আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্নভঙ্গ, ঠাঁইনাড়া, জীবন সংগ্রাম, পরিবার - আত্মস্মৃতির এ এক বিনি সুতোর মালা শীর্ষেন্দুর কলমে।আসলে এই বইটি হল এক আশ্চর্য ভ্রমণ। জীবনের বয়ে চলা। গল্পে - উপন্যাসে পাঠক, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই ঘোর লাগা রহস্যের ভাষাকে এতকাল উপলব্ধি করেছেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবার কলম ধরেছেন চরিত্রের মুখে নয় - নিজের জীবনপ্রবাহ থেকে তুলে আনতে কাঁচা ঘর, লাল সুরকির রাস্তা বেয়ে সারা জীবনের কোলাহল। এই বই বাংলা আত্মজৈবনিক লেখালেখির অনন্য সংযোজন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কলমে এই প্রথম তাঁরই জীবনপ্রবাহের খুদকুঁড়ো।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
কি সুন্দর একটা বই!😍 ছোটবেলার স্মৃতি রোমন্থন করতে আমরা কমবেশি সবাই খুব ভালোবাসি,এই একটা মাত্র সময়ই বোধহয় প্রতিটা মানুষের জীবনে এত সুন্দর আর রঙিন স্মৃতি দিয়ে ঘেরা থাকে যে হাজার কাজের ফাঁকে ফাঁকে,মন খারাপের দিনগুলোতে কিংবা খুব আনন্দের সময়ে টুপ করে কোনো না কোনো কথা মনে পড়ে যায়.ছেলে বুড়ো যুবা সবার কাছেই যেন এ এক সুখের অধ্যায়.কদাচিৎ এমন লোক পাওয়া যায় যার ছেলেবেলায় হারিয়ে যাওয়ার দুরন্ত দুর্নিবার ইচ্ছে ঘুরেফিরে আসে না।
আমার বেশ মনে আছে ছোটবেলায় গ্ৰামে বেড়াতে গেলেই বাবার কাঁধে উঠে সারা পাড়া ঘুরে বেড়াতাম,পাড়াবেড়ানী বলে আমার বেশ সুনাম(দুর্নাম!)ছিল বৈকি😐কে কোন কথা বলে আর তাতে আমি গাল ফুলিয়ে কাঁদতে বসি এই ভয়ে বাবা নিজেই আমাকে নিয়ে এপাড়া থেকে ওপাড়া ঘুরে বেড়াতো, মাঝেমধ্যে বোনাস হিসেবে এ গাছ থেকে আম ও গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে খাওয়ার ধুম তো ছিলই,আরেকটা জিনিস ছিল আমি ভীষন মাছ ভালোবাসতাম (বাসতাম কারন এখন গন্ধ পর্যন্ত সহ্য করতে পারি না)মা মাছ ভেজে উঠায় রাখতে না রাখতেই চুপিসারে খেতে যেয়ে কতবার যে বকা খাইছি মাছের চেয়ে বেশি তার হিসেব নেই,ত্রাতার ভূমিকায় তখন নানু বা খালামনিরাই বাচাতো বেশিরভাগ সময়।
লেখকদের জীবনী নিয়ে সাধারনের আগ্ৰহের শেষ নেই, ক্লাস এইটে থাকতে বৃত্তি পরীক্ষার মধে্যই লুকিয়ে পড়েছিলাম সুনীলের "অর্ধেক জীবন"তার শৈশব থেকে শুরু করে যৌবনের প্রতিটা বিষয় নিয়ে খুঁটিনাটি এত সুন্দর করে লেখা ছিল যে চুম্বকের মত এ বইয়ের পিছনে দিয়েছিলাম আমার সিংহভাগ সময়ই.এরপর থেকেই এ ধরনের বই পেলে লুফে নিতাম কোনো চিন্তা ভাবনা ছাড়াই.আর অনেক দিন এই বইটা নিয়ে মনে হচ্ছে সিদ্ধান্ত নিতে এবারো ভুল করিনি মোটেও।
শীর্ষেন্দুর এই বইটা মোট ছোট ছোট ৩৫টি অধ্যায় আছে,পড়তে পড়তে হারিয়ে গিয়েছিলাম রুনুর(শীর্ষেন্দুর ডাকনাম) ছোট বেলার স্মৃতি বিজড়িত সব জায়গা গুলোতে,তার সে ময়মনসিংহের বাসা, বিক্রমপুরের পৈতৃক বাড়ী কিংবা বাবার রেলের চাকরির সুবাদে ঘুরে বেড়ানো শিলিগুড়ি কোচবিহার সহ আরো নানা জায়গায়.এত গুছিয়ে লেখা এই বইয়ের প্রতিটা পাতায় পাতায় যেন ছড়িয়ে আছে নির্মল আনন্দের ঝরনাধারা.রুনুর বমা,প্রিয় কুকুর পপি,তার ব্যক্তিত্বশীল বাবা,ধ্রুবদা, সাইকেল বাজ বন্ধু সহ আরো নানা চরিত্রের মাঝে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ নিশ্চিত।
শীর্ষেন্দুর ছোটবেলা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ছিলো কারন বাবার ছিলো সরকারি বদলি চাকরি।ফলে কোথাও থিতু হবার দায় ছিলোনা। সারা বাংলার নানান স্থানে তাঁর শৈশব কেঁটেছে। ফলে নানান মানুষ,জায়গা আর বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এক শৈশব তিনি পেয়েছেন। আর সেইসব অভিজ্ঞতার ছোট ছোট গল্প খুদকুঁড়োর ন্যায় তিনি অত্যন্ত সাবলীলতার সাথে আমাদের শুনান উক্ত গ্রন্থে। শীর্ষেন্দুর মিঠে গদ্য স্মৃতিগুলোকে ও করে তোলে বেশ মিষ্টি..
সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশ, পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য জগতের তিন মহারথীর মাঝে শীর্ষেন্দু বরাবরই আমার পছন্দে এগিয়ে। মূল কারণ তাঁর ন্যাকামিবর্জিত অথচ সহজ কোমল ভাষাভঙ্গী আর তাঁর লেখার চরিত্রগুলো। শীর্ষেন্দুর চরিত্ররা যখন উদ্ভট কাণ্ড করে, তখনো তাদের খুব কাছের মানুষ মনে হয়, কারণ তাদেরকে তিনি তুলে আনেন আমাদের চারপাশের অতি পরিচিত মানুষগুলো থেকে। তাই শীর্ষেন্দু যখন স্মৃতিকথা লেখেন, সেখানেও উঠে আসে তাঁর পরিবার-প্রতিবেশী-আত্মীয়বান্ধবদের মাঝে দেখা আপাত অকিঞ্চিৎকর অনেক মানুষ আর তাদের নিত্যদিনকার জীবনযাপনের খুঁটিনাটি। সেসব মানুষ বা ঘটনা হয়তো পৃথিবী বা কালের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, কিন্তু একজন শীর্ষেন্দু'র বেড়ে ওঠায় তাদের ভূমিকা কম নয়। শীর্ষেন্দু'র লেখালেখি কেন মানুষের কাছাকাছি, তাঁর স্মৃতিকথা 'খুদকুঁড়ো' পড়লে সেটার আঁচ পেতে কষ্ট হয় না।
স্মৃতিকথার সঙ্কলনটি ছোট ছোট লেখায় ভাগ করা। প্রতিটা লেখায় কোন না কোন একজন পরিচিত মানুষের কথা। দেখে পরিতোষ সেন-এর 'জিন্দাবাহার'-এর কথা মনে পড়বে। তবে পরিতোষের মানুষগুলো বেশ অসাধারণ বা ব্যতিক্রম ছিলেন, অভিজ্ঞতাগুলোও কিছুটা অন্যরকম। শীর্ষেন্দু'র বেলায় সেরকম কিছু নয়। মনে হবে প্রতিদিনকার কথা পড়ছি। পাড়ার কাকীমা, রেলের সূত্রে পরিচিত মামা-কাকা, নিজের জ্যেঠিমা-পিসি, পোষা কুকুর, পাড়ার বা স্কুলের কোন ছেলে, এদের নিয়েই গল্পসল্প। আমি সম্ভবত বুড়ো হয়ে গেছি, কারণ ভদ্রলোকের শহর বা গ্রাম বা মানুষের বর্ণনা আমার কাছে পরিচিতই মনে হলো, অন্তত ছোটবেলায় হলেও সমাজের এরকম চিত্রই দেখেছি। এখনকার প্রজন্ম এই যোগাযোগটা খুঁজে পাবে কিনা সন্দেহ আছে। এক বসাতেই শেষ করে ফেলেছি, কিন্তু আফসোস হলো, বইটার আকার বেশ ছোট। এরকম বহমান লেখনী আর ২০০-৩০০ পৃষ্ঠা চললেও পড়তে কোন ক্লান্তি বোধ করতাম না। প্রকৃত রেটিং সাড়ে তিন দেয়াই যুক্তিযুক্ত, কিন্তু শীর্ষেন্দু'র প্রতি পক্ষপাতের জন্য ৪ তারা দেয়া গেল।
বিঃ দ্রঃ বইটা প্রায় বছর দু'য়েক হলো খুঁজেও পাইনি, দোকানে বা ইন্টারনেটে। এ মুহূর্তে দেশের বাইরে থাকায় হার্ডকপি পাওয়া সম্ভব ছিল না। অবশেষে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়াতে ইশরাত জেরিন এবং হারুন আহমেদ-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা।
ময়মনসিংহে জন্ম নেওয়া শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কিশোরবেলার একটা বড়ো সময় কাটে পূর্ববঙ্গে। এরপর পিতার রেলের চাকরির সূত্রে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে থেকেছেন। এই সময়ে দেখা পেয়েছেন বিচিত্র কিছু মানুষের। তারা হয়তো অনেকের চোখেই ভীষণ সাদামাটা। নেই কোনো বিশেষত্ব। তবুও তারাই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছেন। তাদেরকে নিয়ে ছোটো ছোটো স্মৃতিচারণ লিখেছেন তিনি।
'খুদকুঁড়ো' দুর্দান্ত কোনো বই নয়। তাই পড়তেই হবে তা-ও মনে হয়নি। তবুও আলাদা রকমের এক সৌন্দর্য ও সারল্য শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখায় থাকে। সম্ভবত তারই গুণে তরতরিয়ে পড়া যায় ওনার যে কোনো লেখা।
আর, ছোটোবেলায় আমাদের মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা থাকে অপরিসীম। যত বড়ো হই, তত হারিয়ে ফেলি বিস্মিত হওয়ার সেই অনুপম ক্ষমতা। কিশোর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তার সেই মুগ্ধ হওয়ার সময়কে কিছু ঘোলাচোখে গড়পড়তা অথচ মনোযোগ দিয়ে দেখলে বৈচিত্র্যময় স্বভাবের মানুষের দেখা পেয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে কলমের মাধ্যমে অমর করে রাখলেন।
কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই বইটা পড়ুন। নিঃসন্দেহে ভালো লাগবে।
স্মৃতি মানুষের মূল্যবান একটা সম্পদ। এই স্মৃতি মানুষকে সময়ে আনন্দ দিতে পারে আবার দুঃখ ও। লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বাবা ছিলেন রেলের কর্মচারি,ফলে তাদের ছিল যাযাবর জীবন। একটা জায়গায় কখনো স্থির হয়ে থাকেন নি। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে,বিভিন্ন ধরনের মানুষের দেখা পেয়েছেন। একেক জায়গার স্মৃতি একেরকম। শৈশবের বিভিন্ন রঙিন স্মৃতি লেখক চমৎকার ভাবে এই বইয়ে লিখেছেন। এতে লেখকের ছোট বেলাকার জীবন সম্পর্কে খানিক ধারণা করা যায়।
শীর্ষেন্দু বাবুর কলমের যাদু বরাবর উজ্বল,প্রতিটা স্মৃতি কথা এত চমৎকার করে লিখেছেন,পড়তে দারুণ লেগেছে। সত্যি ই দারুণ একটা বই খুদকুঁড়ো। এই বইটার ও সন্ধান দিয়েছে হারুন ভাই। ভালোবাসা ভাই আপনাকে।
ছোটবেলার স্মৃতি সময়ই মধুর। বাচ্চাকালের মজার সব ঘটনার মধ্যে দেশভাগের কারনে লেখকের মনোকষ্টের ছাপটা স্পষ্ট বোঝা যায়। শীর্ষেন্দুর একটা পূর্নাঙ্গ আত্মজীবনী পড়ার সৌভাগ্য কী পাঠকদের আদৌ হবে? মনে হয় না।
এই ছোট্ট জীবনে আমরা কতশত মানুষের সংস্পর্শে আসি। আমাদের চরিত্র গঠনে,মনন তৈরিতে এইসব মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। সকলের কথা কি আমাদের মনে থাকে?মনে পড়ে?