মানুষের হৃদয়ের ধর্মটাই বড়। নিজের হৃদয়ে ঈশ্বর বিরাজমান বোঝাতে তিনি এই কবিতায় বলেছেন:-
কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে’ কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে? হায় ঋষি দরবেশ, বুকের মানিকে বুকে ধরে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।
সাম্যবাদী কাব্য সিরিজে সাম্য ও মানবতা সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে "সাম্যবাদী" কাব্যগ্রন্থের তৃতীয় কবিতা "মানুষ" কবিতায়। কবি নজরুলের সাহিত্যে মানুষ ও মানবতা সবার ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেছে, তবুও তাঁর "মানুষ" কবি নজরুলের সে আদর্শ চরমভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি এই কবিতায় বলেছেন-
গাহি সাম্যের গান- মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
এ রকম আহ্বান কেবল কবি নজরুলের পক্ষেই সম্ভব। ধর্মকে কেন্দ্র করে ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তিনি এভাবেই প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে কবি এই কবিতাটিতে মন্দির-মসজিদে তালা লাগানোর যে দুটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তাতে পূজারী ও মোল্লাকে সমানভাবে অভিযুক্ত করেছেন।
সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের চতুর্থ কবিতা "পাপ" কবিতায় একইভাবে সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেলেও এটি একটি ভিন্নধর্মী কবিতা। এই কবিতায় কবি সাম্যের গান গেয়েছেন পাপ-বিদগ্ধ মানুষদের নিয়ে। কবি এই কবিতায় বলেছেন :-
সাম্যের গান গাই!– যত পাপী তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর ভাই। তেত্রিশ কোটি দেবতার পাপে স্বর্গ সে টলমল, দেবতার পাপ-পথ দিয়া পশে স্বর্গে অসুর দল! বিশ্ব পাপস্থান অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান্!
কবি নজরুল একদিকে লিখেছেন "পাপ" কবিতা, অন্যদিকে এই কবিতার সম্পূরক হিসেবে লিখেছেন "চোর-ডাকাত" কবিতা। এটি এই কাব্যগ্রন্থের পঞ্চম কবিতা। "পাপ" কবিতায় তিনি যেমন পাপীকে ভাই বলে সম্বোধন করেছেন, "চোর-ডাকাত" কবিতায় তারই এক প্রকার অনুসরণ ঘটেছে। এখানে ভাই না হয়ে হয়েছে বন্ধু। কবি এই কবিতায় বলেছেন :-
কে তোমায় বলে ডাকাত বন্ধু, কে তোমায় চোর বলে? চারিদিকে বাজে ডাকাতি ডঙ্কা, চোরেরই রাজ্য চলে! চোর-ডাকাতের করিছে বিচার কোন সে ধর্মরাজ? জিজ্ঞাসা করো, বিশ্ব জুড়িয়া কে নহে দস্যু আজ?
এরপর সমাজে যেসব নারী পতিতা বা বেশ্যা, যাদেরকে সমাজ ঘৃণার চোখে দেখে, কবি নজরুল তাদেরকেও এনেছেন সাম্যের কাতারে। তাদেরকে কবি "মা" বলে সম্বোধন করেছেন। এছাড়া, তারাও যে মানুষ, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর জন্য কবি বিভিন্ন ঐতিহাসিক নারী চরিত্রকে উদ্ধৃতি হিসেবে টেনে এনেছেন কবিতায়। কবি সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের ষষ্ঠ কবিতা "বারাঙ্গনা" কবিতায় বলেছেন :-
কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে? হয়ত তোমায় স্তন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে।
সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের সপ্তম কবিতা "মিথ্যাবাদী" কবিতাও একটি ভিন্নধর্মী কবিতা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে কবি নজরুল মিথ্যাবাদীর পক্ষে কলম ধরেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ভিন্নভাবে সত্যেরই জয়গান গেয়েছেন। কবি এই কবিতায় বলেছেন :-
মিথ্যা বলেছ বলিয়া তোমায় কে দিল মনস্তাপ? সত্যের তরে মিথ্যা যে বলে স্পর্শে না তারে পাপ।
সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের অষ্টম কবিতা "নারী" কবিতাটি বর্তমান সময়ের নারীবাদের প্রধান পাথেয় হয়ে রয়েছে। বর্তমান সময়ের নারী সমাজের দিকে দৃষ্টিপাত করলে এটা ভেবে বিস্মিত হতে হয় যে, কবি নজরুল তাঁর সময়ের চিন্তাভাবনা থেকে কতটা এগিয়ে ছিলেন। কারণ, নারীদের জন্য যখন ছিল বন্দী যুগ, সে সময় তিনি তাঁর এই "নারী" কবিতায় ঘোষণা করেছিলেন :-
সেদিন সূদূর নয়- যেদিন ধরণি পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।
সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের নবম কবিতা "রাজা-প্রজা" কবিতাটি কবি নজরুলের সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শনের উপর ভিত্তি করে রচিত একটি বিশেষ কবিতা, যেখানে নজরুল জনগণের শক্তি ও রাষ্ট্রের মৌল উৎসকে তুলে ধরেছেন। কবি এই কবিতায় বলেছেন :-
সাম্যের গান গাই যেখানে আসিয়া সম-বেদনায় সকলে হয়েছি ভাই। এ প্রশ্ন অতি সোজা, এক ধরণীর সন্তান, কেন কেউ রাজা, কেউ প্রজা?
সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত প্রায় একই অর্থের দুটি কবিতা রয়েছে। একটি "সাম্যবাদী", অন্যটি এই কাব্যগ্রন্থের দশম কবিতা "সাম্য"। একটি বিশেষ্য, অন্যটি বিশেষণ। আর দুটোরই মূল সুর প্রায় একই, বিষয়বস্তুও এক। তবে সাম্যবাদীতে ধর্ম ও দর্শনের বিষয়বস্তুই প্রধান, কিন্তু "সাম্য" কবিতায় বর্ণভেদের বিষয়টিও এসেছে। ফলে বর্ণবাদের অসাম্য ও শােষণের দিকটিও নজরুল কাব্যে স্থান করে নিতে পেরেছে। তিনি এই কবিতায় বলেন:-
সাম্যবাদী-স্থান নাইকো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গোরস্থান। নাইকো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গির্জা-ঘর, নাইকো পাইক-বরকন্দাজ নাই পুলিশের ডর। এই সে স্বর্গ, এই সে বেহেশ্ত, এখানে বিভেদ নাই, যত হাতাহাতি হাতে হাত রেখে মিলিয়াছে ভাই ভাই!
সাম্যবাদী মার্কসীয় দর্শনের দিক থেকে এই কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতা "কুলি-মজুর" কবিতাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 'মজুর' শব্দটি পৃথিবী জুড়ে জনপ্রিয় হলেও 'কুলি' শব্দটি সবদিক থেকেই অবহেলিত সম্প্রদায়। কবি নজরুল তাদের সবাইকে একত্রিত করেই সাম্যের গান গেয়েছেন এই কবিতায়। এই কবিতাটি তিনি শুরুই করেছেন একটি গল্পের ছলে। তিনি বলেছেন:-
দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
পরিশেষে, সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থে নজরুলের সাম্যবাদী দর্শনের ভিত্তি যা-ই হােক, তা দুনিয়ার যে-কোনাে সাম্যবাদী আদর্শ থেকে ভিন্ন। কমিউনিজম এবং কমিউনিস্টদের দ্বারা নজরুল নিঃসন্দেহে প্রভাবিত। কিন্তু নজরুলের সাম্যবাদ মার্কসীয়-লেনিনীয় সাম্যবাদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর সাম্যবাদে শ্রেণি আছে, বর্ণ আছে এ কথা ঠিক। কিন্তু ধর্মও আছে, উদার মানবতা আছে, আছে সামান্য চোর-ডাকাত, মিথ্যাবাদী প্রসঙ্গ, এমনকি তৃণমূল বারাঙ্গনা পর্যন্ত। নজরুল কোরানের সাম্যকেও তুলে ধরেছেন। এসব মার্কসীয় দর্শনের বাইরের বিষয়। নজরুলের সাম্যবাদ সেদিক থেকে দুনিয়ার এ জাতীয় দর্শনের বাইরে কিছু, যেখানে নজরুল একা এবং অনন্য। তাঁর সাম্যদৃষ্টির পরিচয় উদ্ঘাটিত হয় তিনি যা লিখেছেন তাকে অবলম্বন করেই। চরম প্রতিকূল এক পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেমন তিনি বড়াে হয়ে উঠেছেন, তেমনি উত্তাল এক তরঙ্গের ভেতর দিয়ে পরাধীন ভারতকে তিনি স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যেতে দেখেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীল কাব্যজগত দর্শনের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছিল। তাঁর কাব্যচর্চা ও অন্যান্য সৃষ্টিশীল লেখালেখির সময়কাল মাত্র দুটি দশক। আর এর মধ্য দিয়েই অনাগত বাংলা ও বাঙালির সমাজ এবং সাহিত্যকে তিনি দান করেছেন এক চিরায়ত সাম্য-দর্শন, যা যুগপৎ নজরুলের নিজস্ব, বাঙলা ও বাঙালির এবং মানুষের জন্য কল্যাণের। সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত কবিতাবলির বিশিষ্টতা এখানেই।
বই : সাম্যবাদী লেখক : কাজী নজরুল ইসলাম প্রকাশনী : আগামী প্রকাশনী মুদ্রিত মূল্য : ৮০ ৳ মোট পৃষ্ঠা : ৭১ প্রকাশ : জুলাই ২০০৭
১৯২৫ সালের শেষের দিকে নজরুল সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। শুরু হয় নজরুলের আরেক জীবন। তাঁর ডেরা আমরা জানি কলকাতা কিন্তু এই মাঠ পর্যায়ের রাজনীতি করার দরুন তাঁকে বাংলাদেশে আসতে দেখা যায়। ঢাকায় আসেন তিনি ১৯২৬ এর দিকে, উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক প্রচারণা। তাঁর পদচারণা আস্তে আস্তে চরম সাম্যবাদের দিকে যাবে তার আর সন্দেহ কি? তাঁর এই নতুন পথযাত্রার বহিঃপ্রকাশ বোধহয় এই 'সাম্যবাদী' কাব্যগ্রন্থ। যে কবিতাগুলো আছে এই বইয়ে তা নিয়ে আর নাইবা বললাম। ত্রিশের দশকে পুরো বাঙলায় এই ধরনের বিপ্লবী সাহিত্যে দ্বিতীয় নজরুল ছিলনা এতে আমার সন্দেহ নেই!
Some of my favorite lines from the book — 1. সুন্দর এই ধরা-ভরা শুধু বঞ্চনা অভিশাপ। 2. হেথা সবে সম পাপী, আপন পাপের বাট্খারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি! 3. যুগের ধর্ম এই – পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই। 4. সাম্যের গান গাই যেখানে আসিয়া সম-বেদনায় সকলে হয়েছি ভাই। এ প্রশ্ন অতি সোজা, এক ধরণির সন্তান, কেন কেউ রাজা, কেউ প্রজা?
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত “সাম্যবাদী” মূলত একটি দীর্ঘ কবিতা, যা ১০ টি উপশিরোনাম বিভক্ত করা হয়েছে। তাই, আপাতদৃষ্টিতে ১১ টি কবিতার সমন্বয়ে রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ মনে করা হয়। কবিতাটি পড়লেই এই ভ্রান্তি দূর হয়। একই সুর, একই ছন্দ ও একই ভাব।
এই কবিতায় কবির সাম্যবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে খুব সচ্ছ ও পরিষ্কারভাবে৷ নজরুলের সাম্যবাদ চিনতে হলে, বুঝতে হলে “সাম্যবাদী” কবিতাটি পড়ার কোন বিকল্প নেই। নজরুলের সাম্যবাদ লেনিনবাদ বা মাওবাদ নয়; একান্তই স্বতন্ত্র। তবে, আমি একান্তভাবে মনে করি, নজরুলের সাম্যবাদের সাথে সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে ইসলামি সাম্যবাদের৷
নজরুলের এই সাম্যবাদী চেতনার জন্ম তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই। নজরুল সাম্যবাদ নিয়ে শুধু কবিতাই লিখেন নি, তিনি সাম্যবাদেই বেঁচে ছিলেন। শুধু কবিতা লিখেই অসাম্যের প্রতিবাদ করেন নি, তিনি তাঁর জীবনে সকল অসাম্যের বিরুদ্ধে সরাসরি সংগ্রাম করেছেন৷ এ কারণেই বলতে হয়— এই পৃথিবীতে একটিই কাজী নজরুল ইসলাম এসেছিলেন৷ আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছি, অনেক কবি-সাহিত্যিক ও গীতিকার ভারতে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সেখানে বসে অনুপ্রেরণামূলক অনেক গান-কবিতা লিখেছেন৷ কিন্তু সকল অন্যায়-অনাচার ও অসাম্যের বিরুদ্ধে (বিশেষত বৃটিশদের বিরুদ্ধে) নজরুল সমান তালে রণক্ষেত্র ও কাগজের পাতায় রক্ত ঝরিয়েছেন৷
ছোটবেলা থেকেই নজরুল আমার প্রিয় কবি৷ স্কুলে থাকাকালীন “সঞ্চিতা” পড়েছিলাম। “বিদ্রোহী” কবিতাটি অসংখ্যবার পড়েছিলাম। পুরোপুরি না বুঝতে পারলেও অনুভব করতে পারতাম৷ আর এই অনুভূতিই আমাকে মোহমুগ্ধ করেছিল। তাঁর মুক্ত চেতনা, মুক্ত মন— আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল।
“যাদের লইয়া রাজ্য, রাজ্যে নাই তাদেরই দাবি, রাজা-দেবতার অনন্ত ভোগ, আমরা খেতেছি খাবি! এ নিয়ে নালিশ কার কাছে করি, জয় রাজাজি কি জয়!”
সাম্যবাদী কবিতাটির মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ১১টি কবিতা রয়েছে। আসলে কবি নজরুল সাম্যবাদী শিরোনামে কবিতা লিখেছিলেন একটিই। বাকি ১০ টি কবিতা এই সাম্যবাদী কবিতার মূল শিরোনামের অন্ত র্ভুক্ত ১০টি উপশিরোনাম মাত্র। শিরোনাম-উপশিরোনাম নিম্নরূপ:
১. সাম্যবাদী (মূল শিরোনাম)। বাকি ১০টি উপশিরোনাম:
১. ঈশ্বর ২. মানুষ ৩. পাপ ৪. চোর-ডাকাত ৫. বারাঙ্গনা ৬. মিথ্যাবাদী ৭. নারী ৮. রাজা-প্রজা ৯. সাম্য ১০. কুলি-মজুর।
লাঙল সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর। লাঙল পত্রিকার এই প্রথম সংখ্যাতেই নজরুলের বিখ্যাত সাম্যবাদী কবিতা প্রকাশিত হয়।
নানা উপশিরোনামে বিভক্ত এটি একটি বিরাট কবিতা। 'ঈশ্বর', 'মানুষ', 'পাপ', 'বারাঙ্গনা', 'নারী', ও 'কুলি-মজুর' এই কবিতার উপশিরোনাম মাত্র। অনেকে ভুল করে এই সাব-হেডিংগুলিকে আলাদা আলাদা কবিতা মনে করেন।
বস্তুত নজরুলের দীর্ঘ কবিতার মধ্যে এটি অন্যতম এমন নয় শুধু, বরং বিশ্ব কবিতার ইতিহাসেও এটি একটি অন্যতম দীর্ঘ কবিতা, যার রয়েছে ১১টি ভিন্ন ভিন্ন উপশিরোনাম। এর চরণ সংখ্যা ৪৭৩।
যেহেতু নজরুল সাম্য খুঁজেছেন বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যেও, তাই এসেছে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেরও নাম, এমনকি উপাসনালয়, ধর্ম প্রচারকদের নাম এবং ধর্মকেন্দ্রসমূহের নামও - কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থ।
নজরুলের সাম্যবাদী চেতনার স্বরূপটি এখানে এভাবে প্রস্ফুটিত হয়ে আছে। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের ৮ কেতাব ও ধর্মগ্রন্থের নাম সম্ভবত আর কোনো কবির কাব্যে এক সঙ্গে এভাবে স্থান পায়নি। মন্তব্যটি বিশ্ব কবিতার ইতিহাস ধরেই করা চলে, আবার কোথাও কাশী কোথাও মদিনা- এ একমাত্র নজরুল কাব্যেই সম্ভব হয়েছে। বিশ্ব কাব্যে তা দ্বিতীয়রহিত।
নজরুল মানে সাম্য, নজরুল মানে বিদ্রোহ, নজরুল মানে লড়াই, লড়াই করার শক্তি ও প্রেরণা। এই বইয়ের বেশিরভাগ কবিতা স্কুলে থাকতে বিভিন্ন শ্রেণীর বাংলা পাঠ্যবইয়ে পড়েছিলাম। সাম্যবাদী, মানুষ, নারী, কুলি-মজুর এই কবিতাগুলো এখনো চোখে ভাসে। আহা নজরুলের কবিতার কি ভাষা! যেমন তেজ, তেমন গর্জন। বইটা পড়ার পর যেন স্কুলে পড়া কবিতাগুলোকে আরও ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারলাম। এমন অমর সব কবিতা দিয়েই জাতীয় কবি বেঁচে আছেন কোটি বাঙালির মনে।
I don't read Bangla poems that much. But Nazrul's poems always used to intrigue me. They are easy to read, easy to understand and absorb. Most of all their messages are nothing less than magnificent. If only we absorbed his messages instead of using him as a political and religious statement, this country would have been a way better place
বর্তমানে ডান-বাম, নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-পাহাড়ি ইত্যাদি ট্যাগ আমাদের মনুষত্ব্যের মাঝে বিভাজন রেখা টেনে দেয়ার চেষ্টা চলছে। নজরুল সমস্ত বিভাজন রেখা মুছে দিয়ে আমাদেরকে একতাবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন বলিষ্ঠতম শব্দচয়নে। একতার বড় দরকার, ভালো মানুষ হওয়ার জন্য, ভালো জাতি হওয়ার জন্য।