খুব ছোটরা গল্প পড়ে না, গল্প শোনে। একটু বড় হয়ে গল্পের বই পড়ে। আরও একটু বড় হলে ভূতের গল্প, রূপকথার গল্পে তার মন ভরে না। তখন চাই রহস্য, রোমাঞ্চ আর অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি। এই দশটি উপন্যাস কিশোরদের সেই ইচ্ছেপূরণের আখ্যান। উত্তরবঙ্গ লেখকের সুপরিচিত ভূখণ্ড। কাহিনিগুলিতে তাই উত্তরবঙ্গের চা বাগান, নদী, পাহাড়, অরণ্য নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে প্রতিফলিত হয়েছে বারংবার। একেবারে অন্য পরিবেশ, অন্য স্বাদ, অন্য জীবনের ভিন্নতর জগতের ছবি।ছোটদের মন ভরাবেই প্রখ্যাত সাহিত্যিক অশোক বসুর আকর্ষণীয় এই দশটি কিশোর উপন্যাস: লুকানো সোনা, বনের মধ্যে মন্দির, ভয়, রোমাঞ্চটা ছিল টানটান, উজ্জ্বল সকালে হঠাৎ অন্ধকার, খাদের ধারে পায়ের দাগ, মৃত্যুর নিপুণ শিল্প, অনাদি ঘোষালের মৃত্যুরহস্য, আঁধারবৃত্তে সূর্যোদয়, মনোজ কোথায় আছে। সহজ, সরল ভাষায় গতিময় সব কাহিনি। উপন্যাস পড়ার আনন্দের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরী খুঁজে পেয়ে যাবে তাদের নিজস্ব জগৎ। দুঃসাহসী অভিযানে আর রহস্যভেদে তারাও যেন সঙ্গী।
লুকানো সোনা বনের মধ্যে মন্দির ভয় রোমাঞ্চটা ছিল টানটান উজ্জ্বল সকালে হঠাৎ অন্ধকার খাদের ধারে পায়ের দাগ মৃত্যুর নিপুণ শিল্প অনাদি ঘোষালের মৃত্যুরহস্য আঁধারবৃত্তে সূর্যোদয় মনোজ কোথায় আছে
অশোক বসুর জন্ম ১৯৩৬, জলপাইগুড়ি শহরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের স্নাতক। প্রথম গল্প ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত। বড়দের জন্যে লেখার পাশাপাশি ছোটদের জন্যেও প্রচুর লেখেন। এ ছাড়া বেতারনাটকও লিখেছেন। ১৯৯৭ সালে সর্বভারতীয় বেতার নাটক। প্রতিযোগিতায় বাংলা হাস্যরসাত্মক নাটকে প্রথমস্থান লাভ। রাজ্য সরকারি অফিসে চাকরি করতেন। অবসরজীবন কাটে লেখালেখি করেই।
বছরের শেষপ্রান্তে এসে একটা আস্ত 'দশটি কিশোর উপন্যাস' পড়ে ফেলার ইচ্ছা বা পরিকল্পনা কোনোটাই ছিল না। তাও আবার অশোক বসুর বইটি। যা কিনা, আনন্দের এই সংকলন সিরিজের সবচেয়ে উপেক্ষিত কালেকশনের একটি। ডিমান্ডের নিরিখেও বহুদিন আউট অফ স্টক। কালের নিয়মে ব্রাত্য। তাই মাত্র আড়াই দিনে গোটা বইটা শেষ করে কতকটা আশ্চর্যই লাগছে এখন।
লেখকের সাথে কোনরূপ পূর্ব পরিচয় ছিল না। শুধু জানতাম, উনি উত্তরবঙ্গের মানুষ। জলপাইগুড়ির বাসিন্দা। আমার নিজ-শহরের লোক। উপরন্তু, দশটির মাঝে বইয়ের আটখানি লেখাই উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাতায় একদা প্রকাশিত। তাই, উপন্যাসগুলো একবার পড়ে দেখাটা কর্তব্য বলেই মনে হলো। এবং ফলস্বরুপ, বেশ চমৎকৃত হলাম, বলা যায়।
তবে আগে একটা ডিলেমার কথা বলি। বইপড়ুয়া হলে, এহেন ডিলেমা আপনার জীবনে আকছার ঘটে থাকবে। বলুন দেখি, চয়েস যদি আপনার হাতে, তবে আপনি কোনখানেতে ভোট দেবেন? 'ভালো লেখনীর সাথে দুর্বল গপ্পো', না 'দুরন্ত কাহিনীর সাথে বাঁধনহীন লেখা'? সুপাঠ্য গদ্য কি গড়পড়তা গল্পে প্রাণসঞ্চার করতে পারে? নাকি, প্লটই কাহিনীর শেষ মাপকাঠি?
সব দেখেশুনে, আপনি যদি ওই প্রথম পথের পথিক হন, তবে এ জিনিসে আপনি ভালোলাগার খোরাক পেলেও পেতে পারেন। প্লট বাছাইয়ে আহামরি বৈচিত্র না থাকলেও, গল্পের বাঁধুনি সুঠাম। লেখকের কলম বেশ কনফিডেন্ট ও গোছানো। ধীর লয়ে, হালকা চালের গদ্য, টুকটুক করে সবটা বেশ পড়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়। তবে লেখাগুলো অনেক পুরোনো। প্রথমটি রচিত ১৯৮৩তে। আবার শেষখানির জন্মতিথি, সেই ২০০১ সাল।
কাহিনীগুলোকে তাই দুটি ভাগে ভাগ করা যায়।
'লুকানো সোনা', 'বনের মধ্যে মন্দির', 'ভয়', 'রোমাঞ্চটা ছিল টানটান' ও 'মনোজ কোথায় আছে' - সবকটাই খাঁটি অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস। পুরোনো আমলের ক্ল্যাসিকাল ইচ্ছাপূরণের গল্প। কাপালিক, কিডন্যাপিং, রহস্যভেদ, গুপ্তধন। গোঁয়ার্তুমির আবেশে অভিযানের রোমাঞ্চ। যা শিশুতোষ, তবুও মনোরঞ্জক।
বাকি পাঁচটি একেবারে ক্রিস্টি মার্কা গোয়েন্দা কাহিনী। 'উজ্জ্বল সকালে হঠাৎ অন্ধকার', 'খাদের ধারে পায়ের দাগ' ও 'আঁধারবৃত্তে সূর্যোদয়', এই তিনটে গল্পে থিম্যাটিক সামঞ্জস্য স্পষ্ট। অবশ্য এতে আগাথার গন্ধ রইলেও, ক্ষুরধার বুদ্ধির প্রকাশ নেই বললেই চলে। সবই প্রায় ঘুরেফিরে এক। উত্তরবঙ্গের কোনো পাহাড়ি টুরিস্ট স্পট। হোটেল বা গেস্ট হাউস। একগুচ্ছ আগন্তুকের আগমন। একটি মৃত্যু। ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক গোয়েন্দার প্রাথমিক তদন্ত। হঠাৎ রহস্যভেদ। এই।
বাকি দুটি লেখা শহুরে লকড রুম মিস্ট্রি। দুটোতেই আবার চমৎকার মিল। 'অনাদি ঘোষালের মৃত্যুরহস্য' মাত্র ষোলো পৃষ্ঠার একটি কাহিনী। যা 'মৃত্যুর নিপুণ শিল্প' নামক উপন্যাসিকাটির একটি অক্ষম প্রতিরূপ মাত্র। দুটোতেই আবার পুলিশ গোয়েন্দার নাম ইন্দ্রজিৎ। ভাবলাম, বুঝি একই সিরিজের অংশ। খুঁটিয়ে দেখে বুঝলাম এক গল্পে ডিটেকটিভের নাম ইন্দ্রজিৎ গুহ তো আরেকটায়, ইন্দ্রজিৎ সেন। তাই নাম বা পদবীর আলাদা কোনো গুরুত্ব নেই। বিশেষত, যেখানে লেখকের প্রতিটি রহস্যভেদীই বাচনভঙ্গি ও কর্মপদ্ধতির দিক দিয়ে আদ্যোপান্ত অভিন্ন।
কিন্তু, এই আপাতঅর্থে নিরীহ, মুডি, থ্রিলবিহীন গোয়েন্দা কাহিনীগুলোর গ্রহণযোগ্যতা এর আশ্চর্য প্রাপ্তবয়স্কতায় বিদ্যমান। আশ্চর্য হচ্ছেন? আমিও হয়েছিলাম। কস্মিনকালেও ভাবতে পারিনি, যে আনন্দ পাবলিশার্সের কিশোর উপন্যাস নিয়ে বসে, গল্পে গালাগাল, পরস্ত্রীকাতরতা, বা প্রেম প্রেম সমীকরণ পেয়ে যাবো। লেখককে দোষ দিয়ে কি লাভ? রহস্য গল্পে ষড়রিপুর বহিঃপ্রকাশ তো নেহাতই স্বাভাবিক।
আমি শুধু ভাবছি সংকলনের পূর্বে কি কেউ লেখাগুলো পড়ে দেখেনি? নাকি আনন্দ গোষ্ঠীর পুরোনো হিসেবে, কিশোর শব্দটির সংজ্ঞা আলাদা ছিল? হলে, বলতে হয়, সমাজ হিসেবে আমরা একটু রিগ্রেসই করে ফেলেছি।